জিজ্ঞাসু : – পরিবেশ দূষণের ফলে অনেক পাখি বর্তমানে অবলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, এগুলি কি আবার এদেশে পরে দেখা যাবে ?
গুরুমহারাজ : – এগুলি জীব বিজ্ঞানের আর পরিবেশ বিজ্ঞানের ব্যাপার, জৈব-অভিব্যক্তি এবং অভিযোজনের ব্যাপার ! যে জীব যেখানে অনুকূল পরিবেশ-পরিস্থিতি পাবে, সেখানেই বসবাস করবে, সেখানেই সে বংশবিস্তার করার চেষ্টা করবে – এটাই প্রাকৃতিক নিয়ম ৷ এবার প্রকৃতিতে কোনোরকম পরিবর্তন ঘটে গেলে জীবকুল অন্যত্র Migrate করার চেষ্টা করে । সেখানে উপযুক্ত পরিবেশ পেলে টিকে যায়, নাহলে অবলুপ্ত হয়ে যায় ৷
আমাদের ছোট বয়সে গ্রামে-গঞ্জে “হাড়গিলা” পাখি দেখতাম । ওরা শ্মশানে, ভাগাড়ে ঘুরে বেড়াতো ৷ মৃত পশুর হাড় গোটা গোটা গিলে খেয়ে নিতো । কি সাংঘাতিক হজম ক্ষমতা ভাবো একবার ! লম্বা লম্বা হাড় বড় বড় ঠোঁটে ঠুকরে ঠুকরে ফাটাতো, তারপর ৬”- ৮” হাড় কপাকপ্ গিলে খেয়ে নিতো । এখন আর এসব জায়গায় হাড়গিলা পাখি দেখা যায় না । ওরা নিরাপদ জায়গা দেখে কোথাও চলে গেছে, তবে লুপ্ত হয়ে যায়নি ৷ আগে আমরা আরো অনেক পাখি গ্রামের এখানে ওখানে দেখতে পেতাম – এখন আর পাই না । এখন এখানে(পশ্চিমবঙ্গে) শকুন কমে যাচ্ছে – হয়তো অন্য কোথাও এরা উপযুক্ত পরিবেশ পেয়ে বাসস্থান তৈরি করে নিয়েছে । অনেক আগে ভারতবর্ষে সাদা কাক ছিল – এখন অস্ট্রেলিয়ায় পাওয়া যায়! পৃথিবীর অন্যান্য কিছু দেশেও সাদা কাক রয়েছে, আফ্রিকায় আছে সাদা-কালো মিশ্রিত রঙের কাক । সিগাল ঠান্ডার দেশের সামুদ্রিক পাখি, তবে যে কোনো স্থানের সমুদ্রের ধারে এদের দেখা মেলে। কোন্দর মেরুপ্রদেশের পাখি, এরা যাযাবর পাখি । মেরুপ্রদেশের জল জমে বরফ হয়ে গেলে এরা ওখান থেকে Migrate করে । একটানা ৫০০০ কিমি continuous উড়তে পারে !
পরিযায়ী পাখিদের গতিপথ নির্দিষ্ট । নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট Root-এ এরা উড়ে যায় ৷ বংশপরম্পরায় একই রীতি মেনে চলা – এটা একটা সাংঘাতিক প্রাকৃতিক ব্যাপার ! বিভিন্ন পশুরাও বছরের নির্দিষ্ট সময়ে Migrate করে, আবার ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঠিক ফিরে আসে । মাছেদের মধ্যে এবং কচ্ছপদের মধ্যেও এই একই রীতি দেখা যায় । লক্ষ লক্ষ কচ্ছপ, হাজার হাজার মাইল সমুদ্রপথ পেরিয়ে এসে নির্দিষ্ট স্থানে এসে ডিম পাড়ে – তারপর বাচ্চা জন্ম দিয়ে তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে নিজের জায়গায় ফিরে যায় ।
মেরু প্রদেশের সিলমাছ বা পেঙ্গুইনরাও বাচ্চা উৎপাদন বা পালনের জন্য বহু পথ অতিক্রম করে নির্দিষ্ট স্থানে যায়, বহু বাধা অতিক্রম করতে হয়, তবু ঠিক পৌঁছে যায় । আমি যখন ইউরোপে ঘুরছিলাম (১৯৯০-১৯৯১) তখন বিভিন্ন ভক্তদের বাড়িতে National Geography চ্যানেল বা এইসবের উপর C.D. দেখেছিলাম (তখনও ভারতে National Geography চ্যানেল টিভিতে দেখানো হোতো না)। বিভিন্ন জীববিজ্ঞানীরা বনে, জঙ্গলে, পাহাড়ে, মেরুপ্রদেশে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন পশুপাখিদের জীবনযাত্রা Photography করে নেয় এবং Record করে রাখে । পরে সেগুলো বাজারে ব্যবসাভিত্তিকভাবে প্রকাশ করে বা কোনো টিভি চ্যানেলকে বিক্রি করে দেয় ৷ যাইহোক, আমরা সাধারন মানুষ তো এগুলো বনে-জঙ্গলে গিয়ে কখনও দেখতে পারতাম না, বাড়িতে বসে দেখা যায় ! এগুলি জীববিজ্ঞানের ছাত্রদের বা গবেষকদের ভীষণ কাজে লাগে । আমিও আমার এখানকার ছাত্রদের জন্য কিছু National Geography-র Cassette নিয়ে এসেছি । তোমরাও ইচ্ছা করলে চিৎবিলাসানন্দ-কে(মদন মহারাজ) বলে ওগুলো দেখতে পারো ।৷
তবে, তুমি পরিবেশ দূষণ নিয়ে যেটা বলতে চাইছিলে__ ওটা বর্তমানে গোটা পৃথিবীর সমস্যা। বিভিন্ন প্রজাতির পশুপাখি কেন__মনুষ্যপ্রজাতি-ই তো আজ এর জন্য বিপন্ন! মানুষ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতি ঘটিয়ে নিজেদের ভোগ-বিলাস, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ইত্যাদি বহাল করতে গিয়ে _প্রকৃতির উপর বারবার আঘাত হেনেছে। ফলে, প্রকৃতির সহজতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, harmony হারিয়ে যাচ্ছে, ছন্দবদ্ধতার পতন ঘটছে ! তার‌ই ফলটা তুমি দেখছো _ পৃথিবীর উপরিস্তরের তাপমাত্রা বাড়ছে, হিমবাহের বরফ গলছে, সমুদ্রের জলস্তর বাড়ছে, অনেক জীব অবলুপ্ত হচ্ছে ! আরও কতো কি ঘটে যাচ্ছে _যেগুলো হয়তো তুমি জানতেও পারছো না!
(ক্রমশঃ)