জিজ্ঞাসু :– আপনি বলেছিলেন এই জগৎসংসার প্রাণ থেকেই জাত হয়েছে, আবার প্রাণেই মিশে যাবে । এই প্রাণটা তাহলে কি ?
গুরুমহারাজ :– উপনিষদ বলেছে, “প্রাণঃ জায়তে” । প্রাণ থেকেই সবকিছু জাত হয় বা জন্মলাভ করে । ‘বিশ্বপ্রাণ’ বলে একটা কথা রয়েছে, এখানে ‘প্রাণ’ বলতে ওই বিশ্বপ্রাণের কথাই বলা হয়েছে । ভারতীয় শাস্ত্রে এই ‘প্রাণ’-কেই ঈশ্বর বলা হয়েছে । ব্রহ্ম এবং শক্তি, নির্গুণ বা static অবস্থা ব্রহ্ম আর dynamic অবস্থাই হোল শক্তি বা প্রাণ । প্রাণ থেকেই জগৎ সংসার সৃষ্টি হয়েছে, প্রাণেই বিধৃত হয়ে আছে, আবার চূড়ান্ত পরিণতিতে সবকিছু সেই প্রাণেই মিশে যাবে – এটাই প্রাণতত্ত্ব ৷ প্রাণবায়ুর সাথে বেদোক্ত ‘প্রাণ’-কে গুলিয়ে ফেললে হবে না। শরীরে যে পঞ্চপ্রাণ ক্রিয়াশীল, সেই পঞ্চপ্রাণ হোল পঞ্চবায়ু I যেগুলির নাম প্রাণ, অপান, সমান, উদান, ব্যান । এই পঞ্চবায়ু বা পঞ্চপ্রাণ শরীরে ক্রিয়াশীল হোলে _তবেই জীবের শরীর জীবন্ত থাকে ৷ এই প্রাণবায়ু ক্রিয়াশীলতা হারালে জীবের মৃত্যু ঘটে । ভারতীয় যোগবিজ্ঞান বহু বছরের Research -এ দেখেছে যে, মানব শরীরে প্রাণকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় প্রাণায়ামের দ্বারা ৷ প্রাণ-অপান এই দুই বায়ুর উপর নিয়ন্ত্রণ আনতে পারলে, তখন সমান বায়ুর ক্রিয়াশীলতা প্রকট হয় । আমাদের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস হলো প্রাণ আর অপানের খেলা ৷ ধ্যানের গভীরতায় এমনটি আপনা আপনিই হয়ে থাকে। তাছাড়া বিভিন্ন যোগমুদ্রার সাহায্যে প্রাণ ও অপানকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে, তখন মানব শরীরের সুষুম্নাকাণ্ড বরাবর সমান বায়ুর ক্রিয়া শুরু হয় ৷ স্বাভাবিক শ্বাসক্রিয়া সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় – কিন্তু শরীরের অভ্যন্তরীণ ক্রিয়া ঠিক থাকে । যোগের এই অবস্থাকে প্রাথমিকভাবে ‘ভাবসমাধি’ অবস্থা বলা হয় (নির্বিকল্প সমাধি অবস্থা আর ও উন্নত অবস্থা)। সাধকের এই সমাধি অবস্থাতেই সেই ‘মহাপ্রাণ’ বা বিশ্বপ্রাণের সাথে যোগাযোগের সূচনা ঘটতে থাকে ৷ তাই তখন নিজের শরীরের উপরেই আর নিজের‌ই control থাকে না।
মানব শরীরের পঞ্চপ্রাণের ‘প্রাণ’কে অবলম্বন করে যে সাধনা শুরু হয়, বিশ্বপ্রাণে মানবচেতনা সম্পূর্ণভাবে লীন হওয়াতেই সেই সাধনার পরিণতি ! এই সমগ্র পদ্ধতিকে শাস্ত্রে ‘প্রাণ-উপাসনা’ বলা হয়েছে ৷
যাইহোক, প্রাণতত্ত্ব নিয়ে অনেক আলোচনা হোল, তবে শুধু শুনে তো আর কোনো কাজ হবে না_কাজের কাজটি করতে পারলে তবেই এই জীবনেই সুফল লাভ করতে পারবে ‌। তাই কথা শুনে যেটুকু ধারণা হোলো, সেইটাকে সম্বল করেই এবার শুরু করে দাও ‘প্রাণ-উপাসনা’।৷ (ক্রমশঃ)