জিজ্ঞাসু :– অনেক পণ্ডিতেরা বা গবেষকেরা দেখেছে যে ভগবান বুদ্ধের সঙ্গে যীশুর নাকি অনেক মিল রয়েছে ?
গুরুমহারাজ :– রয়েছেই তো ! ভগবান বুদ্ধের প্রায় ৫০০ বছর পরে যীশুর জন্ম হয় ৷ যীশু কিশোর বয়সে তৎকালীন ভারতের অন্তর্গত তিব্বতে এসে গুরুলাভ করেন এবং বেশ কিছুদিন এই অঞ্চলে সাধন-ভজনও করেছিলেন । তখন ভারতীয় উপমহাদেশে বৌদ্ধ প্লাবন চলছে – ফলে তিব্বতীয় সাধু-পরম্পরাতেও বৌদ্ধ প্রভাব ছিল । তাই যীশুর মধ্যে বুদ্ধের প্রভাব থাকা বিচিত্র কিছুই নয় । স্থান-কাল-পাত্র ! এখনকার পরিবেশ-পরিস্থিতি দিয়ে আজ থেকে দু’হাজার বছর আগের পরিস্থিতি বিচার করতে গেলে মস্ত ভুল হয়ে যাবে ।
তাছাড়া আর একটা কথা মনে রাখবে যীশুর শিক্ষা ইউরোপে ছড়িয়েছে যীশুর মৃত্যুর প্রায় ১০০ বছর পর । সেখানেও সময়ের বিস্তর ব্যবধান ঘটে গেছে ৷ ফলে এতোটা সময়ের মধ্যে অনেক কিছু মিল বা অমিল ঢুকে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয় ! তবু যেটুকু তথ্য পাওয়া যায়, তাতে দেখা যায় যে, এই দুজনের মধ্যে সত্যিই অনেক মিল ছিল ! উদাহরণস্বরূপ যেমন ধরো__ বুদ্ধের ত্রিশরণ, খ্রিস্টধর্মের Trinity, বৌদ্ধদের বোধিবৃক্ষই খ্রীষ্টসমাজে X-mas tree, বুদ্ধদেবের জাতকের গল্পের মতোই খ্রীষ্টানদের Parable ! যদিও জাতকের গল্প, বুদ্ধের পূর্ব পূর্ব জীবনের ঘটনা বলে ধরা হয় কিন্তু গল্পের মাধ্যমে শিক্ষা দেবার ব্যাপারটা Common ! তাছাড়াও বৌদ্ধধর্মের ধর্মগুরু যেমন ‘দলাই লামা’ ইত্যাদি রয়েছে__ খ্রিস্টধর্মে ওইরকমই ধর্মগুরু হোলেন ‘পোপ’। এইরকমভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার করলে আরো অনেক মিল পাওয়া যায় ।
কিন্তু দ্যাখো, এসব সাদৃশ্য দেখেই বা কি হবে ? ‘কালে’-র (Time) নিজস্ব ধর্ম রয়েছে – সবকিছুই সেই ‘কালে’-র অধীন ৷ তাই ‘কাল’ যখন যাঁর উপর প্রসন্ন হয়, তখন তাঁর কথাই মানুষ শুনে থাকে । এইভাবে কোনো সময় ভগবান বুদ্ধের প্রভাবে বৌদ্ধধর্ম বিশ্ব জয় করেছিল, পরে আবার ঈশ্বরপুত্র যিশুখ্রিস্টের প্রভাবও বিশ্বের কোনায় কোনায় ছড়িয়ে পড়েছিল, আবার দ্যাখো_ আরো পরবর্তীতে হযরত মুহাম্মদের প্রভাব পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়েছে!
কিন্তু কোথায় মুশকিল হয়েছে জানোতো – যখন থেকে এইসব মহামানবদের followers-রা, বিশেষতঃ ধর্মীয় নেতারা তাদের নিজ নিজ Prophet-দের শিক্ষাকে ‘উপলক্ষ’ হিসাবে সাব্যস্ত করে, নিজেদের মতামত প্রতিষ্ঠাটাকেই ‘লক্ষ্যে’ পরিণত করার চেষ্টা করেছে ! তখন থেকেই সাধারণ হিন্দুদের মধ্যে ঠাকুর-দেবতার থেকে পুরোহিতরা বড় হয়েছে, এই একইভাবে খ্রীষ্টান সমাজে সাধারণের কাছে পোপ-পাদ্রীরা খ্রীষ্টের চেয়ে মহান প্রতিপন্ন হয়ে গেছে, মুসলমানদের কাছে মোল্লা-মৌলভিরাই আল্লাহ্-র থেকে বড় হয়ে গেছে __কারণ সাধারণ মানুষ তাদের মনগড়া ধর্মশাস্ত্রের ব্যাখাকেই প্রকৃত ধর্ম ভেবে বসে এবং তাদের সৃষ্ট বিধি-বিধানকেই শ্রেষ্ঠ ধর্মাচরণ বলে মনে করে!
আর শুধুমাত্র এই একটা কারনে সকল ধর্মমতেই সাম্প্রদায়িকতা দৃঢ়ভাবে বাসা বেঁধেছে। সকলেই চাইছে__ আপন আপন ধর্মমতকে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে – সবার উপর নিজের মতকে চাপিয়ে দিতে ! কিন্তু সে যদি একবার ‘নিজে’-কে ভালো করে দেখে, ‘নিজের চারিপাশ’-কে ভাল করে দেখে এবং বিচার করে যে – “সে কি ভালো আছে?” “তার চারপাশের মানুষজন কি ভালো আছে ?” “সে কি জাগতিক চাওয়া-পাওয়া, কামনা-বাসনার ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছে ?” “সে কি জীবনে শান্তি পেয়েছে বা নিজে প্রকৃত অর্থে শান্ত হতে পেরেছে ?” ____তা যদি সে না পারে, তাহলে কেন আবার সে অপরকে পুনরায় একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে আনতে চাইছে ? এমনটা যে করতে চাইছে সে অবশ্যই ভ্রান্ত বা বিকৃত !
যিনি এইসব রহস্য অবগত হয়েছেন, তিনি কখনও অপরকে অকারণ প্রভাবিত করার চেষ্টা করবেন না । তিনি আগে তাঁর স্ব-ধর্মমতের শিক্ষা সমূহকে নিজের জীবনে যোজনা করবেন – দেখবেন যে এর মধ্যে প্রকৃত সত্যটা কি ? সেই সত্যের বোধ হলে তবে তিনি অপরকে শেখাবেন । এটাই ভারতীয় সনাতন পদ্ধতি !
ঋষিরা আগে ধ্যানের গভীরে, জ্ঞানের গভীরে পরমসত্যের বোধ করলেন, তারপর জগৎবাসীকে বললেন, “শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রা, আ যে ধামানি দিব্যানি তস্থূ । !”
সেমেটিক বা সুমেরীয়দের স্বভাবেই রয়েছে – “অপরকে জোর করা” । বহু পূর্বে ওরা নিজেদের দেশের রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল জোর করে – লড়াই করে । ওরা যে কোনো ধর্মমতকে যখন প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে, তখনও তা করেছে জোর করে – গলায় পা দিয়ে বা গলায় ছুরি ধরে !
এর ফলটা কি হয়েছে ___ এর ফলে ‘জোর করে আনা’ এই নতুন ধর্মাবলম্বীদের ঐ “ধর্মমতে”-র প্রতি শ্রদ্ধা যতটা না এসেছে, তার থেকে বেশি তৈরি হয়েছে ‘Reaction’ ৷ ব্যাপারটা হয়েছে অনেকটা ‘লেজকাটা শেয়ালে’-র গল্পের মতো ! আমার লেজ যখন কেটেছে তখন তোরটাও কাটুক – এইরূপ Reaction এই ধর্মাবলম্বীদের ভিতরে খুবই রয়েছে ৷
কিন্তু সে যাইহোক, আগে যে বলছিলাম __প্রকৃতপক্ষে বলবান হোলো _’কাল’ বা Time ! ‘কাল’ যতদিন যে ব্যক্তির উপর বা যে বিষয়ের উপর প্রসন্ন থাকে, ততদিন সে-ও ‘কালে’র বলে বলীয়ান হয়ে ওঠে । যে মুহূর্তে ‘কাল’ অপ্রসন্ন হয়ে যায়, সেই মুহূর্ত থেকেই ঐ ব্যক্তি বা বিষয় বলহীন হোতে শুরু করে দেয়। আজ থেকে হাজার বছর বা তার কিছুটা আগে, ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা ‘ইসলাম’ নিয়ে আগ্রাসী ছিল ! আরব থেকে বেড়িয়ে এই ধর্মমতের ধ্বজা এশিয়া মহাদেশ,আফ্রিকা মহাদেশ এমনকি ইউরোপেও উড়ছিল! কিন্তু আবার দ্যাখো, মাত্র ২৫০/৩০০ বছর আগে বলা হোত __ইংরেজ রাজত্বে সূর্যাস্ত হয় না ! সেই সময় থেকে ইসলামের প্রসার কমতে লাগলো ! কারণ তখন ‘কাল’ ইউরোপীয়দের উপর অনেক বেশি প্রসন্ন ছিল I এখন মহাজাগতিক নিয়মটা হোচ্ছে ‘মহাকাল’-কে প্রসন্ন করতে হবে ! যারা ‘কালে’র সু-উপযোগ করতে পারেনা –তাদের প্রতি ‘কাল’-অপ্রসন্ন হয়ে যায় ! তাদের অগ্রগতি ব্যাহত হয়। এখন যাদের উপর ‘কাল’ প্রসন্ন তারাও যদি ‘কালে’র প্রসন্নতা অর্জন না করতে পেরে _ এর দূরোপযোগ করে, তাহলে তারাও কালের বুকে হারিয়ে যাবে !
নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে গেলে ‘কাল’-কে প্রসন্ন করতেই হবে ৷ এটা মহাজাগতিক নিয়ম এবং এটাই যুগে যুগে মহাপুরুষদের শিক্ষা_ বাবা ! কিন্তু মানুষ সে শিক্ষা গ্রহণ করে কই ? মহাকালের বুকে কত বড় বড় তরঙ্গ উঠেছে – অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে, আবার মহাকালের বুকেই সমাহিত হয়ে গেছে ! কত তরঙ্গ উঠে সাথে সাথেই মিশে গেছে, কোনটা হয়তো কিছুটা বিস্তৃতি লাভ করেছে ! কিন্তু সমুদ্রের কোনো পরিবর্তন হয় নি। ঠিক তেমনি মহাসমুদ্রের মতোই_ ‘মহাকাল’_ যেমনকার তেমনই রয়ে গেছে !
সুতরাং এটা জেনে রাখবে যে, যুগপুরূষ ছাড়া কোনো একটা সাধারণ শক্তিশালী মানুষ অথবা তার সঙ্গে জোট বাঁধা কিছু মানুষ লাফালাফি করে কখন্ই মহাকালের নিয়মকে বদলাতে পারে না । আর পারবেও না ! কোনোদিনই পারবে না।
তবে ঐ যে বললাম_ কেউ কেউ পারেন – আর তা পারেন একমাত্র কোনো মহামানব ! সাধারণ মানুষ কি করে পারবে বলো?
বুদ্ধ-যীশুর আলোচনা করতে করতে হযরত মুহাম্মদের প্রচারিত ধর্মমতের কথাও এসে গেল । আসলে খ্রীষ্ট এবং হযরত উভয়ের প্রচারিত ধর্মমত-ই Semetic বা সুমেরীয় । এছাড়া অনেকে যিশু ও মুহাম্মদের মধ্যেও নানান মিল খুঁজে পায় । যেমন উভয়েই একই পরম্পরার নবী, ওদের পরম্পরার আদি ব্যক্তি আদম ৷ উভয়েরই জন্ম এবং বাল্য বা কশোরজীবন প্রায় একই প্রকার(উভয়েরই কিশোর বয়স সম্বন্ধে বিশেষ জানা যায় না) । উভয়েই নিরাকার ঈশ্বরের কথা প্রচার করেছিলেন ৷ উভয়েরই মুখের কথা থেকেই আপন আপন ধর্মগ্রন্থ সৃষ্টি হয়েছিল ! উভয় পরম্পরাতেই প্রাচীনকে সম্মান জানানোর রীতি রয়েছে কিন্তু অনুসারীরা পালন করে তাদের Prophet-এর মত ! অন্য কোনো মত, তা সেটা যত ভালোই হোক না কেন – গ্রহণ করা হয় না ৷ এ ব্যাপারে উভয়েই খুব গোঁড়া !
তবে দ্যাখো, এসব মিল খোঁজা বা Similarity দেখতে যাওয়া– এগুলো বুদ্ধিমান মানুষের স্বভাবের মধ্যে পড়ে ! এরা এইসব নিয়ে বুদ্ধির কচকচানি করতে ভালোবাসে ! এরা আচার্য শঙ্করকেও ‘ছদ্ম বুদ্ধ’ বলেছে I কারণ তাদের অনেকে এই দুজনের নানা বিষয়ে মিল পেয়েছে ! তবে, ঐ যে বললাম__ এসবই পণ্ডিতদের কচকচি ! তোমরা এসব বিচার-বিতর্কে থেকো না । মানবজীবনের উদ্দেশ্য আত্মজ্ঞান লাভ । আত্মজ্ঞান মানেই ঈশ্বরজ্ঞান ৷ আত্মজ্ঞান লাভ হোলে তখনই প্রকৃতপক্ষে ঈশ্বর, আল্লাহ্ বা গড -এর প্রকৃত জ্ঞান হয় ৷ তখনই ঠিক ঠিক বোঝা যায় যে, অজ্ঞানী মানুষ ঈশ্বরের নাম নিয়ে কত কি বালখিল্যতা করে যাচ্ছে ! তবে যাঁকে নিয়ে এইসব করা হোচ্ছে, তিনি অবশ্য এসবে কিছু মনে করেন না – কারণ তিনি জানেন যে, এগুলি__ “অবোধের গো বধে আনন্দ !”( ক্রমশঃ)
গুরুমহারাজ :– রয়েছেই তো ! ভগবান বুদ্ধের প্রায় ৫০০ বছর পরে যীশুর জন্ম হয় ৷ যীশু কিশোর বয়সে তৎকালীন ভারতের অন্তর্গত তিব্বতে এসে গুরুলাভ করেন এবং বেশ কিছুদিন এই অঞ্চলে সাধন-ভজনও করেছিলেন । তখন ভারতীয় উপমহাদেশে বৌদ্ধ প্লাবন চলছে – ফলে তিব্বতীয় সাধু-পরম্পরাতেও বৌদ্ধ প্রভাব ছিল । তাই যীশুর মধ্যে বুদ্ধের প্রভাব থাকা বিচিত্র কিছুই নয় । স্থান-কাল-পাত্র ! এখনকার পরিবেশ-পরিস্থিতি দিয়ে আজ থেকে দু’হাজার বছর আগের পরিস্থিতি বিচার করতে গেলে মস্ত ভুল হয়ে যাবে ।
তাছাড়া আর একটা কথা মনে রাখবে যীশুর শিক্ষা ইউরোপে ছড়িয়েছে যীশুর মৃত্যুর প্রায় ১০০ বছর পর । সেখানেও সময়ের বিস্তর ব্যবধান ঘটে গেছে ৷ ফলে এতোটা সময়ের মধ্যে অনেক কিছু মিল বা অমিল ঢুকে যাওয়াটা অস্বাভাবিক নয় ! তবু যেটুকু তথ্য পাওয়া যায়, তাতে দেখা যায় যে, এই দুজনের মধ্যে সত্যিই অনেক মিল ছিল ! উদাহরণস্বরূপ যেমন ধরো__ বুদ্ধের ত্রিশরণ, খ্রিস্টধর্মের Trinity, বৌদ্ধদের বোধিবৃক্ষই খ্রীষ্টসমাজে X-mas tree, বুদ্ধদেবের জাতকের গল্পের মতোই খ্রীষ্টানদের Parable ! যদিও জাতকের গল্প, বুদ্ধের পূর্ব পূর্ব জীবনের ঘটনা বলে ধরা হয় কিন্তু গল্পের মাধ্যমে শিক্ষা দেবার ব্যাপারটা Common ! তাছাড়াও বৌদ্ধধর্মের ধর্মগুরু যেমন ‘দলাই লামা’ ইত্যাদি রয়েছে__ খ্রিস্টধর্মে ওইরকমই ধর্মগুরু হোলেন ‘পোপ’। এইরকমভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার করলে আরো অনেক মিল পাওয়া যায় ।
কিন্তু দ্যাখো, এসব সাদৃশ্য দেখেই বা কি হবে ? ‘কালে’-র (Time) নিজস্ব ধর্ম রয়েছে – সবকিছুই সেই ‘কালে’-র অধীন ৷ তাই ‘কাল’ যখন যাঁর উপর প্রসন্ন হয়, তখন তাঁর কথাই মানুষ শুনে থাকে । এইভাবে কোনো সময় ভগবান বুদ্ধের প্রভাবে বৌদ্ধধর্ম বিশ্ব জয় করেছিল, পরে আবার ঈশ্বরপুত্র যিশুখ্রিস্টের প্রভাবও বিশ্বের কোনায় কোনায় ছড়িয়ে পড়েছিল, আবার দ্যাখো_ আরো পরবর্তীতে হযরত মুহাম্মদের প্রভাব পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়েছে!
কিন্তু কোথায় মুশকিল হয়েছে জানোতো – যখন থেকে এইসব মহামানবদের followers-রা, বিশেষতঃ ধর্মীয় নেতারা তাদের নিজ নিজ Prophet-দের শিক্ষাকে ‘উপলক্ষ’ হিসাবে সাব্যস্ত করে, নিজেদের মতামত প্রতিষ্ঠাটাকেই ‘লক্ষ্যে’ পরিণত করার চেষ্টা করেছে ! তখন থেকেই সাধারণ হিন্দুদের মধ্যে ঠাকুর-দেবতার থেকে পুরোহিতরা বড় হয়েছে, এই একইভাবে খ্রীষ্টান সমাজে সাধারণের কাছে পোপ-পাদ্রীরা খ্রীষ্টের চেয়ে মহান প্রতিপন্ন হয়ে গেছে, মুসলমানদের কাছে মোল্লা-মৌলভিরাই আল্লাহ্-র থেকে বড় হয়ে গেছে __কারণ সাধারণ মানুষ তাদের মনগড়া ধর্মশাস্ত্রের ব্যাখাকেই প্রকৃত ধর্ম ভেবে বসে এবং তাদের সৃষ্ট বিধি-বিধানকেই শ্রেষ্ঠ ধর্মাচরণ বলে মনে করে!
আর শুধুমাত্র এই একটা কারনে সকল ধর্মমতেই সাম্প্রদায়িকতা দৃঢ়ভাবে বাসা বেঁধেছে। সকলেই চাইছে__ আপন আপন ধর্মমতকে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে – সবার উপর নিজের মতকে চাপিয়ে দিতে ! কিন্তু সে যদি একবার ‘নিজে’-কে ভালো করে দেখে, ‘নিজের চারিপাশ’-কে ভাল করে দেখে এবং বিচার করে যে – “সে কি ভালো আছে?” “তার চারপাশের মানুষজন কি ভালো আছে ?” “সে কি জাগতিক চাওয়া-পাওয়া, কামনা-বাসনার ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছে ?” “সে কি জীবনে শান্তি পেয়েছে বা নিজে প্রকৃত অর্থে শান্ত হতে পেরেছে ?” ____তা যদি সে না পারে, তাহলে কেন আবার সে অপরকে পুনরায় একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে আনতে চাইছে ? এমনটা যে করতে চাইছে সে অবশ্যই ভ্রান্ত বা বিকৃত !
যিনি এইসব রহস্য অবগত হয়েছেন, তিনি কখনও অপরকে অকারণ প্রভাবিত করার চেষ্টা করবেন না । তিনি আগে তাঁর স্ব-ধর্মমতের শিক্ষা সমূহকে নিজের জীবনে যোজনা করবেন – দেখবেন যে এর মধ্যে প্রকৃত সত্যটা কি ? সেই সত্যের বোধ হলে তবে তিনি অপরকে শেখাবেন । এটাই ভারতীয় সনাতন পদ্ধতি !
ঋষিরা আগে ধ্যানের গভীরে, জ্ঞানের গভীরে পরমসত্যের বোধ করলেন, তারপর জগৎবাসীকে বললেন, “শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রা, আ যে ধামানি দিব্যানি তস্থূ । !”
সেমেটিক বা সুমেরীয়দের স্বভাবেই রয়েছে – “অপরকে জোর করা” । বহু পূর্বে ওরা নিজেদের দেশের রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল জোর করে – লড়াই করে । ওরা যে কোনো ধর্মমতকে যখন প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে, তখনও তা করেছে জোর করে – গলায় পা দিয়ে বা গলায় ছুরি ধরে !
এর ফলটা কি হয়েছে ___ এর ফলে ‘জোর করে আনা’ এই নতুন ধর্মাবলম্বীদের ঐ “ধর্মমতে”-র প্রতি শ্রদ্ধা যতটা না এসেছে, তার থেকে বেশি তৈরি হয়েছে ‘Reaction’ ৷ ব্যাপারটা হয়েছে অনেকটা ‘লেজকাটা শেয়ালে’-র গল্পের মতো ! আমার লেজ যখন কেটেছে তখন তোরটাও কাটুক – এইরূপ Reaction এই ধর্মাবলম্বীদের ভিতরে খুবই রয়েছে ৷
কিন্তু সে যাইহোক, আগে যে বলছিলাম __প্রকৃতপক্ষে বলবান হোলো _’কাল’ বা Time ! ‘কাল’ যতদিন যে ব্যক্তির উপর বা যে বিষয়ের উপর প্রসন্ন থাকে, ততদিন সে-ও ‘কালে’র বলে বলীয়ান হয়ে ওঠে । যে মুহূর্তে ‘কাল’ অপ্রসন্ন হয়ে যায়, সেই মুহূর্ত থেকেই ঐ ব্যক্তি বা বিষয় বলহীন হোতে শুরু করে দেয়। আজ থেকে হাজার বছর বা তার কিছুটা আগে, ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা ‘ইসলাম’ নিয়ে আগ্রাসী ছিল ! আরব থেকে বেড়িয়ে এই ধর্মমতের ধ্বজা এশিয়া মহাদেশ,আফ্রিকা মহাদেশ এমনকি ইউরোপেও উড়ছিল! কিন্তু আবার দ্যাখো, মাত্র ২৫০/৩০০ বছর আগে বলা হোত __ইংরেজ রাজত্বে সূর্যাস্ত হয় না ! সেই সময় থেকে ইসলামের প্রসার কমতে লাগলো ! কারণ তখন ‘কাল’ ইউরোপীয়দের উপর অনেক বেশি প্রসন্ন ছিল I এখন মহাজাগতিক নিয়মটা হোচ্ছে ‘মহাকাল’-কে প্রসন্ন করতে হবে ! যারা ‘কালে’র সু-উপযোগ করতে পারেনা –তাদের প্রতি ‘কাল’-অপ্রসন্ন হয়ে যায় ! তাদের অগ্রগতি ব্যাহত হয়। এখন যাদের উপর ‘কাল’ প্রসন্ন তারাও যদি ‘কালে’র প্রসন্নতা অর্জন না করতে পেরে _ এর দূরোপযোগ করে, তাহলে তারাও কালের বুকে হারিয়ে যাবে !
নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে গেলে ‘কাল’-কে প্রসন্ন করতেই হবে ৷ এটা মহাজাগতিক নিয়ম এবং এটাই যুগে যুগে মহাপুরুষদের শিক্ষা_ বাবা ! কিন্তু মানুষ সে শিক্ষা গ্রহণ করে কই ? মহাকালের বুকে কত বড় বড় তরঙ্গ উঠেছে – অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে, আবার মহাকালের বুকেই সমাহিত হয়ে গেছে ! কত তরঙ্গ উঠে সাথে সাথেই মিশে গেছে, কোনটা হয়তো কিছুটা বিস্তৃতি লাভ করেছে ! কিন্তু সমুদ্রের কোনো পরিবর্তন হয় নি। ঠিক তেমনি মহাসমুদ্রের মতোই_ ‘মহাকাল’_ যেমনকার তেমনই রয়ে গেছে !
সুতরাং এটা জেনে রাখবে যে, যুগপুরূষ ছাড়া কোনো একটা সাধারণ শক্তিশালী মানুষ অথবা তার সঙ্গে জোট বাঁধা কিছু মানুষ লাফালাফি করে কখন্ই মহাকালের নিয়মকে বদলাতে পারে না । আর পারবেও না ! কোনোদিনই পারবে না।
তবে ঐ যে বললাম_ কেউ কেউ পারেন – আর তা পারেন একমাত্র কোনো মহামানব ! সাধারণ মানুষ কি করে পারবে বলো?
বুদ্ধ-যীশুর আলোচনা করতে করতে হযরত মুহাম্মদের প্রচারিত ধর্মমতের কথাও এসে গেল । আসলে খ্রীষ্ট এবং হযরত উভয়ের প্রচারিত ধর্মমত-ই Semetic বা সুমেরীয় । এছাড়া অনেকে যিশু ও মুহাম্মদের মধ্যেও নানান মিল খুঁজে পায় । যেমন উভয়েই একই পরম্পরার নবী, ওদের পরম্পরার আদি ব্যক্তি আদম ৷ উভয়েরই জন্ম এবং বাল্য বা কশোরজীবন প্রায় একই প্রকার(উভয়েরই কিশোর বয়স সম্বন্ধে বিশেষ জানা যায় না) । উভয়েই নিরাকার ঈশ্বরের কথা প্রচার করেছিলেন ৷ উভয়েরই মুখের কথা থেকেই আপন আপন ধর্মগ্রন্থ সৃষ্টি হয়েছিল ! উভয় পরম্পরাতেই প্রাচীনকে সম্মান জানানোর রীতি রয়েছে কিন্তু অনুসারীরা পালন করে তাদের Prophet-এর মত ! অন্য কোনো মত, তা সেটা যত ভালোই হোক না কেন – গ্রহণ করা হয় না ৷ এ ব্যাপারে উভয়েই খুব গোঁড়া !
তবে দ্যাখো, এসব মিল খোঁজা বা Similarity দেখতে যাওয়া– এগুলো বুদ্ধিমান মানুষের স্বভাবের মধ্যে পড়ে ! এরা এইসব নিয়ে বুদ্ধির কচকচানি করতে ভালোবাসে ! এরা আচার্য শঙ্করকেও ‘ছদ্ম বুদ্ধ’ বলেছে I কারণ তাদের অনেকে এই দুজনের নানা বিষয়ে মিল পেয়েছে ! তবে, ঐ যে বললাম__ এসবই পণ্ডিতদের কচকচি ! তোমরা এসব বিচার-বিতর্কে থেকো না । মানবজীবনের উদ্দেশ্য আত্মজ্ঞান লাভ । আত্মজ্ঞান মানেই ঈশ্বরজ্ঞান ৷ আত্মজ্ঞান লাভ হোলে তখনই প্রকৃতপক্ষে ঈশ্বর, আল্লাহ্ বা গড -এর প্রকৃত জ্ঞান হয় ৷ তখনই ঠিক ঠিক বোঝা যায় যে, অজ্ঞানী মানুষ ঈশ্বরের নাম নিয়ে কত কি বালখিল্যতা করে যাচ্ছে ! তবে যাঁকে নিয়ে এইসব করা হোচ্ছে, তিনি অবশ্য এসবে কিছু মনে করেন না – কারণ তিনি জানেন যে, এগুলি__ “অবোধের গো বধে আনন্দ !”( ক্রমশঃ)
