[ আগের দিন একটি জিজ্ঞাসার উত্তরে গুরু মহারাজ ওনার শিক্ষাগুরু, পেরেন্টাপল্লীর স্বামী বাউলানন্দজীর সাথে ওনার প্রথম দিনের অলৌকিক সাক্ষাৎ-এর বিষয়ে আলোচনা করছিলেন । আজ তার পরবর্ত্তী অংশ] …. এরপর উনি(স্বামী বাউলানন্দজী) কথা বলতে শুরু করলেন, আমি(গুরু মহারাজ, স্বামী পরমানন্দ) দেখলাম আমার শরীর সুখাসনে স্থির এবং সোজা হয়ে গেল । ধ্যানমুদ্রায় চুপচাপ বসে ওনার কথা শুনতে লাগলাম ৷ আমার মনে হতে লাগলো যেন নির্ঝরিণীর ধারার ন্যায় ওনার শিক্ষা আমার উপর বর্ষিত হোচ্ছে, আর আমার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে সেখানেই স্থান করে নিচ্ছে অর্থাৎ মস্তিষ্কের কোষে কোষে সঞ্চিত হয়ে যাচ্ছে । এক একবার আমি চেষ্টা করলাম ভাবতে যে,”ওনার কথা শুনবো না বা এই শিক্ষাগুলিকে বিশেষ পাত্তা দেব না।” কিন্তু দেখলাম__ আমার শরীরের প্রতি আমার কোনো নিয়ন্ত্রন‌ই নাই ! আমার দেহ বা দেহের সমস্ত অঙ্গগুলি যেন ওনার প্রতি অনুগত হয়ে গেছে ! সেই রাত্রি ১০-৩০ টা থেকে ভোর পর্যন্ত অনর্গল উনি বলে গেলেন আর আমার মস্তিষ্ক সেইসব শিক্ষা continuous__ Receive করে গেল ! তারপর একসময় উনি চুপ করে গেলেন! আমার শরীরের উপরেও আমার নিয়ন্ত্রন এসে গেল ৷ এরপর উনি আমাকে বললেন, ” পৃথিবীতে এখন সূর্যোদয় হোচ্ছে, তুমি এখন তোমার ক্ষেত্রে ফিরে যাও ৷ আবার সময়মতো আমি তোমার সাথে যোগাযোগ করে নেব ।” এরপর-ই আমার শরীরে সম্পূর্ণ হুঁশ ফিরে এলো ৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি অনুভব করলাম আমি রায়নার শ্মশানেই বসে আছি । দেখলাম সত্যি সত্যিই পূব আকাশে সূর্যোদয় হোচ্ছে ৷আমার চেতনায় এলো যে, আমাকে ক্যাম্পে ফিরতে হবে (সেই সময় গুরুমহারাজ রুরাল ইলেক্ট্রিফিকেশন-এর কাজে রায়নায় ক্যাম্প করে ছিলেন) ! তাই ওঠার চেষ্টা করতেই দেখলাম পা টলমল করছে ! তবু, ওই অবস্থাতেই যাহোক করে ক্যাম্পে ফিরে এলাম । আমার চোখমুখ লাল টকটকে, পা টলমল করছে দেখে ক্যাম্পের বন্ধুরা ভাবলো বোধহয় আমার শরীর খারাপ করছে । ওরা জিজ্ঞাসা করলো, ” রবীনদা ! কি হয়েছে আপনার ?” ওদেরকে আর কী বোঝাই ! তবুও পাঁচ রকম কথা বলে ওদেরকে বোঝালাম ! তারপর স্নানাদি সেরে একটু Rest নিতেই শরীরটা ঠিক হয়ে গেল । সুস্থ হবার পর আমি ওখানেই বসে বসে দক্ষিণ ভারতের (অন্ধপ্রদেশের নন্দীয়াল) দেবেন্দ্রনাথকে চিঠি লিখলাম I ও ওখানে অনেক সাধুসঙ্গ করেছে বা এখনও করে – সেইজন্য ও ঐ সাধুবাবার ব্যাপারে খবর জানতে পারে! ওকে চিঠিতে জানালাম যে গোদাবরীর তীরে কোন্‌ আশ্রমে এই ধরনের চেহারার সন্ন্যাসী থাকে খোঁজ নাও । ও খোঁজ করতে করতে আপ্পা বেঙ্কটরাও-এর সন্ধান পায় । বেঙ্কটজী ওর কাছে সব শুনে বলেন যে,__’ হ্যাঁ ! এইরকম চেহারার এক সাধুর কথা ও জানে । গোদাবরীর তীরে আশ্রম, জায়গাটির নাম পেরেন্টাপল্লী ।’ কিন্তু যে তারিখের কথা বলা হোচ্ছে, ওই সময়ই তো বালানন্দজী (তেলেগু ভাষীরা বাউলানন্দজীকে “বালানন্দ” উচ্চারণ করতো।) শরীর ছেড়েছিলেন ! দেবেন্দ্রনাথ আমার নির্দেশমতো সেখানে পৌছে দেখলো যে, আমার বর্ণনা অনুযায়ী প্রাকৃতিক অবস্থান ঠিক ঠিক মিলে যাচ্ছে । তারপর আশ্রমে ঢুকে সেই তিনজনকে মা-কে ও দেখতে পেল ৷ অবশ্য ওনাদের সেই দিন-তারিখ উল্লেখ করে রাত্রি ১০ টা বা ১০-৩০ টায় কেউ বাইরে থেকে আশ্রমে এসেছিল কিনা জিজ্ঞাসা করায় তাঁরা কিছু বলতে পারেনি ! ওরা দেবেন্দ্রনাথকে বলেছিল যে, ‘রাত্রি দশটার সময় গুরুদেব স্বামী বাউলানন্দে ওদের বলেন যে উনি এখন Rest নেবেন, যতক্ষণ পর্যন্ত উনি ভিতরে না ডাকেন__ ততক্ষণ যেন কেউ কোনো কারণে ওনার ঘরে না ঢোকে ৷ সেইজন্য গুরুর নির্দেশে ওনারা ঘরের দাওয়ায় বসে বসে ইষ্টমন্ত্র জপ করছিলেন এবং যাতে গুরুদেব দ্রুত আরোগ্য লাভ করেন__ তার জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন ‘। তারপর পরদিন সকাল ছটার সময় একটা আওয়াজ পেয়ে ঘরের ভিতরে ঢুকে ওনারা দেখেন যে, গুরুদেব (স্বামী বাউলানন্দজী) অচৈতন্য অবস্থায় বিছানায় শুয়ে রয়েছেন ৷ তারা বাইরে বেরিয়ে চেঁচামেচি করে লোকজন জড়ো করেন । সবাই মিলে মনস্থ করে যে স্বামীজীকে শহরে নিয়ে যাওয়া হবে চিকিৎসার জন্য । কিন্তু পেরেন্টাপল্লী থেকে কাছাকাছি শহরও অনেক দূরের পথ এবং গোদাবরী নদীপথ ধরে লঞ্চে যেতে হয় । সেই ভাবেই ব্যবস্থা করা হয়েছিল কিন্তু কোনো লাভ হয়নি ! ওই অবস্থাতে কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই মহাপুরুষ স্থূলশরীর ছেড়ে চিন্ময়ধামে গমন করেন । যাইহোক, এখানে একটা কথা তোমাদের বলার আছে । দ্যাখো, ভারতীয় পরম্পরার যে জ্ঞান তা আমার ছোটবেলা থেকেই করায়ত্তধীন ৷ ধর্মের সনাতন আদর্শ, বেদ-বেদান্তের জ্ঞান, ষড়দর্শনের জ্ঞান, সবকিছু-ই যেমন যেমন আমার বয়স বেড়েছে, তেমন তেমন আমার মধ্যে অনুপ্রবিষ্ট হয়েছে ৷ পথে-প্রান্তরে, গিরি-গুহায় বিভিন্ন মহাত্মাদের সাথে আমার সাক্ষাত হয়েছে, আলোচনা হয়েছে – সেগুলি শুধুমাত্র আমার ভিতরের জ্ঞানটা ঝালাই করে নেওয়ার জন্য ৷ তাহলে_ স্বামী বাউলানন্দের কাছে আমার নেবার কি ছিল ! সেদিন স্বামী বাউলানন্দ প্রায় সারারাত ধরে আমাকে ভারতীয় প্রাচীন পরম্পরা সমস্ত শিক্ষার যুগোপযোগী ব্যাখ্যা বুঝিয়েছিলেন ! উনি আমাকে সেই রাতে শিখিয়েছিলেন__ বর্তমানকালের উপর দাঁড়িয়ে প্রাচীন শিক্ষাসমূহকে কিভাবে নবীনভাবে অর্থাৎ নতুন করে আধুনিক শিক্ষিত মানুষ, বিশেষত নতুন প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে পরিবেশন করতে হবে__ তার কৌশল ! এখন আমি তোমাদের যেভাবে কথা বলি বা যেসব শব্দ ব্যবহার করি ___সেগুলির প্রায় সবই ওনার শেখানো ৷ সেই অর্থে স্বামী বাউলানন্দ আমার গুরু – আমার শিক্ষাগুরু ! উনি আমাকে কথা দিয়েছিলেন যে প্রয়োজনমতো আবার যোগাযোগ করবেন । পরবর্তীতে উনি তাও করেছেন । পরিব্রাজনকালে বা বনগ্রাম আশ্রম তৈরি করার পরও বেশ কয়েকবার আমার সামনে প্রকট হয়ে __আমার এই শরীরের পরবর্তী পদক্ষেপ কেমন হবে __তা আলোচনা করেছেন, প্রয়োজনে সিদ্ধান্ত‌ও দিয়েছেন ৷ [জয়গুরু – জয়গুরু – জয়গুরু!!!!] ।৷