জিজ্ঞাসু :– তাহলে কোন্ ধরনের ‘মত’- গ্রহণ করা উচিৎ ?
গুরুমহারাজ :– দ্যাখো, তুমি তো মানুষ ! আর তোমার চারিপাশেও মানুষ-ই রয়েছে ৷ আমরা সবাই মানুষেরই সমাজে বাস করি । তাই মানবতাবিরোধী কোনো মত যেখানে রয়েছে তাই পরিত্যজ্য । মানবতার কল্যাণে যে মত রয়েছে তাই গ্রহণীয় । সাধারণত ভারতীয় বেদ-বেদান্ত বা দর্শনে মানবতাবিরোধী কিছুই পাওয়া যায় না – তাই সমস্ত বিশ্বের গুণীমানুষেরা ভারতীয় বেদ-বেদান্তের মহিমা কীর্তন করে গেছেন ৷
তবে, একটা কথা জেনে রাখা ভালো__যে কোনো মহাপুরুষ, যাঁরা মানবকল্যাণের জন্য এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেন, তাঁরাও কখনোই কোনো মানবতাবিরোধী কথা বলেন না ৷ পরবর্তীকালে ঐ সমস্ত মতের followers -রা তাদের মনোমত কথা ঢুকিয়ে দিয়ে তাদের Prophet -এর কথা বলে চালিয়ে দেয় ! আর সেই কথাগুলোই মানবতাবিরোধী হয়ে যায় ৷
এই যে বললাম মহাপুরুষগণ জন্ম -“গ্রহণ” করেন, জন্মান না, অর্থাৎ তাঁরা স্বেচ্ছায় ঈশ্বরের নির্দেশে পৃথিবীর গ্রহের কোনো বিশেষ স্থানে শরীর ধারণ করে কোনো নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করে চলে যান । ওইটুকুই তাঁর দায়িত্ব ছিল – উনি শুধু সেটাই করে যান । তাহলে তিনি মানবতা বিরোধী কথা বলবেন কেন? তিনি তো ঈশ্বর প্রেরিত ! তিনি তো ঈশ্বরের সৃষ্ট এই পৃথিবীর সকলের কল্যানের জন্য এসেছেন __তাই না ! তাহলে তাঁর কাছে আবার আপন-পর কে ? সবাই আপন __তাই নয় কি ?
কিন্তু দেখা যায়__ পরবর্তীতে তাঁর প্রতিষ্ঠিত মতের শক্তিশালী (ধর্মীয়ভাবে, রাজনৈতিকভাবে) followers রা, এই devine rule -এর ব্যাপারটা বোঝে না! তারা জাগতিক নিয়মের অধীন, তাই তারা নিজের মতো করে ভেবে নিয়ে Prophet এর কথার ব্যাখ্যা করতে থাকে , কেউ কেউ আবার তার নিজের ব্যাখা নতুন করে ধর্মগ্রন্থগুলিতে ঢুকিয়েও দেয় !
এইসব ব্যক্তির কথা বা তার দেওয়া ব্যাখা কারও ভাল নাও লাগতে পারে_সে এর বিরোধে নামে ! তখনই শুরু হয় দলাদলি ! এইভাবে এক একটা ধর্মমতে আবার বিভিন্ন দল, উপদল, শাখাদল গড়ে ওঠে ৷ আর এগুলি সৃষ্টি হওয়া মানেই জানবে পরবর্তী followers রা মূল নীতি বা আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছে ৷
ধর্মাচরণের প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো “সত্য” । যদি কেউ শুধু “সত্য” অবলম্বন করে চলে – তাহলেই বিভিন্ন ধর্মমতের যেটি চূড়ান্ত অবস্থা – তা সে এমনিতেই লাভ করবে ৷ এর জন্য তাকে অন্য কোনো নিয়ম, আচার, অনুষ্ঠান পালন করতে হবে না ! তাকে কোনোরকম ধর্মীয় বিধান বা অনুশাসন মেনে চলতে হবে না !
কিন্তু তথাকথিত ধর্মরক্ষকেরা(পুরোহিত-পান্ডা, মোল্লা-মৌলভী, ফাদার-ধর্মজাজক) কি এই শিক্ষা মানবে ? সত্য আচরণকারী ঐ ধরনের ব্যক্তিকে তারা__ বিধর্মী, কাফের বা পাপী, অনাচারী ইত্যাদি নানা নামে আখ্যায়িত করবে।
আমি তোমাদের ধর্মবিজ্ঞানের মূল কথা বলছি শোন__ মানবতাকে ক্ষুন্ন করে বা মানবতার অপমান করে__এমন কোনো কিছুই ধর্ম বা আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হোতে পারে না । যদি কোনো ধর্মমতে এই ধরনের কথা থাকে, তাহলে জানবে অবশ্যই তা পরবর্তীতে সংযোজিত কোনো শক্তিশালী নেতা(ধর্মীয় বা রাজনৈতিক)-র মতামত ৷
আচার্য্য শঙ্করের লেখা গ্রন্থাবলীতে নারীবিরোধী কিছু বক্তব্য রয়েছে দেখে স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন – ‘যদি আচার্য এই কথাগুলি বলে থাকে তাহলে তাকে আমি একজন দক্ষিণী ভট্টচায্ ছাড়া আর বেশি কিছু ভাবতে পারি না'((“এখানে স্বামীজী “যদি” কথাটি ব্যবহার করেছেন ! তার মানে হোচ্ছে__হয়তো এই কথাগুলি প্রক্ষিপ্ত, শঙ্করাচার্যের কথাই নয়) !
জানো, গুরুদেব রামানন্দজীর ইচ্ছা অনুযায়ী আমার সন্ন্যাস-সংস্কারের কাজটি হয়েছিল, ঋষিকেশের কৈলাশ আশ্রমে বিদ্যানন্দ গিরি মহারাজের কাছে ৷ সন্ন্যাস নেবার পর আমি টানা তিন মাস ওখানেই কাটিয়ছিলাম _ সন্ন্যাসের পর যা যা রীতি সেগুলি পুঙ্খানুপুঙ্খ পালনের জন্য ! পরবর্তীতে একদিন বিদ্যানন্দজী যখন আমার সাথে সন্ন্যাস পরম্পরার নারী পুরুষের ভেদাভেদ নিয়ে বিভিন্ন বিধি-নিষেধের ব্যাপারে আলোচনা করছিলেন বা নির্দেশ দিচ্ছিলেন – তখন কিন্তু আমি প্রতিবাদ করেছিলাম । ওনাকে ঐ কথাগুলিই বলেছিলাম (যেটা প্রথমেই এক ব্যক্তির জিজ্ঞাসার উত্তরে বলা হয়েছিল)__”দেখুন, আমি একজন মানুষ, আর আমি মানুষের সমাজেই জন্মেছি ! আমি এখানেই বড় হয়েছি এবং এখনও এই সমাজেই বসবাস করছি ৷ মনুষ্য সমাজের সবকিছু বিচার করে আমি জেনেছি যে, মনুষ্যসমাজে মানুষ দুই প্রকার – নারী ও পুরুষ ! এখানে অন্য কিছু ভেদ নাই।আর যা আছে সেগুলি মানুষের সৃষ্টি–ঈশ্বরের সৃষ্টি নয়! তাই এই গ্রহের মানুষের জন্য মহাপ্রকৃতির একটাই বিধান এবং তা নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য – আপনি আলাদা করছেন কেন ? উনি আমার যুক্তি শুনে একটু রেগে গিয়ে উত্তর দিয়েছিলেন – ” কারণ এগুলি পরম্পরার নিয়ম ! তাই এগুলিই তোমাদের মানতে হবে!” হিন্দি ভাষায় আমাদের মধ্যে কথোপকথন হচ্ছিলো, সুতরাং আমি হিন্দিতে ওনাকে উত্তর দিয়েছিলাম – “পরম্পরা কা ইয়ে কানুন ম্যায় নেহি মানুঙ্গা ! কিঁউ কি ম্যায় পরম্পরাকা এক সদস্য জরুর হুঁ,লেকিন ম্যায় পরম্পরা কা গুলাম নেহি হুঁ ৷”
তারপর আমি উত্তরকাশীতে গুরুদেব রামানন্দ অবধূতের কাছে এসে সব বললাম । উনি সস্নেহে হেসে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন । বললেন _”তুমি ঠিকই বলেছ! তুমি ছাড়া একথা আর কে বলতে পারে!”
আর একবার‌ও এইরকমই ঘটনা ঘটেছিল জানো – তখন আমার খুব‌ই কম বয়স ! সেবারও হিমালয়ের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরছি, ভাবলাম অনেক তো ঘোরা হোল – এবার কোনো আশ্রমে কিছুদিন থেকেই যাই । তাই কাছাকাছি একটা আশ্রমের মোহান্তের কাছে গিয়ে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করতেই উনি আমাকে সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত ঘন্টায় ঘন্টায় কখন কি করতে হবে, তার একটা List বলে দিলেন । আমি সেসব শুনে বললাম – “দেখুন, আমি খুব ছোট থেকেই পথে-প্রান্তরে ঘুরে বেড়ানো ছেলে ৷ আমি অত নিয়ম মেনে চলতে পারবো না । আমার শরীর ক্লান্ত হোলে আমি বিশ্রাম নিই, ঘুম ভাঙলেই উঠে পড়ি এবং পায়খানা, স্নান করে নিই ৷ ক্ষিদে পেলে খাই – Unnecessary কখনও আলস্যে-বিলাসে সময় অপচয় করি না ।” একটা ছোট বয়সের ছেলের মুখে এইসব কথা শুনে সম্ভবত ওনার পছন্দ হোলো না । উনি আমার থাকার ব্যাপারে আপত্তি প্রকাশ করতে লাগলেন ৷ আমি তখন ওনাকে জিজ্ঞাসা করলাম, _”নিয়মে কি হয় ?” উনি বললেন – ” নিয়ম মেনে চললে তা অভ্যাসে পরিণত হয়, নিয়মিত অভ্যাস থেকেই জীবনে সংযম আসে ৷” আমি বললাম – ” ও এই ব্যাপার ! তাহলে তো আমার ওসবের প্রয়োজন নাই, কারণ আমি অসংযমী নই । আর অভ্যাস বা যোগাভ্যাস নিশ্চয়ই ভালো! তা মানবজীবনের অনেক বন্ধন কাটাতে সাহায্য করে । কিন্তু আমি দেখেছি, সেই অভ্যাসটাই নতুন নতুন এক একটা বন্ধনের সৃষ্টি করে! তাহলে আমি সেটাতে আটকে থাকতে যাব কেন ?’ __এই কথাগুলো বলে ঐ আশ্রম ত্যাগ করে চলে এসেছিলাম ।
এইভাবেই আমি বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ানোর সময় দেখেছিলাম যে, বড় বড় মঠ-মিশনের নামডাক‌ওয়ালা সাধু মহারাজদের মধ্যেও প্রকৃত সত্যের বোধ তো নাই-ই, সত্যের ধারণাও নাই ! সুতরাং তোমরা সত্য-কে ধরে থাকো– তাহলেই হবে। যে, যে ধর্মমতেই থাকো না কেন__সত্যের বোধ হোলেই প্রকৃত ধর্মবোধ তৈরি হবে। আর তখনই ঠিক ঠিক বোঝা যাবে যে, ধর্ম একটাই। ধর্ম বিভিন্ন হয় না, ধর্মমত ভিন্ন ভিন্ন হয় ! (ক্রমশঃ)