জিজ্ঞাসু :– আপনি যখন আলোচনা করেন, তখন দেখি_অনায়াসেই আপনি __যে কোনো বস্তু বা বিষয়কে ধরে “ব্রহ্ম-তত্ত্বে” উপনীত হ‌য়ে যান !!! এটা কি করে সম্ভব ?
গুরুমহারাজ :– তুমি দেখছো বস্তু – তাই বস্তু ! তুমি দেখছো বিষয় – তাই বিষয় ! কিন্তু সবার দৃষ্টি কি একই রকম ? তা নয় – প্রতিটি ব্যক্তি তার নিজের নিজের চেতনার Level অনুযায়ী এই জগৎকে দেখে ৷ তোমরা শুনলে হয়তো অবাক হবে যে, পৃথিবীতে যত সংখ্যক মানুষ __তাদের তত সংখ্যক চিন্তাধারা এবং তারা প্রত্যেকে নিজের নিজের মতো করে এই জগৎকে দেখে ! আর বস্তুই বলো অথবা ব্যক্তিই বলো বা যাই বলো – প্রত্যেকের যেমন স্থূলরূপ রয়েছে, তেমনি সূক্ষ্ম বা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম রূপ রয়েছে – যেটা তুমি স্থুলতঃ দেখতে পাচ্ছো না বলে কি অস্বীকার করতে পারবে ? এখন বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে এগুলি পরীক্ষা করে দেখিয়ে দেওয়াও যায় ৷ সব‌ই dimensional factor ! যেমন ধরো, এই যে তোমার সামনে এই নারকেল গাছটি রয়েছে – তুমি একে কাণ্ড-পাতা সমেত বা দু’একটি ফল ও ফুল সমেত একটি নারকেল গাছ দেখছো – তাইতো ! এইটি এর স্থূল রূপ । এবার এটিকে বিশ্লেষণ করো _ যেহেতু এটি একটি সজীব বস্তু, অতএব একে ভাঙলে বা বিশ্লেষণ করলে কি পাবে – না _ এটি অসংখ্য কোষ-কলা দিয়ে তৈরি । মাইক্রোস্কোপ বা আরও সূক্ষ্ম কোনো যন্ত্র দিয়ে দেখলে তোমার স্থূল চোখের দেখার সঙ্গে আর ওর সেই রূপটি মিলবে না । মিলবে কি ? এবার কোষ-কলাকেও ভাঙো – কি পাবে ? প্রোটোপ্লাজম, কোষ অঙ্গাণু তারপর আরো সূক্ষ্মে গেলে পাবে D.N.A, R.N.A ৷ তাহলে বস্তুর সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম রূপের দিকে যত এগিয়ে যাবে ততই বৈচিত্র ! আর সবকিছুকে ভাঙতে ভাঙতে শেষে পাবে শক্তি বা প্রাণ !
এবার যদি কোনো জড় বস্তু নিয়ে বিশ্লেষণ করো, তাহলে কি পাবে – প্রথমে অনু, তারপর পরমাণু ৷ পরমাণুকে ভাঙলে পাচ্ছো ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন ইত্যাদি । এগুলোকে ভাঙলে পাচ্ছ বিভিন্ন Particle, কোয়ার্ক – এইভাবে ভাঙতে ভাঙতে সেখানেও এগিয়ে যাচ্ছো সেই শক্তির দিকেই ৷ তাহলে দ্যাখো, তোমার মন – তোমার চেতনা যত সূক্ষ্ম বিজ্ঞানে আগ্রহী – কোনো বস্তু, ব্যক্তি বা বিষয় তত সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হয়ে ধরা দিচ্ছে তোমার কাছে ।
তাহলে দেখা গেল যে, এই জগতের যে কোনো বস্তু, ব্যক্তি বা বিষয়কে অথবা এই সামগ্রিকভাবে এই জগৎকে বাইরে থেকে দেখতে একরকম__ কিন্তু এর সূক্ষ্ম বা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম রূপ অন্যরকম ! বুঝতে পারছো ব্যাপারটা !!
যে কোনো বস্তু বা বিষয়ের অন্তর্নিহিত রূপ দেখার জন্য তোমার স্থূল চোখ নয়, তোমার মনকে প্রস্তুত করতে হবে, যাতে অন্তঃশ্চক্ষুর উন্মীলন হয় ৷ ঋষিরা এটা কতো প্রাচীনকালে অনুধাবন করেছিলেন, তাই ওঁরা শুধু বাইরের জগতের রূপ-রস-শব্দ-গন্ধ-স্পর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নিজেদের মনকে অধ্যয়ন করতে শুরু করেছিলেন ৷ একমাত্র প্রাণ সাধনার দ্বারা মনকে Control করা যায় ৷ তাই শুরু হল প্রাণ-উপাসনা ৷ স্থূল প্রাণবায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করতে করতে সূক্ষ্ম প্রাণ, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম প্রাণতত্ত্বের সন্ধান পেলেন তাঁরা ৷ তখন দেখলেন সবই প্রাণের প্রকাশ ৷ প্রাণ-ই শক্তি ৷
বর্তমানে জড় বিজ্ঞানীরা ঋষিদের চিন্তাগুলি অনেকটা ধরতে সমর্থ হোচ্ছে । অতিসম্প্রতি দেখবে ‘মন’ নিয়ে খুব গবেষণা হোচ্ছে, ‘মন’-কে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা চলছে । বিজ্ঞানীরা এইটা বুঝেছে যে, Three dimensional যে কোনো factor-কে বিশ্লেষণ করা যায় Fourth dimensional factor দিয়ে ৷ আর মনের অবস্থান হচ্ছে 4th dimension-এর ও উপরে। তাই মন দ্বারা যে কোনো Three dimensional factor কে বিশ্লেষণ করা সম্ভব ৷
এবার প্রশ্ন আসছে__মনকে কে অধ্যয়ন করছে, কে নিয়ন্ত্রন করছে ? মনের অবস্থান কোথায় ? ঋষিরা দেখলেন মানবের অন্তর্জগতে রয়েছে অতীন্দ্রিয় সত্তারূপী অন্তঃকরণ চতুষ্টয় – মন, বুদ্ধি, চিত্ত, অহংকার । এরমধ্যে চিত্তের বৃত্তি হিসাবে বাকি তিনটি অতীন্দ্রিয় ক্রিয়াশীল । তাই মন, বুদ্ধি ও অহংকার কে বলা হয়েছে ‘চিত্তবৃত্তি’ । চিত্ত যেন হ্রদ বা বড় জলাশয় বিশেষ, আর বৃত্তিগুলি যেন এক একটি তরঙ্গ ! তরঙ্গ যেমন উত্থিত হয়ে হ্রদ বা জলাশয়কে চঞ্চল করে তোলে, তেমনি চিত্তহ্রদেও যখন মন, বুদ্ধি বা অহংকাররূপী বৃত্তিগুলির ক্রিয়াবিক্ষেপ হয়, তখন মানবের চিত্তচাঞ্চল্য ঘটে ৷ তাই চিত্ত যেন এই তিন বৃত্তির আধার । এবার মনের সংজ্ঞা দিয়েছেন ঋষিরা ৷ “সংকল্প-বিকল্পাত্মক” ক্রিয়া যেখানে সাধিত হয়__ তাই ‘মন’৷ মনে নিয়তই সংকল্প ও বিকল্প শক্তির ক্রিয়া চলছে । ‘এটা করব’ অথবা ‘না_ করবো না’, ‘যাবো’ অথবা ‘যাবো না’, ‘দেখবো’ অথবা ‘দেখবো না’ – এইরকম অসংখ্য-অসংখ্য সংকল্প উঠছে এবং সঙ্গে সঙ্গে ঐ মনোজগতেই তার বিকল্প তৈরি হয়ে যাচ্ছে । এবার তুমি ঐ ক্রিয়াটি করবে অথবা করবে না – এটা ‘নিশ্চয়’ করে তোমার চিত্তের বুদ্ধিবৃত্তি । ঋষিরা বললেন, বুদ্ধি “নিশ্চয়াত্মিকা বৃত্তি”। বুদ্ধি sixth dimension -এ স্থিত । আধাররূপ চিত্ত স্থির হোলে যে বৃত্তিগুলি স্থির থাকবেই__সেকথা বলাই যায় ! তাই মন বা বুদ্ধিকে স্থির করার চেষ্টা না করে, চিত্ত স্থির করাটাই ঠিক ঠিক সাধনা । যোগসাধনায় ঐ জন্য‌ই ‘নিরূদ্ধ চিত্ত’ অবস্থা প্রাপ্ত হবার কথা বলা হয়েছে।
‘অহংকার’ বা ‘ego’ কিন্তু স্থির চিত্তেও ক্রিয়াশীল ! ব্যক্তি অহং থেকে বিশ্ব অহং বা Individual ego থেকে Universal ego – ego থেকেই যায় । Egoless হোতে পারলে সাধক তখন বুঝতে পারে যে, আত্মতত্ত্ব আর ব্রহ্মতত্ত্ব একাকার ৷ সুতরাং অহংকার রয়েছে Seventh dimension-এ ।
এই Seventh dimension -এ স্থিত হয়েই ঋষিরা বস্তুর যথার্থ স্বরূপ প্রত্যক্ষ করলেন । বোধ করলেন_”সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম”! স্থুল প্রাণ উপাসনা দিয়ে সাধনার বা অন্তর্মুখীনতার যাত্রা শুরু করে ___মনের একাগ্রতা, বুদ্ধির Perfection ইত্যাদির দ্বারা চিত্তকে শান্ত করে, অহংতত্ত্বের পারে যাওয়া পর্যন্ত সাধককে দীর্ঘপথ পার হোতে হয় ! আর এই যাত্রাপথে বস্তুরহস্য, জগৎরহস্য, ঈশ্বর রহস্য ইত্যাদির আবরণ একটু একটু করে সাধকের কাছে খুলতে থাকে ! আর সেই সব দেখে অত্যন্ত অবাক-বিস্ময়ে সাধক “এ কি”! “এ কি”– করতে থাকে! কতজন মাঝপথেই সাধনা থামিয়ে যেটুকু পেয়েছে__তাতেই মত্ত হয়ে যায় ! আর কেউ কেউ সাধনার শেষ পর্যায়ে স্বরূপের জ্ঞান প্রাপ্ত হয় !
তাহলে বুঝতে পারছো তো বাবা__ চূড়ান্ত স্থিতিতে পৌঁছেই ঋষিরা বলতে পেরেছিলেন, “সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম”৷ ব্রহ্মই সব হয়েছেন – শুধু বৈচিত্রের তারতম্য !
তুমি, আমি অজ্ঞান ! তাই সবকিছুকে পৃথক করছি ! বলছি __’এটা’, ‘ওটা’! কিন্তু পূর্ণজ্ঞানীরা বলেন, “সবই তিনি” অথবা বলেন “তিনিই সব হয়েছেন”। বলতে পারেন_”আমিই তিনি, তিনিই আমি”!
(ক্রমশঃ)