[একজনের জিজ্ঞাসার উত্তরে গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দ আলেকজান্ডারের ভারত অভিযান নিয়ে আলোচনা করছিলেন।আজ পরবর্তী অংশ…..।]
যাইহোক, পারস্য থেকে গান্ধারের পথে এগিয়ে যাবার সময় রাস্তায় পড়েছিল পুষ্কলাবতী নগরী। বর্তমান আফগানিস্তান সহ ওই সব অঞ্চল তখন ভারতেরই অন্তর্ভূক্ত ছিল । পুস্কলাবতীর পরের উল্লেখযোগ্য রাজ্যের নাম ছিল অবন্তিপুর ৷ পুষ্কলাবতীতে তখন একজন রানী ছিলেন সিংহাসনে আসীন [হয়তো রাজার আকস্মাৎ মৃত্যু হয়, তারই স্ত্রী (রানী) সিংহাসনে বসেন অথবা রাজার মৃত্যুর পর তার পুত্র না থাকায় কন্যা সিংহাসনে আরোহন করেন)। এখানেই যুদ্ধের সময় প্রাচ্যের রণকৌশলের সাথে আলেকজান্ডারের প্রথম পরিচয় হয় (ভারতীয় শশ্ত্রবিদ্যা ও রণকৌশল আসিরিয়,সুমেরিয় ইত্যাদিদের চেয়ে আলাদা ছিল ৷ সোজা তরোয়াল এবং বাঁকা তরোয়ালের ব্যবহারটাও একটা অন্যতম ব্যাপার ছিল।) এই যুদ্ধে আলেকজান্ডারের সৈন্যবাহিনীর ব্যাপক ক্ষতি হয়, ওর প্রচুর সৈন্য মারা গিয়েছিল । কিন্তু পুষ্কলাবতী খুবই ক্ষুদ্র রাজ্য ছিল, সৈন্যসংখ্যাও কম । তাই রাণী স্বয়ং বীরবিক্রমে যুদ্ধ করেও শেষরক্ষা করতে পারেননি ৷ আলেকজান্ডারের সেনাবাহিনীর অবশিষ্টরা এরপর ওখানে নারকীয় হত্যালীলা চালায় । একে তো ওরা বেশিরভাগই ছিল মরুদস্যু, বাকিরা North Greece -এর উপজাতি_যারা আলেকজান্ডারের সঙ্গে এসেছিল ! ওদেরকে বর্তমান গ্রীসের শিক্ষিত সমাজ barbarian বলে অভিহিত করে । ওখান থেকেই বাংলায় ‘বর্বর’ কথাটি এসেছে । অসভ্য, আদিম, হিংস্র অর্থে ‘বর্বর’।
যাইহোক, আলেকজান্ডারের এই সৈন্যদল সব জায়গাতেই নির্বিচারে খুন করতো, যথেচ্ছ লুটপাট করতো ! লুটের মাল বলতে ধনরত্ন-অলংকার, খাদ্য এবং নারী ! বাকী যারা থাকতো অর্থাৎ সাধারণ মানুষ_তাদেরকে হত্যা করে ঘরবাড়ি সহ সবকিছুতেই আগুন লাগিয়ে দিতো! শস্যক্ষেত্র-শস্যাগারও পুড়িয়ে দিতো, কারন ওরা জানতো__এখন ওরা আগাচ্ছে বটে কিন্তু একসময় ওদের এই পথেই ফিরতে হবে ! তাই ফেরার সময় যেন কোনো প্রতিরোধের মুখে পড়তে না হয় তাই এই ব্যবস্থা ।
তৎকালীন পশ্চিম ভারতের(অবন্তিপুর) রাজা অম্ভি হঠাৎ করে বিনাযুদ্ধে আলেকজান্ডারের বশ্যতা স্বীকার না করলে হয়তো ওর সৈন্যরা ওখান থেকেই ফিরে যেতো ৷ পুষ্কলাবতীর যুদ্ধে আলেকজান্ডারের সৈন্যসংখ্যা অর্ধেক হয়ে যাওয়ায় বাকিদের মনোবল ভেঙে পড়েছিল ! ওরা ভাবছিল__ ‘লুটের মাল যা পাওয়া গেছে – ওই নিয়েই নিজের নিজের ডেরায় ফিরে যাওয়া যাক্! প্রাণে বেঁচে থাকলে, তবে তো এসবের দাম! অন্যথায় এইসব বয়ে বয়ে বেড়িয়ে কি হবে?’
অবন্তীপুরের রাজা অম্ভি আলেকজান্ডারকে সমাদর করে তার রাজ্যে আহ্বান করে শুধু নিয়েই গেল না –আলেকজান্ডারকে আশ্বাস দিল যে, —‘ ভারতবর্ষের বাকি রাজ্য জয় করতে সে সৈন্য সাহায্যও করবে ‘। ব্যস্, নতুন সঞ্জীবনী পেয়ে গেল আলেকজান্ডার !! সে মনোবল ভেঙে পড়া সৈন্যবাহিনীকে পুনরায় চাঙ্গা করার জন্য বলল – “এতদিন তোমরা এমন বেশি আর কি লুটের মাল পেয়েছো ? এবার আমাদের লক্ষ্য যে সব রাজ্য, সেগুলি সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা ! সেখানে প্রচুর ধনরত্ন – সেইসব মাল না নিয়ে ফিরে যাবে ? দেখলে তো _আমি অজেয় এবং ঈশ্বরপুত্র বলেই _আমার প্রয়োজনে কেমন সাহায্য এসে গেল ! এবার এই রাজার সৈন্য দের কাছে তোমরা _এদেশের রণকৌশল শিখে নাও! তাহলেই তোমাদের পরবর্তী রাজ্যগুলি জয় করতে অসুবিধা হবে না! তখন তোমরা এক একজনে প্রচুর লুটের মাল পেয়ে যাবে !”
রাজার কথায় সৈন্যরা লোভ সংবরন করতে না পেরে আরও এগিয়ে যেতে রাজি হয়ে গেল ! অবন্তীপুরে অম্ভির আতিথিয়তায় কিছুদিন থাকার সময়কালে আলেকজান্ডার অম্ভিকে বলেছিল__’ সেখানে কোনো আধ্যাত্মিকভাবে উন্নত গুরু রয়েছে কিনা তার খোঁজ করে তাকে ধরে নিয়ে আসতে!’ অম্ভির দুতেরা খুঁজে খুঁজে কল্লন নামের একজন আধ্যাত্মিক উন্নত সাধুর সন্ধান পেয়েছিল। কিন্তু সেই সাধু রাজদরবারে আসতে রাজি হননি ! একজন দোভাষীকে সঙ্গে নিয়ে আলেকজান্ডার নিজেই তাঁর সাথে দেখা করতে গিয়েছিল ।
সাধুটির উপর জোর-জবরদস্তি না করে, আলেকজান্ডারের নিজেই দেখা করতে যাবার পিছনেও একটা কারণ ছিল ৷ রাজা হবার পর আলেকজান্ডার ওর গুরু অ্যারিস্টটলের কাছে (যিনি শুধু দার্শনিকই নন, একজন উন্নত সাধকও ছিলেন!) সেনাপতি পাঠিয়ে রাজধানীতে ডেকে পাঠিয়েছিল, কিন্তু গুরু আসেন নি । শেষ বয়সে উনি রাজ্যের বাইরে নদীর ধারে একটা পাতার কুটির নির্মাণ করে বসবাস করতেন । তিনি সেনাপতিকে বলেছিলেন যে. _’তিনি রাজার প্রজা নন । তিনি ঈশ্বরের রাজত্বে স্বাধীনভাবে বাস করেন – তাই রাজার আদেশ মানতে তিনি বাধ্য নন’। সেনাপতি ফিরে গিয়ে এই কথা বলতেই _ তখন দলবল নিয়ে রাজা নিজেই গিয়েছিল গুরুর কাছে । উনি তখন নদীর ধারে পড়ন্ত শীতের বেলায় একটা বড় পাথরের উপর রোদে শুয়েছিলেন । রাজার নকীব হাঁক পাড়লো – “মহামান্য সম্রাট, রাজাধিরাজ …. (ইত্যাদি) এ-সে-ছে-ন !!!” ঐসব হাঁকাহাঁকিতেও গুরুর আচরণে কোনো হেলদোলই দেখা দিলো না ! তাই দেখে আলেকজান্ডার নিজেই এগিয়ে এসে অভিবাদন জানিয়ে নিজের পরিচয় দিল এবং সে যে রাজা হয়েছে তাও বললো । এরপর সে গুরুকে রাজধানীতে নিয়ে যাবার অনুরোধ জানালো_কিন্তু সাথে সাথেই গুরু তার প্রত্যখ্যান করলেন। এরপর আলেকজান্ডার তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলো যে, ‘তাঁর রাজার কাছে কিছু চাওয়ার আছে কিনা ‘! উত্তরে গুরু একটু হেসে শুয়ে শুয়েই উত্তর দিয়েছিলেন – ” হ্যাঁ, একটাই চাওয়ার আছে । তোমরা ভিড় করে দাঁড়ানোয় আমার গায়ে যে রোদ পরছিল, সেটায় বাধা সৃষ্টি হওয়ায় তা আর পাচ্ছি না ! তাই তোমরা যদি সরে দাঁড়াও _ তাহলে খুবই ভালো হয় ৷ আর তুমি রাজাধিরাজ হয়ে যদি নিজেকে রৗেদ্র বা সূর্যেরও কর্ত্তা মনে করো, তাহলে যা খুশি তাই করতে পারো !” আলেকজান্ডার এই কথা শুনে লজ্জিত হয়ে সরে গিয়েছিল।
সুতরাং সর্বত্যাগী সাধুদের তেজের কথা সে জানতো বলে_ নিজেই সাধু কল্লনের সাথে দেখা করতে গিয়েছিল ।
সেখানে গিয়ে আলেকজান্ডার সাধুর কাছে কিছু জ্ঞানের কথা শুনতে চেয়েছিল ৷ কল্লন কিন্তু প্রথমটায় তার সঙ্গে কথাই বলতে চাননি ! অম্ভির অনুরোধে শুধু কিছু শাস্ত্রকথা শুনিয়েছিলেন । তারপর সেই সাধু আলেকজান্ডারকে কিছুক্ষণ ভালো করে নিরীক্ষণ করে বলেন – ” তুমি জীবনে অনেক খারাপ কাজ করেছো, মানুষের রক্তে তোমার হাত রঞ্জিত ! কেন পৃথিবীকে রক্তাক্ত করছো, কেন এতো হিংসার আশ্রয় নিচ্ছো ? যা করেছো করেছো – এবার দেশে ফিরে যাও এবং বাকি জীবন হিংসা ছেড়ে সৎভাবে জীবন-যাপন করো ৷”
এই ধরণের সোজাসাপ্টা কথা শুনে আলেকজান্ডার সেই সাধুকে বলেছিল যে, _’সে বিভিন্ন দেশজয়ী বীর,সে ইচ্ছা করলে তাকে এই মূহূর্ত্তেই হত্যা করতে পারে ‘। এর উত্তরে সাধু উচ্চৈস্বরে হেসে ওঠেন এবং বলেন – ” ‘আমা’কে মারার সাধ্য তোমার নাই । তুমি ‘আমা’র দেহকে হত্যা করতে পারো কিন্তু ‘আমা’কে নয় । ‘আমি’ অস্ত্রে ছিন্ন হই না, জলে ডুবি না, আগুনে দগ্ধ হই না । ‘আমি’ শাশ্বত, নিত্য, চিরন্তন, অজর, অমর (গীতা বললেন)।”
সাধুর কাছ থেকে ফেরার পর থেকেই আলেকজান্ডার বিমর্ষ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তবু অম্ভির কথায় সে পাঞ্জাব আক্রমণ করলো (কারণ পুরুর পরাক্রমের সাথে অম্ভি কখনোই পারতো না। পুরুকে জব্দ করার জন্যেই তার বিদেশী শক্তিকে আনা!)। আর ঐ যুদ্ধ হয়েছিল পুরুর পুত্রের সাথে(পুরুর সাথে নয়), যুদ্ধে আহতও হয়েছিল আলেকজান্ডার ! ফলে যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত হয়ই নি ! পুরুর সৈন্যরা আলেকজান্ডারের বহু সৈন্যকে মেরে ফেলেছিল, অনেকে আহতও হয়েছিল ৷
বাকী সৈন্যরা এবং আহতরা আলেকজান্ডারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ফিরে যেতে চাইলো । কারণ, তারা দেখলো __’তাদের বহু সাথী মারা গিয়েছে, ফলে আগেকার লুটের মাল এখন দ্বিগুণ হয়ে গেছে ! নতুন করে পাওয়ার আর কোনো আশাই নাই _ তাই যা আছে সেটাকে নিয়ে আপন আপন স্থানে ফিরে যাওয়াই ভালো ! কারণ মারা গেলে তো আর এগুলি ভোগ করা যাবে না ‘৷
এছাড়াও পুরুর ছেলের সাথে যুদ্ধে আলেকজান্ডার ভীষণভাবে আহত ও রক্তাক্ত হয়েছিল । সেটা দেখেও সৈন্যরা বুঝলো যে, রাজার সন্বন্ধে যে প্রচার ছিল (ঈশ্বরপুত্র, অপরাজেয়) তা মিথ্যা ! রাজা পরাজিত, রক্তাক্ত বা আহতও হোতে পারে ! তাই তারা ওখান থেকেই ফিরে যেতে শুরু করেছিল । আলেকজান্ডার পুরুর কাছে আত্মসমর্পণ করায় , ওদের মধ্যে একটা সন্ধিস্থাপনও হয়েছিল। তাই তাদের সকলেরই ফেরার ব্যবস্থাও করে দিয়েছিল পাঞ্জাবের সম্রাট পুরু স্বয়ং । ফেরার পথেই অল্পভোগী, অল্পবয়সী আলেকজান্ডারের মৃত্যু হয়েছিল ! অনেকে বলে যে আততায়ীর হাতে মারা যায়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে রোগব্যাধির প্রকোপে আলেকজান্ডারের মৃত্যু হয়েছিল। বিভিন্ন রোগের মধ্যে, ওর শরীরে যৌনরোগের লক্ষণও ছিল ! …. [ক্রমশঃ]
যাইহোক, পারস্য থেকে গান্ধারের পথে এগিয়ে যাবার সময় রাস্তায় পড়েছিল পুষ্কলাবতী নগরী। বর্তমান আফগানিস্তান সহ ওই সব অঞ্চল তখন ভারতেরই অন্তর্ভূক্ত ছিল । পুস্কলাবতীর পরের উল্লেখযোগ্য রাজ্যের নাম ছিল অবন্তিপুর ৷ পুষ্কলাবতীতে তখন একজন রানী ছিলেন সিংহাসনে আসীন [হয়তো রাজার আকস্মাৎ মৃত্যু হয়, তারই স্ত্রী (রানী) সিংহাসনে বসেন অথবা রাজার মৃত্যুর পর তার পুত্র না থাকায় কন্যা সিংহাসনে আরোহন করেন)। এখানেই যুদ্ধের সময় প্রাচ্যের রণকৌশলের সাথে আলেকজান্ডারের প্রথম পরিচয় হয় (ভারতীয় শশ্ত্রবিদ্যা ও রণকৌশল আসিরিয়,সুমেরিয় ইত্যাদিদের চেয়ে আলাদা ছিল ৷ সোজা তরোয়াল এবং বাঁকা তরোয়ালের ব্যবহারটাও একটা অন্যতম ব্যাপার ছিল।) এই যুদ্ধে আলেকজান্ডারের সৈন্যবাহিনীর ব্যাপক ক্ষতি হয়, ওর প্রচুর সৈন্য মারা গিয়েছিল । কিন্তু পুষ্কলাবতী খুবই ক্ষুদ্র রাজ্য ছিল, সৈন্যসংখ্যাও কম । তাই রাণী স্বয়ং বীরবিক্রমে যুদ্ধ করেও শেষরক্ষা করতে পারেননি ৷ আলেকজান্ডারের সেনাবাহিনীর অবশিষ্টরা এরপর ওখানে নারকীয় হত্যালীলা চালায় । একে তো ওরা বেশিরভাগই ছিল মরুদস্যু, বাকিরা North Greece -এর উপজাতি_যারা আলেকজান্ডারের সঙ্গে এসেছিল ! ওদেরকে বর্তমান গ্রীসের শিক্ষিত সমাজ barbarian বলে অভিহিত করে । ওখান থেকেই বাংলায় ‘বর্বর’ কথাটি এসেছে । অসভ্য, আদিম, হিংস্র অর্থে ‘বর্বর’।
যাইহোক, আলেকজান্ডারের এই সৈন্যদল সব জায়গাতেই নির্বিচারে খুন করতো, যথেচ্ছ লুটপাট করতো ! লুটের মাল বলতে ধনরত্ন-অলংকার, খাদ্য এবং নারী ! বাকী যারা থাকতো অর্থাৎ সাধারণ মানুষ_তাদেরকে হত্যা করে ঘরবাড়ি সহ সবকিছুতেই আগুন লাগিয়ে দিতো! শস্যক্ষেত্র-শস্যাগারও পুড়িয়ে দিতো, কারন ওরা জানতো__এখন ওরা আগাচ্ছে বটে কিন্তু একসময় ওদের এই পথেই ফিরতে হবে ! তাই ফেরার সময় যেন কোনো প্রতিরোধের মুখে পড়তে না হয় তাই এই ব্যবস্থা ।
তৎকালীন পশ্চিম ভারতের(অবন্তিপুর) রাজা অম্ভি হঠাৎ করে বিনাযুদ্ধে আলেকজান্ডারের বশ্যতা স্বীকার না করলে হয়তো ওর সৈন্যরা ওখান থেকেই ফিরে যেতো ৷ পুষ্কলাবতীর যুদ্ধে আলেকজান্ডারের সৈন্যসংখ্যা অর্ধেক হয়ে যাওয়ায় বাকিদের মনোবল ভেঙে পড়েছিল ! ওরা ভাবছিল__ ‘লুটের মাল যা পাওয়া গেছে – ওই নিয়েই নিজের নিজের ডেরায় ফিরে যাওয়া যাক্! প্রাণে বেঁচে থাকলে, তবে তো এসবের দাম! অন্যথায় এইসব বয়ে বয়ে বেড়িয়ে কি হবে?’
অবন্তীপুরের রাজা অম্ভি আলেকজান্ডারকে সমাদর করে তার রাজ্যে আহ্বান করে শুধু নিয়েই গেল না –আলেকজান্ডারকে আশ্বাস দিল যে, —‘ ভারতবর্ষের বাকি রাজ্য জয় করতে সে সৈন্য সাহায্যও করবে ‘। ব্যস্, নতুন সঞ্জীবনী পেয়ে গেল আলেকজান্ডার !! সে মনোবল ভেঙে পড়া সৈন্যবাহিনীকে পুনরায় চাঙ্গা করার জন্য বলল – “এতদিন তোমরা এমন বেশি আর কি লুটের মাল পেয়েছো ? এবার আমাদের লক্ষ্য যে সব রাজ্য, সেগুলি সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা ! সেখানে প্রচুর ধনরত্ন – সেইসব মাল না নিয়ে ফিরে যাবে ? দেখলে তো _আমি অজেয় এবং ঈশ্বরপুত্র বলেই _আমার প্রয়োজনে কেমন সাহায্য এসে গেল ! এবার এই রাজার সৈন্য দের কাছে তোমরা _এদেশের রণকৌশল শিখে নাও! তাহলেই তোমাদের পরবর্তী রাজ্যগুলি জয় করতে অসুবিধা হবে না! তখন তোমরা এক একজনে প্রচুর লুটের মাল পেয়ে যাবে !”
রাজার কথায় সৈন্যরা লোভ সংবরন করতে না পেরে আরও এগিয়ে যেতে রাজি হয়ে গেল ! অবন্তীপুরে অম্ভির আতিথিয়তায় কিছুদিন থাকার সময়কালে আলেকজান্ডার অম্ভিকে বলেছিল__’ সেখানে কোনো আধ্যাত্মিকভাবে উন্নত গুরু রয়েছে কিনা তার খোঁজ করে তাকে ধরে নিয়ে আসতে!’ অম্ভির দুতেরা খুঁজে খুঁজে কল্লন নামের একজন আধ্যাত্মিক উন্নত সাধুর সন্ধান পেয়েছিল। কিন্তু সেই সাধু রাজদরবারে আসতে রাজি হননি ! একজন দোভাষীকে সঙ্গে নিয়ে আলেকজান্ডার নিজেই তাঁর সাথে দেখা করতে গিয়েছিল ।
সাধুটির উপর জোর-জবরদস্তি না করে, আলেকজান্ডারের নিজেই দেখা করতে যাবার পিছনেও একটা কারণ ছিল ৷ রাজা হবার পর আলেকজান্ডার ওর গুরু অ্যারিস্টটলের কাছে (যিনি শুধু দার্শনিকই নন, একজন উন্নত সাধকও ছিলেন!) সেনাপতি পাঠিয়ে রাজধানীতে ডেকে পাঠিয়েছিল, কিন্তু গুরু আসেন নি । শেষ বয়সে উনি রাজ্যের বাইরে নদীর ধারে একটা পাতার কুটির নির্মাণ করে বসবাস করতেন । তিনি সেনাপতিকে বলেছিলেন যে. _’তিনি রাজার প্রজা নন । তিনি ঈশ্বরের রাজত্বে স্বাধীনভাবে বাস করেন – তাই রাজার আদেশ মানতে তিনি বাধ্য নন’। সেনাপতি ফিরে গিয়ে এই কথা বলতেই _ তখন দলবল নিয়ে রাজা নিজেই গিয়েছিল গুরুর কাছে । উনি তখন নদীর ধারে পড়ন্ত শীতের বেলায় একটা বড় পাথরের উপর রোদে শুয়েছিলেন । রাজার নকীব হাঁক পাড়লো – “মহামান্য সম্রাট, রাজাধিরাজ …. (ইত্যাদি) এ-সে-ছে-ন !!!” ঐসব হাঁকাহাঁকিতেও গুরুর আচরণে কোনো হেলদোলই দেখা দিলো না ! তাই দেখে আলেকজান্ডার নিজেই এগিয়ে এসে অভিবাদন জানিয়ে নিজের পরিচয় দিল এবং সে যে রাজা হয়েছে তাও বললো । এরপর সে গুরুকে রাজধানীতে নিয়ে যাবার অনুরোধ জানালো_কিন্তু সাথে সাথেই গুরু তার প্রত্যখ্যান করলেন। এরপর আলেকজান্ডার তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলো যে, ‘তাঁর রাজার কাছে কিছু চাওয়ার আছে কিনা ‘! উত্তরে গুরু একটু হেসে শুয়ে শুয়েই উত্তর দিয়েছিলেন – ” হ্যাঁ, একটাই চাওয়ার আছে । তোমরা ভিড় করে দাঁড়ানোয় আমার গায়ে যে রোদ পরছিল, সেটায় বাধা সৃষ্টি হওয়ায় তা আর পাচ্ছি না ! তাই তোমরা যদি সরে দাঁড়াও _ তাহলে খুবই ভালো হয় ৷ আর তুমি রাজাধিরাজ হয়ে যদি নিজেকে রৗেদ্র বা সূর্যেরও কর্ত্তা মনে করো, তাহলে যা খুশি তাই করতে পারো !” আলেকজান্ডার এই কথা শুনে লজ্জিত হয়ে সরে গিয়েছিল।
সুতরাং সর্বত্যাগী সাধুদের তেজের কথা সে জানতো বলে_ নিজেই সাধু কল্লনের সাথে দেখা করতে গিয়েছিল ।
সেখানে গিয়ে আলেকজান্ডার সাধুর কাছে কিছু জ্ঞানের কথা শুনতে চেয়েছিল ৷ কল্লন কিন্তু প্রথমটায় তার সঙ্গে কথাই বলতে চাননি ! অম্ভির অনুরোধে শুধু কিছু শাস্ত্রকথা শুনিয়েছিলেন । তারপর সেই সাধু আলেকজান্ডারকে কিছুক্ষণ ভালো করে নিরীক্ষণ করে বলেন – ” তুমি জীবনে অনেক খারাপ কাজ করেছো, মানুষের রক্তে তোমার হাত রঞ্জিত ! কেন পৃথিবীকে রক্তাক্ত করছো, কেন এতো হিংসার আশ্রয় নিচ্ছো ? যা করেছো করেছো – এবার দেশে ফিরে যাও এবং বাকি জীবন হিংসা ছেড়ে সৎভাবে জীবন-যাপন করো ৷”
এই ধরণের সোজাসাপ্টা কথা শুনে আলেকজান্ডার সেই সাধুকে বলেছিল যে, _’সে বিভিন্ন দেশজয়ী বীর,সে ইচ্ছা করলে তাকে এই মূহূর্ত্তেই হত্যা করতে পারে ‘। এর উত্তরে সাধু উচ্চৈস্বরে হেসে ওঠেন এবং বলেন – ” ‘আমা’কে মারার সাধ্য তোমার নাই । তুমি ‘আমা’র দেহকে হত্যা করতে পারো কিন্তু ‘আমা’কে নয় । ‘আমি’ অস্ত্রে ছিন্ন হই না, জলে ডুবি না, আগুনে দগ্ধ হই না । ‘আমি’ শাশ্বত, নিত্য, চিরন্তন, অজর, অমর (গীতা বললেন)।”
সাধুর কাছ থেকে ফেরার পর থেকেই আলেকজান্ডার বিমর্ষ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তবু অম্ভির কথায় সে পাঞ্জাব আক্রমণ করলো (কারণ পুরুর পরাক্রমের সাথে অম্ভি কখনোই পারতো না। পুরুকে জব্দ করার জন্যেই তার বিদেশী শক্তিকে আনা!)। আর ঐ যুদ্ধ হয়েছিল পুরুর পুত্রের সাথে(পুরুর সাথে নয়), যুদ্ধে আহতও হয়েছিল আলেকজান্ডার ! ফলে যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত হয়ই নি ! পুরুর সৈন্যরা আলেকজান্ডারের বহু সৈন্যকে মেরে ফেলেছিল, অনেকে আহতও হয়েছিল ৷
বাকী সৈন্যরা এবং আহতরা আলেকজান্ডারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ফিরে যেতে চাইলো । কারণ, তারা দেখলো __’তাদের বহু সাথী মারা গিয়েছে, ফলে আগেকার লুটের মাল এখন দ্বিগুণ হয়ে গেছে ! নতুন করে পাওয়ার আর কোনো আশাই নাই _ তাই যা আছে সেটাকে নিয়ে আপন আপন স্থানে ফিরে যাওয়াই ভালো ! কারণ মারা গেলে তো আর এগুলি ভোগ করা যাবে না ‘৷
এছাড়াও পুরুর ছেলের সাথে যুদ্ধে আলেকজান্ডার ভীষণভাবে আহত ও রক্তাক্ত হয়েছিল । সেটা দেখেও সৈন্যরা বুঝলো যে, রাজার সন্বন্ধে যে প্রচার ছিল (ঈশ্বরপুত্র, অপরাজেয়) তা মিথ্যা ! রাজা পরাজিত, রক্তাক্ত বা আহতও হোতে পারে ! তাই তারা ওখান থেকেই ফিরে যেতে শুরু করেছিল । আলেকজান্ডার পুরুর কাছে আত্মসমর্পণ করায় , ওদের মধ্যে একটা সন্ধিস্থাপনও হয়েছিল। তাই তাদের সকলেরই ফেরার ব্যবস্থাও করে দিয়েছিল পাঞ্জাবের সম্রাট পুরু স্বয়ং । ফেরার পথেই অল্পভোগী, অল্পবয়সী আলেকজান্ডারের মৃত্যু হয়েছিল ! অনেকে বলে যে আততায়ীর হাতে মারা যায়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে রোগব্যাধির প্রকোপে আলেকজান্ডারের মৃত্যু হয়েছিল। বিভিন্ন রোগের মধ্যে, ওর শরীরে যৌনরোগের লক্ষণও ছিল ! …. [ক্রমশঃ]
