[31-st December, 1994] আজিমগঞ্জ
জিজ্ঞাসু :– গুরুমহারাজ ! কয়েকদিন ধরেই শুনছি, কদিন আগে আপনার গলা বসে গেছিলো – আপনি কথা-ই ভালো করে বলতে পারছিলেন না ৷ কি ব্যাপার হয়েছিল ?
গুরুমহারাজ :– মুর্শিদাবাদের এই সমস্ত অঞ্চল গঙ্গার তীরবর্তী, তাই কাঁচারাস্তায় গাড়ি চলার ফলে প্রচুর ধুলো ওড়ে ৷ তাই এখানে সব সময় সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম ধূলিকণা বাতাসে ভাসমান অবস্থায় থাকে । এখানে দেখছো তো __সবসময়ই এই ধুলোবালির রাস্তা দিয়ে যানবাহন চলছে, (তখনও আজিমগঞ্জের দিয়ারা, আহিনগর আশ্রমের সামনের রাস্তাগুলো মাটির কাঁচা রাস্তা ছিল), গরুর পাল যাচ্ছে, গরুর গাড়ি চলছে, আর সূক্ষ্ম ধূলোর কণাগুলি সবসময় উড়ে গিয়ে বাতাসে মিশে যাচ্ছে ৷ কদিন ধরেই এগুলো আমার ল্যারিংস বা ফ্যারিংস (Larinx & Farinx) কে জ্যাম্ (Jam) করেছিল ৷ তার উপরে আবার এক কান্ড হয়েছিল _যখন রসবেরুলিয়া আশ্রমে গিয়েছিলাম, তখন ওখানকার কর্মকর্তারা মোটর সাইকেলের পিছনে বসিয়ে, আমাকে এখানে ওখানে খুব ঘুরিয়েছিল ৷ ওই সময়েতেই নাক-মুখ দিয়ে প্রচুর ধুলো ভিতরে প্রবেশ করে গেছিলো ৷ এছাড়া আরও একটা কারণের কথাও বলা যায় — রসবেরুলিয়া আশ্রমে গিয়ে, ওখানকার একটা পুকুরের জলে স্নান করেছিলাম । এগুলি সবই আমার গলায় ঐ Infection-এর জন্য এক একটা বড় কারণ ছিল ।
এরপর যে কান্ডটা ঘটেছিল, সেইটা ছিল আরও মারাত্নক! শ্যামাপদ (তখন উনিই রসবেরুলিয়া আশ্রমের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, উনি ইসলামপুর হাইস্কুলের টিচার ছিলেন) আর ওর স্ত্রী মিলে তুলসীপাতার রসের সাথে কি সব মিশিয়ে ঠান্ডা মতো কিছু একটা যেই খাওয়ালো, অমনি সাথে সাথেই আমার গলাটা গলা বুজে গেল ! খাওয়ার আগে আমি ওদেরকে কত নিষেধ করলাম – ‘তোমরা অত চিন্তা কোরো না, ঠিক হয়ে যাবে ‘।৷ কিন্তু এখানকার মানুষের তমোভক্তি ! শুনবে না কিছুতেই ! জোর করে খাওয়া লো_ আর ওই কান্ড ঘটে গেল !
আমার অবস্থা কেমনটা হোল জানো –আমি দেখলাম, আমার গলা দিয়ে তখন কোন আওয়াজই বেরোচ্ছে না, গলার আওয়াজটা যেন ফ্যাসফ্যাস্ করছে ! সেই অবস্থায় সামান্য কথা বোঝানোর জন্য আমাকে এতো শক্তি প্রয়োগ করতে হচ্ছিলো যে, স্বাভাবিক গলায় ততোটা জোর দিলে মাইকের সমান আওয়াজ বেরোতো ! তাহলেই বুঝতে পারছো__ ঐ ক’দিন মানুষের সঙ্গে সামান্যতম Communication করতে গেলেও আমার কতটা কষ্ট হয়েছে !
এর পরের ইতিহাস আরও করুণ ! ওই অবস্থায় শুরু হোল আমার উপর “ডাক্তারীয় অত্যাচার” ! ‘গুরুদেবের গলা বসে গেছে’, গুরুদেব কথা বলতে পারছে না’ !– ব্যস্, আর যায় কোথায় । যার যা টোটকা জানা ছিল সবাই আমার উপর প্রয়োগ করতে লাগলো ৷ আর এর ফলে, আমার গলার অসুবিধা আরও বেরে গেল ! তখন ভক্তদের ভালোবাসার অত্যাচারে বিপন্ন হয়ে, আমি খড়দহের অরুণবাবুকে বললাম, – ‘ তুমি তো একটু-আধটু হোমিওপ্যাথি ওষুধ রাখো, দু-এক পুরিয়া দাও তো’ !
সত্যি সত্যিই ওনার কাছে ওষুধ ছিল এবং অরুণ বাবু আমাকে সেই ওষুধ দিয়েছিল ৷ এইবার আমি একটা বড় সুযোগ পেয়ে গেলাম। দলে দলে যেসব ভক্তরা তাদের টোটকা নিয়ে আসছিলো – আমি তাদেরকে বললাম__ ‘আমার এখন Treatment চলছে, ফলে অন্য ওষুধ তো এখন চলবে না’ ! সকলকে এই একটা কথা বলেই তাদের _”গুরুদেবের উপর চালানো হাতুড়েগিরি” থেকে রেহাই পেয়েছিলাম I ঐ পন্থা অবলম্বন না করলে, হয়তো ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের মতো আমাকেও গলার ঘা নিয়ে বাকী জীবনটা কাটাতে হোতো !
দ্যাখো, ওই সময় আমি দেখেছিলাম যে, প্রায় সকল ভক্তরাই অন্যসময় বলে – ” বাবা, আপনি ভগবান ! বাবা, আপনি সদ্গুরু ! বাবা, আপনি অমুক, বাবা আপনি তমুক !” –কিন্তু যেই আমি অসুস্থ হোলাম, কেউ ভাবলো না – উনি যখন ভগবান (নিদেনপক্ষে মহাপুরুষ তো বটেনই!)নিজে নিজেই ঠিক করে নিতে পারেন বা ওনাকে জিজ্ঞাসা করি – “এখন কি করা উচিত !” না— তারা এসব কিছু করলো না – নিজেরাই কর্ত্তাত্তি করতে শুরু করলো, আর আমাকে খামোকা কয়েকদিন দুঃসহ কষ্ট ভোগ করতে হোলো !
তবে গল্পটা এখনও শেষ হয়নি ! অরুণবাবুর কাছে হোমিওপ্যাথি ওষুধ খাওয়ার পর অন্যান্য টোটকাগুলো যেহেতু কিছু আর খাইনি এবং দু-চার দিন পর থেকে আমার গলার স্বরও Normal হোতে শুরু করলো, অমনি পাবলিকের কাছে অরুণবাবুর পরিচয় হয়ে গেল – “গুরুজীর ডাক্তার”!!!! অরুণবাবু (অরুণ কুমার দে, খড়দহের একটি হাইস্কুলের টিচার ছিলেন) তো কোন পাশ করা ডাক্তার নয়, বাড়িতে বই-টই পড়ে একটু-আধটু চর্চা করতেন । কিন্তু যেইমাত্র ওর ওষুধ খেয়েছি (আদৌ খেয়েছিলেন কিনা কে জানে!), এবং রোগারোগ্য হয়েছিল_তাই অতি দ্রুত এই অথাটা প্রচার হয়ে গেল ! ভক্তমহলে ‘ডাক্তার’ হিসাবে অরুণবাবুর খ্যাতিও এক লাফে বেশ খানিকটা বেড়ে গেল !
সুতরাং একটু আগে বলছিলাম না, যে প্রশংসা মানুষের মনে অহংকার সৃষ্টি করে, ভালো কিছু করে না । – এখানে সেইরকম ঘটলো । তাও তো আমি নিজের মুখে প্রশংসাও করিনি, হয়তো বলেছি, “আমি অরুণবাবুর দেওয়া ওষুধ খাচ্ছি”– ব্যস্, এটুকুই ! এতেই কত কান্ড হয়ে গেল ! এরা সব জানে(আজিমগঞ্জের ইয়ং ভক্তদের দিকে নির্দেশ করে বললেন)_কৌতূহল থাকলে এদের কাছে জেনে নিও।(ক্রমশঃ)
জিজ্ঞাসু :– গুরুমহারাজ ! কয়েকদিন ধরেই শুনছি, কদিন আগে আপনার গলা বসে গেছিলো – আপনি কথা-ই ভালো করে বলতে পারছিলেন না ৷ কি ব্যাপার হয়েছিল ?
গুরুমহারাজ :– মুর্শিদাবাদের এই সমস্ত অঞ্চল গঙ্গার তীরবর্তী, তাই কাঁচারাস্তায় গাড়ি চলার ফলে প্রচুর ধুলো ওড়ে ৷ তাই এখানে সব সময় সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম ধূলিকণা বাতাসে ভাসমান অবস্থায় থাকে । এখানে দেখছো তো __সবসময়ই এই ধুলোবালির রাস্তা দিয়ে যানবাহন চলছে, (তখনও আজিমগঞ্জের দিয়ারা, আহিনগর আশ্রমের সামনের রাস্তাগুলো মাটির কাঁচা রাস্তা ছিল), গরুর পাল যাচ্ছে, গরুর গাড়ি চলছে, আর সূক্ষ্ম ধূলোর কণাগুলি সবসময় উড়ে গিয়ে বাতাসে মিশে যাচ্ছে ৷ কদিন ধরেই এগুলো আমার ল্যারিংস বা ফ্যারিংস (Larinx & Farinx) কে জ্যাম্ (Jam) করেছিল ৷ তার উপরে আবার এক কান্ড হয়েছিল _যখন রসবেরুলিয়া আশ্রমে গিয়েছিলাম, তখন ওখানকার কর্মকর্তারা মোটর সাইকেলের পিছনে বসিয়ে, আমাকে এখানে ওখানে খুব ঘুরিয়েছিল ৷ ওই সময়েতেই নাক-মুখ দিয়ে প্রচুর ধুলো ভিতরে প্রবেশ করে গেছিলো ৷ এছাড়া আরও একটা কারণের কথাও বলা যায় — রসবেরুলিয়া আশ্রমে গিয়ে, ওখানকার একটা পুকুরের জলে স্নান করেছিলাম । এগুলি সবই আমার গলায় ঐ Infection-এর জন্য এক একটা বড় কারণ ছিল ।
এরপর যে কান্ডটা ঘটেছিল, সেইটা ছিল আরও মারাত্নক! শ্যামাপদ (তখন উনিই রসবেরুলিয়া আশ্রমের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, উনি ইসলামপুর হাইস্কুলের টিচার ছিলেন) আর ওর স্ত্রী মিলে তুলসীপাতার রসের সাথে কি সব মিশিয়ে ঠান্ডা মতো কিছু একটা যেই খাওয়ালো, অমনি সাথে সাথেই আমার গলাটা গলা বুজে গেল ! খাওয়ার আগে আমি ওদেরকে কত নিষেধ করলাম – ‘তোমরা অত চিন্তা কোরো না, ঠিক হয়ে যাবে ‘।৷ কিন্তু এখানকার মানুষের তমোভক্তি ! শুনবে না কিছুতেই ! জোর করে খাওয়া লো_ আর ওই কান্ড ঘটে গেল !
আমার অবস্থা কেমনটা হোল জানো –আমি দেখলাম, আমার গলা দিয়ে তখন কোন আওয়াজই বেরোচ্ছে না, গলার আওয়াজটা যেন ফ্যাসফ্যাস্ করছে ! সেই অবস্থায় সামান্য কথা বোঝানোর জন্য আমাকে এতো শক্তি প্রয়োগ করতে হচ্ছিলো যে, স্বাভাবিক গলায় ততোটা জোর দিলে মাইকের সমান আওয়াজ বেরোতো ! তাহলেই বুঝতে পারছো__ ঐ ক’দিন মানুষের সঙ্গে সামান্যতম Communication করতে গেলেও আমার কতটা কষ্ট হয়েছে !
এর পরের ইতিহাস আরও করুণ ! ওই অবস্থায় শুরু হোল আমার উপর “ডাক্তারীয় অত্যাচার” ! ‘গুরুদেবের গলা বসে গেছে’, গুরুদেব কথা বলতে পারছে না’ !– ব্যস্, আর যায় কোথায় । যার যা টোটকা জানা ছিল সবাই আমার উপর প্রয়োগ করতে লাগলো ৷ আর এর ফলে, আমার গলার অসুবিধা আরও বেরে গেল ! তখন ভক্তদের ভালোবাসার অত্যাচারে বিপন্ন হয়ে, আমি খড়দহের অরুণবাবুকে বললাম, – ‘ তুমি তো একটু-আধটু হোমিওপ্যাথি ওষুধ রাখো, দু-এক পুরিয়া দাও তো’ !
সত্যি সত্যিই ওনার কাছে ওষুধ ছিল এবং অরুণ বাবু আমাকে সেই ওষুধ দিয়েছিল ৷ এইবার আমি একটা বড় সুযোগ পেয়ে গেলাম। দলে দলে যেসব ভক্তরা তাদের টোটকা নিয়ে আসছিলো – আমি তাদেরকে বললাম__ ‘আমার এখন Treatment চলছে, ফলে অন্য ওষুধ তো এখন চলবে না’ ! সকলকে এই একটা কথা বলেই তাদের _”গুরুদেবের উপর চালানো হাতুড়েগিরি” থেকে রেহাই পেয়েছিলাম I ঐ পন্থা অবলম্বন না করলে, হয়তো ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের মতো আমাকেও গলার ঘা নিয়ে বাকী জীবনটা কাটাতে হোতো !
দ্যাখো, ওই সময় আমি দেখেছিলাম যে, প্রায় সকল ভক্তরাই অন্যসময় বলে – ” বাবা, আপনি ভগবান ! বাবা, আপনি সদ্গুরু ! বাবা, আপনি অমুক, বাবা আপনি তমুক !” –কিন্তু যেই আমি অসুস্থ হোলাম, কেউ ভাবলো না – উনি যখন ভগবান (নিদেনপক্ষে মহাপুরুষ তো বটেনই!)নিজে নিজেই ঠিক করে নিতে পারেন বা ওনাকে জিজ্ঞাসা করি – “এখন কি করা উচিত !” না— তারা এসব কিছু করলো না – নিজেরাই কর্ত্তাত্তি করতে শুরু করলো, আর আমাকে খামোকা কয়েকদিন দুঃসহ কষ্ট ভোগ করতে হোলো !
তবে গল্পটা এখনও শেষ হয়নি ! অরুণবাবুর কাছে হোমিওপ্যাথি ওষুধ খাওয়ার পর অন্যান্য টোটকাগুলো যেহেতু কিছু আর খাইনি এবং দু-চার দিন পর থেকে আমার গলার স্বরও Normal হোতে শুরু করলো, অমনি পাবলিকের কাছে অরুণবাবুর পরিচয় হয়ে গেল – “গুরুজীর ডাক্তার”!!!! অরুণবাবু (অরুণ কুমার দে, খড়দহের একটি হাইস্কুলের টিচার ছিলেন) তো কোন পাশ করা ডাক্তার নয়, বাড়িতে বই-টই পড়ে একটু-আধটু চর্চা করতেন । কিন্তু যেইমাত্র ওর ওষুধ খেয়েছি (আদৌ খেয়েছিলেন কিনা কে জানে!), এবং রোগারোগ্য হয়েছিল_তাই অতি দ্রুত এই অথাটা প্রচার হয়ে গেল ! ভক্তমহলে ‘ডাক্তার’ হিসাবে অরুণবাবুর খ্যাতিও এক লাফে বেশ খানিকটা বেড়ে গেল !
সুতরাং একটু আগে বলছিলাম না, যে প্রশংসা মানুষের মনে অহংকার সৃষ্টি করে, ভালো কিছু করে না । – এখানে সেইরকম ঘটলো । তাও তো আমি নিজের মুখে প্রশংসাও করিনি, হয়তো বলেছি, “আমি অরুণবাবুর দেওয়া ওষুধ খাচ্ছি”– ব্যস্, এটুকুই ! এতেই কত কান্ড হয়ে গেল ! এরা সব জানে(আজিমগঞ্জের ইয়ং ভক্তদের দিকে নির্দেশ করে বললেন)_কৌতূহল থাকলে এদের কাছে জেনে নিও।(ক্রমশঃ)
