[গুরু মহারাজ রামায়ণে বর্ণিত চরিত্রগুলি নিয়ে আলোচনা করছিলেন। আজ সেই আলোচনার শেষাংশ…..!]
… শূর্পণখাকে রাক্ষসী হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে ৷ ‘শূর্প-নখা’ কথাটির অর্থ ‘কুলো’-র মতো নখ । এখানেই পণ্ডিতরা ভুল ব্যাখ্যা করেছে ৷ ‘কুলো’ মানে হচ্ছে ধান বা কলাই-মাকড় কে ধুলো-বালি-ময়লা মুক্ত করার জন্য কৃষক পরিবারের ব্যবহৃত একটি সামগ্রী । সাধারণত: মানুষের নখের আকার গঠনগত ভাবে ঐ কুলোর আকারের মতোই হয় । ঠিক ঠিক কুলোর গঠনের মতো যদি নখেরও আকার বা আকৃতি হয়_ তাহলে হাতের আঙ্গুলের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায় । তাই শূর্পনখা অর্থে যে রমণীর ‘সুন্দর নখ’। দেহ-সৌন্দর্য প্রকাশের একটা প্রবণতা মানুষের রয়েছেই – এটা অস্বীকার করা যায় না । পুরুষ হলে মাংসপেশী, চুল, গোঁফ-দাড়ি এগুলির পরিচর্যা করে নিজের সৌন্দর্য প্রদর্শন করতে চায় ! আর নারীরা কেশ, ত্বক, নখের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে তা পুরুষের কাছে প্রদর্শন করে নিজেকে পুরুষের চোখে আকর্ষণীয় করতে চায় ! এগুলো কোনো দোষের নয় – এগুলিই স্বাভাবিক নিয়ম, যৌবনের ধর্ম । পুরুষ নারীর কাছে নিজেকে আকর্ষণীয় করতে চায় ! আর নারী নিজেকে আকর্ষণীয় করতে চায় পুরুষের চোখে । কোনো নারী এই কথার প্রতিবাদ করতে পারে – কিন্তু দ্যাখো, এখানে তোমরা যেসব মেয়েরা বসে আছো, তোমরা সবাই আমার কন্যা ! – তবু জিজ্ঞাসা করছি বলোতো – তোমরা যখন খুব সেজেগুজে বাইরে বেরোও তখন তোমাদেরকে কেউ তোমার রূপচর্চার বা কেশবিন্যাসের প্রশংসা করে তাহলে তোমাদের ভালো লাগে কি_ না লাগে ? আবার ধরো, তুমি সেজেগুজে রাস্তায় বেরোলে বা কোথাও বেড়াতে গেলে__ অথচ কেউ তোমার দিকে ধ্যান দিচ্ছে না – তাকিয়েও দেখছে না, তাহলে কি তুমি বাইরে বেরোবার মজা পাবে ? ___পাবেনা ! এটা নারীর স্বভাবে রয়েছে ! তবে যে কথাটা বললাম এটা general___ ব্যতিক্রম সবের-ই রয়েছে, সেটা অন্য কথা !
রামায়ণের শূর্পনখারও নামকরণ ঐভাবেই হয়েছিল! ‘কুলো’-র মতো বড় বড় কান বিশিষ্ট নারী নয়, ‘সুন্দর আকৃতির নখ যে নারীর’_এই অর্থে শুর্পনখা ! নাম যাই হোক, তার ছিল রাক্ষসী-স্বভাব, অর্থাৎ প্রচন্ড অহংকারী – সব সময় নিজের রূপ, বংশমর্যাদা, দাদা(রাবন,কুম্ভকর্ণ)-দের শক্তি ইত্যাদি নিয়ে অহংকার করতো ৷ যখন যা চাইতো তাই পেতো – কারণ রাবণের মতো শক্তিশালী রাজার বোন ছিল সে ! আর প্রকৃতপক্ষেই শূর্পনখা সুন্দরীও ছিল, কিন্তু এই ধরনের অহংকারী রমণীদের চরিত্রে যে সব দোষ থাকে – সে সবই সূর্পনখার ছিল ! রাবণ তার আদরের বোনের Bodyguard হিসাবে দুজন সেনাপতি(খর ও দূষণ) এবং তাদের under. -এ কিছু সৈন্য দিয়ে দিয়েছিল ৷ এইসব নিয়ে শূর্পনখা তাদের রাজ্য থেকে বেরিয়ে দক্ষিণভারত বা মধ্যভারতের বিভিন্ন অঞ্চল স্বেচ্ছাচারীনীর ন্যায় ঘুরে বেড়াতো। এইরকমই একবার ঘুরে বেড়ানোর সময় বনবাসী রাম-লক্ষণের সাথে ওর দেখা হয়ে গিয়েছিল । আগেই বলা হয়েছে যে, লঙ্কার রাজকুমারীর স্বভাব মোটেই ভাল ছিল না – সুন্দর চেহারার এবং সুদর্শন পুরুষ দেখলেই তাকে নিজের শয়নকক্ষে আহবান করতো । রাম-লক্ষণ রাজপুরুষ, অসম্ভব সুন্দর এবং বলিষ্ঠ চেহারাবিশিষ্ট ছিলেন । তাদেরকে দেখে শূর্পনখা ঐ একই প্রস্তাব দিয়ে বসলো । রাম তার সাথে স্ত্রী রয়েছে বলে বা অন্য কোনোভাবে এড়িয়ে গেলেন ! তখন সে লক্ষণকেই ঐ একই প্রস্তাব দিয়ে বসলো ৷ আর এরপরেই ওই কান্ড – “নাক-কানকাটা”!! এখানে ‘নাক-কাটা’ বা ‘কান-কাটা’ অর্থে সর্বসমক্ষে নারীত্বের চরম অপমান ! লক্ষণ সদ্য বিবাহ করলেও তখনো পর্যন্ত আজন্ম ব্রহ্মচারী ছিলেন ৷ তিনি স্ত্রী-সংসর্গ বা মেয়েদের সংস্পর্শ একদম পছন্দ করতেন না ৷ তাই ওই রমণীর নির্লজ্জতা বা বেহায়াপনা দেখে চরম বিরক্ত হয়ে গেছিলেন লক্ষণ ! কারণ আর্যাবর্তে কোনো রমণীর এই ধরনের স্বেচ্ছাচার লক্ষণ কখনো দেখেননি । সরাসরি কোনো নারী যে ওই ধরনের প্রস্তাব দিতে পারে বিশেষত দাদা রামকে, যিনি বিবাহিত_ এই ধরনের স্বেচ্ছাচারিতার সাথে ওনারা পরিচিত ছিলেন না। তার উপরে আবার__ রামের কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়ে লক্ষণকেও সেই একই approch করা – এইসব দেখে লক্ষণ আর নিজেকে সংযত রাখতে পারেন নি (যেটা কিন্তু রামচন্দ্র পেরেছিলেন)! সকলের সামনেই তিনি ওই নারীকে তার সতীত্ব তুলে চরম অপমান করে বসেন ! কোনো পুরুষ, নারীকে এইভাবে refuse করছে_ এটাই হোল নারীত্বের অপমান ! এই ব্যাপারটা যে কোনো নারীর পক্ষে সর্বাপেক্ষা অপমান – এটাকেই শাস্ত্রে নারীর ‘নাক কাটা’, বা ‘কান কাটা’– বলে বর্ণনা করা হয়েছে ৷ কোনো বাণ চালিয়ে বা অন্য কোনো রকম অস্ত্রাঘাতে ‘নাক কাটা’ হয়নি !! চরম বাক্যবাণে তাকে এমন অপমান করা হয়েছিল যে, শূর্পনখা লঙ্কারাজ্যে ফিরে গিয়ে এই ঘটনার প্রতিশোধ নেবার জন্য__ নানারকম কথা বলে ভ্রাতা রাবণকে একেবারে তাতিয়ে তুলেছিল ! আদরিনী ভগিনীর প্রতি ঘটে যাওয়া অপমানের শোধ নিতে গিয়েই তো রাবন সীতাকে অপহরণ করেছিল। আর তাতেই ঘটে গেল লঙ্কাকান্ড !!
যাইহোক, যা বলতে চাইছিলাম_দ্যাখো, এইভাবেই রামায়ণ, মহাভারত বা প্রাচীন অন্যান্য ভারতীয় শাস্ত্রাদির ভুল ব্যাখ্যা হয়েছে ! বিদেশীদের এদেশে আগমনের পর থেকেই এই কাণ্ডটি আরো বেশি বেশি করে হয়েছে । তাছাড়া পরবর্তীকালের টীকাকার বা ব্যাখ্যাকাররাও__রাজতন্ত্রের যুগে, রাজতন্ত্র ও ব্রাহ্মণ্যবাদের কবলে পড়ে শাস্ত্রের ব্যাখ্যা সহজ-সরল ভাষায় না করে হেঁয়ালির সাহায্যে অথবা গল্পের মাধ্যমে করতো । যাতে সাধারন মানুষ শাস্ত্রের অর্থ সহজে বুঝতে না পারে । আবার কোনো কোনো পরম্পরায় মন্ত্রগুপ্তির শিক্ষা ছিল অর্থাৎ তাদের গুরুর শিক্ষা সেই পরম্পরার লোক ছাড়া অন্যেরা জানতে পারবে না ! এছাড়াও ভারতীয় শাস্ত্রাদিতে রয়েছে প্রচুর প্রক্ষিপ্ত অংশ (যেগুলো সমাজপতি ব্রাহ্মণ এবং রাজন্যবর্গের নির্দেশে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটা অবশ্য সব দেশের ধর্মগ্রন্থের ক্ষেত্রেই ঘটেছে!)_যেগুলি মূলগ্রন্থে ছিল না ! এইরকম নানান উৎপাতের ফলে আধুনিক সমাজে ভারতীয় শাস্ত্রাদির এই দুর্দশা ! কিন্তু দ্যাখো, কোনো মানুষ যদি শুদ্ধ অন্তঃকরণে সঠিকটা (সত্য) জানতে চায় অর্থাৎ যদি সে শেখার ব্যাপারে আন্তরিক হয় ___তাহলে কিন্তু কোনো বাধাই সেখানে কাজ করবে না ৷ জার্মান পন্ডিত ম্যাক্সমুলার ২৫ বছর ধরে সংস্কৃত শিখে ভারতের বেদ-বেদান্ত পড়ে ফেললো এবং ইংরাজিতে অনুবাদও করলো । হয়তো স্থানে স্থানে সে ভুল ব্যাখ্যা করেছে, কিন্তু পশ্চিমী দুনিয়ায় বেদ-বেদান্তকে ছড়িয়ে তো দিয়েছে ! আর তোমরা___ ভারতীয় হয়ে, শিক্ষিত বাঙালি হয়ে__ কি আর করলে বলো ? মাঝে মাঝে তোমরা এইভাবে নিজে নিজেই আত্মবিশ্লেষণ করবে __তাহলে তোমরা প্রত্যেকে নিজের নিজের চেতনার অবস্থান সম্বন্ধে আরও ভালো করে উপলব্ধি করতে পারবে ৷
(ক্রমশঃ)
