জিজ্ঞাসু :– আপনিও তো মানব কল্যানের জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করছেন, মানুষকে শিক্ষা দিচ্ছেন, দীক্ষা দিচ্ছেন !
গুরুমহারাজ :– আমি মা(জগদম্বা)য়ের নির্দেশে কাজ করি ! মা – যা করতে বলেন আমি তাই করি ! ছোটোছেলে যেমন মায়ের কাছে আবদার করে বেশি কিছু আদায় করে নেয় – তেমনি আমি অবশ্য কিছু কিছু আদায়-ও করি । এই আমি sitting করছি__এর মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়ার কথা বলছো তো – কিন্তু দ্যাখো, আমি কিন্তু বেদ-বেদান্ত-দর্শনাদি ইত্যাদি কোনো বই সেভাবে পড়িনি ৷ তবে, আমার ভ্রমনকালে বহু সাধু-সন্ত, মহাত্মাদের সঙ্গ করেছি –তখন তাঁদের কাছে অনেক কিছু শুনেছি । তবু তোমাদের জিজ্ঞাসার উত্তর যখন দিই – তখন আমার মুখে কথা আপনা থেকেই যুগিয়ে যায় । কিভাবে জোগায় তা_আমি নিজেই বুঝতে পারি না, কিন্তু জুগিয়ে যায় ! অনেক সময় এমন হয়, হয়তো আমি তখনও ঘর থেকে বেরোয়নি, ঘরেই বসে রয়েছি, ওখান থেকেই বাইরেটা দেখতে পাচ্ছি – কে কে এসেছে, কে কোথায় বসে আছে ! তারপর আবার দেখি কোন্ অবস্থান থেকে কে, কি জিজ্ঞাসা করছে এবং সঙ্গে সঙ্গে তার উত্তরগুলোও তৈরি হয়ে যাচ্ছে ! ফলে আমি ঘর থেকে বেরিয়ে যখন আসনে বসি – তারপর থেকে যা-যা হয় সে সবই যেন পূর্বের ঘটে যাওয়া ঘটনার পুনরাবৃত্তি !
আর আমি মন্ত্র (দীক্ষা)-ও দিই __মা জগদম্বার ইচ্ছাতেই । উনি আমাকে দিয়ে এখন এইটা করিয়ে নিচ্ছেন ৷ কিন্তু মন্ত্র দিলে কি হবে__দেখিতো, যারা মন্ত্র নিয়েছে, তাদের বেশীরভাগই কোনো চর্চাই করে না ৷ ভাবটা এমন যেন মন্ত্র নেওয়া হয়ে গেছে – ব্যস্ আবার কি ? তবু আমি কেন মন্ত্র দিই – সেটা অনেকটা সেই পিশাচসিদ্ধের গল্পের মতো ! জানোতো গল্পটা ! – এক সাধক পিশাচ-সাধনা করছিল । কিছুকাল সাধনা করার পর একদিন হঠাৎ পিশাচ প্রকট হয়ে গেল আর সাধককে বলল, “কি হুকুম হুজুর ! আমায় কাজ বলে দাও, আমি কাজ না পেলে থাকতে পারি না । কোনো কাজ না পেলে তোমার ঘাড় মটকাবো ।” সাধক চট্ করে বলল – আমাকে বড় বাড়ি করে দাও,– চট করে পিশাচ তা করে দিল ৷ এইভাবে বাড়ি-গাড়ি-দাস-দাসী-জমি-জমা সবই যোগাড় হয়ে গেল ৷ তবু পিশাচ আরও কাজ চায়, কিন্তু সাধুবাবা আর দেবার মত কাজ খুঁজে পাচ্ছিলো না । কিন্তু কাজ না পেলে তো পিশাচ তার ঘাড় মটকাবে । তাই সেই সাধক দৌড় লাগালো, গেল তার গুরুদেবের কাছে !
গুরুদেব সব শুনে ব্যাপারটা বুঝলেন, তারপর পিশাচকে বললেন, ” যাও, দূরে ওই পাহাড়ের পাদদেশে যাও ।” মুহূর্তে পিশাচ সেখানে পৌঁছে গেল আর চিৎকার করে পরের কাজ কি তা জিজ্ঞাসা করলো । গুরুদেব ওখান থেকেই বললেন, “যে বড় পাথরের চাঁইটা ওখানে পড়ে আছে, ওটা মাথায় করে নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় ওঠো ।” পিশাচ তাও উঠে পরলো । এবার পাহাড়ের মাথা থেকে জিজ্ঞাসা করলো – এরপর কি করবে ? গুরুদেব বললেন – “এবার পাথরের চাঁই মাথায় নিয়ে নেমে এসো ।” গুরুদেবকে আবার যখন পিশাচ জিজ্ঞাসা করলো – এবার সে কি করবে ? গুরুদেব তাকে একই আদেশ দিলেন যে, “ওই পাথরের চাঁই মাথায় নিয়ে পাহাড়ের মাথায় একবার ওঠ্, আর একবার নাম্ _ এইরকম করতে থাক্ ৷” এই একই কাজ করতে করতে একটা সময় আসবে যখন ঐ পিশাচ ক্লান্ত হয়ে পড়বে – তখন তাকে বশে আনা যাবে ।
আমিও এখন এটাই করছি । যারা মন্ত্র নিতে আসে তাদেরকে দীক্ষা দিয়ে বিভিন্ন ক্রিয়ার সাথে মন্ত্রজপ ও ধ্যান করার কথা বলি ৷ শ্বাসে-প্রশ্বাসে ‘জপ’ করতে বলা হয় । ‘জপ’ করার ক্ষেত্রে শুচি-অশুচি, সময়-অসময় বিচার করার প্রয়োজন নাই । এইরকম করতে করতে মানুষের চঞ্চল মন যখন শান্ত হবে, তখনই সবকিছু ধীরে ধীরে বশে আসবে ৷ আর শান্ত মনে, মন্ত্রের তাৎপর্য্য প্রকাশও পাবে । এমন অবস্থা প্রাপ্ত হোলে, তখন মন্ত্রের প্রভাবে ঐ সাধকের জীবনে আমূল পরিবর্তন আসবে ! বীজ বপন করার পর যেমন তাকে Nurturing করার প্রয়োজন হয়, না হোলে কখনোই সেই বীজ থেকে সুপুষ্ট গাছ হয় না বা সেই গাছে উন্নত মানের ফুল-ফল হয় না __এখানেও ব্যাপারটা অনেকটাই তেমনি । এই যে এখানে সিটিং হয় বা প্রত্যহ ধর্মালোচনা করা হয় – এটাই ঐ Narturing ! এর মাধ্যমে তোমাদের মনকে একাগ্র করার অভ্যাস তৈরি করে দেওয়া এবং Spirituality -র touch দেওয়া ! এ যেন “পরমানন্দ”-এর দেওয়া “আনন্দ”-এর স্পর্শ ! এইজন্যই আমি সকলকে বলি “মাঝে মাঝে আশ্রমে এসো!” এছাড়াও অন্যত্র প্রকৃত সাধুসঙ্গেও কাজ হয়।
আমি দেখেছি, মানুষের হৃদয়ে এতো কিছু বিষয় জায়গা করে নিয়েছে যে, যেন তাদের অভ্যন্তরটা গিজ-গিজ করছে, সেখানে পরমানন্দের স্থান কোথায় ? আমি প্রথমে সেখানে “তিল”-মাত্র স্থান করে নিই । তারপর ওই যে বললাম ক্রিয়ার কথা, সেটা করতে করতেই “তিল –তাল” হয় ! আমার স্থান সেখানে স্থায়ী হয়ে যায় ৷ আর একবার স্থায়ী হয়ে গেলে আর চিন্তা কি ? তখন তার ঠাঁই পরমানন্দলোকে !
দ্যাখো, যতক্ষণ না মন্ত্রের অন্তর্নিহিত রূপটি প্রকটিত হোচ্ছে, ততক্ষণ মানুষের খুব একটা আভ্যন্তরীণ পরিবর্তন হয় না বা চেতনার উত্তরণ ঘটে না । আমি তো দেখেছি কোনো মানুষ খুব হরিনাম করছে, হরিবাসর হোলেই সেখানে যোগদান করছে, কিন্তু সেখান থেকে ফিরে এসে প্রতিবেশীর সাথে ঝগড়া-ঝাঁটি, মামলা-মোকদ্দমা করছে । তাহলে কি লাভ হোল ? ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন – আবেগপ্রবণ হয়ে বা লাফাঝাঁপা করে হরিনাম করলে কুলকুণ্ডলিনী জেগে গিয়ে খানিকটা উপরে উঠে, কিন্তু তারপরই ফরফর্ করে নিচের দিকে নেমে যায় ৷ এই নামার সময় কাম, ক্রোধ ইত্যাদি বিভিন্ন রিপুর প্রবল বেগ আসে ।
তাহলে ভাব বা আবেগকে control বা নিয়ন্ত্রণ তো করতেই হবে! আর এইটি করার উপায় কী হবে ? মহাপুরুষের সান্নিধ্য এবং সংস্পর্শ ! ওস্তাদ বেদের সামনে যেমন উদ্যত ফণা সাপ মাথা নত করে থাকে, তেমনি আত্মজ্ঞানী মহাপুরুষের কাছে বসলে মানুষের কাম-ক্রোধাদি রিপু যেন ঘুমিয়ে থাকে । তোমরা তোমাদের নিজেদেরকে দিয়ে কি এটা লক্ষ্য করেছো ? পারিবারিক জীবন থেকে বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনে এসে যখন দু-চারদিন কাটিয়ে যাও, তখন তোমার অভ্যস্ত জীবনের প্রভাব কাজ করে কি ? করে না ৷ আবার যখন বনগ্রাম থেকে বেরিয়ে যাও অমনি তোমার বাড়ির কথা, পারিবারিক সমস্যা, সামাজিক সমস্যার সব কথা তোমার মনে পড়ে যায় ! কি !–এরকমটা হয় না ? কোনো লোহাকে চুম্বকে পরিণত করতে গেলে যেমন চুম্বক দিয়ে লোহাটাকে বারবার ঘষতে হয় ৷ যখনই চুম্বক লোহার কাছে আসছে তখন সাময়িকভাবে সেটাও চুম্বকে পরিণত হচ্ছে – আবার যেই সরে যাচ্ছে, লোহা যে কে সেই ! কিন্তু বারবার ঘষাঘষি করতে করতে একসময় ঐ লোহাটাই হয়ে যায় চুম্বক !
আধ্যাত্মিক জগতেও এমনটাই হয় । মীরাবাঈ বলেছিলেন – ” হরিসে লগন লাগাতে রহ রে ভাই, তেরি বনত বনত বনি যাই ৷” এই যে একটু আগে দীক্ষার সময় মন্ত্রসহ কিছু ক্রিয়ার কথা বলা হচ্ছিলো, প্রাণ-অপানের খেলায় ঐ ক্রিয়াযোগ নিয়ন্ত্রণ আনে । ‘গুরু’ মানুষের অভ্যন্তর জগতে ঢুকবে কি করে ? প্রাণকে ধরেই ভিতরে প্রবেশ করতে হয় ৷ তাই শ্বাসে-প্রশ্বাসে জপ করার কথা বলা হয় । মন্ত্র –অর্থাৎ যা মনকে ত্রান করে । কিন্তু এই যে আড়াই অক্ষর (বা কম-বেশি) মন্ত্র, এর স্থূলরূপের অভ্যন্তরে সূক্ষ্মরূপ রয়েছে, সূক্ষ্মরূপের অভ্যন্তরে রয়েছে সূক্ষাতিসূক্ষ রূপ ! মানুষের মনোজগৎ যত শুদ্ধ হয়, মন্ত্রের সূক্ষ্মরূপ, সূক্ষাতিসূক্ষ্মরূপ ততই প্রকটিত বা প্রকাশিত হোতে থাকে ৷ তখন ঐ রূপের Vibration এবং সমগ্র মানুষের জীবন রূপ Vibration___ একসুরে বাঁধা পড়ে যায় । আর এই সুর সংগীত হয়ে মহাসংগীতের সুরে মিশে যায় ! এটাই আত্মা ও পরমাত্মার মিলন !! মনুষ্যজীবন লাভের সার্থকতার চূড়ান্ত অবস্থা ।৷
গুরুমহারাজ :– আমি মা(জগদম্বা)য়ের নির্দেশে কাজ করি ! মা – যা করতে বলেন আমি তাই করি ! ছোটোছেলে যেমন মায়ের কাছে আবদার করে বেশি কিছু আদায় করে নেয় – তেমনি আমি অবশ্য কিছু কিছু আদায়-ও করি । এই আমি sitting করছি__এর মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়ার কথা বলছো তো – কিন্তু দ্যাখো, আমি কিন্তু বেদ-বেদান্ত-দর্শনাদি ইত্যাদি কোনো বই সেভাবে পড়িনি ৷ তবে, আমার ভ্রমনকালে বহু সাধু-সন্ত, মহাত্মাদের সঙ্গ করেছি –তখন তাঁদের কাছে অনেক কিছু শুনেছি । তবু তোমাদের জিজ্ঞাসার উত্তর যখন দিই – তখন আমার মুখে কথা আপনা থেকেই যুগিয়ে যায় । কিভাবে জোগায় তা_আমি নিজেই বুঝতে পারি না, কিন্তু জুগিয়ে যায় ! অনেক সময় এমন হয়, হয়তো আমি তখনও ঘর থেকে বেরোয়নি, ঘরেই বসে রয়েছি, ওখান থেকেই বাইরেটা দেখতে পাচ্ছি – কে কে এসেছে, কে কোথায় বসে আছে ! তারপর আবার দেখি কোন্ অবস্থান থেকে কে, কি জিজ্ঞাসা করছে এবং সঙ্গে সঙ্গে তার উত্তরগুলোও তৈরি হয়ে যাচ্ছে ! ফলে আমি ঘর থেকে বেরিয়ে যখন আসনে বসি – তারপর থেকে যা-যা হয় সে সবই যেন পূর্বের ঘটে যাওয়া ঘটনার পুনরাবৃত্তি !
আর আমি মন্ত্র (দীক্ষা)-ও দিই __মা জগদম্বার ইচ্ছাতেই । উনি আমাকে দিয়ে এখন এইটা করিয়ে নিচ্ছেন ৷ কিন্তু মন্ত্র দিলে কি হবে__দেখিতো, যারা মন্ত্র নিয়েছে, তাদের বেশীরভাগই কোনো চর্চাই করে না ৷ ভাবটা এমন যেন মন্ত্র নেওয়া হয়ে গেছে – ব্যস্ আবার কি ? তবু আমি কেন মন্ত্র দিই – সেটা অনেকটা সেই পিশাচসিদ্ধের গল্পের মতো ! জানোতো গল্পটা ! – এক সাধক পিশাচ-সাধনা করছিল । কিছুকাল সাধনা করার পর একদিন হঠাৎ পিশাচ প্রকট হয়ে গেল আর সাধককে বলল, “কি হুকুম হুজুর ! আমায় কাজ বলে দাও, আমি কাজ না পেলে থাকতে পারি না । কোনো কাজ না পেলে তোমার ঘাড় মটকাবো ।” সাধক চট্ করে বলল – আমাকে বড় বাড়ি করে দাও,– চট করে পিশাচ তা করে দিল ৷ এইভাবে বাড়ি-গাড়ি-দাস-দাসী-জমি-জমা সবই যোগাড় হয়ে গেল ৷ তবু পিশাচ আরও কাজ চায়, কিন্তু সাধুবাবা আর দেবার মত কাজ খুঁজে পাচ্ছিলো না । কিন্তু কাজ না পেলে তো পিশাচ তার ঘাড় মটকাবে । তাই সেই সাধক দৌড় লাগালো, গেল তার গুরুদেবের কাছে !
গুরুদেব সব শুনে ব্যাপারটা বুঝলেন, তারপর পিশাচকে বললেন, ” যাও, দূরে ওই পাহাড়ের পাদদেশে যাও ।” মুহূর্তে পিশাচ সেখানে পৌঁছে গেল আর চিৎকার করে পরের কাজ কি তা জিজ্ঞাসা করলো । গুরুদেব ওখান থেকেই বললেন, “যে বড় পাথরের চাঁইটা ওখানে পড়ে আছে, ওটা মাথায় করে নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় ওঠো ।” পিশাচ তাও উঠে পরলো । এবার পাহাড়ের মাথা থেকে জিজ্ঞাসা করলো – এরপর কি করবে ? গুরুদেব বললেন – “এবার পাথরের চাঁই মাথায় নিয়ে নেমে এসো ।” গুরুদেবকে আবার যখন পিশাচ জিজ্ঞাসা করলো – এবার সে কি করবে ? গুরুদেব তাকে একই আদেশ দিলেন যে, “ওই পাথরের চাঁই মাথায় নিয়ে পাহাড়ের মাথায় একবার ওঠ্, আর একবার নাম্ _ এইরকম করতে থাক্ ৷” এই একই কাজ করতে করতে একটা সময় আসবে যখন ঐ পিশাচ ক্লান্ত হয়ে পড়বে – তখন তাকে বশে আনা যাবে ।
আমিও এখন এটাই করছি । যারা মন্ত্র নিতে আসে তাদেরকে দীক্ষা দিয়ে বিভিন্ন ক্রিয়ার সাথে মন্ত্রজপ ও ধ্যান করার কথা বলি ৷ শ্বাসে-প্রশ্বাসে ‘জপ’ করতে বলা হয় । ‘জপ’ করার ক্ষেত্রে শুচি-অশুচি, সময়-অসময় বিচার করার প্রয়োজন নাই । এইরকম করতে করতে মানুষের চঞ্চল মন যখন শান্ত হবে, তখনই সবকিছু ধীরে ধীরে বশে আসবে ৷ আর শান্ত মনে, মন্ত্রের তাৎপর্য্য প্রকাশও পাবে । এমন অবস্থা প্রাপ্ত হোলে, তখন মন্ত্রের প্রভাবে ঐ সাধকের জীবনে আমূল পরিবর্তন আসবে ! বীজ বপন করার পর যেমন তাকে Nurturing করার প্রয়োজন হয়, না হোলে কখনোই সেই বীজ থেকে সুপুষ্ট গাছ হয় না বা সেই গাছে উন্নত মানের ফুল-ফল হয় না __এখানেও ব্যাপারটা অনেকটাই তেমনি । এই যে এখানে সিটিং হয় বা প্রত্যহ ধর্মালোচনা করা হয় – এটাই ঐ Narturing ! এর মাধ্যমে তোমাদের মনকে একাগ্র করার অভ্যাস তৈরি করে দেওয়া এবং Spirituality -র touch দেওয়া ! এ যেন “পরমানন্দ”-এর দেওয়া “আনন্দ”-এর স্পর্শ ! এইজন্যই আমি সকলকে বলি “মাঝে মাঝে আশ্রমে এসো!” এছাড়াও অন্যত্র প্রকৃত সাধুসঙ্গেও কাজ হয়।
আমি দেখেছি, মানুষের হৃদয়ে এতো কিছু বিষয় জায়গা করে নিয়েছে যে, যেন তাদের অভ্যন্তরটা গিজ-গিজ করছে, সেখানে পরমানন্দের স্থান কোথায় ? আমি প্রথমে সেখানে “তিল”-মাত্র স্থান করে নিই । তারপর ওই যে বললাম ক্রিয়ার কথা, সেটা করতে করতেই “তিল –তাল” হয় ! আমার স্থান সেখানে স্থায়ী হয়ে যায় ৷ আর একবার স্থায়ী হয়ে গেলে আর চিন্তা কি ? তখন তার ঠাঁই পরমানন্দলোকে !
দ্যাখো, যতক্ষণ না মন্ত্রের অন্তর্নিহিত রূপটি প্রকটিত হোচ্ছে, ততক্ষণ মানুষের খুব একটা আভ্যন্তরীণ পরিবর্তন হয় না বা চেতনার উত্তরণ ঘটে না । আমি তো দেখেছি কোনো মানুষ খুব হরিনাম করছে, হরিবাসর হোলেই সেখানে যোগদান করছে, কিন্তু সেখান থেকে ফিরে এসে প্রতিবেশীর সাথে ঝগড়া-ঝাঁটি, মামলা-মোকদ্দমা করছে । তাহলে কি লাভ হোল ? ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন – আবেগপ্রবণ হয়ে বা লাফাঝাঁপা করে হরিনাম করলে কুলকুণ্ডলিনী জেগে গিয়ে খানিকটা উপরে উঠে, কিন্তু তারপরই ফরফর্ করে নিচের দিকে নেমে যায় ৷ এই নামার সময় কাম, ক্রোধ ইত্যাদি বিভিন্ন রিপুর প্রবল বেগ আসে ।
তাহলে ভাব বা আবেগকে control বা নিয়ন্ত্রণ তো করতেই হবে! আর এইটি করার উপায় কী হবে ? মহাপুরুষের সান্নিধ্য এবং সংস্পর্শ ! ওস্তাদ বেদের সামনে যেমন উদ্যত ফণা সাপ মাথা নত করে থাকে, তেমনি আত্মজ্ঞানী মহাপুরুষের কাছে বসলে মানুষের কাম-ক্রোধাদি রিপু যেন ঘুমিয়ে থাকে । তোমরা তোমাদের নিজেদেরকে দিয়ে কি এটা লক্ষ্য করেছো ? পারিবারিক জীবন থেকে বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনে এসে যখন দু-চারদিন কাটিয়ে যাও, তখন তোমার অভ্যস্ত জীবনের প্রভাব কাজ করে কি ? করে না ৷ আবার যখন বনগ্রাম থেকে বেরিয়ে যাও অমনি তোমার বাড়ির কথা, পারিবারিক সমস্যা, সামাজিক সমস্যার সব কথা তোমার মনে পড়ে যায় ! কি !–এরকমটা হয় না ? কোনো লোহাকে চুম্বকে পরিণত করতে গেলে যেমন চুম্বক দিয়ে লোহাটাকে বারবার ঘষতে হয় ৷ যখনই চুম্বক লোহার কাছে আসছে তখন সাময়িকভাবে সেটাও চুম্বকে পরিণত হচ্ছে – আবার যেই সরে যাচ্ছে, লোহা যে কে সেই ! কিন্তু বারবার ঘষাঘষি করতে করতে একসময় ঐ লোহাটাই হয়ে যায় চুম্বক !
আধ্যাত্মিক জগতেও এমনটাই হয় । মীরাবাঈ বলেছিলেন – ” হরিসে লগন লাগাতে রহ রে ভাই, তেরি বনত বনত বনি যাই ৷” এই যে একটু আগে দীক্ষার সময় মন্ত্রসহ কিছু ক্রিয়ার কথা বলা হচ্ছিলো, প্রাণ-অপানের খেলায় ঐ ক্রিয়াযোগ নিয়ন্ত্রণ আনে । ‘গুরু’ মানুষের অভ্যন্তর জগতে ঢুকবে কি করে ? প্রাণকে ধরেই ভিতরে প্রবেশ করতে হয় ৷ তাই শ্বাসে-প্রশ্বাসে জপ করার কথা বলা হয় । মন্ত্র –অর্থাৎ যা মনকে ত্রান করে । কিন্তু এই যে আড়াই অক্ষর (বা কম-বেশি) মন্ত্র, এর স্থূলরূপের অভ্যন্তরে সূক্ষ্মরূপ রয়েছে, সূক্ষ্মরূপের অভ্যন্তরে রয়েছে সূক্ষাতিসূক্ষ রূপ ! মানুষের মনোজগৎ যত শুদ্ধ হয়, মন্ত্রের সূক্ষ্মরূপ, সূক্ষাতিসূক্ষ্মরূপ ততই প্রকটিত বা প্রকাশিত হোতে থাকে ৷ তখন ঐ রূপের Vibration এবং সমগ্র মানুষের জীবন রূপ Vibration___ একসুরে বাঁধা পড়ে যায় । আর এই সুর সংগীত হয়ে মহাসংগীতের সুরে মিশে যায় ! এটাই আত্মা ও পরমাত্মার মিলন !! মনুষ্যজীবন লাভের সার্থকতার চূড়ান্ত অবস্থা ।৷
