জিজ্ঞাসু :– আমি কলকাতায় ক্রিয়াযোগীদের সংস্থায় গিয়েছিলাম । ওরা যা বললো তাতে এটাই বোঝা গেল – যারা ক্রিয়াযোগী নয় তারা কোনোভাবেই আধ্যাত্মিকভাবে উন্নত হোতে পারে না ৷ এই যে আমরা পরমানন্দ মিশনে দীক্ষিত, ওদের মতে এইসব দীক্ষায় কোনো লাভ হয় না । আমাকে ওরা এইসব বললো, ওদের কথাগুলো কতোটা ঠিক ?
গুরুমহারাজ :– দ্যাখো দিদিমণি ! তুমি যখন গুরুকরণ করেছো অর্থাৎ দীক্ষা গ্রহণ করেছো, তখন তোমাকে তো দীক্ষার তাৎপর্য, ক্রিয়াযোগের তাৎপর্য__ এগুলিও জেনে রাখতে হবে ।
তুমি যখন স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি নিয়েছিলে – তার আগে তুমি তো পড়াশোনা করে নিজেকে প্রস্তুত করে তবেই Interview Board -এর সামনে বসেছিলে –না কি ? তাহলে এখন যখন আধ্যাত্মিক জগতে এসেছো – বিভিন্ন Organisation-এ গিয়ে মত বিনিময় করতে যাচ্ছো – তখন নিজেকে প্রস্তুত হয়ে যাওয়াটাই তো উচিৎ ! নাহলে তারা যা বলবে, তাই তোমাকে নতমস্তকে শুনে আসতে হবে ! বুঝতে পারছো ব্যাপারটা ! কিন্তু কোনো অবস্থাতেই অন্তরে কষ্ট পেলে চলবে না, সবকিছু হজম করে নিতে শিখতে হবে ! কোনো Organisation যদি একজন উন্নত মহাপুরুষের পরম্পরা হয় – তাহলে সেখানে অবশ্যই সত্য রয়েছে ! হয়তো পরবর্তীতে উন্নত সাধকের অভাবে অনেকটাই মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হবার সম্ভাবনাও থাকছে – তবু একটা মূল সুর সেখানে থেকেই যায় । ক্রিয়াযোগী পরম্পরার স্রষ্টা যোগী শ্যামাচরণ লাহিড়ী ঈশ্বর-আদিষ্ট পুরুষ ছিলেন । হিমালয়ে বাবাজী মহারাজের কাছে উনি পূর্ব পূর্ব জন্মের সাধনালব্ধ যোগজ্ঞান সহ এই জন্মের জন্য প্রয়োজনীয় সাধন লাভ করেন এবং সিদ্ধ হ’ন । উনি পরবর্তীতে সমাজকল্যাণের নিমিত্ত পরম্পরাগতভাবে সেই যোগজ্ঞানের মাত্র কয়েকটি যোগক্রিয়া “সাধন” হিসাবে প্রদান করেন । সেটাই যুক্তেশ্বর গিরি, স্বামী যোগানন্দ ইত্যাদি গুরু পরম্পরায় ‘ক্রিয়াযোগ’ নামে সমাজে প্রচলিত । শ্যামাচরণ লাহিড়ী সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য কঠিন যোগক্রিয়াকে সহজ করে, সবার গ্রহণযোগ্য হিসাবে রূপদান করেছিলেন ৷ ঐ ক্রিয়াগুলি ঠিকমতো করলে কুণ্ডলিনীর জাগরণ হয় এবং তার ঊর্ধ্বগতিও হয় ৷ এটা আমি পরীক্ষা করে দেখেছি ৷
কিন্তু ঐ যে বলছিলাম__ যে কোনো পরম্পরায় উপযুক্ত সাধনসম্পন্ন গুরুর অভাবে যে দশা হয় – এখানেও সেটাই হয়েছে ! স্বামী যোগানন্দের সময় থেকেই সন্ন্যাসী পরম্পরা এবং গৃহী পরম্পরা – এই দুটি শাখায় ক্রিয়াযোগীরা বিভক্ত হয়ে যায় । যোগানন্দের পরবর্তী সন্ন্যাসী পরম্পরার অনেকে দেশে এবং বিদেশে (আমেরিকা) খুবই খ্যাতি অর্জন করেছিল । গৃহী পরম্পরার অনেকেও দু-এক জেনারেশন আধ্যাত্মিক পরম্পরাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল_কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এখন সেখানে ঘাটতি পড়ে যাচ্ছে !
যাই হোক, এখন কথা হোচ্ছে দিদিমণি – তোমাকে যে ব্যক্তি ‘ক্রিয়াযোগ’ সম্বন্ধে বলেছে__ সে এটাই বলেছে যে, ‘ক্রিয়াযোগ’ না করলে কোনো সাধকের কোনোরূপ
উন্নতিই হয় না ৷ এটা তো ঠিকই বলেছে ৷ মানুষের জীবনে হাঁটা-চলা, খাওয়া-নাওয়া ইত্যাদি সবই, এমনকি শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণও তো ‘ক্রিয়া’। আবার যে কোনো ক্রিয়াই যখন ঈশ্বরের সাথে যোগ হয়, আত্মতত্ত্ব লাভের প্রচেষ্টায় সম্পন্ন হয়, মনুষ্যজীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্যে উপনীত হবার জন্য হয় – তাই ‘ক্রিয়াযোগ’ হয়ে যায় । কিন্তু তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে যে ব্যক্তি তোমাকে কথাগুলো বলেছে __তার এই ধারণা তৈরি হয় নি ! সেইজন্যেই সে তোমাকে বলেছে যে, ‘ একমাত্র ওদের পরম্পরাতে দীক্ষা নিলে, তবেই কারো আধ্যাত্মিক উন্নতি হবে_আর তা না নিয়ে অন্য কোথাও দীক্ষা নিয়ে ‘ক্রিয়া’ করলে কোনো লাভ হবে না !
এইটা অজ্ঞানের কথা । যেকোনো পরম্পরায়, আধ্যাত্মিক ব্যক্তির অভাবে এই একই ধরনের বক্তব্য প্রকাশ পায় । তুমি গোটা পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মীয় পরম্পরা বা ধর্মমতের ধ্বজাধারীদের কাছে এই এক কথাই শুনবে যে, তাদের Group-এ দীক্ষা না নিলে বা তাদের মত না মানলে কারো কোনো আধ্যাত্মিক উন্নতি হবে না ! কিন্তু দ্যাখো, বেদ (ভারতীয় শাস্ত্র) কি বলেছে – ”সমস্ত নদী যেমন বিভিন্ন পথ পরিক্রমা করে সাগরে এসে মেশে, তেমনই পৃথিবীর সমস্ত ধর্মমতের সাধনা সেই পরমেশ্বরের সাধনায় পরিণত হয়” । ___এইটাই চরম সত্য, এটাই শাশ্বত- সনাতন- চিরন্তন সত্য ! এইজন্যই বেদ (ভারতীয় ধর্মশাস্ত্র) পৃথিবীর ধর্মগ্রন্থ হিসাবে শ্রেষ্ঠ ও সবার গ্রহণযোগ্য । ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন, _’মত অনেক কিন্তু সেগুলি সবই পথ’ – আন্তরিক হোলে এবং গুরুতে ঐকান্তিক নিষ্ঠা থাকলে, যে কোনো ‘মতের পথ’ ধরেই সাধক অন্তিম লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে । কারণ সব মতের পথ-ই এসে “রাজপথে” মেশে ! আর এই রাজপথ ধরে আগাতে পারলেই _রাজদর্শন হবেই ! ঠাকুর আরও বলেছিলেন – ‘সবাই ভাবছে তার ঘড়িই সঠিক সময় দিচ্ছে, অপরেরটা ভুল ! কিন্তু সে কি জানে যে তার নিজেরটাই ভুল নয় ? সেইজন্য সূর্যঘড়ির সঙ্গে নিজের ঘড়ির সময় মিলিয়ে নিতে হয়’ ৷ এখানে বেদ বা উপনিষদ-ই হোল সূর্যঘড়ি ৷ গোটা পৃথিবীর যত মতের, যত ধর্মশাস্ত্র রয়েছে – তাদের বক্তব্যের মধ্যে যদি কোথাও শাশ্বত, চিরন্তন সত্যের কথা বলা থাকে তাহলে সেটা গ্রহণযোগ্য, কারণ তা বেদের শিক্ষার সাথে মিলছে !
বেদকে বলা হয়েছে_ অপৌরুষেয়, কোনো একজন পুরুষের সৃষ্টি নয়_বেদ ! বহু হাজার বছর ধরে, বহু সাধকের _বহু সাধনার ফল ঐ বেদ বা উপনিষদ ! …. (বাকীটুকু পরের দিন)