(আগের দিন গুরু মহারাজের আলোচনায় ক্রিয়াযোগের প্রকৃত ব্যাখা উঠে আসছিল ! আজ তার‌ই পরবর্ত্তী অংশটুকু)
যাইহোক, তোমাদের বলছিলাম যে শ্বাস-প্রশ্বাসের ক্রিয়াও ‘ক্রিয়া’। আর শ্বাস-প্রশ্বাসকে ধরেই ভিতরে ঢুকতে হয় ৷ বেদে বলা আছে প্রাণতত্ত্বের কথা । প্রাণ সর্বত্র‌ই বিরাজমান! জীবজগৎ-জড়জগৎ সবার মধ্যে, সব জায়গায় প্রাণের ক্রিয়া হয়ে চলেছে । জীবজগতে এই প্রাণতত্ত্বের স্থুলরূপ শ্বাস-প্রশ্বাস কার্যরূপে অর্থাৎ যা জীবনের লক্ষণ রূপে প্রকাশিত, আর জড়জগতে প্রাণতত্ত্ব প্রকাশিত শক্তি হিসাবে ৷ তাই জীবজগৎ-জড়জগৎ সবখানে প্রাণ-ই রয়েছে । যেখানে প্রাণী (উন্নত প্রাণী বা মানুষ)আধ্যাত্মিক পথে আগাতে চায়, সেখানে প্রাণকে ধরেই অগ্রসর হতে হয় । আর এই অগ্রসরের পথে প্রাণবায়ুকে আশ্রয় করে, আগাতে আগাতে প্রকৃত প্রাণতত্ত্বের সন্ধান পাওয়া যায় !
প্রকৃতপক্ষে প্রাণতত্ত্বই__ শাক্তের কালী, বৈষ্ণবের রাধা, সাংখ্যের প্রকৃতি, যোগীর কুলকুণ্ডলিনী শক্তি বা মাতৃশক্তি ! সনাতন শাস্ত্রাদি “ব্রহ্ম” এই শব্দ দিয়ে সেই ‘বিরাট’-কে বোঝাতে চেয়েছে এবং বলা হয়েছে– যা সবেতে ওতপ্রোত, সবেতে অনুষ্যুত, সবেতে প্রকাশিত, সর্বত্র বিরাজমান, সব তত্ত্বই যেখান থেকে উৎসারিত এবং যেখানে সব তত্ত্বেরই লয় –তাই “ব্রহ্ম” ! ব্রহ্মে-র কোনো প্রতিশব্দ ইংরাজীতে বা অন্য কোনো ভাষায় পাওয়া যাবে না । কারণ ভারতের আর্যঋষিরা যখন নিজেদের জীবন নিংড়ে নিংড়ে গভীর সাধনার দ্বারা জগতের রহস্য উদঘাটন করেছিলেন (হাজার হাজার বছর আগে) তখন পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তে সভ্যতার আলোক-ই পৌঁছায়নি ।
পৃথিবীর আজকে যে পরিবেশ বা পরিস্থিতি দেখছো – আজ থেকে ২০/২৫ হাজার বছর পূর্বে বা ৫০ হাজার বছর পূর্বে কি এইরকমই ছিল নাকি ? বিদেশীরা বলেছে ঋকবেদ সৃষ্টির সময়কাল ২০/২৫ হাজার বছর আগে । কিন্তু ভারতীয় সাধু পরম্পরায় প্রচলিত রয়েছে যে___ বেদ সৃষ্টি হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ৫০ হাজার বছর আগে ! বহু পূর্বে পৃথিবীর স্থলভাগ অখন্ড ছিল অর্থাৎ যাযাবর, সভ্য, অর্ধসভ্য বা অসভ্য মানবগোষ্ঠী পায়ে হেঁটে হেঁটে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে পারতো । সুতরাং কোনো একস্থানের সভ্যতার স্পর্শ, শিক্ষার স্পর্শ অন্যত্র সহজেই পৌঁছে যাওয়াটা বিচিত্র কিছু ছিল না ৷ এইভাবেই ভারতবর্ষে ঋষিদের দ্বারা সৃষ্ট প্রাচীন সভ্যতা বা সংস্কৃতি পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গাতেই ছড়িয়ে পড়েছিল । কিন্তু স্থান-কাল-পাত্রভেদে সেগুলি কোথাও স্থান পেয়েছে, কোথাও পায় নি, আবার কোথাও মূল ধারাটি বদলে গেছে ৷
ভারতবর্ষে হিমালয়কে কেন্দ্র করেই ঋষি পরম্পরা সৃষ্টি হয়েছিল, ফলে এখানেই সবচাইতে অধিক জ্ঞানের উৎকর্ষতা লাভ করেছিল । অন্যত্র সাধনার অভাবে, পরম্পরাগত অযোগ্যতার অভাবে সত্য বিকৃত হয়েছে, শিক্ষা বিকৃত হয়েছে । এইভাবেই সমগ্র বিশ্বে এত বৈচিত্রতার সৃষ্টি হয়েছে । তাছাড়া তৎকালীন যুগে__ বৃহস্পতি এবং শুক্রাচার্য এই দুজন দিকপাল ঋষির নীতি দুই প্রকারের বিপরীত মানসিকতা সম্পন্ন মানুষেরা গ্রহণ করেছিল । ঋষিরা এদের নাম দিয়েছিলেন “দেব ও দানব” ! দেব-স্বভাবের মানুষেরা বৃহস্পতির শিক্ষা গ্রহণ করলো আর শুক্রাচার্যের শিক্ষা গ্রহণ করলো দানব বা অসুর অথবা রাক্ষসেরা । এই উভয়প্রকার মানুষ আজও সমাজে বিদ্যমান । পরবর্তীকালে বিভিন্ন দেশের পুরাণাদি শাস্ত্র বা Myth-এ রাক্ষস, দানবকে বীভৎসদর্শন, শিংওয়ালা, মানুষ মেরে খায় ইত্যাদি হিসাবে বর্ণনা করতে গিয়েই গোলমাল হয়েছে ৷ প্রকৃতপক্ষে বলা হয়েছিল, রাক্ষস-অসুর-দানব তাঁরাই, যাদের মনুষ্যত্বের মৃত্যু ঘটেছে ! মানুষের যেরূপ আচরণ হওয়া উচিত__ এদের সেরূপ নয় । দেবগুরুর শিক্ষাগ্রহণকারীরা ত্যাগ, বৈরাগ্য, সন্তোষ, ভালোবাসা, পরোপকার ইত্যাদি দেবসুলভ গুণসম্পন্ন হ’ন – অপরপক্ষে শুক্রাচার্যের শিক্ষাগ্রহণকারীরা মানবতাবিরোধী, স্বার্থপর, আত্মসুখসর্বস্ব, ভোগবাদী ইত্যাদি
negative গুণসম্পন্ন হয়ে থাকে ।
বিভিন্ন শাস্ত্রে দেখবে দেবাসুরের সংগ্রামের কথা বলা হয়েছে ! এই সংগ্রাম সবসময় ছিল, এখনো আছে, পরেও থাকবে । আর মহাপুরুষগণের কাজ-ই হোল আসুরিক-গুণসম্পন্ন মানুষদেরকে__ দেব-স্বভাববিশিষ্ট মানুষে পরিণত করার চেষ্টা করা ৷ মহাপুরুষদের এটাই কাজ – এই কাজ করতেই তাঁদের আসা । কালস্রোতে ভেসে যাচ্ছে সবকিছু, জগৎ,- জীবন সব । এরমধ্যেই কালকে ধরে যে পারছে, সে উজান স্রোতে উৎসে ফেরার চেষ্টা করছে – উৎসে ফেরাটাকেই পূর্ণতাপ্রাপ্তি বলা হয়েছে ।
অন্যথায় তো শুধু ভেসে যাওয়া, আর ভেসে যাওয়া ! স্রোতের ঘায়ে ঘায়ে আঘাত প্রাপ্ত হোতে হোতে, হাবুডুবু খেতে খেতে __কোন্ অজানা-অচেনা মহাসাগরের উদ্দেশ্যে শুধুই ভেসে যাওয়া ! কিন্তু সেখানে পৌঁছেও তো ভাসমান অবস্থাই থেকে যাচ্ছে ! সেখানেও ঢেউয়ের ধাক্কায় ধাক্কায় একবার তীরে আসা – আবার ফিরে যাওয়া ! সেখানেও প্রয়োজন হয় under-current-এ পরার !! যাই হোক, এইজন্যেই এই সংসার-সমুদ্রকে বলা হয়েছে “অকুল” ! একমাত্র গুরু-ই অকুলে কুল দিতে পারেন ।
এতক্ষণ যা বলা হোলো – এটা ভারতীয় ঋষি-পরম্পরার শিক্ষা । এইবার তোমরা দ্যাখো, অকুলে শুধু ভেসে বেড়াবে___ না কুলে ওঠার চেষ্টা করবে ! যদি তা করতে চাও__ তাহলে দেবগুরু বৃহস্পতির নীতিতে ফিরে এসো, ঋষিদের শিক্ষা গ্রহণ করো, সদ্গুরুর শরণাপন্ন হয়ে তাঁর কাছে নিজেকে সমর্পণ করো । দেখবে, তিনিই তোমাকে হাত ধরে অকুলে কুল পাবার পথ দেখাবেন !!
[ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ৷৷]