*জিজ্ঞাসু* :– ‘বৈরাগ্য’ বলতে সাধু-ব্রহ্মচারীদের মত সংসার ত্যাগ করাকে বলা হয়েছে তো ?
*গুরুমহারাজ* :– সংসার ত্যাগ কে করে রে ? এই জগৎ-সংসার ত্যাগ করে কোথায় যাবি ? আর সত্যিই যেদিন যাবি – সেটাই হবে পূর্ণতা ! তখন‌ই ‘বোধ’ হবে__আমার দ্বারা কোনোকিছুই ত্যাগ করার নাই, সবকিছুতেই ওতপ্রোত হয়ে আছে ‘আমি’। সুতরাং সেই অর্থে ‘সংসার ত্যাগ’ হয় না ৷ সাধারণতঃ আমরা বলি___ সংসারী, ব্রহ্মচারী, সাধু-সন্ন্যাসী ইত্যাদি । এগুলি এক এক ধরনের পৃথক পৃথক জীবনচর্যা ৷ যে সমস্ত মানুষ একা একাই জীবনপথে চলতে চায়, চলতে পারে_ সে ব্রহ্মচর্য আশ্রম অবলম্বন করে ৷ আর যে একা চলতে ভয় পায়, ভাবে হয়তো স্রোতে ভেসে কোথায় হারিয়ে যাবে, সে আর একজনকে সাথে নিয়ে জীবনপথে চলতে চায় – সে গার্হস্থ্য আশ্রমে রয়েছে ৷ কিছুকাল গার্হস্থ্য জীবন-যাপন করার পর আর যাদের সেখানে থাকতে ভালো লাগছে না, এবার ভোগের পথ ছেড়ে ত্যাগের পথে আসতে চাইছে – তারা বানপ্রস্থী । আর ইহজগতের তিলমাত্র বাসনাও ত্যাগ করে যারা সম্পূর্ণভাবে নিজেকে পরমেশ্বরের ইচ্ছায় নিজেকে সমর্পণ করে দিয়েছেন – তিনিই যথার্থ সন্ন্যাসী ৷
যোগশাস্ত্রে বৈরাগ্যের প্রকারভেদ করা হয়েছে_ চার রকমের (১) আতুর, (২) মর্কট, (৩) বিদ্যোৎ, (৪) বিবিদিষা ৷ আতুর এবং মর্কট বৈরাগ্য জাগতিক কামনা-বাসনায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির কারণে হয়ে থাকে ৷ এই বৈরাগ্য সাময়িক, এইটা বেশিদিন স্থায়ী নাও হোতে পারে ৷ যে অসুবিধার জন্য তার সাময়িক ‘বৈরাগ্য’, সেটার সুরাহা হয়ে গেলে হয়তো তার ‘বৈরাগ্য’ভাব কেটে যেতেও পারে ৷ যেমন ধরো__ হয়তো কেউ শারীরিক মারণব্যাধির কবলে পড়ে অনেক চেষ্টা করেও যখন সুস্থ হয়নি, তখন সে কোনো সাধুর আশ্রমে স্থান গ্রহণ করলো ৷ কিছুকাল ধ্যান-জপ, সাধন-ভজন করা, নিয়মিত জীবন-যাপন করায় (আহার, নিদ্রা, সংযত নিত্যকর্মাদি) হয়তো ওই ব্যক্তির রোগমুক্তি ঘটে গেল । দেখা যাবে, এবার সে হয়তো আর আশ্রমে থাকতে চাইবে না, কোনো না কোনো বাহানা দেখিয়ে সে ফিরে যেতে চাইবে গার্হস্থ্য জীবনে I এমন উদাহরন অনেক পাওয়া যায় ।
আবার ধরো__ কেউ গার্হস্থ্য জীবনে পরপর এমন কিছু আঘাত পেল যে, তার সেই জীবনে বিতৃষ্ণা ধরে গেল ! তখন সে শান্তির সন্ধানে কোনো সাধুর আশ্রমে এসে হাজির হোল ৷ সেখানকার আধ্যাত্মিক পরিবেশে কিছুদিন থাকার পরই _দেখা যায় ধীরে ধীরে তার মনের অশান্তি দূর হয়ে গিয়ে একটা balance চলে আসবে । এবার কিন্তু আর তার ভালো লাগতে নাও পারে –ফলে সে ওই আশ্রমের নানান দোষ দেখতে থাকবে এবং অবশেষে One fine morning সে ওই আশ্রম ত্যাগ করে ফিরে যাবে নিজের গৃহে ৷ ‘বিদ্যোৎ’ এবং ‘বিবিদিষা’ বৈরাগ্য-ই প্রকৃত বৈরাগ্য ! পৃথিবীর সকল মহাপুরুষদেরই জীবনে ঐ দুটির মধ্যে যে কোনো একটির প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়।
তবে জানো, বৈরাগ্যের শ্রেণীবিভাগ বাউল পরম্পরা যেভাবে করেছে__ সেটা আরও নিখুঁত বা বিস্তৃত । ওরা বলেছে আট প্রকারের বৈরাগী রয়েছে – (১) আউসে, (২) পউসে, (৩) নিব্বংশে, (৪) নপুংসে, (৫) মাগ-মলে, (৬) প্যাটের দায়ে, (৭) চ্যাটের দায়ে, (৮) স্বভাব ও ভক্তিতে । ‘আউশে’– মানে হচ্ছে যারা শারীরিকভাবে অক্ষম বা দুর্বল – তাদের গার্হস্থ্যজীবনে স্থান হয় না । যতদিন তাদের বাবা-মা থাকে, ততদিন হয়তো তারা ঐসব সন্তানদেরকেও যত্ন করে বা দুবেলা-দুমুঠো গ্রাসাচ্ছনের ব্যবস্থা করে ! কিন্তু বাবা-মা মারা গেলে এদের আর কেউ দেখে না ! তখন এদের অনেকেই কোনো না কোনো সাধুর আশ্রমে চলে যায় ৷সেখানেই যাহোক করে জীবনটা কাটিয়ে দেয় ! ‘পউসে’– মানে হচ্ছে যারা গার্হস্থ্যজীবনে উশৃংখল ছিল অর্থাৎ আয় অনুযায়ী ব্যয় করেনি, ফলে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে । এবার পাওনাদারদের তাগাদা আসতে থাকলে_ সে সবাইকে ‘পৌষ মাস’ দেখিয়ে চুপ-চাপ বসে থাকে ৷ পৌষ মাস – অর্থে তখনকার দিনে অগ্রাহায়ন-পৌষ মাসে গ্রামাঞ্চলের মানুষের একমাত্র অর্থকরী ফসল ‘ধান’ গোলাজাত হোতো । এইজন্যেই ঐ ধরনের ব্যক্তিরা সবাইকে এক‍ই কথা বলে রেখেছে – ” আমার ধান উঠলেই তোমার ঋণ শোধ করে দেবো।” কিন্তু সে তো জানে যে, সে যে পরিমাণ ঋণ বাজার থেকে করেছে, তা ধান বিক্রি করে শোধ করতে গেলে__ গোলার সব ধান বিক্রি করে দিয়েও শোধ হবে না এবং এইরকম করতে গেলে সারাবছর সে, তার ছেলে-পরিবার নিয়ে ভরপেট খেতেও পাবে না ৷ তাই সে পৌষ মাস আসার আগেই ছেলের হাতে সংসারের ভার দিয়ে বৈরাগী হয়ে কোনো আশ্রমে গিয়ে সেখানকার কাজকর্ম করতে শুরু করে দেয় ৷ পৌষ মাসে পাওনাদারেরা তার বাড়ি টাকা চাইতে গেলে তার ছেলেরা কেঁদে-কেটে আকুল ! বলে, ” আমরা তো কিছুই জানিনা জেঠু ! দেখুন না – বাবা আমাদের অকূলে ভাসিয়ে দিয়ে চলে গেল, আমরা এখন কি যে করি !” ওদের কান্না দেখে পাওনাদার আর কি করে – তারাই আবার সান্তনা দিয়ে বলবে – ” তা আর কি করবি ! ঠিক আছে আমার টাকাটা না হয় পরে দিবি – এখন তোরা সংসারটা দাঁড় করা ৷”
‘নিব্বংশে’– মানে যার বংশ নাই, অর্থাৎ পরিবারের সবাই মারা গেছে ! সেক্ষেত্রে বেচারা আর কি করে – কোনো আশ্রমে গিয়ে যোগদান করে কিংবা নিজেই গ্রামের পাশে একটা কুটির বানিয়ে সাধন-ভজন করে । ‘নপুংসে’– মানে যারা নপুংসক । বুঝতেই পারছো এরা পুরুষত্বহীন বা একপ্রকার রোগগ্রস্থ । ফলে সংসার যখন হবেই না, তাহলে _’চলো তাহলে কোনো সাধুর আশ্রমে যাওয়া যাক ‘– এই বলে তারা কোনো না কোনো আশ্রমে চলে যায় ৷ ‘মাগ-মলে’– কথাটা গ্রাম্যভাষা । শুনতে তোমাদের হয়তো একটু খারাপ লাগছে কিন্তু গ্রামগঞ্জে স্ত্রী অর্থে ‘মাগ’ কথাটা কিছুদিন আগে পর্যন্ত‌ও খুবই চলতো ৷ কোনো ব্যক্তির অল্প বয়সে স্ত্রী-বিয়োগ হোলে, তার মনে একটা বৈরাগ্যভাব আসে । হয়তো সে স্ত্রী-কে খুব ভালোবাসতো, সেই স্ত্রী মারা যাওয়ায় ঐ ব্যক্তি আর গৃহে থাকতে চাইলো না । সে তখন কোনো না কোনো আশ্রমে গিয়ে সাধন-ভজন করতে লাগলো বা আশ্রমের অন্য কাজে নিযুক্ত হয়ে গেল ।
বাউলরা বলে ‘প্যাটের দায়ে’ অর্থাৎ পেটের দায়ে বা চরম দারিদ্রতা থেকে অনেকে সন্ন্যাস আশ্রমে এসে আশ্রয় নেয় ৷ কিছু কিছু মানুষ এমন আছে জানো – যারা কর্মজগতে যে কাজেই হাত দেয়, তাতেই অসফল হয় । কথায় রয়েছে, .”যে ডালটাই ধরে, সেটাই ভেঙে যায়”, তার মানে একজন পতনশীল ব্যক্তি হয়তো কোনো ডাল ধরে বাঁচার চেষ্টা করছে, কিন্তু দেখা গেল__সেই ডালটাও ভেঙে যাচ্ছে! তখন হয়তো সে আর একটা ডাল ধরলো কিন্তু সেটাও ভেঙে গেল ! এতএব তার পতন সুনিশ্চিত ! এই ধরনের, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধাক্কা খাওয়া ব্যক্তিদের_ সংসারের প্রতি একটা বিতৃষ্ণা জন্মে যায় এবং বৈরাগ্য অবলম্বন করে ।
‘চ্যাটের দায়ে’– কথাটা একটু অশ্লীল ইঙ্গিত বহন করে ! বহু ইন্দ্রিয়পরায়ণ ব্যক্তিরাও অনেকসময় সাধু-আশ্রমকে, তার কামনা চরিতার্থ করার স্থান হিসাবে বেছে নেয় ! কারণ তারা জানে যে, আশ্রম বা দেবস্থানে যেহেতু নানাবয়সের বহু নর-নারীর আগমন ঘটে, সেখানে তারা তাদের নিজেদের ইন্দ্রিয়লিপ্সা সহজেই মেটাতে পারবে । এইজন্য তারা আশ্রমে আসে কিংবা অনেকসময় নিজেরাই একটা আশ্রম বানিয়ে “গুরু” হয়ে বসে পড়ে।
এরপর হোল স্বভাবে ও ভক্তিতে বৈরাগ্য ! জগতের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে, এরাই হোলো প্রকৃত বৈরাগী । স্বভাব-সাধু কথাটির অর্থ‌ই হোলো__’যার স্বভাবেই সাধু হওয়া রয়েছে’ ৷ ছোটবেলা থেকেই এদের জগৎসংসারের ভোগ-সুখের প্রতি অনীহা, অনাসক্তির ভাব বিদ্যমান থাকে ৷ তারপর একটু বড় হোলেই এরা উপযুক্ত গুরুর সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে এবং খুঁজতে খুঁজতে পেয়েও যায় একদিন I তারপর সেখানেই তারা Settled হয়ে যায় । এরাই হোলো স্বভাব-সাধু । আর “ভক্তিতে” বলতে__ কোনো সদ্গুরুর সান্নিধ্য লাভ করার পর, তাঁর কাছে যাওয়া-আসা করতে করতে পরমার্থিক প্রেমের স্পর্শ পাওয়া ব্যক্তিটি একদিন ঠিক করে বসে যে, আর গৃহে ফিরে যাওয়া নয়__ বাকি জীবনটা গুরুর সেবায়, ঈশ্বরের কাজে, গুরুর কার্যে সহায়তা করে কাটিয়ে দেওয়া যাক্ । “গুরুগত প্রাণ”– এইসব ভক্তরাই আবার পরবর্তীকালে ঐ পরম্পরায় “গুরু” বণে যান ৷ এঁদের মধ্যে দিয়েই গুরুপরম্পরা রক্ষা পায় ৷
অধ্যাত্মজগতে নিষ্ঠা-ভক্তির একান্ত প্রয়োজন হয় বাবা ! না হোলে গুরু-কৃপা লাভ কি অতোই সহজ !!