জিজ্ঞাসু :– ক্রিয়াযোগীরা বলে ‘আত্মা’ Migrate করে – এই ব্যাপারটি যদি একটু বুঝিয়ে বলেন ?
গুরুমহারাজ :– হ্যাঁ, আমিও শুনেছি কেউ কেউ ‘Transmigration of self’_ কথাটি ব্যবহার করে ৷ কিন্তু জানো_ এই কথাটা ভুল ! আমি যখন জার্মানিতে ঘুরছিলাম, তখন হাইজেনবার্গ ইউনিভার্সিটির একদল বিজ্ঞানীর সাথে আমার এইসব ব্যাপারে আলোচনা হয়েছিলো । ওরা আমাকে এই কথাটাই জিজ্ঞাসা করছিলো যে, ” ‘Transmigration of self’– বলতে কী বোঝায়__ আপনি আমাদের বলুন ।”
আমি ওদেরকে ওই উত্তরটাই দিয়েছিলাম যে,_ “কথাটা ভুল !” আমি ওদেরকে ব্যাপারটা বোঝালাম, বললাম_” দ্যাখো, ‘Self’ বলতে যদি তোমরা ‘আত্মা’ ধরে নাও, তাহলে এটা জেনে রাখো যে, আত্মার জন্ম হয় না- মৃত্যু হয় না- তার চলন হয় না- গমন হয় না । আত্মাকে শাশ্ত্রে বলা হয়েছে – অচলম্, অচ্ছেদ্যম্, অদাহ্যম্, অখন্ডঘনাকারং ….. ।
তাহলে মৃত্যুর পর পুনরায় যে জন্ম, তা কখনোই ‘আত্মা’-র গমনাগমন নয় ৷ দেহের জন্ম হয়, বৃদ্ধি হয় আবার মৃত্যু হয় । আত্মা অবিকৃতই থেকে যায় ৷ যেমন সমুদ্র আর তার ঢেউ এবং বুদবুদ । সমুদ্রে ঢেউ উঠছে_ মনে হোচ্ছে বোধহয় সমুদ্র উঁচু হয়ে গেল- সমুদ্র বেড়ে গেল ! আবার অসংখ্য বুদবুদ তৈরি হোল__তাদের কিছু নষ্ট হয়ে গেল_ঢেউ কমে গেল, মনে হবে সমুদ্র কমে গেল । এই সব ঢেউ-এর ওঠানামা সমুদ্রেই হোচ্ছে কিন্তু সমুদ্র যেমনকার তেমনই থেকে যাচ্ছে_ প্রকৃতপক্ষে, তার কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না । ঠিক এইরকমই মহাবিশ্বে লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি জীব জন্ম নিচ্ছে– বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হচ্ছে__ আবার তাদের মৃত্যু হোচ্ছে । কিন্তু আত্মার মৃত্যু নাই ! আত্মা জন্মায়ও না–মরেও না ।
তাই জীবের জন্ম, বৃদ্ধি বা স্থিতিকাল এবং মৃত্যু এই নিয়ে যে জীবনচক্র, তা প্রকৃতই চক্রাকার – কোনটা শুরু কোনটা শেষ, সেটা যোগদৃষ্টি ছাড়া সাধারণভাবে বুঝতে পারা যাবে না ৷ জড় থেকেই জীবন, আবার জীবনের অন্তে জড়াবস্থা ৷ একটা জীবনের অন্ত__ তো সহস্র জীবনের যাত্রা শুরু ! এ লীলা বিচিত্র ! এক গ্রহের লীলা শেষ, তো অন্য গ্রহে শুরু ! এক নক্ষত্রলোকের ক্রিয়া শেষ হয়ে সে কালগহ্বরে (Black hole) প্রবেশ করছে__ তো শ্বেতগহ্বর থেকে আবার নতুন নক্ষত্র জন্ম নিচ্ছে ! নক্ষত্রলোকের পথে পথে, নীহারিকাপুঞ্জের অলিতে-গলিতে এই যে ছন্দবদ্ধতা__ একেই বলা হচ্ছে Cosmic dance , মহাকালের বুকে মহাকালীর নৃত্য !
সাধারণ বুদ্ধি দিয়ে এই মহারহস্যের মর্মার্থ কি করে বোঝা যাবে ? একমাত্র মহাজ্ঞানী মহাজনেরা মহাকালীর নৃত্য প্রত্যক্ষ করতে পারেন – আর তার ছিটেফোঁটা তাঁরা পরম্পরাগতভাবে উত্তরসূরিদের আস্বাদন করাতে পারেন । ব্যস্ এইটুকুই__তার বেশি কিছু নয় !
সেইজন্যেই তো বলা হয়, বই অর্থাৎ গ্রন্থ পড়ে কখনোই প্রকৃত তত্ত্বের সন্ধান পাওয়া যায় না । গ্রন্থ – গ্রন্থ-ই । তা সে যেকোনো গ্রন্থই হোক না কেন ! গ্রন্থ থেকে কখনও কোনো বিষয়ের সম্পূর্ণ জ্ঞান পাওয়া যায় না । সেখান থেকে__ ধারণা পাওয়া যায়, আভাস পাওয়া যায়,আর কিছু পাওয়া যায় না ৷
বাংলায় একটা কথা আছে না__ ‘খেই’ পাওয়া ! অধ্যাত্মজগতে এসেও__প্রথমে খুঁজে-পেতে ওইরকম একটা ‘খেই’ ধরতে হয় ! তারপরে সেই ‘খেই’ ধরে ধীরে ধীরে আগাতে পারলে__ নিজের অভ্যন্তরেই সাধক খুঁজে পায় অনাবিল আনন্দের আস্বাদ ! সে তখন আবিষ্কার করতে পারে যে, এতোদিন সে যা খুঁজছিল_তা সে লাভ করেছে এবং তা ছিল তার নিজের মধ্যেই !
মানুষ নিজ অন্ত:প্রকৃতিকে বশ করেই বহি:প্রকৃতির রহস্যও জানতে পারে ! তার জন্য মা মহামায়াকে প্রসন্ন করতে হয় । আর মা মহামায়া প্রসন্ন হয়ে দরজা খুলে দিলে – মায়ের সমগ্র জগতের রহস্য সাধকের কাছে উন্মোচিত হয় ৷ সন্তানের কাছে ‘মা’ তখন তাঁর আবরণ উন্মোচিত করে দেন।নিরাবরণা উলঙ্গিনী মা-য়ের এটাই রহস্য ! শিব ছাড়া নিরাবরণা মা-য়ের মহিমা কে-ই বা জানতে পারে !
যাইহোক, কথা হচ্ছিলো ‘জন্মান্তর’ নিয়ে । জন্মান্তরের ইংরেজি প্রতিশব্দ হোলো_ Reincarnation ! জার্মানীর ঐ seminar-এ আমি এটাই ওখানকার প্রফেসরদের বলেছিলাম__ “যদি Self মানে ‘আত্মা’ ধরা হয়, তাহলে_ Transmigration of self কথাটা ভুল, এটা হয় না । এক জন্ম থেকে অন্যজন্মে যাওয়া অর্থাৎ পুনঃর্জন্ম হওয়াটাকে Reincarnation বলা যেতে পারে, কিন্তু Transmigration of self–কোনোমতেই নয় ৷(ক্রমশঃ)
গুরুমহারাজ :– হ্যাঁ, আমিও শুনেছি কেউ কেউ ‘Transmigration of self’_ কথাটি ব্যবহার করে ৷ কিন্তু জানো_ এই কথাটা ভুল ! আমি যখন জার্মানিতে ঘুরছিলাম, তখন হাইজেনবার্গ ইউনিভার্সিটির একদল বিজ্ঞানীর সাথে আমার এইসব ব্যাপারে আলোচনা হয়েছিলো । ওরা আমাকে এই কথাটাই জিজ্ঞাসা করছিলো যে, ” ‘Transmigration of self’– বলতে কী বোঝায়__ আপনি আমাদের বলুন ।”
আমি ওদেরকে ওই উত্তরটাই দিয়েছিলাম যে,_ “কথাটা ভুল !” আমি ওদেরকে ব্যাপারটা বোঝালাম, বললাম_” দ্যাখো, ‘Self’ বলতে যদি তোমরা ‘আত্মা’ ধরে নাও, তাহলে এটা জেনে রাখো যে, আত্মার জন্ম হয় না- মৃত্যু হয় না- তার চলন হয় না- গমন হয় না । আত্মাকে শাশ্ত্রে বলা হয়েছে – অচলম্, অচ্ছেদ্যম্, অদাহ্যম্, অখন্ডঘনাকারং ….. ।
তাহলে মৃত্যুর পর পুনরায় যে জন্ম, তা কখনোই ‘আত্মা’-র গমনাগমন নয় ৷ দেহের জন্ম হয়, বৃদ্ধি হয় আবার মৃত্যু হয় । আত্মা অবিকৃতই থেকে যায় ৷ যেমন সমুদ্র আর তার ঢেউ এবং বুদবুদ । সমুদ্রে ঢেউ উঠছে_ মনে হোচ্ছে বোধহয় সমুদ্র উঁচু হয়ে গেল- সমুদ্র বেড়ে গেল ! আবার অসংখ্য বুদবুদ তৈরি হোল__তাদের কিছু নষ্ট হয়ে গেল_ঢেউ কমে গেল, মনে হবে সমুদ্র কমে গেল । এই সব ঢেউ-এর ওঠানামা সমুদ্রেই হোচ্ছে কিন্তু সমুদ্র যেমনকার তেমনই থেকে যাচ্ছে_ প্রকৃতপক্ষে, তার কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না । ঠিক এইরকমই মহাবিশ্বে লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি জীব জন্ম নিচ্ছে– বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হচ্ছে__ আবার তাদের মৃত্যু হোচ্ছে । কিন্তু আত্মার মৃত্যু নাই ! আত্মা জন্মায়ও না–মরেও না ।
তাই জীবের জন্ম, বৃদ্ধি বা স্থিতিকাল এবং মৃত্যু এই নিয়ে যে জীবনচক্র, তা প্রকৃতই চক্রাকার – কোনটা শুরু কোনটা শেষ, সেটা যোগদৃষ্টি ছাড়া সাধারণভাবে বুঝতে পারা যাবে না ৷ জড় থেকেই জীবন, আবার জীবনের অন্তে জড়াবস্থা ৷ একটা জীবনের অন্ত__ তো সহস্র জীবনের যাত্রা শুরু ! এ লীলা বিচিত্র ! এক গ্রহের লীলা শেষ, তো অন্য গ্রহে শুরু ! এক নক্ষত্রলোকের ক্রিয়া শেষ হয়ে সে কালগহ্বরে (Black hole) প্রবেশ করছে__ তো শ্বেতগহ্বর থেকে আবার নতুন নক্ষত্র জন্ম নিচ্ছে ! নক্ষত্রলোকের পথে পথে, নীহারিকাপুঞ্জের অলিতে-গলিতে এই যে ছন্দবদ্ধতা__ একেই বলা হচ্ছে Cosmic dance , মহাকালের বুকে মহাকালীর নৃত্য !
সাধারণ বুদ্ধি দিয়ে এই মহারহস্যের মর্মার্থ কি করে বোঝা যাবে ? একমাত্র মহাজ্ঞানী মহাজনেরা মহাকালীর নৃত্য প্রত্যক্ষ করতে পারেন – আর তার ছিটেফোঁটা তাঁরা পরম্পরাগতভাবে উত্তরসূরিদের আস্বাদন করাতে পারেন । ব্যস্ এইটুকুই__তার বেশি কিছু নয় !
সেইজন্যেই তো বলা হয়, বই অর্থাৎ গ্রন্থ পড়ে কখনোই প্রকৃত তত্ত্বের সন্ধান পাওয়া যায় না । গ্রন্থ – গ্রন্থ-ই । তা সে যেকোনো গ্রন্থই হোক না কেন ! গ্রন্থ থেকে কখনও কোনো বিষয়ের সম্পূর্ণ জ্ঞান পাওয়া যায় না । সেখান থেকে__ ধারণা পাওয়া যায়, আভাস পাওয়া যায়,আর কিছু পাওয়া যায় না ৷
বাংলায় একটা কথা আছে না__ ‘খেই’ পাওয়া ! অধ্যাত্মজগতে এসেও__প্রথমে খুঁজে-পেতে ওইরকম একটা ‘খেই’ ধরতে হয় ! তারপরে সেই ‘খেই’ ধরে ধীরে ধীরে আগাতে পারলে__ নিজের অভ্যন্তরেই সাধক খুঁজে পায় অনাবিল আনন্দের আস্বাদ ! সে তখন আবিষ্কার করতে পারে যে, এতোদিন সে যা খুঁজছিল_তা সে লাভ করেছে এবং তা ছিল তার নিজের মধ্যেই !
মানুষ নিজ অন্ত:প্রকৃতিকে বশ করেই বহি:প্রকৃতির রহস্যও জানতে পারে ! তার জন্য মা মহামায়াকে প্রসন্ন করতে হয় । আর মা মহামায়া প্রসন্ন হয়ে দরজা খুলে দিলে – মায়ের সমগ্র জগতের রহস্য সাধকের কাছে উন্মোচিত হয় ৷ সন্তানের কাছে ‘মা’ তখন তাঁর আবরণ উন্মোচিত করে দেন।নিরাবরণা উলঙ্গিনী মা-য়ের এটাই রহস্য ! শিব ছাড়া নিরাবরণা মা-য়ের মহিমা কে-ই বা জানতে পারে !
যাইহোক, কথা হচ্ছিলো ‘জন্মান্তর’ নিয়ে । জন্মান্তরের ইংরেজি প্রতিশব্দ হোলো_ Reincarnation ! জার্মানীর ঐ seminar-এ আমি এটাই ওখানকার প্রফেসরদের বলেছিলাম__ “যদি Self মানে ‘আত্মা’ ধরা হয়, তাহলে_ Transmigration of self কথাটা ভুল, এটা হয় না । এক জন্ম থেকে অন্যজন্মে যাওয়া অর্থাৎ পুনঃর্জন্ম হওয়াটাকে Reincarnation বলা যেতে পারে, কিন্তু Transmigration of self–কোনোমতেই নয় ৷(ক্রমশঃ)
