জিজ্ঞাসু :– কিন্তু ‘ক্রিয়াযোগী’-দের কথাটা তো শেষ করলেন না ? আমি অন্তত: ঠিক বুঝতে পারলাম না । ওদের পরম্পরার ধ্যান-ধারণা সম্বন্ধে আমার যা শেখার ছিল, তা শেখা হোলো না !
গুরুমহারাজ :– আসলে কিছুই শেখা হয়নি__ দিদিমণি ! দ্যাখো,যদি কেউ এটা বলতে পারে যে, “আমি কিছুই শিখিনি”, “আমি কিছুই জানি না” – আর এইটা যদি সে ঠিকমতো জানতে পারে, তাহলে সেটা জানাটাই ঠিক ঠিক __’জ্ঞান’ ! এটা জানা – ওটা জানা-র চেষ্টাটাকেই মানুষ ভাবছে ‘জ্ঞান’, কিন্তু সেই জানায় জগৎজ্ঞান কিছুটা হয়, প্রকৃত ‘জ্ঞান’ তো আর হয় না ৷ সেই ‘এক’-কে জানা বা শুধু ‘তাঁকেই'(ঈশ্বরকে) জানা – এটাই ‘জ্ঞান’ । আমি ছোটবেলা থেকে এটাই করেছি – দেখেছি ওইটা করতে গিয়েই ‘জগৎজ্ঞান’ আপনা-আপনি হয়ে গেছে !
দ্যাখো, তুমি যেভাবেই হোক_ যদি কোনো স্থানের একেবারে Top-এ উঠতে পারো__ তাহলে তখন সেখান থেকে ডানদিক-বামদিক সবদিকই দেখতে পাবে, সবদিকের পারিপার্শ্বিক জ্ঞান তোমার করায়ত্ত হবে ৷ একটা উঁচু সৌধের কথাই যদি ধরে নেওয়া যায়, তাহলে সেই সৗেধের উপরে যদি তুমি ওঠো, তাহলে বাইরে থেকে Top-এ উঠলে বাইরের জ্ঞান হবে__ কিন্তু অভ্যন্তরে কি আছে তা আর তোমার জানা হোলো না ৷ এইবার তুমি যদি তার কেন্দ্রে প্রবেশ করে, সৌধটির অভ্যন্তরীণ সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে উপরে উঠে যাও – তখন ভিতরের-বাইরের সবকিছুর জ্ঞান হবে ! বুঝতে পারছো ব্যাপারটা !
দেখবে, অনেকেই বনগ্রাম আশ্রমে এসে_এখানে Sitting-এ বসে ফটর্ ফটর্ করে কথা বলে__ এটা অজ্ঞানের লক্ষণ ৷ একবার এক সভায় বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণদের পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছিলো ৷ যিনি প্রধান আচার্য তিনি একে একে সবাইকে জিজ্ঞাসা করছিলেন, ” ব্রহ্ম সম্বন্ধে তোমার ধারণা কি ?” একজন উত্তর দিল__ ‘ব্রহ্ম’ শিমূল তুলার ন্যায় ৷ একটি ফলের মধ্যে আবদ্ধ শিমূল তুলা যেমন ফল ফেটে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে ! তেমনি ব্রহ্ম-ও এক থেকে বহু হয়েছেন । আরেকজনকে একই প্রশ্ন করা হোলে, সে বললো – ‘ব্রহ্ম আকাশবৎ ! আকাশের ছায়া সবকিছুতেই পড়ে , কিন্তু কোনো কিছুর ছায়া আকাশে পড়ে না !’
অপর একজন উত্তর দিল –’ ব্রহ্ম সমুদ্রবৎ! সমুদ্রেই ঢেউ ওঠে, বুদ্বুদ সৃষ্টি হয়__আবার সব কিছু তাতেই বিলয় হয়। আর এইসব কিছুর ফলে সমুদ্র বাড়েও না,কমেও না_একইরকম থেকে যায়।’
এইভাবে সবাই ব্রহ্মের ব্যাখা করতে শুরু করলো । ওই সভায় শেষকাল পর্যন্ত একজন ব্যক্তিই থেকে গেল__যে এখনও পর্যন্ত কোনো কথাই বলে নি ! এইবার সভার পরিচালকমন্ডলী সেই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করলে__ সে উঠে দাঁড়ালো ! কিন্তু তখনও সে মৌন‌ই রয়ে গেল ! এই দেখে আশ্চর্যান্বিত হয়ে সবাই সেই বেদজ্ঞকে কিছু বলার জন্য পুনঃ পুনঃ অনুরোধ করতে লাগলো ! তা সত্ত্বেও সে সভায় দাঁড়িয়েই থাকলো__একটা কথাও বললো না ৷
এইটা দেখেই পরিচালক মন্ডলীর প্রধান আচার্য বললেন__ “এই ব্যক্তিই যথার্থ, ‘ব্রহ্ম কি’– তা বুঝেছে । সমবেত ব্রাহ্মণদের মধ্যে ইনিই শ্রেষ্ঠ !”
কি বলতে চাইছি__তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো ! তবে, আমার কথা শুনে আবার ‘অভিমান’ করো না দিদিমণি ! বাংলাদেশের মেয়েরা আবার কথায় কথায় ‘অভিমান’ করে বসে ! জানো, অভিমান করা কিন্তু ভালো নয় । পারলে ‘মান’ করো – ‘অভিমান’ নয় । ‘অভিমান’ আসে অহংকার থেকে, আর ‘মান’ হয় ভালোবাসা থেকে ।
জানো দিদিমণি__ আমার জীবনে কখনও অভিমান আসেনি ৷ বহু সময় দেখেছি ইষ্টের প্রতি হয়তো আমার ‘মানে’-র পালা চলছে –তারপর দেখি ‘তিনি’-ই আবার আপনি স্বয়ং এসে আমার মানভাঞ্জন ঘটিয়ে যাচ্ছেন । আর কি দেখেছি জানো, দেখেছি__ সেখানে শুধু ভালোবাসাই ভালোবাসা, শুধু অপার্থিব ভালোবাসা ! যে ভালবাসায় জগৎসংসার তুচ্ছ হয়ে যায়, জীবন-যৌবন-ধন-প্রাণ তুচ্ছাতিতুচ্ছ বোধহয় !
আর তোমাকেও তো সাধন-ভজন অন্তে এই অবস্থাতেই তো পৌঁছাতে হবে ৷
‘ক্রিয়াযোগ’ নিয়ে তোমার এতো কৌতুহল কেন দিদিমণি ! তোমাদেরকে তো আমি আগে বলেছিলাম যে, যে কোনো কাজ তুমি করছো তাই ক্রিয়া । আর সেই ক্রিয়ার মাধ্যমে যদি ঈশ্বরের সাথে তোমার যোগাযোগ হয় – তাহলে সেটাই ‘ক্রিয়াযোগ’ । তবে যে ক্রিয়াযোগী-পরম্পরার কথা তুমি বলছো, এঁরা যোগী শ্যামাচরণ লাহিড়ীর পরম্পরা ৷ মহাযোগী শ্যামাচরণ লাহিড়ী মশায় যোগসিদ্ধ ছিলেন, ওনার নির্বিকল্প সমাধি হয়েছিল ৷ ওনার পূর্ব পূর্ব জন্মে বহু যোগক্রিয়া, সাধন-ভজন করা ছিল ৷ এই শরীরে উনি হিমালয় অঞ্চলে, একবার কোনো কর্ম উপলক্ষে একবার গিয়েছিলেন । নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছানো মাত্রই তাঁর নানা স্মৃতি জাগতে শুরু করেছিল । হঠাৎ তিনি দৈবনির্দেশের মতো আহ্বান শোনেন – কেউ যেন তাঁকে ডাকছে ৷ উনি সেই নির্দেশ follow করে গিয়ে দেখেন যে, একজন সন্ন্যাসী (বাবাজী মহারাজ) তাকে একটি নির্দিষ্ট গুহা দেখিয়ে বলছেন যে সেখানে তার পূর্বজন্মের সাধনসামগ্রী রাখা আছে এবং ওইখানে তার নির্দিষ্ট আসন‌ও রয়েছে ! যে আসনে বসলে (সাধনা করলে) এই জন্মেই তার বাকি কাজ সম্পূর্ণ হয়ে যাবে । এরপর সেই মহাত্মা লাহিড়ীমশায়কে এককাপ তৈলজাতীয় ঔষধি খাইয়ে তার দেহশুদ্ধি করিয়ে নেন এবং নিকটস্থ ঝর্ণার জলে স্নান সেরে নতুন মন্ত্রে দীক্ষা দিয়ে তাঁকে যোগসাধনায় বসিয়ে দেন । ওখানেই লাহিড়ীমশায় সিদ্ধ হ’ন । এরপর গুরুদেব বাবাজী মহারাজ ওনাকে লোককল্যাণের নিমিত্ত সমভূমিতে ফিরে যাবার কথা বলেন এবং সাধারণ মানুষের গ্রহণোপযোগী মাত্র ৫টা(পাঁচ) প্রাণায়াম, মুদ্রা ও যোগাসনের ক্রিয়া শেখানোর অনুমতি দেন । এইটাই ‘ক্রিয়াযোগ’- নামে পরিচিতি লাভ করে ৷ আর এই পরম্পরার অনুগামীদের ‘ক্রিয়াযোগী’ বলা হয় ।
কিন্তু এই যে বলা হোচ্ছে “ক্রিয়াযোগ না করলে কিছুই হবে না”– এটা ঠিক কথা ! কিন্তু তার মানে এই নয় যে, ঐ পাঁচটা যৌগিক ক্রিয়াই ‘ক্রিয়া’ আর বাকি যা কিছু সব ভাঁওতা বা ‘অক্রিয়া’__ সেইটা ভুল কথা ! ক্রিয়াযোগীদের গৃহী পরম্পরায় উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে মন্মথ ভট্টাচার্য্য এবং বরদাচরন মজুমদার খুবই উন্নত ছিলেন । তাছাড়া আর কই ? যোগানন্দ এবং তার গুরু যুক্তেশ্বর গিরি – সন্ন্যাসী পরম্পরার, এঁরাও উন্নত ছিলেন। কিন্তু সবাই সবিকল্প পর্যন্ত । যোগানন্দ একটা বই লিখেছেন__ ‘Autobiography of a Yogi’ . হিমালয়ে আমি বিভিন্ন উচ্চকোটির মহাত্মাদের সাথে আলোচনায় শুনেছি যে বইটিকে “আধ্যাত্মিক গ্রন্থ” হিসাবে বিচার করা যাবে না, কারণ গ্রন্থটিতে শুধু রয়েছে__ তথাকথিত অলৌকিকতার ছড়াছড়ি ! …. [পরবর্ত্তী অংশ পরের দিন]