জিজ্ঞাসু :– তাহলে কিছুদিন যোগাভ্যাস করলেই কিছু শক্তি পাওয়া যায় ?
গুরুমহারাজ :– ‘যোগাভ্যাস’ বলতে কি বলতে চাইছো –তুমি নিশ্চয়ই রাজযোগ অভ্যাসের কথা বলছো তো ! তাহলে উত্তরে আমি বলবো_’ হ্যাঁ, তা তো হবেই ‘ ৷ নিয়ম-নিষ্ঠা সহকারে যা-ই কিছু করবে – তারই ফল পাবে । এটাই তো স্বাভাবিক নিয়ম ! তবে এতক্ষণ তো তোমাদেরকে এই কথাগুলোই বলছিলাম যে, সাধকের সাথে ঈশ্বরের অর্থাৎ ভক্তের সাথে ভগবানের যোগ-ই প্রকৃত অর্থে “যোগ”, তা সে যেভাবেই হোক । আর রাজযোগের মাধ্যমে অগ্রসর হোতে গেলে, সাধকের পাশে থাকার মতো একজন শক্তিশালী গুরুর প্রয়োজন । বাবাজী মহারাজ (যিনি প্রায় ৫০০০ বছর ধরে এখনও যুবক শরীরে রয়েছেন বলে সাধু পরম্পরায় কথিত রয়েছে) যোগসিদ্ধ মহাপুরুষ – তিনি স্বয়ং লাহিড়ীমশায়কে ‘রাজযোগ’ শিক্ষা দিয়েছিলেন । তাছাড়া ওনার পূর্ব পূর্ব জীবনের সংস্কার ছিল– তাই তো লাহিড়ী মশায় এই জন্মেই এবং অত্যল্প সময়ের মধ্যেই সিদ্ধ হোতে পেরেছিলেন । সিদ্ধ হবার পর তিনি তাঁর জীবদ্দশায় বেশ কয়েকজনকে এই যোগশিক্ষা দিয়ে আধ্যাত্মিক উন্নত করতে সক্ষম হয়েছিলেন । কিন্তু স্বাভাবিক নিয়মেই কয়েক generation-পরে যে কোনো পরম্পরার সাধকদের মধ্যে সাধন-শক্তির হানি ঘটতে থাকে, এবং শেষে তা তলানিতে ঠেকে যায় ! তখন আবার অন্য কোনো পরম্পরায় অন্য কোনো মহাপুরুষ জগতকল্যানের ‘ক্রিয়া’ শুরু করেন । ঈশ্বরের জগতে এইরকমই চলছে ! মানবকল্যাণ, জগতকল্যাণ – সবসময়ই হয়ে চলেছে,– এটা মহা-প্রকৃতির নিয়মের মধ্যেই রয়েছে । সুতরাং আমার পরম্পরাই শ্রেষ্ঠ অথবা আমাদের পরম্পরার পদ্ধতি ছাড়া আর কোনো পদ্ধতিতে আধ্যাত্মিক উন্নতি হবে না – এগুলি সংকীর্ণবুদ্ধি ছাড়া আর কিছু নয় ৷
যা বলছিলাম__রাজযোগ অভ্যাসের জন্য উপযুক্ত গুরুর প্রয়োজন, অন্যথায় সাধকের চরম অনিষ্ট-সাধন হয় ৷ সেইজন্যেই বাবাজী মহারাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ীকে যে সমস্ত ক্রিয়া দিয়েছিলেন__তাদের মধ্যে মাত্র সহজ পাঁচটি ‘ক্রিয়া’ মানুষকে শেখাতে বলেছিলেন ! যাতে করে __ যে কেউ সেগুলি করতে পারে এবং যেগুলির অভ্যাসে কোনোরকম অনিষ্ট হবে না । এইগুলিই হোলো যথার্থ মানবকল্যাণ-মূলক কাজ ! ‘রাজযোগ’ বড় সহজ কাজ নয় !
যে শিবানন্দ সরস্বতী ‘যোগগুরু’ হিসাবে সবজায়গায় স্বীকৃত, সেই শিবানন্দজী-ই যোগশিক্ষাকালে একবার চরম সংকটে পড়েছিলেন ৷ ঋষিকেশে রাজযোগ অভ্যাসকালে হঠাৎ করে তাঁর অপানবায়ু আটকে গেছিলো – এমন অবস্থা হয়েছিল যে, তাঁর প্রাণ সংকটকাল উপস্থিত হয়ে গেছিলো । ঐ অঞ্চলের অনেক বয়স্ক সাধু-সন্তরা চেষ্টা করেও কিছু করতে পারেন নি ! সবাই যখন আশা ছেড়ে দিয়েছেন__এমন সময় হঠাৎ সেখানে ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মাঝ থেকে “সিরডি সাইবাবা”(যিনি বহু পূর্বে স্থুলশরীর ছেড়ে দিয়েছিলেন! কিন্তু সুক্ষ অবস্থায় শরীর রেখে দিয়েছেন_শুধুমাত্র যোগী-মহাত্মাদেরকে রক্ষা করার জন্য।) প্রকট হয়ে গিয়েছিলেন এবং শিবানন্দকে “যোগ কা বাচ্ছা” বলে সম্বোধন করে বলেছিলেন, ” এ বাচ্ছার গাল টিপলে দুধ বের হয় – আর এ এসেছে ‘যোগ’ করতে ! ঠিকমতো যোগাভ্যাস করতে হোলে যা – গুরুর কাছে গিয়ে শিখগে যা !” এই বলে শিবানন্দের পিঠ আর পাছার মধ্যিখানে সজোরে মেরেছিলেন এক ঘা ! আর তাতেই শিবানন্দ, মুখে একটা শব্দ করে ধড়াস্ করে পড়ে গেছিলো – আর এরপরেই সে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে গেছিলো ৷ সিরডি সাইবাবার ওই মূর্তি কিন্তু এই ঘটনার পরই আবার অদৃশ্য হয়ে গেছিলো ৷
জানো, এটা কিন্তু কোনো ছেলে ভুলানো গল্প নয়, একদমই বাস্তবিক ঘটনা ! কারণ, এই পুরো ঘটনাটি বহু লোকের চোখের সামনে ঘটেছিল ! হৃষিকেশে ওনার আশ্রমে বা ঐ অঞ্চলের সাধু-মহলে এখনো ঐ ঘটনার চর্চা হয়, তাছাড়া এটার Record-ও রয়েছে ৷
আমাদের এখানেও সত্যানন্দের(শম্ভু মহারাজ) ঐরকমই যোগ করাকালীন অপানবায়ু আটকে প্রাণ যায় যায় অবস্থা হয়েছিল । শম্ভু সেই সময় ‘সূর্য-ত্রাটক’ অভ্যাস করছিল, আর তা করতে গিয়েই ঐ বিপদ ! সন্ধ্যার পর আমাকে বনগ্রামের মুখার্জিবাড়ী থেকে ডেকে আনলো আশ্রমের ব্রহ্মচারী ছেলেরা ৷ এসে দেখলাম ওর ঐ রকম একটা অবস্থা ! ত্রিভঙ্গ-মুরারীর মতো দাঁড়িয়ে আছে, ভালোভাবে উঠতেও পারছে না, আবার বসতেও পারছে না ! আমি ওখানে পৌঁছেই ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম, তারপর হাঁটু দিয়ে ওর পিছনের দিকে নির্দিষ্ট point-এ মারলাম এক ঘা ! ‘আঁক’- করে একটা শব্দ করে ও পড়ে গেলো – তার কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়েছিল ।
সেইজন্যই বলছিলাম ‘রাজযোগ’-এর বিভিন্ন ক্রিয়া অভ্যাস করার সময় উপযুক্ত গুরুর তত্ত্বাবধানেই তা করা উচিৎ । উপযুক্ত ‘যোগগুরু’ মানে যাঁর প্রাণের রহস্য ভেদ হয়েছে বা প্রাণতত্ত্ব যার অধিগত । তিনি ছাড়া তো বুঝতেই পারবে না যে, গোলমালটা কোথায় হোচ্ছে ! ঠিক point-এ Touch করে বা ধাক্কা দিয়ে আটকে যাওয়া অপানবায়ুকে আবার চালু করে দিতে পারলেই প্রাণ-অপানের ক্রিয়া পুনরায় শুরু হয়ে যাবে । আমাদের এখানে সত্যানন্দের যেটা হয়েছিল – ও আমার অনুমতি নিয়েছিল ‘ত্রাটক’ করার ব্যাপারে । কিন্তু আমি আহার-বিহারের ব্যাপারে যেমন যেমন নির্দেশ দিয়েছিলাম – সেইটা ঠিকমতো পালন করতে পারেনি ৷ ‘পালন করতে পারেনি’– বললে ভুল বলা হবে, ওকে পালন করতে দেওয়া হয়নি । আমাদের এখানে তখন যে ছেলেগুলো থাকতো, তারা প্রত্যেকে এক একটা বিচ্ছু । বিশেষত: মিহির (মহারাজ) ! ওই ওকে বাধ্য করেছিল আগের দিন উল্টোপাল্টা কিছু খেতে – যেগুলো ওই ক্রিয়া চলাকালীন সময়ে খাওয়া একদম নিষেধ ! বেচারা সত্যানন্দ ! মিহিরদের ‘চাল’-টা ধরতে পারেনি ! তাই ফেঁসে গেল । পরে আমি মিহিরদেরও বকাবকি করেছিলাম । আমি উপস্থিত না থাকলে তো ছেলেটা মরেই যেতো ! এ ব্যাপারে ওদের ধারণাই ছিল না । ওরা চাইছিল সত্যানন্দের এইসব উটকো ‘ঝোঁক’ যেন বন্ধ হয় ! কিন্তু ব্যাপারটা যে এত বাড়াবাড়ি হবে –তা ওরাও বুঝতে পারে নি ৷৷