জিজ্ঞাসু : ~ আপনি সাধন-ভজনের কথা বলেন – কিন্তু পৃথিবীতে কজনই বা এসব করে ? কয়েক জন সাধু মহাত্মা বা দু চারজন অন্য লোক ছাড়া বেশির ভাগ মানুষই তো নিজের নিজের কাজকর্ম নিয়েই ব্যস্ত । আর বর্তমানে শক্তিমান তো ধনীরা এবং রাজ নেতারা ! সাধুসন্তকে কজন মানে ?
গুরু মহারাজ : ~ হ্যাঁ, আমি সকলকে সাধন-ভজন করতেই তো বলবো ! সাধন-ভজন ই তো পথ ৷ শরীরে সামর্থ্য থাকতে থাকতে ‘সাধন’ আর শরীরের ক্ষমতা কমে গেলে ‘ভজন’ ! তখন হাততালি দিয়ে ইষ্টনাম গুণগান করো , জপ করো । এইজন্যেই বাউল গানে রয়েছে “সময় গেলে সাধন হবে না ।” কিন্তু আমি বলবো _ঠিক আছে,বয়স হয়ে গিয়েছে বলে আফশোষ করবে কেন _সাধন হবে না, ভজন তো হবে !
আর কি বলছিলে __সবাই সাধন ভজন করে না ? সবাই হয়তো সাধনা করে না কিন্তু ভজনা সকলেই করে বই কি ! সেই অর্থে সবাই ‘ভজা’ ! ‘ভজা’ – নয় কে ? কেউ কর্তাভজা – কেউ গিন্নিভজা ! __সবাই হাসছো যে ! ঠিকই বলছি – স্বামী বিবেকানন্দ প্রায় সমগ্র বিশ্ব ঘুরে এসে ভক্তদের কাছে বলেছিলেন , ” পৃথিবী ঘুরে কি দেখলাম জানিস — সর্বত্রই ঐ শিব আর শিবানীরই পূজা হয়ে চলছে __বিভিন্ন নামে , বিভিন্ন রূপে , বিভিন্ন আচারে !” সেই জন্যই বললাম কেউ কর্তাভজা নয় কেউ গিন্নিভজা ! কেউ কৃষ্ণভজা , কেউ রাধাভজা ! কেউ রামভজা , কেউ কালিভজা ! কেউ যীশুভজা , কেউ আল্লাহ বা মোহাম্মদভজা ! ভজা নয় কে ? গৃহে বা পরিবারে বেশিরভাগ পুরুষই অর্থভজা,ক্ষমতাভজা নাহয় নারীভজা ! এর বাইরে কে আছে বলো ?
রাজ নেতাদের কথা বলছো ! তারাও নিজের নিজের আদর্শকে-ভজনা করে ! ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার সবচাইতে বেশি বিরোধ করে তথাকথিত কমিউনিস্টরা , তো তারাও মার্কস ভজে , লেলিন ভজে ! ধর্মীয়ভাবে, ভারতবাসীদের মানসিকতায় রয়েছে মূর্তি পূজা – দেখা গেছে ভারতবর্ষে যত মার্কস – লেনিনের মূর্তি রয়েছে পৃথিবীর কোনো দেশে সংখ্যায় তত নেই । এবার কি করে অস্বীকার করবে যে, এরা মূর্তিপূজার বিরোধী নয় !!
মানুষের অজ্ঞতা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ! হয়তো লেখাপড়া শিখেছে – পন্ডিত হয়েছে কিন্তু একদেশদর্শিতায় ভুগছে ! সে যেটা ভালো মনে করছে __সেটাই ঠিক আর সব ভুল ! ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন – সবাই ভাবছে নিজের ঘড়িটা ঠিক সময় দিচ্ছে – অপরেরটা ভুল ! কিন্তু নিজের টা ঠিক না ভুল – তা জানার জন্য সূর্য ঘড়ির সাথে নিজের ঘড়িকে মিলিয়ে নিতে হয় । এখানে সূর্য ঘড়ির অর্থ মহাপুরুষ – মহাজনগন । শাস্ত্র বলেছে “মহাজন যেন গত স পন্থা শ্রেয়:” – ৷ কিন্তু কিছু পন্ডিতস্মন্য ব্যক্তি – আবার (এদের সংখ্যা বাংলাতেই বেশি ,) ভারতের কোনো কিছুই ভালো দেখতে পায় না ! শুধু ইউরোপ-আমেরিকার কোনো কিছুকে অথবা ঐ সব দেশের কোনো ব্যক্তিকে আদর্শ করে বসে আছে ! আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, এরা হয়তো কলকাতার লোক কিন্তু ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বা স্বামী বিবেকানন্দ পড়ে না –মার্ক্স , এঙ্গেলস পরে , রাশিয়ান পাবলিকেশনের বই পড়ে ! ইউরোপ বা আমেরিকার সাহেবরা ভারতের কোনো কিছুকে ভালো বললে _তারপর ওরা সেটার একটু খোঁজ খবর নেয় ।
দ্যাখো, সেই অর্থে বাউলরাই একমাত্র সংস্কারমুক্ত । ওদের গানে আছে , ” আমি মরছি খুঁজে সেই দোকানের সহজ ঠিকানা – যেথা আল্লা-হরি-রাম-কালী-গড একথালাতে খায় খানা ৷” আধুনিক বাউল গানে হয়তো কেউ গাইবে …..” যেথা আল্লা-হরি-রাম-কালী-কার্ল মার্কস একথালাতে খায় খানা ।”
আমি বুঝতে পারি না __এদের অসুবিধাটা কোথায় ? তোরাও তো ভজিস্ ! আমি রামকৃষ্ণ ভজি, তুই মার্কস ভজিস্ ! এই তো ব্যাপার ! তবে, এখানেও কিন্তু পার্থক্য রয়েছে ! রামকৃষ্ণ ভজারা , মার্কসভজাদের বিরক্ত করে না বা সমালোচনা করে না ! কিন্তু দ্বিতীয় দলের সমর্থকেরা এটা খুবই করে ! যদি জিজ্ঞাসা করো _’তোরা এটা কেন করিস ‘? বলবে _’ওই যে মার্কস বলে দিয়েছে – ধর্মাচরণ যেন আফিমের নেশা’ ৷ ব্যস্ ! ওতেই সিদ্ধান্ত হয়ে গেল _ মার্কসভজা ছাড়া বাকিরা নেশাগ্রস্ত !
আরে পাগল ! মার্কসভজা-নেশা আরো প্রবল ক্ষতিকারক নেশা ! এটা কেন বলছি তার কারণ রয়েছে । ১০ বছর রামকৃষ্ণ ভজা একজন লোককে দেখো, আর দশ বছর বাম রাজনীতি করছে বা মার্কস ভজছে এমন একজনকে দেখো । এই দুজনের জীবনকে পর্যালোচনা করো – পার্থক্যটা তুমি নিজেই বুঝতে পারবে । শুধু আত্মসুখ ভোগ আর আত্মস্বার্থসিদ্ধি ছাড়া আজকাল কজন মানুষ রাজনীতি করে ? মুখেই শুধু বড় বড় বুলি , High-sounding কথাবার্তা ! ‘মানুষের সেবা করছি’ – বললেই মানুষের সেবা করা যায় ?
আত্মসুখের তিল মাত্র বাসনা থাকলে অপরের সেবা হয় না , একটু আধটু করুণা , অনুদান , অনুকম্পা এসব হতে পারে । সেবা মানেই নিঃস্বার্থ ৷ সম্পূর্ণরূপে কাম-কাঞ্চন ত্যাগী-ই নিঃস্বার্থ সেবা করতে পারে । বর্তমানের সন্ন্যাসীরা অর্থাৎ যারা প্রকৃতঅর্থে কাম-কাঞ্চন ত্যাগ করে স্বামী বিবেকানন্দকে আদর্শ ক’রে নিজের জীবনকে পরহিতে উৎসর্গ করেছে অর্থাৎ এককথায় আজকের সমাজে যারা কর্মযোগী সন্ন্যাসী _তারাই ঠিক ঠিক নিঃস্বার্থ সেবা করছে ! রামকৃষ্ণ মিশন , ভারত সেবাশ্রম সংঘ বা বিভিন্ন অন্যান্য মিশনের যে কার্যকলাপ, বিশেষত: প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় – যে ভাবে এরা দুর্গত মানুষের পাশে এসে দাঁড়ায় – তা কেন রাজনীতির লোকেরা বা অন্যান্যরা পারে না ?
পারে না, কারণ তাদের জীবনে সাধনা নেই , নিঃস্বার্থ সেবার ব্রত নেই ।। যাদের আছে তারাই পারে – এখন সন্ন্যাসী পরম্পরাই এই ব্রত পালন করছে ।। আমাদের এখানেও (পরমানন্দ মিশনে)সাধুরা অনাথ ছেলেদের লালন-পালন করছে এবং গৃহী ভক্তরা বাইরে থেকে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান দিচ্ছে! এইভাবে পারস্পরিক সহযোগিতায় এখানে সেবামূলক কাজ হয়ে চলেছে। মানুষের কল্যাণ করা বা সেবা করা অত সহজ কাজ নয় । আর _যে কোনো বাকসর্বস্ব-স্বার্থসর্বস্ব মানুষ তা করতে চাইলেও করতে পারবে না ৷।