জিজ্ঞাসু :– শাস্ত্রে রয়েছে__ ‘কোনোপ্রকার কর্মের দ্বারাই ঈশ্বরকে পাওয়া যায় না, ধ্যান-জপ, যাগ-যজ্ঞ ইত্যাদি কোনো কিছুতেই তাকে লাভ করা যায় না’ । অথচ আপনি সবসময় বলেন__ঈশ্বরলাভ‌ই মানবজীবনের উদ্দেশ্য। তাহলে আমাদের কিভাবে আগাতে হবে ? কি করতে হবে?
গুরুমহারাজ :– ‘কাজের কাজ’-টি করতে হবে । বেশিরভাগ মানুষ তো সবসময় আজেবাজে কাজ করে চলেছে – ওসব করে লাভ কি ? কাজের কাজটি করতে হবে । একটা ঘটনার কথা বলছি শোনো__তাতে যদি তোমাদের ধারণা হয়!!
বেনারসে ত্রৈলঙ্গস্বামীর আশ্রমের কাছাকাছি এক ভাঙ্গি (অন্ত্যজ শ্রেণীর মেথর জাতীয় লোক) থাকতো ৷ সে প্রতিদিন ভোরে এবং সন্ধ্যার দিকে স্বামীজীর আশ্রম প্রাঙ্গন পরিষ্কার করতো, ঝাড়ু দিতো (২৮১ বছরের সুদীর্ঘ জীবনকালে ত্রৈলঙ্গস্বামী কোনো সময় বারাণসীতে আশ্রম করে থাকতেন)। ভাঙ্গীটি পেট চালানোর জন্য অন্যত্রও কাজ করতো কিন্তু সকাল-সন্ধ্যায় সাধুবাবার আশ্রমটি মন-প্রাণ দিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে পরিষ্কার করার চেষ্টা করতো ৷ মাঝে মাঝে সে জোড়হাতে স্বামীজীর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করতো – “আশ্রম প্রাঙ্গন ভালোভাবে ‘সাফ্’ (পরিষ্কার) হয়েছে তো” ? ত্রৈলঙ্গস্বামীজী উত্তর দিতেন – “তুম্ ভি সাফ্ হো রহা হ্যায় !”(তার মানে হোচ্ছে– উনি ভাঙ্গির প্রতি প্রসন্ন হচ্ছিলেন!)
এইরকমভাবেই বেশ চলছিল ভাঙ্গীর জীবনধারা ! একদিন ভাঙ্গীর মাথায় চাপলো যে, ‘সে পূর্বজন্মে কি বা কে ছিল, তা জানবে’ ৷ সে, তার এই জিজ্ঞাসা ত্রৈলঙ্গস্বামীকে বিনীতভাবে নিবেদন করলো । প্রথমটায় স্বামীজী ব্যাপারটা এড়িয়ে গেলেও_ ভাঙ্গীর পুনঃপুনঃ অনুরোধে তাকে জোরসে এক থাপ্পড় মেরে বললেন, ” পুর্ব জনম্ মে তুম্ যশোর কা মহারাজ থে ।” সাথে সাথে ভাঙ্গীর চেতনায় পরিবর্তন ঘটে গেল ! সে কাউকে কিছু না বলে হাঁটতে শুরু করল যশোরের অভিমুখে । মুখে শুধু একটাই কথা “ম্যায় যশোর কা মহারাজ হুঁ”!
প্রকৃতপক্ষে সত্যিই সাধুবাবার কৃপায় তার পূর্বজন্মের স্মৃতি সব মনে পড়ে গেছিলো এবং সত্যিই সে যশোরের মহারাজা ছিল। পায়ে হেঁটে, নানারকম অত্যাচার সহ্য করে__ ভাঙ্গী যখন যশোর পৌঁছালো, তখন সে দেখতে পেল যে, সিংহাসনে তার নাতি বসে আছে । এবার সে রাজ দরবারে পৌঁছে নিজের পরিচয় দিতে চাইলে রাজা চিনতে তো পারলই না – বরং দারোয়ান ডেকে তাকে মারতে মারতে প্রাসাদ থেকে বের করে দেবার আদেশ দিলো ৷
মেরে আধমরা করে__বাইরে বের করে দেবার পরেও ওর মুখে সেই একই কথা__ “ম্যায় যশোর কা মহারাজ হুঁ”!
রাজ্যের লোকে ওর কথা শুনে হাসাহাসি করতে লাগলো বা নানারকম অপমান ও অত্যাচার‌ও করতে লাগলো ।
চারদিক থেকে অপমানিত হয়ে, সেই ভাঙ্গী আবার হাঁটতে হাঁটতে ফিরে চললো বেনারসে__ ত্রৈলঙ্গস্বামীর কাছে ।
প্রায় দেড়-দু’মাস পরে সে যখন স্বামীজীর কাছে ফিরে গেল, তখন আর তাকে চেনাই যাচ্ছে না ৷ শরীর ভেঙে গেছে, হেঁটে হেঁটে পায়ে ঘা হয়ে গেছে ৷ সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন ! তবু তার কিছুতে হুঁশ নাই । আশ্রমে পৌঁছেই সে স্বামীজীকে জিজ্ঞাসা করলো, “ম্যায় যশোর কা মহারাজ হুঁ কি নেহী ?” উনি বললেন, “হাঁ- হাঁ জরূর তুম মহারাজ ! লেকিন তুম্ মহারাজ থে, অভি তুম্ ভাঙ্গী হ্যায় ৷” এই বলে উনি আবার ওকে একটা থাপ্পড় মারলেন ! সাথে সাথেই ভাঙ্গি অচৈতন্য হয়ে গেল ৷ কিছু শুশ্রুষার পর সুস্থ হয়ে সে স্বামীজীর পা ধরে কাঁদতে লাগলো ! ত্রৈলঙ্গস্বামী ওকে তুলে ধরে আলিঙ্গন করলেন এবং বাকি জীবনের ভার যে তাঁর, এই বলে আশ্বস্ত করলেন৷
এরপর থেকে ঐ ভাঙ্গি মৌন হয়ে গেছিলো, সবসময় জপ কোরতো। ধীরে ধীরে সে একজন ‘পূর্ণজ্ঞানী’ সাধুতে পরিণত হোলো । পরবর্তীকালে কোন সাধু-সন্ত যখন ত্রৈলঙ্গস্বামীর কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতো – “৫০ বছর যোগসাধনা করছি, কই কিছুই তো হোলো না !” উনি তখন একপাশে চুপ করে বসে থাকা সেই ভাঙ্গিকে দেখিয়ে বলতেন – “ওকে দ্যাখো”৷ তারা বলতো, “ও তো ভাঙ্গি”! উনি বলতেন – “ও জ্ঞানী”। তারা বলত, “ও তো ধ্যান-জপ, সাধন-ভজন, যোগাভ্যাস কিছুই করেনি ?” স্বামীজী বলতেন, ” সেটা তোমরা বলছো–কিন্ত কাজের কাজটি ঐ করেছে !”
তাহলে এখানে একটা জিজ্ঞাসা আসছে__এখানে “কাজের কাজটি”- কি ? সেটি হোলো__’গুরু প্রসন্ন হওয়া’, ‘ঈশ্বর প্রসন্ন হওয়া’ । ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণও বলতেন – ” যো সো করে তাঁকে প্রসন্ন করতে পারলেই হোলো ৷” দ্যাখো, এখানে কিন্তু ‘আমার মতটাই শ্রেষ্ঠ’- এই ভাবটা যে ভুল__সেই কথাটাও বলা হোচ্ছে । ‘যো সো’- করে প্রসন্ন করার কথা বলা হোচ্ছে । অর্থাৎ যে কোনো ভাব-কে আশ্রয় করে তাঁকে খুশি করো, তাঁকে প্রসন্ন করো__তাহলেই হবে ৷ ….. [পরবর্তী অংশ পরের দিন]