জিজ্ঞাসু :– জীব-ই শিব হয়ে ওঠে – এই ব্যাপারটা বোঝা খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে !
গুরুমহারাজ :– তোমার বোঝা বা না বোঝার উপর কি নির্ভর করে বাবা ! সত্য তো ‘সত্য’-ই !!! শিব স্বপ্রকৃতি বা মায়া-কে আশ্রয় করে জীব হয়েছে, আবার জীব যখন মায়ামুক্ত হয় তখন সে ‘মা’ বা পরাশক্তিকে আশ্রয় করে এবং জীব-ই আবার ‘শিব’ হয় । ব্যাপারটা কেমন জানো – কেউ যখন মাটিতে পড়ে যায়, তখন সে তো মাটিকে আশ্রয় করেই বা মাটি ধরেই উঠে দাঁড়ায়,– এটাও এইরকমই খানিকটা । অভাব-ভাব-স্বভাব ৷ অভাবে জীব, ভাব আশ্রয় করে স্বভাবে উপনীত হলেই ‘শিব’ ৷ ব্রহ্মই সব হয়েছে, ব্রহ্মময়ং জগৎ ৷ ব্রহ্ম যখন অহং-কে আশ্রয় করে, তখন হয় জীব! আবার অহংমুক্ত হলেই শিব ! সমুদ্রে দু’রকম Current বা প্রবাহ দেখা যায় ৷ একটা Under current, একটা Surface current ! Surface current -এর ফলে সমুদ্রের জল পাড়ে এসে ধাক্কা মারে সমুদ্রের উপরিভাগের বস্তুকে পারে নিয়ে এসে ফেলে, আর Under current_ সেইগুলিকে আবার গভীর সমুদ্রে নিয়ে চলে যায় । এইভাবেই জীবত্ব থেকে শিবত্বে, আবার শিবত্ব থেকে জীবত্বে ক্রমবিবর্তন – এটাই ‘ব্রহ্মবিলাস’ ।
মানুষ জন্মাচ্ছে – কিছুকাল জীবনধারণ করে আবার মারা যাচ্ছে – এটা যেন সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে উপরে ওঠা ৷ এক একটা জীবনের শরীর বা দেহধারণ যেন এক একটা ধাপ বা সিঁড়ি ৷ এইভাবে ৮৪ লক্ষ যোনী-ভ্রমণ বা ৮৪ লক্ষ বার শরীরধারণ । শরীরের বিবর্তনের সাথে সাথে চেতনার অভিবিকাশ হয়ে চলেছে ৷ ভারি মজার ব্যাপার ! এটা অনাদি ! অনাদিকাল থেকে এই প্রবাহ চলেছে ! কল্প থেকে কল্পান্তর হয়ে চলেছে এই চিৎবিলাস ।৷
জিজ্ঞাসু :– এই ব্যাপারটা অন্যভাবে ব্যাখ্যা করা যায় কি ?
গুরুমহারাজ :– অন্যভাবে বলতে কি বলছো ? সত্য-কে যেভাবেই বল, সত্য তো সত্য-ই থাকবে, নয় কি ? ৮৪ লক্ষ জন্ম যা বলা হচ্ছিলো, সেটা জীবের Evolution-এর ধারা । উদ্ভিদজ, স্বেদজ, অন্ডজ ও জরায়ুজ – এই প্রতিটি Stage-এ ১০ লক্ষ করে মোট ৮০ লক্ষ যোনি ভ্রমণ । এতদূর পর্যন্ত Forward Manifestation, বানর হয়ে নরে আসার পর থেকে শুরু হয় Upward Manifestation ৷ বানর ও নর মিলে ৪ লক্ষ জীবন আরও অতিক্রম করতে হয় । দেহ বিবর্তনের চূড়ান্ত রূপ হোলো মানুষ । মানুষের মধ্যে ‘বিবেক’ ও ‘বৈরাগ্য’ জাগ্রত হলেই মানুষ দেবতা হয় । আর এরপর ওই মানুষের মধ্যে ‘জ্ঞানে’র প্রকাশ ঘটলে মানুষ ‘সিদ্ধ’ হয়, এটাই ascending-এর চূড়ান্ত অবস্থা ! এটাকে বলা যায়__ ‘জ্ঞানী’ অবস্থা বা ‘ঋষি’ স্থিতি ।
কিন্তু মনুষ্যশরীর পেয়েও, মানুষের জ্ঞানলাভের আগ্রহ জাগে কোথায় ? ব্রহ্মবিদ্যার প্রতি আগ্রহ মানুষের মধ্যে খুবই কম । যাদের আগ্রহ জাগে, তাদের মধ্যে ব্রহ্মজ্ঞ মানুষের সন্ধান করে বা তাদের কথা শুনতে চায়_ এমন সংখ্যা যথেষ্টই কম । যারা শোনে তাদের মধ্যে সেই ‘ব্রহ্ম’কথা বোঝার লোকের সংখ্যা আরও কম । যারা বোঝে, তাদের মধ্যে আবার জানা লোকের সংখ্যা আরও আরও কম ! আর যাঁরা জানেন, তাঁরাই ব্রাহ্মণ বা ব্রহ্মজ্ঞ ।
নিম্নস্তরের প্রাণীদের ক্ষেত্রে জীবনের বিবর্তন মানে তো Life cell এবং germ cell-এর বিবর্তন । Neuro cell-এর বিবর্তন হয় উচ্চস্তরে । এই যে কথাটা বলা হোলো অর্থাৎ নিম্নস্তর থেকে উচ্চতর অবস্থায় উত্তরণ__এর কারণটাই বা কি ? তার উত্তরে বলতে হয়__ ‘কারণ’, ‘কার্য্যে’ আসতে পারছে না উপযুক্ত ক্ষেত্রের অভাবে – তাই উন্নত ‘ক্ষেত্র’ বা শরীরের প্রয়োজন হোলো, শরীরের বিবর্তন হোতে হোতে সৃষ্টি হোলো মানুষ ।
ব্রহ্ম-ই সব হয়েছে,এই সমস্ত জড় বা জীবজগৎ সব, আবার বিবর্তনের শেষে সেই ব্রহ্মস্বরূপে ফিরে যাওয়া ! ব্রহ্মের বিবর্তবিলাস !! ক্ষেত্র আর ক্ষেত্রজ । ক্ষেত্রজ উপযুক্ত ক্ষেত্রের অভাবে নিজেকে পূর্ণরূপে প্রকাশিত হতে পারছিলো না – তাই “মনুষ্যত্বম্”। মনুষ্যদেহ এমনই প্রকৃষ্ট যে, এই দেহে ব্রহ্মবোধ হোতে পারে, আবার এই শরীরে পূর্ণব্রহ্ম প্রকাশিতও হোতে পারেন ।
ব্রহ্ম ষোলকলায় সম্পূর্ণরূপে প্রকাশিত, আর অবতার পুরুষেরা চোদ্দকলায় । অনেকে(পন্ডিতেরা) এখানে ব্রহ্মের বেশী-কম প্রকাশের অংক কষতে বসে যায় । ব্রহ্ম – ব্রহ্মই, সবকিছুই ব্রহ্মের প্রকাশ, তাই কোথাও কমবেশী হয় না – শুধু প্রকাশভেদ ৷ যেমন সূর্য এবং সূর্যের প্রতিবিম্ব ! জলের প্রতিবিম্ব অপেক্ষা কাঁচে বেশি উজ্জ্বল, কাঁচ অপেক্ষা হীরায় আরও উজ্জ্বল – পাত্রভেদে উজ্জ্বলতার তারতম্য ! সূর্য একই থাকে, শুধু পাত্রভেদে শক্তির প্রকারভেদ । সেই অর্থে সবই পূর্ণ – অপূর্ণ কোথায় ? তাই এক কথায় জীবের উত্তরন বোঝাতে গেলে বলতে হয় __ “পূর্ণ -ই যেন অপূর্ণের জ্বালা বুকে নিয়ে এগিয়ে চলেছে পূর্ণত্বের দিকে”।