জিজ্ঞাসু :~ সদগুরু তো সবই পারেন, তাহলে তিনি সংসারের সব ঝামেলা মিটিয়ে দিয়ে নিজের দিকে কৃপা করে টেনে নিচ্ছেন না কেন ?
গুরুমহারাজ :~ সংসারের ঝামেলা বলতে হয়তো তুমি অর্থনৈতিক, পারিবারিক এই ধরনের কিছু সমস্যার কথা বলছো। কিন্তু সেই সব ঝামেলা মিটলেও তোমার মনের ঝামেলা কি মিটবে ? তোমার মনের ঝামেলা__ আবার নতুন নতুন আরও কিছু ঝামেলা সৃষ্টি করে ফেলবে অচিরেই। তাই বর্তমানে এখন যে ঝামেলাগুলি রয়েছে, ঐগুলি সদগুরু মেটালেও__ কখনোই কোনো মানুষের জীবনের সমস্ত সমস্যা বা ঝামেলা মেটে না ! এই কথাটা সত্য জেনে রাখবে।
আর কৃপা করার কথা বলছো ? অর্থাৎ তুমি বলতে চাইছো গুরু নিজের শক্তি শিষ্যে সঞ্চারিত করে তাকে সমস্যামুক্ত করে দিক – এই তো ? দ্যাখো, সদ্গুরু জানেন কাকে কতোটা দিতে হবে ! কার কতোটা নেবার ক্ষমতা__ তাও তিনি জানেন, এবং সেই মতোই তাকে ‘কৃপা’ করেন। যেই মুহুর্তে সদ্গুরুর কাছে কেউ দীক্ষা নেয়, সেই মুহূর্ত থেকেই গুরুর সাথে শিষ্যের শক্তি আদান-প্রদানের খেলা শুরু হয়। গুরুর ‘ভালো’ শিষ্যে এবং শিষ্যের ‘কালো’ গুরুতে সঞ্চারিত হোতে শুরু করে ৷ শিষ‍্যদের সমস্ত ‘কালো’ শুষে নেওয়ার জন্য, আর তাঁর জীবনের সমস্ত ‘আলো’ (আধ্যাত্মিক সম্পদ) শিষ‍্যদের দিয়ে দেওয়ার জন্যই সদ্গুরুর আসা ! কিন্তু মানুষ তার কামনা-বাসনার জাল দিয়ে নিজেকে এমনভাবে বেঁধে রেখেছে যে, সেই জাল কেটে বেরিয়ে আসতেই চায় না – ফলে গুরুর করুণা বা কৃপার প্রবাহ বয়ে গেলেও সে সবটা নিতে পারে না ! অবশ্য সদ্গুরুর তাতে কিছু যায় আসে না_কারণ তিনি তো জানেন কার ক্ষমতা কতটুকু ! তিনি অকাতরে তাঁর অর্জিত, সঞ্চিত সম্পদ (আধ্যাত্মিক) বিলোতে থাকেন – তারপর যখন মানুষের দেওয়া ‘কালো’-য় তাঁর পার্থিব শরীর‌ও কালো হয়ে যায় – তখন তিনি স্থুলশরীর ছেড়ে পুনরায় অমূর্ত হয়ে যান।
সদ্গুরু-ই মর্তের ভগবান – আর যথার্থ অর্থেই সদা-সর্বদা তিনি কৃপাময় বা করুণাময় !
কি বলতে চাইলাম _ সেই ব্যাপারটা কি তুমি বুঝতে পারলে ? সদ্গুরু জানেন, কোন্ শিষ্যের গ্রহণ করার ক্ষমতা কতটা ! তুমি কৃপা বা করুণা নিতেই চাইছো না – তোমাকে কি করে দেবে বলো ? আর অকারণে যদি তোমাকে কৃপা করা হয় – তুমি কি তা নিতে পারবে ?
প্রতিটি মানুষেরই নিজস্ব স্বভাব বা বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা তার জীবনের বিকাশের জন্য দায়ী। সদ্গুরুর সংস্পর্শে যখনই কোনো মানুষ আসে, তখন তিনি সেই মানুষটির নিজস্ব স্বভাব বা বৈশিষ্ট্যটিকে দেখে নেন। তারপর সদ্গুরু তার সেই স্বভাবকে আশ্রয় করেই যাতে তার বিকাশ হয়, তার সহায়তা করেন। বাংলায় একটা কথা রয়েছে ‘স্বভাব যায় না মলে’– অর্থাৎ সাধারনতঃ মানুষের স্বভাব মৃত্যুকাল পর্যন্ত একই থাকে। কিন্তু সদ্গুরুর সংস্পর্শে আসার সাথে সাথেই গুরুশক্তির প্রভাবে মানুষের স্বভাবের ধীরে ধীরে পরিবর্তন হোতে শুরু করে। আর শিষ্য যদি গুরুর নির্দেশ ঠিক ঠিক পালন করে নিয়মিত সাধন-ভজন করে, তাহলে এই গতি আরও ত্বরান্বিত হয়।
সেইজন্যই বলছিলাম_মানুষের স্বভাব কিন্তু পরিবর্তনশীল। রত্নাকর দস্যুও বাল্মিকী হোতে পারে – যদি জীবনে চলার পথে ব্রহ্মা ও নারদ ঋষির মতো কারো সাথে দেখা হয় ! তাঁদের সংস্পর্শে আসার পর‌ই ওর জীবনের চলার পথটা যে ভুল ছিল বা ওর ‘স্বভাব’ খারাপ হয়ে গেছিল__ সেটা সে বুঝতে পারে। তারপর দেখা যায় যে, ওঁদের কাছে ‘দীক্ষা’ গ্রহণ করে এবং কিছুকাল তাঁদের দেওয়া ‘যোগ’ অভ্যাস করার পরেই রত্নাকরের তন্ময়তা এসে গিয়েছিল এবং সে গভীর ধ্যানে এমনভাবে নিমগ্ন হয়েছিল যে, ওর সারা গায়ে উইঢিবি বা বল্মিকের স্তুপ গজিয়ে গেছিলো। পরে পূর্ণ জ্ঞান হবার পর যখন সকলে ওনাকে বল্মিকের স্তুপ থেকে বের করে আনে, তখন থেকেই ওর নাম হয় বাল্মিকী।
যাইহোক, এই ঘটনা থেকে বোঝা যায় যে, মানুষের স্বভাব পাল্টালেই মানুষটাও পাল্টে যায়।
কিন্তু একটা কথা মনে রাখতে হবে __যে “রত্নাকর” অর্থাৎ যার মধ্যে মাল আছে, তারই হোতে পারে বা হয়। রত্ন+আকর= রত্নাকর। রত্নাকর না হোলে হওয়া মুশকিল ! তোমরা তো এমনিতেই টলমল করছো। তোমাদের মনোজগতে গড়া কামনা-বাসনার প্রাসাদ ভেঙে যাবার ভয়ে অস্থির হোচ্ছো, আর আমার কাছে তার প্রতিবিধানের জন্য ছুটে ছুটে আসছো ! আবার চাইছো একলাফে আধ্যাত্মিক রাজ্যে প্রবেশ করতে !!
সদ্গুরু জানেন কার দ্বারা কতটা হবে, প্রয়োজনে কাকে কতটা (শক্তি) দিতে হবে। গুরুকৃপা লাভ করেও তো অনেকে bad utilise করে – তখন আবার “পুনর্মূষিক ভবঃ” বলতে হয় বা পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হয়।
সেই সাধুবাবার গল্প তো জানো, যিনি তাঁর কুঠিরে বসবাস করা একটি ইঁদুরের বাহানা মেটাতে গিয়ে প্রথমে তাকে ইঁদুর থেকে বিড়ালে, পরে বিড়াল থেকে বাঘে পরিণত করেন, কিন্তু বাঘ হবার পর সে-ই সাধুটিকে আক্রমণ করতে উদ্যত হয়েছিল। তখন সাধুটি আবার বাঘকে “পুনর্মূষিক ভবঃ” বলে ইঁদুরে পরিণত করে দিয়েছিলেন। … [ পরবর্তী অংশ পরের দিন ]