[সদগুরু যখন সবই পারেন, তখন তিনি সব ঝামেলা মিটিয়ে নেন না কেন__এই প্রসঙ্গে গুরু মহারাজ উত্তর দিচ্ছিলেন। আজ সেই আলোচনার শেষাংশ।]
এইভাবেই সদ্গুরুও শিষ্যের জীবনের নানান আগাছা নির্মূল করতে থাকেন। তখন আপাতত ভক্তের মনে হয়__ তিনি কি নিষ্ঠুর ! তারপর যখন তিনি সাধন পথে বাধাস্বরূপ ফেঁকড়িগুলি কাটতে থাকেন তখন তো শিষ্যের জ্বালা-যন্ত্রণা অনুভূত হবে-ই। রহস্যটা বোঝার চেষ্টা করো। আমাদের আশ্রমেই এইরকম উদাহরণ রয়েছে। আমাদের আশ্রমের ব্রহ্মচারী সন্ন্যাসী সত্যানন্দ (শম্ভু মহারাজ)-কে সংসারী হয়ে বিয়ে-থা করতে বলা হয়েছে – কারণ ওর স্বভাবে সংসার ছিল ! চেষ্টা করা হয়েছিল–যাতে ও নিজেকে এই স্বভাব বা সংস্কারের ঊর্দ্ধে তুলতে পারে। কিন্তু ও পারে নি _সংসারে জড়িয়েছে ! গেরুয়া কাপড় খুলে ওর সংসারী হওয়ায় অনেকের মধ্যে অনেক জিজ্ঞাসারও অবতারণা হয়েছিল। আজকে এই আলোচনার মাধ্যমে আমি উত্তর দিয়ে দিলাম।
দ্যাখো, সদ্গুরুর সম্বন্ধে ঠিকঠাক ধারণা হোলে আর কোনো জিজ্ঞাসা থাকে না ! কিন্তু সাধারণ মানুষ সেই ধারণা কোথা থেকে পাবে ? তবে, সদগুরুর শিষ্যদের সঠিক ধারণা থাকা দরকার ! গুরু অনুমতি দিলে তবেই জিজ্ঞাসা, না হলে গুরুর মুখের দিকে শুধু চেয়ে থাকা__ গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক এমনটাই হওয়া উচিত !
উত্তর ভারতে বারাণসীতে থাকতেন কবীর (যিনি অধ্যাত্ম বিষয়ক ‘দোঁহা’ রচনার জন্য বিখ্যাত) ! তিনি নিম্নবর্গের ‘জোলা’ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। যৌবনের প্রারম্ভে যখন তাঁর পূর্বসংস্কার জাগ্রত হোলো, তখন ওনার মধ্যে তীব্র বৈরাগ্য এল এবং উপযুক্ত গুরুর সন্ধানে উনি বারানসীর গঙ্গার তীরে তীরে বিভিন্ন আশ্রমে ঘুরতে লাগলেন। তৎকালীন সময়ে রামানন্দ স্বামী ছিলেন একজন আধ্যাত্মিকভাবে উন্নত অবস্থার সাধু। কবীর সরাসরি ওখানে গিয়ে তাঁকে দীক্ষা দেবার অনুরোধ জানালেন। কবীরকে দেখেই গুরু চিনতে পেরেছিলেন এবং বুঝেছিলেন যে, ইনিই তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরি ! কিন্তু তৎকালীন সামাজিক অনুশাসনের জন্য তিনিও নিম্নবর্ণজাত কবীরকে সকলের সামনে শিষ্য হিসাবে গ্রহণ করতে পারলেন না ! এদিকে ঈশ্বরের ইচ্ছা ছিল অন্য ! এইজন্য তিনি কৌশল করে রামানন্দকে দিয়েই কবীরকে দীক্ষা দেওয়া করিয়েছিলেন !
ঘটনাটা ঘটেছিল কি__একদিন ভোরের আলো-আঁধারিতে কবীর গঙ্গার ঘাটের সিঁড়িতে শুয়েছিলেন। রামানন্দ স্বামী প্রতিদিনের ন্যায় সেদিনও গেছিলেন গঙ্গাস্নানে, অজান্তে কবীরের গায়ে পা পড়তেই উনি বলে ওঠেন “রাম কহো”! কবীর ঘুম থেকে জেগে উঠেই দেখে যে, স্বয়ং রামানন্দ ওনাকে এই কথা বলছেন ! ব্যস্, কবীর আর কোনো কথাই জিজ্ঞাসা করেননি, তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস হয়ে গেল যে, তিনি মন্ত্র পেয়ে গিয়েছেন ! আর সেই মন্ত্র হোলো “রাম”- নাম জপ ! এরপর উনি সোজা ফিরে গেলেন নিজের গৃহে। ওনারা ছিলেন জোলা সম্প্রদায়ের, ওদের সম্প্রদায়ের প্রায় সকলেই তাঁত বুনতো। তাঁত বুনেই ওদের জীবিকা নির্বাহ হোতো। কবীর সারা দিন-রাত তাঁত বোনেন আর মুখে সদা-সর্বদা “রাম কহো”, “রাম কহো” অর্থাৎ “রামনাম” জপ করতেন ।
দ্যাখো, কবীরের মনে কোনো সংশয় হয়নি, কোনো সন্দেহ দানা বাঁধেনি ! কখনোই তাঁর মনে হয়নি যে, “রাম-নাম” জপে-ই তার মুক্তি হবে কি না –এতেই তাঁর সিদ্ধিলাভ হবে কি না– ইত্যাদি ?
এইগুলি থাকলে আর কি আর বোধ হয় ? সংশয়-সন্দেহ থাকা মানে তো সদ্গুরু সম্বন্ধে ধারণাই তৈরি হোলো না – ‘বোধ’ আরও অনেক দুরের কথা ! যাইহোক, যা বলছিলাম__ঐ তাঁত বুনতে বুনতেই কবীরের রাম-দর্শন বা ইষ্টলাভ হয়েছিল। এরজন্য তাঁকে হেঁটমুন্ড-ঊর্দ্ধপদে’ তপস্যা করতে হয় নি !
আমি যখন ছোটবেলায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছিলাম – আমার অন্তর্জগতের শক্তি-ই মাতৃরূপে আমায় নানা নির্দেশ দিতেন, আমি শুধু সেগুলিই পালন করতাম ! আমার কিন্তু কখনও কোনো সংশয় হয়নি – এগুলো করাটা ঠিক না বেঠিক। এটা করবো না ওটা ! যখন যেমন অন্তর্জগৎ থেকে প্রেরণা পেয়েছি – তখন সেইটাই ঠিক ঠিক পালন করতাম ! পরবর্তীতে হিমালয়ে ঘুরে বেড়ানোর সময় বিভিন্ন মহাত্মাদের কাছ থেকেও নানান উপদেশ এবং নির্দেশ পেতাম – সেগুলোও বিনা দ্বিধায় পালন করতাম ৷ এই সব করতে করতেই আমার সাধনার বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম হয়ে গেছিলো। হিমালয়ের বিভিন্ন অঞ্চলে হয়তো কোনো যোগী আমাকে বলতো – “বালক তুমি এমনটা করো – অমনটা করো” ! আমি তাঁদেরকে জিজ্ঞাসা করতাম – ওইসব করলে কি হয় ? ওনারা বলতেন – “এইসব ক্রিয়া অভ্যাস করলে এটা হয় – সেটা হয় !” সব শুনে আমি বলতাম –”ওগুলো তো আমার এমনিতেই হয়, তার জন্য আবার বিশেষ ক্রিয়া করার কি প্রয়োজন !” আমার কথা শুনে ওনাদের কেউ কেউ অবাক হোতেন ! আমি দেখতাম আমার যে ‘অসংশয় ভাব’– এটাই আমাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো। সেই জন্যই বলছিলাম – সদ্গুরু লাভ সব মানুষের জীবনে হয় না, যদি ঈশ্বর কৃপায় তা লাভ হয় তাহলে কোনোদিকে না তাকিয়ে তাঁর শরণাগত হও। বৃথা উচ্ছ্বাস বা আবেগতাড়িত হয়ে পড়লে অকারণে কালক্ষয় হয়ে যাবে, আর এই সংক্ষিপ্ত জীবনকালে ‘কাজের কাজটি’ আর করার সময় থাকবে না। সুতরাং, গুরুর শরণাগত হয়ে, তিনি যা বলছেন বা যা নির্দেশ দিচ্ছেন তা অসংশয় হয়ে অক্ষরে অক্ষরে পালন করো। কিছুদিনের মধ্যেই ফল ফলতে শুরু করবে ! মহাজন বাক্য কখনও বৃথা হবার নয়।৷
এইভাবেই সদ্গুরুও শিষ্যের জীবনের নানান আগাছা নির্মূল করতে থাকেন। তখন আপাতত ভক্তের মনে হয়__ তিনি কি নিষ্ঠুর ! তারপর যখন তিনি সাধন পথে বাধাস্বরূপ ফেঁকড়িগুলি কাটতে থাকেন তখন তো শিষ্যের জ্বালা-যন্ত্রণা অনুভূত হবে-ই। রহস্যটা বোঝার চেষ্টা করো। আমাদের আশ্রমেই এইরকম উদাহরণ রয়েছে। আমাদের আশ্রমের ব্রহ্মচারী সন্ন্যাসী সত্যানন্দ (শম্ভু মহারাজ)-কে সংসারী হয়ে বিয়ে-থা করতে বলা হয়েছে – কারণ ওর স্বভাবে সংসার ছিল ! চেষ্টা করা হয়েছিল–যাতে ও নিজেকে এই স্বভাব বা সংস্কারের ঊর্দ্ধে তুলতে পারে। কিন্তু ও পারে নি _সংসারে জড়িয়েছে ! গেরুয়া কাপড় খুলে ওর সংসারী হওয়ায় অনেকের মধ্যে অনেক জিজ্ঞাসারও অবতারণা হয়েছিল। আজকে এই আলোচনার মাধ্যমে আমি উত্তর দিয়ে দিলাম।
দ্যাখো, সদ্গুরুর সম্বন্ধে ঠিকঠাক ধারণা হোলে আর কোনো জিজ্ঞাসা থাকে না ! কিন্তু সাধারণ মানুষ সেই ধারণা কোথা থেকে পাবে ? তবে, সদগুরুর শিষ্যদের সঠিক ধারণা থাকা দরকার ! গুরু অনুমতি দিলে তবেই জিজ্ঞাসা, না হলে গুরুর মুখের দিকে শুধু চেয়ে থাকা__ গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক এমনটাই হওয়া উচিত !
উত্তর ভারতে বারাণসীতে থাকতেন কবীর (যিনি অধ্যাত্ম বিষয়ক ‘দোঁহা’ রচনার জন্য বিখ্যাত) ! তিনি নিম্নবর্গের ‘জোলা’ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। যৌবনের প্রারম্ভে যখন তাঁর পূর্বসংস্কার জাগ্রত হোলো, তখন ওনার মধ্যে তীব্র বৈরাগ্য এল এবং উপযুক্ত গুরুর সন্ধানে উনি বারানসীর গঙ্গার তীরে তীরে বিভিন্ন আশ্রমে ঘুরতে লাগলেন। তৎকালীন সময়ে রামানন্দ স্বামী ছিলেন একজন আধ্যাত্মিকভাবে উন্নত অবস্থার সাধু। কবীর সরাসরি ওখানে গিয়ে তাঁকে দীক্ষা দেবার অনুরোধ জানালেন। কবীরকে দেখেই গুরু চিনতে পেরেছিলেন এবং বুঝেছিলেন যে, ইনিই তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরি ! কিন্তু তৎকালীন সামাজিক অনুশাসনের জন্য তিনিও নিম্নবর্ণজাত কবীরকে সকলের সামনে শিষ্য হিসাবে গ্রহণ করতে পারলেন না ! এদিকে ঈশ্বরের ইচ্ছা ছিল অন্য ! এইজন্য তিনি কৌশল করে রামানন্দকে দিয়েই কবীরকে দীক্ষা দেওয়া করিয়েছিলেন !
ঘটনাটা ঘটেছিল কি__একদিন ভোরের আলো-আঁধারিতে কবীর গঙ্গার ঘাটের সিঁড়িতে শুয়েছিলেন। রামানন্দ স্বামী প্রতিদিনের ন্যায় সেদিনও গেছিলেন গঙ্গাস্নানে, অজান্তে কবীরের গায়ে পা পড়তেই উনি বলে ওঠেন “রাম কহো”! কবীর ঘুম থেকে জেগে উঠেই দেখে যে, স্বয়ং রামানন্দ ওনাকে এই কথা বলছেন ! ব্যস্, কবীর আর কোনো কথাই জিজ্ঞাসা করেননি, তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস হয়ে গেল যে, তিনি মন্ত্র পেয়ে গিয়েছেন ! আর সেই মন্ত্র হোলো “রাম”- নাম জপ ! এরপর উনি সোজা ফিরে গেলেন নিজের গৃহে। ওনারা ছিলেন জোলা সম্প্রদায়ের, ওদের সম্প্রদায়ের প্রায় সকলেই তাঁত বুনতো। তাঁত বুনেই ওদের জীবিকা নির্বাহ হোতো। কবীর সারা দিন-রাত তাঁত বোনেন আর মুখে সদা-সর্বদা “রাম কহো”, “রাম কহো” অর্থাৎ “রামনাম” জপ করতেন ।
দ্যাখো, কবীরের মনে কোনো সংশয় হয়নি, কোনো সন্দেহ দানা বাঁধেনি ! কখনোই তাঁর মনে হয়নি যে, “রাম-নাম” জপে-ই তার মুক্তি হবে কি না –এতেই তাঁর সিদ্ধিলাভ হবে কি না– ইত্যাদি ?
এইগুলি থাকলে আর কি আর বোধ হয় ? সংশয়-সন্দেহ থাকা মানে তো সদ্গুরু সম্বন্ধে ধারণাই তৈরি হোলো না – ‘বোধ’ আরও অনেক দুরের কথা ! যাইহোক, যা বলছিলাম__ঐ তাঁত বুনতে বুনতেই কবীরের রাম-দর্শন বা ইষ্টলাভ হয়েছিল। এরজন্য তাঁকে হেঁটমুন্ড-ঊর্দ্ধপদে’ তপস্যা করতে হয় নি !
আমি যখন ছোটবেলায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছিলাম – আমার অন্তর্জগতের শক্তি-ই মাতৃরূপে আমায় নানা নির্দেশ দিতেন, আমি শুধু সেগুলিই পালন করতাম ! আমার কিন্তু কখনও কোনো সংশয় হয়নি – এগুলো করাটা ঠিক না বেঠিক। এটা করবো না ওটা ! যখন যেমন অন্তর্জগৎ থেকে প্রেরণা পেয়েছি – তখন সেইটাই ঠিক ঠিক পালন করতাম ! পরবর্তীতে হিমালয়ে ঘুরে বেড়ানোর সময় বিভিন্ন মহাত্মাদের কাছ থেকেও নানান উপদেশ এবং নির্দেশ পেতাম – সেগুলোও বিনা দ্বিধায় পালন করতাম ৷ এই সব করতে করতেই আমার সাধনার বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম হয়ে গেছিলো। হিমালয়ের বিভিন্ন অঞ্চলে হয়তো কোনো যোগী আমাকে বলতো – “বালক তুমি এমনটা করো – অমনটা করো” ! আমি তাঁদেরকে জিজ্ঞাসা করতাম – ওইসব করলে কি হয় ? ওনারা বলতেন – “এইসব ক্রিয়া অভ্যাস করলে এটা হয় – সেটা হয় !” সব শুনে আমি বলতাম –”ওগুলো তো আমার এমনিতেই হয়, তার জন্য আবার বিশেষ ক্রিয়া করার কি প্রয়োজন !” আমার কথা শুনে ওনাদের কেউ কেউ অবাক হোতেন ! আমি দেখতাম আমার যে ‘অসংশয় ভাব’– এটাই আমাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো। সেই জন্যই বলছিলাম – সদ্গুরু লাভ সব মানুষের জীবনে হয় না, যদি ঈশ্বর কৃপায় তা লাভ হয় তাহলে কোনোদিকে না তাকিয়ে তাঁর শরণাগত হও। বৃথা উচ্ছ্বাস বা আবেগতাড়িত হয়ে পড়লে অকারণে কালক্ষয় হয়ে যাবে, আর এই সংক্ষিপ্ত জীবনকালে ‘কাজের কাজটি’ আর করার সময় থাকবে না। সুতরাং, গুরুর শরণাগত হয়ে, তিনি যা বলছেন বা যা নির্দেশ দিচ্ছেন তা অসংশয় হয়ে অক্ষরে অক্ষরে পালন করো। কিছুদিনের মধ্যেই ফল ফলতে শুরু করবে ! মহাজন বাক্য কখনও বৃথা হবার নয়।৷
