জিজ্ঞাসু :~ আমাদের একজন বন্ধুর এমন দর্শন হয়েছে যে, পৃথিবীর ধ্বংস অনিবার্য, আর সেই ধ্বংসের হাত থেকে বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী কয়েকজনকে মাত্র রক্ষা করবেন – বাকিরা লয়প্রাপ্ত হয়ে যাবে ? – এই দর্শনটি কি সঠিক না স্বপ্নদর্শন ??
গুরুমহারাজ :~ এইসব কথার উত্তরে কি বলি বলোতো ? এগুলো পেটগরম জনিত স্বপ্নদর্শন ছাড়া আর কি-ই বা বলা যায়! দ্যাখো, কোনো মহাপুরুষের নাম নিয়ে কিছু একটা বলা মানেই তো সেটা সত্য নয়। সত্য যা – তা সত্যই ! মহাবিশ্বপ্রকৃতি বা মা জগদম্বাই এই জগৎ নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি হয়তো কোনো কাজ কারো দ্বারা করিয়ে নিলেন – এই আর কি ! বিজয়কৃষ্ণ পরম্পরায় যারা দীক্ষিত তারা হয়তো বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী মহারাজকেই স্বয়ং ঈশ্বর জ্ঞান করে – এটা যে কোনো পরম্পরাতেই হয়, সব পরম্পরার অনুগামীরা তাদের নিজ নিজ আচার্যকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে মনে করে_এটা দোষের নয়।
বিজয়কৃষ্ণ মহারাজ অবশ্য‌ই সিদ্ধ মহাপুরুষ ছিলেন। কিন্তু সিদ্ধ হোলেই সবাই যে জগৎ রক্ষার ‘চাপরাশ’ পাবে, তা কিন্তু নয়। চাপরাশ প্রাপ্তরা আলাদা-তত্ত্ব ! যদি তোমরা বিজয়কৃষ্ণের সমগ্র জীবন পর্যালোচনা করো, তাহলে তোমাদের খানিকটা ধারণা জন্মাতে পারে। বিজয়কৃষ্ণের জীবনে বহুবার বহু বিপদ-আপদ থেকে, তাঁকে নানান মহাত্মা-মহাপুরুষগণ নানাভাবে বাঁচিয়েছেন। প্রথমেই তাকে রক্ষা করলেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস৷ অদ্বৈতের(শ্রীচৈতন্যের পার্ষদ অদ্বৈত আচার্য) বংশের ছেলে, শান্তিপুরে বাড়ী ! ছোটবেলায় ঠাকুর মন্দিরের গোপালের (বালক কৃষ্ণ মূর্তি) সাথে খেলা করতো, খুনসুটি করতো, বাঁশির কাড়াকাড়ি–নুপুর কাড়াকাড়ি করতো। সেই ছেলে বড় হয়ে, লেখাপড়া শিখে কলকাতায় এসে ব্রাহ্মসমাজে যোগদান করলো৷ আর যোগদান করাই শুধু নয়, ব্রাহ্ম হয়ে ধর্ম বিক্রি করে পয়সা রোজগার করতে শুরু করলো।
তখনকার দিনে ব্রাহ্মধর্মের প্রধান পৃষ্ঠপোষক দেবেন্দ্রনাথ, বিজয়কৃষ্ণকে আচার্যপদে বসিয়েছিল এবং মোটা টাকা মাইনে দিতো। ‘অদ্বৈত আচার্যবংশের ছেলে – সেই দেখ কেমন আমাদের হয়ে ব্রাহ্মধর্মের প্রচার করছে, ভাষণ দিচ্ছে ! সে নিরাকারবাদী হয়ে গেছে – তাহলে তোমরা সাধারণ মানুষ তোমরাই বা কেন ব্রাহ্মধর্ম মেনে নেবে না’ ? – এটাই ছিল বার্ত্তা ! এইসব কারণেই অধিক বেতন বা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হোতো বিজয়কে !
এই একই strategy-তে দক্ষিণ ভারতের আচার্য শঙ্করের বংশধর E.M.S Nambudaripad-কে কমিউনিস্ট leder বানিয়েছিল বামপন্থীরা। ছাত্রাবস্থা থেকেই ওকে ব্যাপক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তুলে এনেছিল। পরে ওকে সামনে রেখে বা ওকে show করে সাধারণ মানুষকে দলে টেনে এনেছিল। এখনও দেখবে ভারতের দক্ষিণ অংশের অন্য অঞ্চলে না থাকলেও, কেরলে বামপন্থী প্রভাব অক্ষুন্ন রয়েছে !
যাইহোক, বিজয়কৃষ্ণকে এই চরম সংকট থেকে প্রথমে রক্ষা করলেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ। তিনি বিজয়কে ভক্তিরসে সিঞ্চিত করে আবার মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনলেন ৷ তার যে মূল স্বভাব বা বৈশিষ্ট্য সেটি প্রদান করলেন।
ঠাকুরের সাথে দেখা হবার পর থেকেই ধীরে ধীরে বিজয় ব্রাহ্মধর্ম থেকে দূরে সরে যেতে লাগলো এবং পরে আকাশগঙ্গা পাহাড়ে গিয়ে সাধন-ভজন শুরু করলো। ওখানে কুম্ভকরত অবস্থায় একবার পাহাড় থেকে পড়ে যাচ্ছিলো – মণিকূট পাহাড়ে অবস্থানরত এক যোগী পড়ন্ত অবস্থায় বিজয়কে ধরে ফেলেন এবং তার জীবন রক্ষা করেন। হিমালয়ে ঘোরার সময় মণিকূট পাহাড়ের ওই যোগীর সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল – ওনার কাছে ঘটনাটি আমি শুনেছিলাম। আকাশগঙ্গা পাহাড় থেকে মণিকূট পাহাড়ের দূরত্ব অন্তত কুড়ি-পঁচিশ কিলোমিটার বা তারও বেশি। সেই যোগীর কি অসম্ভব যোগৈশ্বর্য্য ভাবো একবার ! তিনি বলেছিলেন – ‘উঁচু থেকে পড়তে থাকা পাখির বাচ্চাকে যেমন তার মা খপ্ করে ধরে ফেলে – ঐ বাচ্ছাকেও তেমনি করে ধরা হয়েছিল’। এছাড়া লোকনাথ বাবা বেশ কয়েকবার বিজয়কে বিভিন্নভাবে বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করেছিলেন।
যাইহোক যা বলছিলাম — দ্যাখো, চাপরাশ পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। আর প্রকৃতপক্ষে জগৎকল্যাণের কাজ করেন চাপরাশপ্রাপ্ত মহাপুরুষেরাই ! বাকি যারা তাঁরা সেই কাজে অংশগ্রহণ করেন – এই মাত্র। এটা যেন একটা মঞ্চস্থ নাটকের মতো (কোনো মহাপুরুষের আগমন), যার মুখ্যচরিত্রে থাকে একজন_ তাকে ঘিরে কয়েকজন বন্ধু-আত্মীয় ইত্যাদিরা। বিপরীতে ভিলেন – তারা আবার দলবদ্ধ ! এইরকমই ব্যাপারটা হয়।
ভগবানের সঙ্গে যারা আসে, তারাও পরবর্তীতে এক একটা unit হিসাবে কাজ করে। ভগবানের স্থুল শরীর অপ্রকট হবার পর, ভগবানের পার্ষদদের শিষ্য-পরম্পরারা তাদেরকেই পৃথক পৃথক ভাবে মুখ্যচরিত্র ভাবতে শুরু করে এবং নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে। এইভাবে এক একটা পরম্পরাতেই দল-উপদল তৈরি হয়ে যায়। ব্যাপারটা বুঝতে পারছো !
অথচ দ্যাখো – ঐ সমস্ত চাপরাশ-প্রাপ্ত মহাপুরুষদের(অথবা ভগবান স্বয়ং যখন আসেন, তাঁর) জীবদ্দশায় কোনোরূপ দলাদলি বা অন্য কোনো অসুবিধা হয় না। বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী ব্রাহ্মসমাজ ত্যাগ করে একবার পরিব্রাজনে বেড়িয়েছিলেন। ফিরে এসে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের সাথে দেখা হোতেই ঠাকুরের জিজ্ঞাসার উত্তরে বলেছিল, “দেখলাম কোথাও এক আনা, দু-আনা, চার আনাও দেখলাম, তবে এখানেই ষোলআনা !” আর একবার ঢাকা শহরের কোনো স্থানে তখন রয়েছে বিজয়কৃষ্ণ। ধ্যান খুব জমেছে, হঠাৎ দেখলো ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ওখানেই তার পাশে বসে। চোখ খুলে দেখে যে, সত্যিই ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ স্বয়ং বসে আছেন! তখন বিজয়কৃষ্ণ হাত দিয়ে ঠাকুরের গা টিপেটুপে দেখেছিলো, ঘটনাটা সত্যি না স্বপ্ন ! পরে দক্ষিণেশ্বরে এসে কথাটা ঠাকুরকে যখন বলেছিলো_ তখন ঠাকুরের সে কি আনন্দ!
তাহলে বুঝতে পারছো তো, কি বলতে চাইছি ! ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ হোলেন যুগপুরুষ, যুগাবতার। সেই সময় বাকি যে সমস্ত মহাপুরুষরা শরীর নিয়েছিলেন – তাঁরা সকলেই ছিলেন তাঁর সহযোগী। যখনই ভগবান শরীর নিয়ে আসেন, তখনই এইরকমই এক ঝাঁক শক্তিশালী মহাপুরুষরা তাঁর আশেপাশেই থাকেন। সবাইকে যে তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংঘে যোগ দিতে হয় বা তাঁর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হয়, তা কিন্তু মোটেই নয়!
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ যখন শরীরে ছিলেন __তখন তারাপীঠে বামদেব, কাশীতে ত্রৈলঙ্গস্বামী, পূর্ব ভারতে লোকনাথ বাবা এনারাও লীলা করছিলেন। এঁরা সবাই খুবই উন্নত মহাপুরুষ, এঁরাও ছিলেন শিবাবতার৷ কিন্তু ‘যুগপুরুষ’ একজনই। কালাকালের কর্তা যে তিনি–তাই জীবজগৎ সহ সমগ্র সংসারকে শুধু রক্ষা করাই নয়, সমস্ত কিছুর ভার‌ও তাঁর ! বাকিরা সকলেই থাকেন সহযোগী হিসেবে।৷