জিজ্ঞাসু :~ আজকাল তো দেখা যাচ্ছে যে অসৎ লোকেরাই সুখে-শান্তিতে আছে আর সৎ লোকেরা পড়ে পড়ে মার খাচ্ছে –
এটাকে কি বলা যাবে ? তাহলে ‘সত্যের জয় হয়’ – এই কথাটা কি ঠিক নয় ?
গুরুমহারাজ :~ ‘সৎ’ এবং ‘অসৎ’ কথা দুটি ব্যবহার করলেন আপনি ! কিন্তু এই দুটি শব্দের প্রকৃত অর্থ কি আপনি জানেন ? নিশ্চয়ই জানেন না। ‘সৎ’- অর্থাৎ যা আছে, থাকবে অর্থাৎ যা অপরিবর্তনীয়, নিত্য, শ্বাশ্বত ! ‘অসৎ’ – অর্থে যা প্রকৃতপক্ষে নাই, অথচ তাকেই আছে– বলে প্রতীয়মান হোচ্ছে। যেমন মরুভূমির মরীচিকা। সেখানে কোনো জলাশয় নাই অথচ আছে বলে প্রতীয়মান হয়ে থাকে। এবারে পথিক যদি তৃষ্ণার্ত হয়, সে জলাশয় খুঁজবেই, তাছাড়া মরুভূমির বুকে জলাশয় পাওয়া তো __হাতে স্বর্গ পাওয়ার মতো। তাই পথিক পাগলের মতো ছুটে যায় এবং মরীচিকা তাকে বিভ্রান্ত করে !
দ্যাখো, এখানে তৃষ্ণা সত্য কিন্তু মরীচিকা সত্য নয়। ওটা মায়া, জল আছে বলে মনে হোচ্ছে কিন্তু ওটা জলাশয় নয়।
জিজ্ঞাসু :~ যদি আর একটু ভালো করে বুঝিয়ে বলেন –
গুরুমহারাজ :~ হ্যাঁ, বলছি ! যেমন ধরুন, আমাদের দেহ বা শরীর__এটিতো পরিবর্তনশীল। এখন যেমন শৈশব,বাল্য, কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের দেহ বা শরীর৷ এই শরীরটা তো কৈশোরে এমনটি ছিল না, আবার কৈশোরে যেমন ছিল বাল্যে সেইরকমটি ছিল না ! আবার শৈশবের শরীর অন্যরকম ছিল। আবার এই দেহটিই প্রৌঢ়ত্বে বা বার্ধক্যে আরও বদলে যাবে ! সুতরাং এটা তো বোঝা গেল যে, দেহ বা শরীর পরিবর্তনশীল। কিন্তু প্রতিটি মানুষের ভাবনায় যে “আমি অমুক” এই ভাব রয়েছে__ সেই “আমি”-টি কে ? দেহটা তো “আমি” নই, বরং বলা হয় ‘আমার দেহ’। ঠিক তেমনি__মন ও “আমি” ন‌ই, আমার মন। আবার দেখুন__ আমার বুদ্ধি, ভাল-মন্দের বিচারবোধ এ সবই আমার, কিন্তু “আমি” ওই সব নই, “আমি” বুদ্ধি নই। এইভাবে আমার অন্তঃকরণ – “আমি” অন্তঃকরণ নই। তাহলে “আমি” কে ? Who am I ? এই যে বিচারের ক্রম-টা বলছিলাম, এটাই way of discrimination ! এইভাবে নেতি নেতি করতে করতে একেবারে মূলে পৌঁছানো যায় এবং “আমি” কে, তার বোধ হয়।
আমার কথাগুলো কি বুঝতে পারলেন – না পারলে বলুন, বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করছি।
জিজ্ঞাসু :~ হ্যাঁ, বুঝতে একটু অসুবিধা হচ্ছে, ধারণা হলো কিন্তু ঠিক concreat ধারণা হলো না ?
গুরুমহারাজ :~ আপনি কিন্তু আবার ভুল শব্দ প্রয়োগ করলেন। আপনাকে তত্ত্বের ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিলো, কিন্তু ‘তত্ত্ব’ কি কোনো পদার্থ নাকি___ যে concreate শব্দ ব্যবহার হবে ? আমি শুধু আপনাকে এই ব্যাপারে ধারণাই দিতে পারি, বোধ তো আপনাকে নিজেকেই করতে হবে। এই দেওয়ালটাকে দেখুন – দেখে কি মনে হচ্ছে – solid তো ! কিন্তু যদি x-ray লেন্সের সাহায্যে দেখেন, তাহলে কি দেখবেন –সব ফাঁক ফাঁক মনে হবে, অর্থাৎ তখন দেখবেন দেওয়ালটি অতোটা solid নয়। এবার যদি শক্তিশালী কোনো electronic microscopic-লেন্স ব্যবহার করেন, তাহলে দেখবেন শুধু-ই particle-এর movement I
তাহলে কি দেখা গেল_ না, দৃষ্টির dimension পাল্টালে বস্তুর চেহারা বদলাচ্ছে। তাহলে এবার জিজ্ঞাসা এসে যাচ্ছে যে, reality-টি কি ? যে বস্তুসমূহ বা জগৎ তোমার আমার সামনে প্রতীয়মান হোচ্ছে, এর স্বরূপটা কি ? বস্তুর যে পাঁচটি অবস্থা solid, liquid, gaseous, plasma ও space – এর মধ্যে কি বস্তুর স্বরূপ রয়েছে__আর থাকলে–কোনটি ? এই যে বলা হোলো দেহ বা শরীরের কথা, এটিকে দেখে আপনি প্রথমে ভাবলেন এটি বোধয় solid, পরে বুঝতে পারলেন dimension পাল্টালেই বস্তুর রূপ পাল্টে পাল্টে যাচ্ছে_তাই না ! আর এইভাবে যদি বিচার করতে করতে আগানো হয়, তাহলে দেখা যাবে বস্তু বলে যা স্থুলচোখে দেখা যাচ্ছে স্বরূপতঃ সেটি solid নয়, সেটি liquid নয়, সেটি gaseous নয়, সেটি plasmic-ও নয়। এইভাবে বিচার করলে দেখা যাবে সবকিছুই এসে আকাশতত্ত্বে বা Space-এ এসে পৌঁছাবে ! বেদেও বলা হয়েছে “গগনসদৃশম্”। চূড়ান্ত বা চরম সীমায় পৌঁছে তবেই প্রকৃত তত্ত্বের বোধ হয় ৷ যা যোগীর কাছে সর্বভূতান্তরাত্মা রূপে প্রকাশিত, জ্ঞানীর জ্ঞানবিচারের শেষে তাই-ই “সর্বং ব্রহ্মময়ং” জগৎ রূপে প্রকাশিত হয়ে থাকে।৷