জিজ্ঞাসু : ~ একটু আগে “কর্তাভজা”কথাটা উল্লেখ করছিলেন , ‘কর্তাভজা’ বলে একটা সম্প্রদায়ও আছে ?
গুরু মহারাজ : ~ হ্যাঁ , তা আছে , ওদের প্রতিষ্ঠাতা আউলচাঁদ গোঁসাই । ওরা বলে তিনি-ই মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য স্বয়ং । এটি ‘নারী নিয়ে সাধন পথ’_ বলে অনেকেই এই মত বা পথকে এড়িয়ে চলতে চান কিন্তু বহু মানুষ এই পথেও সাধনা করেন , এদের মধ্যে অনেক উন্নত সাধকেরাও রয়েছেন । ঘোষপাড়ার সতীমেলায় যদি কখনো যাও, তাহলে লক্ষ লক্ষ এই পরম্পরার ভক্ত দেখতে পাবে । এই মতে যে কাহিনীটা রয়েছে, সেটা হলো এই যে___মহাপ্রভূর অন্তর্ধানের সময়, পুরীর জগন্নাথ ক্ষেত্রের টোটা গোপীনাথের মন্দির থেকে গোরাচাঁদ হারিয়ে যান – লোকজন আর তাঁর কোন সন্ধান পায়নি ৷ সেই গোরাচাঁদ-ই ঘোষপাড়ায় আউল চাঁদের রূপ নিয়ে উদয় হ’ন । এখানে তিনি গৃহীদের জন্য কর্তাভজা সম্প্রদায়ের সূচনা করেন । আর সতীমা বলতে আউল চাঁদের অন্যতম শিষ্য রামশরণ পালের স্ত্রী সরস্বতী দেবীর নাম-ই সতীমা ৷ ‘কর্তা-ভজা’ অর্থাৎ গুরু কে ইষ্ট জ্ঞানে ভজন করা ৷ গুরু-ই সব , গুরুকে সন্তুষ্ট করতে পারলেই ইষ্ট সন্তুষ্ট হবে ৷ এই মতের সাধন পদ্ধতি পরে পরে পরিবর্তিত হয়ে নানা রকম হয়েছে – কিন্তু সাধারণ মানুষের উপর এক সময় এই মতের খুবই প্রভাব ছিল ।
এছাড়া আমি একবার দেখেছিলাম “কালাচাঁদ” সম্প্রদায়ের কিছু সাধককে । এরা ‘করঙ্গ ভোজন’ করে ৷ সবাই মিলে গোল হয়ে বসে নারকেল মালায় (করঙ্গ) পায়খানা-পেচ্ছাব ভালোভাবে মিশিয়ে নিয়ে সরবতের মতো খায় । এইরকমটা করে কেন?_এর ওরা বলে যে, মানুষের সাধনার অন্যতম অন্তরায় হোলো ‘ঘৃনা’! – এতে সেটা দূর হয় ৷
যাইহোক, এইসব সম্প্রদায় বা মতের সাধন পদ্ধতি সম্বন্ধে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন _”বাড়িতে ঢোকার অনেক রাস্তা থাকে, তার মধ্যে পায়খানার দরজা দিয়েও ঢোকা যায় ৷ এরকম ঢুকলে গায়ে দুর্গন্ধ লাগার সম্ভাবনা বেশি ।” তাই ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ এই মত বা পথকে অস্বীকার করেননি আবার তার ভক্তদের এবং followers-দেরকে, এই পথ অবলম্বনও করতে বলেননি । ঠাকুর, যোগেশ্বরী ভৈরবীর guidance-এ যখন সাধন করছিলেন, তখন ভৈরবী-মা ঠাকুরকে বিষ্ঠা গ্রহণের জন্য যখন বলেছিলেন, তখন ঠাকুর প্রথমে ” আমি ওসব পারবো নি বাপু” – বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন ৷ ভৈরবী ছাড়েননি , তিনি জোর খাটিয়ে বা বুঝিয়ে শুনিয়ে রাজি করিয়েছিলেন ৷ ঠাকুর প্রথমে নিজের ‘গু’ মুখে দিয়েছিলেন, পরে একদিন অপরের ‘গু’- ও মুখে দিয়েছিলেন । ভৈরবী মা যখন উলঙ্গ যুবতী নারীর কোলে ঠাকুরকে উলঙ্গ হয়ে বসে সাধনা করার কথা বলেছিলেন__ তখনও ঠাকুর প্রথমটায় অস্বীকার করেন কিন্তু ভৈরবীর জোরাজুরিতে সেটাও তাঁকে কোরতে হয়েছিল । ওই অবস্থায় বসার পরেই ঠাকুরের বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত হয়ে গেছিল ।
দ্যাখো , ঠাকুর পরবর্তীকালে ভক্তদের বলেছিলেন যে , ” আমি ষোল “টাং” করলে তোরা এক “টাং” করবি ৷” আবার বলেছিলেন – “আমি সবকিছু করে নিয়েছি , তোদের অত কষ্ট করতে হবে না ৷” ঠাকুর স্বয়ং করুণাময় ভগবানের রূপ ছিলেন, তাই পরবর্তীদের জন্য কত করুণা করে গেলেন ! তিনি সকলকে সহজ সরল পদ্ধতির সাধন করতে বললেন ৷ আরও পরবর্তীতে স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর পরম্পরার সন্ন্যাসীদেরকে শুধুমাত্র ‘কর্মযোগে’-ই উদ্বুদ্ধ করলেন ! বললেন__সেবা ও সাধনা ৷ আবার সেবাকেই সাধনা হিসেবে নিয়েছে অনেকে ৷ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ , মা সারদা দেবী এবং বীরেশ্বর বিবেকানন্দের চরণে স্মরণ নিয়ে যে কোনো কাজ করা হোক না কেন, তাই সাধনা হয়ে যায় ৷ এইজন্যই তো তাঁকে বলা হয়েছে__যুগপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণ ।৷