জিজ্ঞাসু :– আজকাল ছেলে-মেয়েরা ছোটো থেকেই কেমন যেন অবাধ্য, একগুঁয়ে, স্বার্থপর হয়ে উঠছে। এটা কী যুগপ্রভাব না বাবা-মায়ের ভূমিকা সঠিক পালন হোচ্ছে না ?
গুরুমহারাজ :– ঠিকই বলেছো তুমি –তবে যে কোনো একটা নয়, ঐ দুটিই হোলো প্রধান কারণ। অন্যান্য কারণও হয়তো যথেষ্ট রয়েছে, কিন্তু – এই দুটোই প্রধান। যুগপ্রভাব মানতে হবে ব‌ই কি ! এই যুগটা পদার্থবিজ্ঞান, প্রাণী বিজ্ঞান সহ বিভিন্ন বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির উন্নতির যুগ। দেখছো না_ পৃথিবীটা কেমন দ্রুত electronic media-র কবলে চলে আসছে! এরপরে দেখবে__সব কিছুই globalisation-এর under-এ আসবে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে digitalisation হবে ! খুব শীঘ্রই দেখবে পৃথিবীটা যেন মানুষের হাতের মুঠোয় চলে আসবে, অর্থাৎ হাতের মুঠোয় ছোট্ট একটা যন্ত্রের দ্বারা তুমি পৃথিবীর অনেক রহস্য–বাড়িতে বসেই জানতে পারবে !
সেইজন্যেই এখনকার(এই যুগের) শিশুরা মস্তিষ্কের অনেকটা বেশি বিকাশ নিয়েই জন্মাচ্ছে, এবং তাই তোমার নিজের শিশুকালের অভিজ্ঞতার সাথে__ এখনকার শিশুদের আচরণের পার্থক্যগুলো তোমার চোখে পড়ছে। এটা সবসময়ে বা সবকালেই হয়ে থাকে। এখনকার শিশুরা আবার যখন বৃদ্ধ হবে – ওরাও, তোমার‌ই মতো এমনই কিছু একটা ভাববে।
আর একটা কথা_ তুমি যেটা বললে যে, ‘পিতা-মাতার ভূমিকা’ –এটা একদম সঠিক ! ছেলে-মেয়েদেরকে ঠিকমতো মানুষ করে তোলা__ মানে তো পিতা-মাতার সাধনা! কিন্তু সমাজে সেটা হয় কি ? ছোটো থেকেই ছেলে-মেয়ের brain-cell-এর ঠিকমতো বিকাশ এবং endoerine gland-গুলির সামঞ্জস্য বজায় রাখতে গেলে প্রয়োজন হয় মায়ের ‘মমতা’ এবং পিতার ‘স্নেহ’। এখনকার পিতা-মাতারা তো ‘মোহ’-গ্রস্ত, ‘স্নেহ’ কোথায় ? স্নেহের নামে পিতা-মাতারা আদিখ্যেতা দেখায়।
এখন তো ছোটো ছোটো micro-সংসার ! অনেক সময় বৃদ্ধ পিতা-মাতার‌ই স্থান হয় না, এখনকার বেশিরভাগ ছেলের সংসারে। তাহলে তাদের শিশুরা কি হবে !! এইভাবেই এখনকার শিশুদের মনোজগৎ বিকৃত হোচ্ছে, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
শহরাঞ্চলে আমরা যাই তো – দেখি কোয়ার্টার life, স্বামী-স্ত্রীর সংসারে হয়তো একটা মাত্র ছেলে বা একটা মেয়ে –শিশুগুলির টম্যাটো-র মত শরীর !! – তোমরা হাসছো তো ! কিন্তু ওদেরকে দেখে আমার করুণা হয়৷ তবু ঐসব মায়েরা আমাকে কাছে পেয়ে, প্রায়শঃই complain করে থাকে__ ” জানেন তো বাবা ! আমার ছেলেটা/মেয়েটা কিছু খেতে চায় না !”– দ্যাখো দেখি ! না খেয়ে ছেলেটার/মেয়েটার ঐরকম টম্যাটো-র মতো চেহারা হয়েছে ? খায় না তো বেঁচে রয়েছে কি করে ? এইগুলোকেই ‘আদিখ্যেতা’ বলছিলাম !
এখন শহরাঞ্চলে ঐ ধরণের পরিবারের স্ত্রী-দের গর্ভকালীন অবস্থা থেকেই গর্ভস্থ সন্তানের পুষ্টির জন্য মা-কে নানারকম প্রোটিন বা ভিটামিন জাতীয় ইনজেকশন দেওয়া হোচ্ছে ! তারপর সন্তান ভূমিষ্ঠ হোতে না হোতেই tinned food আর packed food, আরো একটু পরে fast food ! এতে মানব-শিশুদের শরীরের original বাঁধনটাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে আর ঐ এক ধরনের থলথলে ‘কুমড়োপটাশ’ চেহারা হোচ্ছে !
অপরপক্ষে, গ্রামের ছেলেমেয়েদের দিকে তাকিয়ে দ্যাখো, তাদের চেহারা পাতলা হোলে কি হবে – তারা জীবনীশক্তিতে ভরপুর !! তুলনামূলক বিচারে_ শহরের টম্যাটো-মার্কা চেহারাবিশিষ্ট শিশুদের জীবনীশক্তি এদের তুলনায় অনেক কম। আমার এই কথাটার সত্যতা বোঝা যাবে, যদি কোনো মহামারী অর্থাৎ epidemic বা এই ধরনের কিছু একটা হয় ! এইরকম হোলে__ গ্রামের ছেলেমেয়েরা survive করবে কিন্তু শহরের ছেলেগুলো পারবে না ! সহজেই রোগগ্রস্ত হয়ে পড়বে।
দ্যাখো, কোনো পরিবারে সুসন্তান হবার পিছনে অন্যতম শর্ত হোচ্ছে পিতা-মাতার জীবনের সংযম ও ত্যাগ ! ছেলে বা মেয়ে যদি ছোটবেলা থেকেই তার মানুষ হয়ে ওঠার পেছনে পিতা-মাতার ত্যাগ, সংযম ইত্যাদি দেখে__ তাহলে সেটা তার মনোজগতে গভীর ছাপ ফেলে। পরবর্তীতে ওই শিশুটি যত বড়-ই হোক না কেন__ পিতা-মাতার ঐ ত্যাগের কথা কখনোই ভোলে না বা ভুলতে পারেনা ! তাই সেই সব শিশু বড় বয়সে বৃদ্ধ পিতামাতার প্রতি কর্তব্য পরায়ন থাকে৷ কিন্তু পিতামাতার কর্তব্যে অবহেলা থাকলে, সন্তানের বড় হয়ে ওঠার পিছনে তাদের sacrifice না থাকলে__ সেই সন্তান শ্রদ্ধাশীল হবেই বা কেন ?
সাধারণত দেখা যায়__পিতার কাছ থেকে সন্তানেরা ‘personality’ বা ‘ব্যক্তিত্ব’ এই গুন লাভ করে থাকে ৷ সেইজন্য অনেক সময়ে দেখা যায়__ পিতৃহীন বালকেরা personality-হীন হয়ে যায় (ব্যতিক্রম নিশ্চয়ই আছে, কারণ গুরু মহারাজ বলেছিলেন_সব জিনিসেরই ব্যতিক্রম রয়েছে!)। তবে ঐ শিশুটি ছোটবেলাতেই যদি উপযুক্ত শিক্ষক বা আচার্যের সান্নিধ্যে আসে বা পরে তাদের সদগুরু লাভ হয় – তাহলে তাদের জীবনের বিকাশ লাভে কোনো অসুবিধা হয় না।
শিশু অবস্থায় কোনো সন্তানের মা মারা গেলে, শিশুটির পরিবারের প্রতি, সমাজের প্রতি অশ্রদ্ধাশীল হয়ে ওঠার সম্ভাবনা বেশি থাকে। মায়ের মমতা থেকে বঞ্চিত হয়ে মনোজগতে যে কুসুমকোমল দিকটি আছে__ সেটি শুকিয়ে যায়। এরপর যদি ওই সন্তানের পিতা পুনরায় বিবাহ করে__ তাহলে ওই কুসুমকোমল স্থানটিই বিকৃত হয়ে একটা বিশ্রী রূপ প্রাপ্ত হয়। সমাজে যত ক্রিমিনাল রয়েছে, বিকৃতকামী মানুষ রয়েছে, তাদের ছোটবেলা এইরকমই অবহেলা বা অবজ্ঞার মধ্যে কেটেছে, যে কোনো কারণে তারা পিতার স্নেহ এবং মায়ের মমতা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।– এগুলো অপরাধ বিজ্ঞানের বিষয় – এ ব্যাপারে যারা বিশেষজ্ঞ তারা এসব জানে !
আমি এই যে এখানে অনাথ আশ্রম করেছি – আমারও একটা অন্যতম উদ্দেশ্য হোলো এই যে, এখানে যেসব ছেলেরা মানুষ হবে তারা যেন পিতা-মাতার কাছ ছাড়া হয়েও এখানে নতুন করে পিতা-মাতাকে খুঁজে পায় !
ব্রহ্মচারী-সন্ন্যাসীদের সাথে ব্রহ্মচারিণীদেরও এই আশ্রমে রাখা হয়েছে। এইটা নিয়ে আমাকে অনেকে নানা কথা বলে, কিন্তু মায়েদেরকে এখানে রাখার অন্যতম একটা উদ্দেশ্য ছিল__ যাতে ব্রহ্মচারিণীরা ঐসব অনাথ, মাতাপিতৃহীন বাচ্চাদের মা-য়ের ভূমিকা পালন করে ! ব্রহ্মচারী-ব্রহ্মচারিণী একসাথে আশ্রমে রাখার ব্যাপারে আমাকে অনেকেই নিষেধ করেছিল – কিন্তু আমি মা-য়ের (জগদম্বা) অনুমতি নিয়ে এই risk-টা নিয়েছি। হয়তো দু-একটা ছোটখাটো incident ঘটে যেতে পারে কিন্তু যুগোপযোগী ধর্মাচরণে নারী-পুরুষ একসঙ্গে কাজ করবে ! এখানে যেটা শুরু করা হোলো_ সেটাই আগামীতে স্বাভাবিক ঘটনা হিসাবে গণ্য হবে ! আমি শুধু সূচনাটা করে দিলাম-এই মাত্র।
দ্যাখো, যে কোনোভাবে একটা অনাথ-আশ্রম তৈরি করে ফেললেই হবেনা – এই সমস্ত ব্যাপারগুলির দিকেও নজর রাখতে হবে ! শুধু তাদের খাওয়া-পরা বা পড়াশোনা নয়, যাতে তার মানবিক গুণগুলির‌ও বিকাশ হয়__ তার চেষ্টা করতে হবে। স্নেহ ও মমতা দিয়ে তাদেরকে মানুষ করতে হবে। নাহলে তো পুরোটাই পন্ডশ্রম-তাই নয় কি !!