জিজ্ঞাসু :– বৈষ্ণব পদাবলীতে যেভাবে রাধাকৃষ্ণের প্রেম বা বিরহের কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে – এর সাথে বাস্তবের কোনো কি সম্পর্ক আছে, না পুরোটাই কল্পনা ?
গুরুমহারাজ :– কল্পনা কেন বলছো ? কল্পনা করতে গেলেও তো কোনো স্থূল বস্তু, ব্যক্তি বা বিষয়ের প্রয়োজন হয় ! কল্পনাকে আশ্রয় করে কি কল্পনা করা যায় ? – যায় না। তাহলে রাধাকৃষ্ণের প্রেম বা বিরহ শুধু কল্পনা কি করে হবে ? যা চিরন্তন, যা শাশ্বত__ সেটাকেই সত্য বলে জানবে !
দ্যাখো, কবে থেকে রাধা-কৃষ্ণের কাহিনী ভারতীয় সমাজে পরম্পরাগতভাবে চলে আসছে__ তার ইয়ত্তা করতে পারবে ? __পারবে না। কই – অন্য কারো নাম নিয়ে তো এই ধরনের কাহিনী এতদিন ধরে সমাজে চলে আসছে না ! আসছে কি ??
বৈষ্ণব মহাজনগণ রাধাকৃষ্ণের প্রেম-কে ‘অকৈতব প্রেম’ বলেছেন, বলেছেন_ লেশমাত্র কাম-বুদ্ধি থাকলে রাধাকৃষ্ণের প্রেম রহস্য বোঝা যায় না ! এটা একদমই সত্যি কথা। সেই অর্থে, এই রহস্য – সাধারণের কাছে রহস্যই থেকে যাবে ! কারণ লেশমাত্র কামনা-বাসনা নেই_এমন মানুষ সমাজে বিরল ! বিরলদের মধ্যে বিরলতম তিনি__ যিনি ওই অবস্থায় পৌঁছাতে পারেন ! আর তিনিই জানেন রাধাকৃষ্ণের প্রকৃত প্রেম-লীলা রহস্য !
আর যেটা বলছিলে বিরহের কথা ! হ্যাঁ, বৈষ্ণব পদাবলীতে অধিকাংশ অধ্যায়ে রাধার বিরহ বর্ণনা রয়েছে। এমনও রয়েছে__যেখানে কৃষ্ণবিরহে রাধা মন খুলে কাঁদতেও পারছেন না ! শাশুড়ি-ননদীর ভয় রয়েছে, যদি চোখের জল দেখে ফেলে – তাহলে কলঙ্কিনী নাম রটে যাবে ! তাই উনুনের জ্বলন্ত কাঠে জল ঢেলে ঢেলে ধোঁয়া করছেন__ যাতে বাড়ির লোকে বুঝতে না পারে, তারা ভাবে যে__ বৌমা-র চোখে-মুখে ধোঁয়া লেগে বোধয় চোখে জল এসেছে ! এইসব নানারকম বর্ণনা রয়েছে। অভিসারিকা রাধা, মানময়ী রাধা ইত্যাদি অনেক রকমের বর্ণনাই রয়েছে।।
কিন্তু এগুলি স্থূল বর্ণনা ! প্রকৃতপক্ষে ভগবানের একনিষ্ঠ ভক্ত-ই ‘রাধা’। যিনি মনপ্রাণ সঁপে ঈশ্বরের আরাধনা করেন তিনিই রাধা। সমাজে থেকে ঈশ্বরের আরাধনা করা সহজ কাজ নয়,– সমাজ, সংসার, আত্মীয়-স্বজন সকলেই তার প্রতিবন্ধক হয়। এইসব প্রতিকূলতা কাটিয়ে সাধককে এগিয়ে চলতে হয় – অভিষ্ট পূরণের লক্ষ্যে ! সাধক বা রাধার ক্রন্দন বহিঃক্রন্দন নয় – অন্তঃক্রন্দন। এটাই প্রকৃত বিরহ বেদনা৷ এই বেদনা অন্তরে অন্তরে পীড়া দেয়, প্রতি রোমকূপে রক্তক্ষরণ হয়, এমনকি_ হৃদপিণ্ড থেকেও রক্তক্ষরণ হয় ! তাই সাধকের প্রথমাবস্থায় বহিঃক্রন্দন, আর শেষের দিকে অন্তঃক্রন্দন !
বৈষ্ণব-পদাবলী অনেকেই লিখেছেন, কিন্তু তাঁরা সবাই তো প্রকৃত অর্থে মহাজন নন, অর্থাৎ তাঁদের সবাই যে উন্নত স্থিতির মানুষ ছিলেন–তা তো নয়। তাই বেশিরভাগ পদাবলীতে দেখা যায় ____যে প্রেম “অধরা-মাধুরী”, তা “অধর-মাধুরী”-তে রূপান্তরিত হয়ে গেছে । সূক্ষ্ম বা সূক্ষাতিসূক্ষ বিষয় যেগুলি শুধু বোধের ব্যাপার – তাও স্থূলরূপ প্রাপ্ত হয়েছে।__বুঝতে পারলে কি__ব্যাপারটা !!
তবে এইটা জেনে রাখবে যে, যার সূক্ষ্মরূপ আছে তার স্থূলরূপও আছে। সুতরাং এটাও অবশ্যই সত্যি যে, বৃন্দাবনে কোনো সময় স্থূলে রাধা ও কৃষ্ণের প্রেমলীলা সংঘটিত হয়েছিল। শ্রীকৃষ্ণ ব্রজগোপীনিদের সাথে যমুনা পুলীনে স্থূলে লীলা করেছিলেন। শাস্ত্রে এইজন্য তিনটি লীলার কথা বলা হয় – স্থূল বৃন্দাবনে, বৈকুন্ঠে আর গোলক বৃন্দাবনে !স্থূল -বৃন্দাবনে মনুষ্য শরীরধারী কৃষ্ণলীলা, বৈকুণ্ঠে লক্ষী-নারায়ন লীলা, আর গোলোক বৃন্দাবনে নিত্যলীলা, যেখানে নিত্যরাস হয়ে চলেছে !
বহু বৈষ্ণব সাধক সাধনার চরমভূমিতে পৌঁছে রাধাকৃষ্ণের নিত্যলীলা বহুকাল থেকে প্রত্যক্ষ করে আসছে এবং যা আজও করা যায়। এইজন্যেই বলা হয়, “নবদ্বীপে নিত্যলীলা করে গোরা রায়, / কেহ কেহ ভাগ্যবানে দেখিবারে পায়।” এখানে ‘নবদ্বীপ’ বলতে নবদ্বার বিশিষ্ট মনুষ্য শরীর কে বোঝানো হয়েছে।।
আর ঐ যে “কেহ কেহ ভাগ্যবান” বলা হয়েছে, এঁরা সাধক বা বলা যায় মহাসাধক। মা মহামায়া কৃপা করে এঁদের সাধনার পথ সুগম করে দিয়েছেন তাই এঁদের ‘ভাগ্যবান’ বলা হয়েছে ! মা প্রসন্ন না হোলে যে__ কেউই সাধন পথে অগ্রসর হোতে পারে না_গোরা রায়ের লীলা দর্শন তো সেখানে দূর-অস্ত !!
গুরুমহারাজ :– কল্পনা কেন বলছো ? কল্পনা করতে গেলেও তো কোনো স্থূল বস্তু, ব্যক্তি বা বিষয়ের প্রয়োজন হয় ! কল্পনাকে আশ্রয় করে কি কল্পনা করা যায় ? – যায় না। তাহলে রাধাকৃষ্ণের প্রেম বা বিরহ শুধু কল্পনা কি করে হবে ? যা চিরন্তন, যা শাশ্বত__ সেটাকেই সত্য বলে জানবে !
দ্যাখো, কবে থেকে রাধা-কৃষ্ণের কাহিনী ভারতীয় সমাজে পরম্পরাগতভাবে চলে আসছে__ তার ইয়ত্তা করতে পারবে ? __পারবে না। কই – অন্য কারো নাম নিয়ে তো এই ধরনের কাহিনী এতদিন ধরে সমাজে চলে আসছে না ! আসছে কি ??
বৈষ্ণব মহাজনগণ রাধাকৃষ্ণের প্রেম-কে ‘অকৈতব প্রেম’ বলেছেন, বলেছেন_ লেশমাত্র কাম-বুদ্ধি থাকলে রাধাকৃষ্ণের প্রেম রহস্য বোঝা যায় না ! এটা একদমই সত্যি কথা। সেই অর্থে, এই রহস্য – সাধারণের কাছে রহস্যই থেকে যাবে ! কারণ লেশমাত্র কামনা-বাসনা নেই_এমন মানুষ সমাজে বিরল ! বিরলদের মধ্যে বিরলতম তিনি__ যিনি ওই অবস্থায় পৌঁছাতে পারেন ! আর তিনিই জানেন রাধাকৃষ্ণের প্রকৃত প্রেম-লীলা রহস্য !
আর যেটা বলছিলে বিরহের কথা ! হ্যাঁ, বৈষ্ণব পদাবলীতে অধিকাংশ অধ্যায়ে রাধার বিরহ বর্ণনা রয়েছে। এমনও রয়েছে__যেখানে কৃষ্ণবিরহে রাধা মন খুলে কাঁদতেও পারছেন না ! শাশুড়ি-ননদীর ভয় রয়েছে, যদি চোখের জল দেখে ফেলে – তাহলে কলঙ্কিনী নাম রটে যাবে ! তাই উনুনের জ্বলন্ত কাঠে জল ঢেলে ঢেলে ধোঁয়া করছেন__ যাতে বাড়ির লোকে বুঝতে না পারে, তারা ভাবে যে__ বৌমা-র চোখে-মুখে ধোঁয়া লেগে বোধয় চোখে জল এসেছে ! এইসব নানারকম বর্ণনা রয়েছে। অভিসারিকা রাধা, মানময়ী রাধা ইত্যাদি অনেক রকমের বর্ণনাই রয়েছে।।
কিন্তু এগুলি স্থূল বর্ণনা ! প্রকৃতপক্ষে ভগবানের একনিষ্ঠ ভক্ত-ই ‘রাধা’। যিনি মনপ্রাণ সঁপে ঈশ্বরের আরাধনা করেন তিনিই রাধা। সমাজে থেকে ঈশ্বরের আরাধনা করা সহজ কাজ নয়,– সমাজ, সংসার, আত্মীয়-স্বজন সকলেই তার প্রতিবন্ধক হয়। এইসব প্রতিকূলতা কাটিয়ে সাধককে এগিয়ে চলতে হয় – অভিষ্ট পূরণের লক্ষ্যে ! সাধক বা রাধার ক্রন্দন বহিঃক্রন্দন নয় – অন্তঃক্রন্দন। এটাই প্রকৃত বিরহ বেদনা৷ এই বেদনা অন্তরে অন্তরে পীড়া দেয়, প্রতি রোমকূপে রক্তক্ষরণ হয়, এমনকি_ হৃদপিণ্ড থেকেও রক্তক্ষরণ হয় ! তাই সাধকের প্রথমাবস্থায় বহিঃক্রন্দন, আর শেষের দিকে অন্তঃক্রন্দন !
বৈষ্ণব-পদাবলী অনেকেই লিখেছেন, কিন্তু তাঁরা সবাই তো প্রকৃত অর্থে মহাজন নন, অর্থাৎ তাঁদের সবাই যে উন্নত স্থিতির মানুষ ছিলেন–তা তো নয়। তাই বেশিরভাগ পদাবলীতে দেখা যায় ____যে প্রেম “অধরা-মাধুরী”, তা “অধর-মাধুরী”-তে রূপান্তরিত হয়ে গেছে । সূক্ষ্ম বা সূক্ষাতিসূক্ষ বিষয় যেগুলি শুধু বোধের ব্যাপার – তাও স্থূলরূপ প্রাপ্ত হয়েছে।__বুঝতে পারলে কি__ব্যাপারটা !!
তবে এইটা জেনে রাখবে যে, যার সূক্ষ্মরূপ আছে তার স্থূলরূপও আছে। সুতরাং এটাও অবশ্যই সত্যি যে, বৃন্দাবনে কোনো সময় স্থূলে রাধা ও কৃষ্ণের প্রেমলীলা সংঘটিত হয়েছিল। শ্রীকৃষ্ণ ব্রজগোপীনিদের সাথে যমুনা পুলীনে স্থূলে লীলা করেছিলেন। শাস্ত্রে এইজন্য তিনটি লীলার কথা বলা হয় – স্থূল বৃন্দাবনে, বৈকুন্ঠে আর গোলক বৃন্দাবনে !স্থূল -বৃন্দাবনে মনুষ্য শরীরধারী কৃষ্ণলীলা, বৈকুণ্ঠে লক্ষী-নারায়ন লীলা, আর গোলোক বৃন্দাবনে নিত্যলীলা, যেখানে নিত্যরাস হয়ে চলেছে !
বহু বৈষ্ণব সাধক সাধনার চরমভূমিতে পৌঁছে রাধাকৃষ্ণের নিত্যলীলা বহুকাল থেকে প্রত্যক্ষ করে আসছে এবং যা আজও করা যায়। এইজন্যেই বলা হয়, “নবদ্বীপে নিত্যলীলা করে গোরা রায়, / কেহ কেহ ভাগ্যবানে দেখিবারে পায়।” এখানে ‘নবদ্বীপ’ বলতে নবদ্বার বিশিষ্ট মনুষ্য শরীর কে বোঝানো হয়েছে।।
আর ঐ যে “কেহ কেহ ভাগ্যবান” বলা হয়েছে, এঁরা সাধক বা বলা যায় মহাসাধক। মা মহামায়া কৃপা করে এঁদের সাধনার পথ সুগম করে দিয়েছেন তাই এঁদের ‘ভাগ্যবান’ বলা হয়েছে ! মা প্রসন্ন না হোলে যে__ কেউই সাধন পথে অগ্রসর হোতে পারে না_গোরা রায়ের লীলা দর্শন তো সেখানে দূর-অস্ত !!
