জিজ্ঞাসু :– গঙ্গাজলি যাত্রা বা অন্তর্জলি যাত্রা কি ?
গুরুমহারাজ :– দ্যাখো, সত্যিকথা বলতে গেলে এই রীতির সূত্রপাতটি কোনো মহাত্মা অর্থাৎ কোনো যোগী বা কোনো আধ্যাত্মিক মানুষ, তাঁর নিজের মৃত্যুবরণের ইচ্ছার‌ রূপদান থেকে এসেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ধীরে ধীরে এটি কুপ্রথায় পরিণত হয়েছিল, যা ছিল অসুস্থ-অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের প্রতি বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের অত্যাচারের এক বিভৎস পরিণতি !
ধর্মকে কাজে লাগিয়ে ব্রাহ্মণ্যপ্রথার প্রাধান্যের যুগে কতকগুলি অবিবেকী সংস্কৃত জানা পণ্ডিতের মনোবিকারের প্রকাশ ঘটেছিল সতীদাহ, গঙ্গায় সন্তান বিসর্জন, ছোঁওয়া-ছুঁয়ি বা অস্পৃশ্যতা ইত্যাদি এই ধরনের আরও শত শত কুপ্রথা বা কু-রীতির মাধ্যমে। এগুলো কোনোটিই বৈদিক রীতি নয়। বেদ-উপনিষদে কোথাও এই ধরনের কোনো রীতি, প্রথা বা আচারের উল্লেখ নাই ! স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন স্মৃতিশাস্ত্র তৈরি করে – তাতে এইসব বিধান ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং প্রচার করা হয়েছিল যে এগুলিই শাস্ত্র !
দ্যাখো, কোনো সাত্ত্বিক পরিবার (যে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বেশিরভাগ সত্ত্বগুণ প্রধান) কি কখনোই ওই বাড়ির মরণাপন্ন বৃদ্ধ বা বৃদ্ধাকে বাইরে ফেলে আসবে ? সত্ত্বগুণী সন্তান সবসময় তার বৃদ্ধ পিতা বা মাতার সেবা করবে। রজঃগুণী সন্তান বৃদ্ধ পিতা-মাতার সেবার জন্য লোক (nurse বা চাকর-বাকর) রাখবে। অবশ্য এতে যতোটা বৃদ্ধ পিতা-মাতার সেবা হয়, তার চেয়েও তার status, সামাজিক মান-সম্মান বজায় রাখাটার দায়‌ই বেশি থাকে। কিন্তু কোনো পরিবারের সন্তান বা সন্তানেরা তমোগুণী হয় – তাহলেই হয় পিতা-মাতার বিপদ ! তখন ওই পরিবারে বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা হয়ে ওঠে গলগ্রহ ! এই ধরনের পরিবারের তমোগুনী সদস্যরা অসহায় ঐ বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের খুবই কষ্ট দেয়, নির্যাতন করে। ঐ বাড়ির কোনো বধূ হয়তো বুড়ো বা বুড়িটাকে খেতে দেয় – কিন্তু খুবই অবজ্ঞা, অবহেলাভরে ! একটুও ভালোবাসা দেয় না – সবসময়ই মুখ-ঝামটা দেয়, কুবাক্য বলে ! দ্যাখো – ওই মহিলাই কিন্তু তার সন্তানকে ভালোবাসে, হয়তো স্বামীকেও ভালোবাসে – কিন্তু বাড়ির বৃদ্ধ বা বৃদ্ধাটিকে নয় !
কিন্তু মহিলাটি অন্য কিছু না দিতে পারলেও__ ভালোবাসা তো সে দিতেই পারে – বলো ! কারণ ভালবাসা কাউকে দিলে, এটা কমে না_তবু বেশিরভাগ তমোগুনী ব্যক্তি এটুকুও করতে পারে না।
অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের প্রতি ছেলে-বৌমাদের ঐ ধরণের অমানবিক আচরণ, আমি নিজের চোখে দেখেছি_ তাই তোমাদেরকে detail-এ বলতে পারছি। আমার দেখা একটা ঘটনার কথা তোমাদের বলছি শোনো –
আমি একবার এই বর্ধমান জেলার‌ই এক ভক্তের বাড়িতে, তাদের আমন্ত্রণে ও তৃষান(স্বামী পরমেশ্বরানন্দ)-এর ব্যবস্থাপনায় গিয়েছিলাম। সেই বাড়ির দোতলার যে ঘরটিতে আমাকে থাকতে দিয়েছিল, সেখান থেকে পাশের বাড়িটি স্পষ্ট দেখা যায়। পাশের বাড়ির লোকজনও (এদেরই ভাই-ভায়াদ হবে) বনগ্রাম আশ্রমের‌ই দীক্ষিত[গুরু মহারাজ কখনোই ‘আমার দীক্ষিত’-এই কথাটি বলতেন না, ‘আশ্রমের দীক্ষিত’বলতেন]। দুপুরবেলা খাবার পর আমি rest নেবো ভেবে বাড়ির লোকজন ঘরের দরজা বন্ধ করে চলে গেল – ঘরে আমি তখন একা ! এমন সময় পাশের বাড়ির বৌমাটির গলা শুনতে পেলাম – বৌমাটি তার বৃদ্ধ শশুরকে ভাত দিয়ে বলছে – “গেলো! পিন্ডি গেলো ! অনামুখো বুড়ো__ শুধু বসে বসে গিলছে – মরেও না ! মরলে আমার হাড় জুড়ােয়!” অসহায় – অসুস্থ বৃদ্ধ ফ্যাল-ক্যাল করে বৌমার দিকে চেয়ে রইল – তারপর থালাটা টেনে নিয়ে খেতে শুরু করল !
এই ঘটনাটি আমাকে খুবই ব্যথিত করেছিল ! আমি ঐ বৃদ্ধের যন্ত্রণাটা নিজে নিয়ে নিলাম ! অর্থাৎ সেই মুহূর্তে ওর সাথে আমার “সাযুজ্য” হয়ে গেল –অবশ্য এইরকমটা অনেক সময়েই হয়ে যায় ! যাইহোক, বিকালের দিকে ঐ বাড়ির বৌমা আমার সাথে একা একা দেখা করতে এলো। নিজের ছেলেমেয়েদের নানান সমস্যার কথা, পরিবারের সকলকে নিয়ে তার অশান্তির কথা ইত্যাদি নানা কথা বলতে শুরু করলো এবং কি করলে এর প্রতিবিধান হয়–তাও জানতে চাইলো ৷ এইবার আমি সুযোগ পেয়ে গেলাম, তাই বৌমাটিকে বললাম – ‘বাড়িতে তোমার বৃদ্ধ শ্বশুর রয়েছেন তো ? ওনাকে পিতা জ্ঞান করে সেবা করো ! নাহলে এখন আর কি অশান্তি ভোগ করছো মা – ছেলের বৌ এসে তোমার সমস্ত কর্মের ফল সুদে-আসলে মেটাবে !’ বৌ-টি কি বুঝলো জানিনা – হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। তারপরে আমাকে প্রণাম করে উঠে গেল।
পরে আমি খবর নিয়ে জানতে পেরেছিলাম যে, ঐ মহিলাটির(বৌমা) বৃদ্ধের প্রতি আচার-ব্যবহার ঠিক হয়ে গেছিল এবং ঐ বৃদ্ধ আরও বেশ কয়েক বছর বেঁচে ছিলেন।
দ্যাখো, ঐ মহিলার যদি মনোজগতের পরিবর্তন না ঘটতো – তাহলে অত্যাচারে, মনোকষ্টে ঐ বৃদ্ধটি অচিরেই মারা পড়তো। আর এটাও তো এক প্রকার murder ! ফলে, এর কর্মফল উভয়কেই ভুগতে হোতো। তার থেকে ওরা দুজনেই মুক্ত হোলো।
এবার তোমার কথায় আসি – তুমি যে জিজ্ঞাসা করেছিলে হিন্দুদের অন্তর্জলি যাত্রার কথা। ওটার ব্যাপারটা হোচ্ছে__আগেকার দিনে মৃত্যুপথযাত্রী কোনো বৃদ্ধ বা বৃদ্ধাকে গঙ্গার তীরে নিয়ে যাওয়া হোতো, সেখানে তার পা-দুটো গঙ্গার জলে স্পর্শ করিয়ে রাখা হোতো – আর শরীরের বাকি অংশ থাকত গঙ্গার পাড়ে। এ অবস্থায় অনেকে কয়েক ঘন্টার মধ্যেই মারা যেতো – আবার অনেকে ২/৪ দিন বা আরো বেশি দিন বেঁচে থাকতো। বৃদ্ধ বা বৃদ্ধাটি বেশিদিন বাঁচলে তখন ওই গঙ্গার ধারেই একটা temporary shade বানিয়ে বাড়ির লোকজন সেখানেই ঐ ব্যক্তির মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতো। তারপর ঐ ব্যক্তি মারা গেলে – সেটিকে “সজ্ঞানে গঙ্গাযাত্রা” বলে চালিয়ে দেওয়া হোতো। তখনকার মানুষের ধারণা ছিল – এইরকমভাবে মাথায় গীতা আর পায়ে গঙ্গা ছুঁয়ে মৃত্যু হোলে – সাক্ষাৎ স্বর্গলাভ হয়ে যায়! তাই এই বিশেষ বিধান ।
তবে তোমরা ভেবো না – এই ধরনের কুপ্রথা বা সামাজিক ব্যবস্থা শুধু ভারতেই ছিল ! জাপানে সিন্টো ধর্মে ছিল – বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা একটা পাহাড়ের মাথায় গিয়ে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতো ! সেইজন্যেই বলা হচ্ছিলো যে,এই ধরণের অবস্থা বা ব্যবস্থা অনেক দেশেই ছিল ! দ্যাখো, মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী জেনেও মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায়। প্রকৃতপক্ষে জীবন সত্য, মৃত্যু সত্য, কাল সত্য ! কিন্তু মৃত্যুকে সহজভাবে মানুষ গ্রহণ করতে পারে না৷ মানুষেরা “জন্ম”-কে স্বাগত করে – বাড়িতে নতুন জাতক এলে শাঁখ বাজায়, লোকজনকে নিয়ে আনন্দ করে, কিন্তু বাড়ির কারো মৃত্যু হোলে ব্যথিত হয় — মৃত্যুকে মানুষ সহজভাবে নিতে পারে না। তবে দ্যাখো, ওই যে সমস্ত কু-প্রথাগুলোর কথা বলছিলে – এগুলো সহজতা নয়। সহজভাবে ঘটা মৃত্যুই কাম্য – অসহজতার মধ্যে দিয়ে মৃত্যু কিন্তু কারও কাম্য নয়৷৷