জিজ্ঞাসু :–আচ্ছা গুরু মহারাজ__ ‘মরমিয়া’ বলতে ঠিক কাদেরকে বোঝানো হয় ?
গুরুমহারাজ :– দ্যাখো, সাধারণ মানুষ যে সংজ্ঞাই দিক না কেন_প্রকৃতপক্ষে মহাপুরুষগণ-ই হোলেন মরমিয়া ! জীবনকে আলিঙ্গন করে জীবনের গভীরে যাঁরা ভুব দেন এবং সেখান থেকে জীবনের রহস্য, জগতের রহস্য, ঈশ্বরের রহস্য যাঁরা উন্মোচন করতে পারেন – তাঁরাই মরমিয়া৷
দ্যাখো, মানব সমাজে দুটো কথা রয়েছে__’জীবন’ এবং ‘জীবিকা’ ! সাধারণ মানুষ জীবিকাকে প্রাধান্য দিয়েই তার জীবনটা কাটাতে চায় ! তাই তারা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য-সুবিধা ইত্যাদি ‘ভোগ’ করার জন্য compitition শুরু করে দেয়৷ স্থূলভাবে দেখতে গেলে _পৃথিবীর এই চিত্র‌ই দেখা যায়। আর এটা ঐ জীবিকাকে প্রাধান্য দেওয়া – compitition-এ ব্যস্ত জনগণের দুনিয়া ! কিন্তু এই সমাজেই এমন কিছু মানুষ রয়েছেন _ যাঁরা সাধারণের, সমাজের, দেশের অথবা সমগ্র পৃথিবীর কল্যাণের জন্য _প্রথমে খুব ছোটো আকারে কাজ করতে শুরু করে দেন ! পরে সময়-সুযোগ মতো কাজের পরিধি বাড়ান। আবার অনেকক্ষেত্রে দেখা যায় _ সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কারো কারো এই ধরণের কাজগুলির গুরুত্ব হয়তো হারিয়ে যায় – সমাজজীবনে বা মানবজীবনে আর তার মূল্য-ই থাকে না৷
আবার দ্যাখো, বৈজ্ঞানিকগনের_ মানবকল্যাণের জন্য কতো dedication, সমগ্র জীবন-যৌবন এক করে তাঁরা একটা একটা আবিষ্কার করেন – কিন্তু ব্যবসায়ীরা, যুদ্ধবাজেরা তাঁদের বেশির ভাগ আবিষ্কারকে খারাপ কাজে লাগিয়ে মানবসমাজকে ধ্বংসের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।
বড় বড় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যাদের নাম আধুনিক ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে – তারাও কিন্তু এক একটা সমাজ, জাতি বা দেশের কল্যাণ করতেই চেয়েছে, কিন্তু তা করতে গিয়ে তারাও এই পৃথিবীকে বারবার রক্তস্নাত করেছে ! তাহলে কি বোঝা যাচ্ছে বলো তো _বড় বড় বিজ্ঞানী, বড় বড় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এরা ভালো কাজ করতে গিয়ে মানুষের প্রকৃত মঙ্গল কি করতে পেরেছে ?
একমাত্র ভারতীয় ঋষিগণ‌ই সাধনার গভীরে ঢুকে বহুপূর্বে জগৎ-জীবন ও ঈশ্বর সম্বন্ধীয় সমস্ত রহস্য অধিগত করতে পেরেছিলেন। তাই তাঁরা বলেছিলেন – “নাল্পে সুখমস্তু, ভূমৈব সুখম্”। তাঁরা বুঝেছিলেন যে, সাধারণ মানুষেরা যে পদ্ধতিতে সুখ আর সুবিধার খোঁজ চালাচ্ছে – সেই পদ্ধতিতে শান্তি বা আনন্দ পাওয়া যায় না। ঐসবে সুখ-ভোগ-ঐশ্বর্য-সমৃদ্ধি লাভ হোতে পারে, কিন্তু প্রকৃত আনন্দ বা শান্তি লাভ হয় না । সাধারণ মানুষের কাছে প্রকৃত আনন্দ বা শান্তি যেন সোনার পাথরবাটি!
আমি তো এখন প্রায়ই শহরাঞ্চলের বাড়িগুলোয় যাই – দেখি তো ! ছোট ছোট সংসার। ফ্ল্যাটবাড়িতে হয়তো শুধুই স্বামী, স্ত্রী আর একটা বাচ্ছা ! ছেলেটা ছোটো বয়স থেকেই ৫/৭টা tutor, পড়াশুনার teacher ছাড়াও নাচের টিচার, গানের টিচার ! ঐ অল্পবয়স থেকেই শিশুগুলো ১২-১৪ ঘন্টা পড়াশুনা, আর ঐ সবকিছুতে engaged ! কৃত্রিম আলোয় অধিকক্ষণ পড়াশুনা করে করে _বেশিরভাগ শিশুর চোখে high power- চশমা ! শিশুসন্তানদের ‘জীবন’-কে অগ্রাহ্য করে ‘জীবিকা’-র উপযোগী করে গড়ে তোলার চেষ্টা – আধুনিক কালের শিক্ষিত অভিভাবকদের এ একটা চরম আহাম্মকি !
দ্যাখো, আমি ‘জীবনে’-র পূজারী – কখনোই আমি আমার জীবনে জীবিকাকে প্রাধান্য দিই নি ! তাই তথাকথিত ব‌ই-পড়া বিদ্যার জগতে প্রবেশের চেষ্টাও করিনি। কিন্তু তাতে আমার অসুবিধা তো কিছু হয় নি । সারাজীবন ধরে আমি শুধু জীবনের জয়গান-ই করে চলেছি।
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ কিশোর বয়সেই দাদা রামকুমারকে সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন – “ঐ চাল-কলা বাঁধা বিদ্যার আমার দরকার নাই।” ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব‌ও জীবনের পূজারী ছিলেন – জীবিকাকে প্রাধান্য কেন দেবেন তিনি ! ঠিক ঠিক জীবনের পূজারী যে হোতে পারে – সেই জীবন-ই তো মহাজীবন ! আর জেনে রাখবে যে, একটা মহাজীবনের সংস্পর্শেই শত-শত সাধারণ মানবের জীবনের হয় উত্তরণ ! এই ধরণের মহাজীবনেরাই মরমিয়া !!