স্থান :– পরমানন্দ মিশন ।

কাল :– ১৯৮৫ সাল ৷

উপস্থিত ব্যক্তিগণ :– মিত্র মহাশয়, সচ্চিদানন্দ বাবু, জনৈক ছাত্র ইত্যাদি ।

জিজ্ঞাসু:—- পৌরাণিক বিভিন্ন আখ্যানে, বিশেষতঃ মহাভারতে _এমন অনেক ঘটনা পরিবেশিত হয়েছে, যেগুলি বর্তমানের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গীতে বিচার করলে অর্থহীন, এমনকি অশ্লীল বলেও মনে হয় – এগুলি কিভাবে নেব ?

গুরুজী :—- ঋষিদের উপলব্ধ সত্য _ শ্রুতির(শুনে শুনে) মাধ্যমে গুরুপরম্পরায় বাহিত হতো ৷ ব্যাসদেব প্রথম বেদকে লিপিবদ্ধ করেন – বেদকে ‘ব্যাস’ করেন তাই তাঁর আর এক নাম বেদব্যাস । ‘ব্যাস’ কথার অর্থ বিভাজন করা নয় – ছড়িয়ে দেওয়া । বেদের পর সৃষ্টি হয়েছিল বেদাঙ্গ, দর্শন, স্মৃতিশাস্ত্র পুরাণাদি ও মহাকাব্য সকল ৷ তাহলে বাবা, বুঝতেই পারছ – এক লিটার দুধকে ফুটিয়ে ফুটিয়ে ক্ষীর করা যায়! আবার এক লিটার দুধে দশ লিটার জল মিশিয়েও পরিবেশন করা যায় ! কোন পরিবারের মা বাড়িতে কি করেন – যার পেটে ক্ষীর সহ্য হয় না , তাকে শুধু গরম দুধ বা দুধে ভাতে খেতে দেন । আবার পেট রোগা ছেলেটিকে জল মেশানো দুধ পথ্য হিসাবে গরম করে দেন । তেমনই বেদাদি শাস্ত্র যাদের পক্ষে গ্রহণযোগ্য নয়, তাদের জন্য বেদাঙ্গদর্শনাদি শাস্ত্র, আবার তাও যাদের গ্রহণযোগ্য নয় – তাদের জন্য পুরাণাদি শাস্ত্র অথবা মহাকাব্য। প্রাচীনকালে আর্য ঋষিগণ এই ভাবেই সর্বস্তরের মানুষের জন্য গ্রহণযোগ্য করে রেখেছেন তাঁদের উপলব্ধ সত্যকে খুঁজে পাওয়ার পথ ! এক লিটার দুধে দশ লিটার জল মেশানো হলেই বা কি ? পরিমাণ অল্প হোতেপারে, কিন্তু দুধের গুণ যেমন তাতেও অক্ষুন্ন থাকে – এক্ষেত্রেও সেইরূপ‌ই হয়ে থাকে । কোন একটা খেই ধরে এগিয়ে যাও – ‘চরৈবেতি’ ‘চরৈবেতি’– করতে করতে ঠিক একদিন উপনীত হবে পরম সত্যে ৷ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ জোনাকীর পিছনে সিল্কের সুতাে বেঁধে চূড়ায় ওঠার গল্প বলতেন । এছাড়া ঠাকুর বলতেন পরমহংসের ন্যায় জল ফেলে দুধটা খেতে । অর্থাৎ তিনি শিক্ষা দিয়েছিলেন_ পুরাণাদি শাস্ত্রের অসারটুকু বাদ দিয়ে সারটুকু গ্রহণ করতে ৷ শাস্ত্র পাঠ করে, বিষয়বস্তু বোঝার মধ্যে কোন ভুল থাকলে সদ্গুরুর কাছে সংশোধন করে নিতে হয়, তাহলেই দেখবে সমস্ত সংশয় কেটে যাবে !

তাছাড়া আর একটা কথাও ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন – “বাদশাহী আমলের মুদ্রা নবাবী আমলে চলে না।” ফলে পৌরাণিক আখ্যানে বা দেবদেবীতে তোমার কাজ কি ? তোমরা যুবক – স্বামী বিবেকানন্দকে আদর্শ করো – স্বামীজী থেকে চিন্তা শুরু করো – তাঁর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হও – তাহলেই দেখবে তোমার উন্নতি তরান্বিত হচ্ছে । তোমরা একবিংশ শতাব্দীতে পা দিতে চলেছ,__ পুরাণাদি শাস্ত্র নিয়ে তো পূর্বে পূর্বে বহু আলোচনা-সমালোচনা হয়ে গেছে, এখন ওসব নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি মানে সময়ের অপচয় নয় কি ? এ যুগের উপযোগী চিন্তানায়কদের চিন্তা গ্রহণ করো! স্বামী বিবেকানন্দের ন্যায় মহাপুরুষদের শিক্ষা গ্রহণ করে, জীবনে যোজনা করতে পারলেই অভীষ্ট সিদ্ধ হবে ৷

জিজ্ঞাসু:—- এখন তো দেখি বেশিরভাগ প্রবীণ পণ্ডিত ব্যক্তিরাও ঐ দেব-দেবী বা শুধু পূজা-পাঠ নিয়েই জীবন কাটাচ্ছেন, তাহলে তাঁরা বোকা বা ভ্রান্ত নন কি ?

গুরুজী :— সে কি রে ! কি হীনবুদ্ধি তোর ! তোরা বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগের যুবক, তোদের এইরূপ বুদ্ধি!! শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতিতে চিন্তার ব্যাপকতা ও স্বচ্ছতা আসায় এখন তো তোরা অনেকটা উন্নত ! বিজ্ঞানের উন্নতি – শিক্ষা-দীক্ষার প্রসারে তোরা এখন অনেকটা সংস্কারমুক্ত! স্বামীজীর স্বপ্ন তোদের মধ্যে দিয়ে ধীরে ধীরে বাস্তবায়িত হচ্ছে দেখে আমারও আনন্দ লাগে, কিন্তু তাই বলে তুই কোন প্রবীণ প্রাচীনপন্থীকে ঘৃণা করবি নাকি ?

দীর্ঘকাল যারা একটা সংস্কারকে আঁকড়ে ধরে থাকে, হুট্ করে সেটা ছেড়ে দেওয়া অত্যন্ত কষ্টকর কাজ! রীতিমতো সাধনা না থাকলে তোর মতটা ‘সত্যি’_ জেনেও, তারা তা মানতে পারবে না ৷ পরে অর্থাৎ ‘কালে'(time) হয়তো তা গৃহীত হবে – কিন্তু প্রাচীনপন্থীরা কখনোই কোন নূতনকে সহজে গ্রহণ করতে চাইবে না । বিশ্বের ইতিহাস পর্যালোচনা করে দ্যাখ্ – বার বার এইরূপ ঘটনাই ঘটেছে ! গ্যালিলিও-র চিন্তা বাইবেল বিরোধী হওয়ায় তাঁর উপর কি অত্যাচার ! সত্য হলেও তার মত তৎকালে গৃহীত হ’ল কি ? যীশুর ‘মত’_ প্রাচীন ইহুদীরা গ্রহণ করতে পারলো না বলেই তো crucifixion ! কিন্তু দ্যাখ্ , পরবর্তীকালের মানুষ সত্যকে ঠিকই গ্রহণ করল ! এইভাবে, এখনো তুই যেটা সঠিক ভাবছিস্, প্রাচীনেরা তা ভাবছে না – আবার তোদের এখনকার সংস্কারমুক্ত Modern মতগুলিও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে back-dated হয়ে পড়বে ৷ যুগে যুগে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ধর্ম-বিশ্বাস-চিন্তার পরিবর্তন হয় ৷ এগুলি গতিশীল বলেই তো সবকিছু টিকে আছে ৷ কারন গতিশীলতাই জীবনের লক্ষণ । দ্যাখ্ না – বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন যুগাচার্য্য বা যুগাবতারের আসারই বা তাহলে প্রয়োজন কি ছিল ? __ঠিকভাবে নিয়মগুলি রূপায়িত করার জন্যই তো – তাই নয় কি ? ধর্মকে ছেড়ে জীবন নয় ৷ তাই জীবন প্রবাহে পরিবর্তন আসার সঙ্গে সঙ্গেই যুগোপযোগী ধর্মও ঠিক adjust হয়ে যায় ! কিন্তু এই সব থেকেই সৃষ্টি হয়, প্রাচীনপন্থী ও নবীনপন্থীদের সংঘাত ।

কিন্তু প্রকৃত জ্ঞানীরা এটা দেখে হাসেন _কারণ তাঁরা মহাবিশ্ব প্রকৃতির এই রহস্যটি জানেন । ‘গাদী’ খেলা দেখেছিস ? যখন এক পক্ষ ‘মোর’ হয় তখন তারা অপর পক্ষকে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে বাধা দেয়, আবার এরা যখন ‘মোর’ হয়, তখন তারা আবার আগের পক্ষকে ঘর থেকে বেরোতে যাতে না পারে সেজন্যসচেষ্ট হয়! ধর্ম জগতের এই ব্যাপারটাও সেইরূপ ! তাই আমি সকলকে বলি – জ্ঞানী হও , বিরোধ করো না ! বৈচিত্র থাক, বৈচিত্রের মধ্যেই ঐক্যের তানকে খুঁজে বের করো – এতেই সকল দ্বন্দ্বের সকল সমস্যার অবসান হবে !