একদেশে এক রাজা ছিল ৷ রাজার হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া, লোক-লস্কর, পাইক-বরকন্দাজ, মন্ত্রী-সান্ত্রী-সেনাপতি সবই ছিল ৷ রাজার রাজ্যে কৃষকের ঘরে গোলাভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ ছিল, ফলে প্রজারা সময়ের আগেই রাজার খাজনা মিটিয়ে দিতো – তাই রাজার রাজকোষ সর্বদাই পূর্ণ থাকতো ৷ পাশাপাশি রাজ্যের রাজাদের সাথে এই রাজার সদাই সদ্ভাব ! তাই বহিঃশত্রুর আক্রমণের ভয় ছিল না – এককথায় বলা যায় রাজা-প্রজা সকলেই খুবই সুখে-শান্তিতে বাস কোরতো । কিন্তু এতসব থাকা সত্ত্বেও রাজা-রানীর মনের কোণে একটাই অশান্তির আগুন ধিকিধিকি করে জ্বলতো – কারণ রাজা ছিল নিঃসন্তান ৷ কত দেবস্থানে মানত করা, কত তাবিজ-মাদুলি-কবজ ধারণ করা, কত হেকিম – কবিরাজ – ডাক্তারের ওষুধ গ্রহণ, কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না! একদিন সেই রাজ্যে ঘুরতে ঘুরতে এক সন্ন্যাসীর আগমন ঘটল । সন্ন্যাসী ছিলেন যথার্থ সাধন-সিদ্ধ যোগী পুরুষ । মন্ত্রীমশাই সেই সন্ন্যাসীর সন্ধান পাওয়া মাত্রই একেবারে তাকে সসম্মানে রাজ-অন্তঃপুরে নিয়ে গিয়ে হাজির করল । রাজা সন্ন্যাসীর ব্যাপারে অবগত ছিল, ফলে যত্ন-আত্তির কোন ত্রুটি হোল না ৷ রাজা-রাণীর ভক্তিপূর্ণ সেবায় সন্ন্যাসী খুব খুশী হলেন ৷ যাবার আগে বললেন , ” বলো ! তোমরা কি চাও ! তোমাদের সেবায় আমি খুবই সন্তুষ্ট হয়েছি – তোমরা কি চাও বল , আমি তোমাদের মনোস্কামনা পূর্ণ করব ৷” রাজা-রাণী তাদের অপূর্ণতার কথা অর্থাৎ একটি সন্তান হলেই যে তাদের মনোস্কামনা পূর্ণ হয় – তা জানালো । সন্ন্যাসী ‘তথাস্তু! তবে তাই হোক!’ বলে স্থান ত্যাগ করলেন ।
কিছুদিন পরই সন্ন্যাসীর আর্শীবাণী ফলে গেল ৷ রাণীর শরীরে গর্ভলক্ষন দেখা দিল ৷ রাজার সে কি আনন্দ ! প্রজাদেরও আনন্দের সীমা নাই । বর্ষব্যাপী উৎসবের আয়োজন শুরু হয়ে গেল । দান- ধ্যান, পূজা-পাঠ, হোম-যজ্ঞের সমারোহে রাজ্যের মানুষ মেতে উঠল! সুস্থ সন্তান প্রসবের কামনায় শুধু রাজাই নয় — রাজ্যের সাধারণ মানুষও সামিল হ’ল। এইসব করতে করতেই প্রসবের সময় সমাগত হ’ল। রাজার শখ হোল যে রাণীর সন্তান হবে খোলা আকাশের নীচে নদীর জলের উপর বজরায় (বড় নৌকা)! যাতে সন্তান জন্মগ্রহণের মুহূর্ত্তটি শুধু রাজাই নয়, রাজ্যবাসীরাও নদীর কিনারে দাঁড়িয়ে তা দেখতে পারে _আনন্দ করতে পারে! মন্ত্রী রাজার শখ মেটানোর সমস্ত ব্যবস্থা সম্পন্ন করে ফেলল। দুটো পাশাপাশি সুসজ্জিত বজরা রাখা হোল , একটা রাজার একটা রাণীর। রাণীর বজরায় কবিরাজ মশাই রা, নার্স, দাসী এবং সান্ত্রীরা থাকল অার রাজার বজরায় সভাসদবৃন্দ, মন্ত্রী, সেনাপতিরা থাকল – সঙ্গে থাকল গান-বাজনা, খানা-পিনার বন্দোবস্ত! মন্ত্রীর নির্দেশে নগরকোটাল রাজ্যে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে দিয়েছে, ফলে নদীর দুই কিনারে কাতারে কাতারে লোক জমে গেল, কারন সকলেই রাণীর সন্তান জন্মের মুহূর্ত্তটির সাক্ষ্য হতে চায়!
দুটি বজরা পাশাপাশি ভাসছে । প্রতি ৫/১০ মিনিট অন্তর রাজা খবর নিচ্ছেন – আর কত দেরী ! অবশেষে…. অবশেষে… অবশেষে রাণীর বজরার অভ্যন্তর থেকে ভেসে এল কান্নার আওয়াজ –”ওঁয়া-ওঁয়া-ওঁয়া..! প্রধানা দাসী বেরিয়ে এসে দিল সুসংবাদ ” রাজামশাই ! আপনার পুত্রসন্তান হয়েছে !” আনন্দে, আবেগে রাজামশাই চিৎকার করে উঠল _ “আমার পুত্রকে একবার আমাকে দেখাও ৷” রাজার হুকুম! রাজ কবিরাজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও প্রধানা দাসী সদ্যোজাতকে ন্যাকড়ায় জড়িয়ে রাজাকে দেখানোর জন্য বাইরে আনল! পাশাপাশি দুটো বজরা নদীবক্ষে থাকলে মধ্যিখানে একটু ফাঁক থাকেই – তাই দূর থেকে দেখে রাজার মন ভরছিল না , রাজা বলে উঠল, ” দাও – দাও , আমার পুত্রকে আমার কোলে একবার দাও ! ওকে আমি একবার স্পর্শ্য করে আমার পিতৃজীবন সফল করি !” দাসী রাজাকে তাদের বজরা থেকে হাত বাড়িয়ে অপর বজরায় থাকা রাজাকে যেই না দিতে গেছে – অমনি শিশুটি একটু কিলবিল করে নড়ে ওঠতেই_ রাজার বাড়ানো হাত শিশুটিকে শক্ত করে ধরতে পারল না, আর শিশুটি রাজার হাত থেকে দুটো নৌকার ফাঁকে নদীর জলে পড়ে গেল!!! [ক্রমশঃ]