[ গুরুমহারাজ ব্রহ্মচর্য‍্যের রহস্য বোঝাতে এই ঘটনাটির উত্থাপন করেছিলেন। এর আগের দুটো এপিসোডে আমরা দেখেছি বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে সম্রাট অশোক তাঁর পুত্র ও কন্যাকে সিংহলে পাঠিয়েছিলেন। সিংহলের রাজকুমার রাজকন্যা (কিন্তু বর্তমানে ভিক্ষুনী) সংঘমিত্রাকে অকারণে তার ‘রূপের খোঁটা’ দিয়ে তাকে অপমান করে বসল। এরপর…..]
……….. রাজকুমার আবার বলতে লাগল , ” তুমি জানো না – তোমার সাথে আসা বৃদ্ধ জ্ঞানী শ্রমণদের সভায় লোক না হলেও , তোমার সভায় কেন ভিড় উপচে পড়ে ? শুধু তোমার রূপ-যৌবন দেখার জন্য – তোমার পাঠ শোনার জন্য নয় ! যদি আমার কথা বিশ্বাস না হয় , তাহলে তুমি আজ ধর্ম সভায় পাঠ করার সময় উপস্থিত জনগণের দিকে তাকিয়ে দেখবে – তাদের দৃষ্টিতে শুধুই কামনা ঝরে পড়ছে ! তোমার মঞ্চে যাওয়া বা আসার সময় তারা তোমাকে স্পর্শ করতে চায় – আমি তাদের ছোঁয়া থেকে তোমাকে রক্ষা করি ! তুমি অকৃতজ্ঞ – তাই সেসবের মর্যাদা তুমি আমাকে দিতে চাও না ৷”
এইসব কড়া কড়া কথা শুনে সংঘমিত্রা কাঁদতে লাগলো । সে আর রাজকুমারের কথা সহ্য করতে পারছিলো না – তাই স্থান ত্যাগ করে কাঁদতে কাঁদতে ভেতরে চলে গেল ! সেই দিন থেকে রাজকুমারীর শরীর যেন থেকে থেকে কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগলো ! শরীরে যৌবন যে একটা সমস্যা – এই প্রথম রাজকুমারীর অনুভবে আসতে শুরু করল ! সেদিন বৈকালীন ধর্মসভায় রাজকুমারী পাঠ করার জন্য গেল বটে – কিন্তু অন্য দিনের ন্যায় স্বচ্ছন্দবোধ করতে পারছিল না ৷ বৌদ্ধ ভিক্ষুনীর ঢিলেঢালা পোশাক পরা সত্ত্বেও আরো একটা চাদর গায়ে জড়িয়ে গেল ৷ বারবার পিঠের কাপড় ঠিক আছে কিনা – সেই সব দিকে নজর দিতে গিয়ে – সেদিন ত্রিপিটক গ্রন্থের পাঠ তেমন জমলই না ! তাছাড়া রাজকুমারের কথা মনে পড়ায় উপস্থিত শ্রোতৃবর্গের দিকে চোখ মেলে চেয়ে তার মনে হলো সত্যি সত্যিই উপস্থিত জনেদের চোখে-মুখে ভক্তিভাব নাই ! সবাই যেন উদগ্র কামনার দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে রয়েছে ! তার শরীর খারাপ করতে লাগল ! মাঝপথে পাঠ বন্ধ করে সংঘমিত্রা আসর থেকে উঠে পড়ে, তাড়াতাড়ি ফিরে গিয়ে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল ৷
এরপর থেকে সংঘমিত্রা আর ধর্ম সভায় যোগ দিতেই পারলো না ! চোখ বন্ধ করলেই শুধুই তার মানসপটে অসংখ্য মানুষের কামনালোলুপ দৃষ্টি ভেসে উঠছিল ! বন্ধ ঘরের মধ্যেই সে গায়ে আরও কাপড় জড়াতে থাকল এবং একা একা চুপচাপ সেই বন্ধ ঘরে বসে থাকলো !
তার এতদিনের সুসংযত , সুশৃংখল জীবনধারা সম্পূর্ণ পাল্টে গেল ৷ তার ধ্যান-জপ-প্রার্থনা বন্ধ হয়ে গেল , ঠিকমত সময়ে খাওয়া-শোয়া হয় না , কারো সাথে ভালোভাবে মিশতে পারে না – সব সময় বন্ধ ঘরে একা একা থাকতেই ভালোবাসে । ভারত থেকে ওনার সাথে আসা গুরুস্থানীয় বৃদ্ধ শ্রমণেরা নিয়মিত সংঘমিত্রার কাছে এসে, এই অবস্থার কারণ জানতে চাইলেন এবং তাকে নানাভাবে বোঝাতে শুরু করলেন! কিন্তু কিছুতেই কিছু কাজ হলো না ।
সংঘমিত্রা নিজেকে ধীরে ধীরে আরও গুটিয়ে নিল , সব সময় ঘরেই থাকতো , প্রায় কারো সাথে দেখা করত না ৷ সে চিন্তার গভীরে ঢুকে চিন্তা করতে থাকলো – তার কি এমন ত্রুটি ছিল যার জন্য তার জীবনে এমন বিপর্যয় নেমে এলো ! অন্বেষণ করে দেখলো – এই সমস্ত ঘটনার জন্য তার ‘চোখ’-ই দায়ী ! কারণ রাজকুমারের কথায় প্রভাবিত হয়ে সে যদি জনগণের দিকে দৃষ্টিপাত না করতো – তাহলে তো অসংখ্য মানুষের কামনার দৃষ্টি তাকে দেখতে হতো না! তাছাড়া তার মুখমণ্ডলের যে সৌন্দর্য – তারও অন্যতম একটা কারণ ছিল তার ঘন কৃষ্ণ আয়তচক্ষু ! তাই সেই স্থির করল – এই চোখ সে নষ্ট করে দেবে ! যাতে করে জগতের কোন কিছুই আর তাকে দেখতে না হয় এবং জগতের লোকজনও যেন তার দিকে চেয়ে না দেখে। এরপর সূক্ষ্ম শলাকা চোখে ঢুকিয়ে সংঘমিত্রা নিজের চোখ দুটি নষ্ট করে দিল এবং দেশে ফিরে এসে পরবর্তী সারাজীবন অন্ধ হয়ে বুদ্ধের চরণে নিজেকে নিবেদিত করে , সাধন-ভজনে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিল ।
এতদূর পর্যন্ত গল্পটি বলার পর গুরু মহারাজ উপস্থিত সকল কে উদ্দেশ্য করে বললেন – ” দ্যাখো , মেয়েটির জীবন-যাপনে , তার নিজস্ব চিন্তা ভাবনার জগতে তো কোনো ত্রুটি ছিল না ! তার জীবনে সাধন-ভজন ছিল , আহার-বিহারে সংযম ছিল – কিন্তু পারিপার্শ্বিক প্রতিক্রিয়া নব যৌবনবতী সংঘমিত্রার মনোজগতে এতদিনকার সংযমের বাঁধনকে ভাসিয়ে নিয়ে চলে গেল , মনে দূর্বলতার সৃষ্টি হল! এর ফল কি হয়েছিল জানো – পরর্বর্তী শরীরে(পরের জন্মে) ওই মেয়েটিকে দ্বাদশ বর্ষ নগরবধূর জীবন-যাপন করতে হয়েছিল! পরে এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর সংস্পর্শে এসে পুনরায় তার সাধন জীবন শুরু হয় এবং সে ধীরে ধীরে পরিনির্বাণের দিকে এগিয়ে যায় ৷”
এরপর গুরু মহারাজ বললেন – “তাহলে বুঝতে পারছো তো , বাহ্যিক সংযম-নিয়ম , সাধন-ভজন , কৃচ্ছ্বসাধন , ত্যাগ-বৈরাগ্য দিয়েও ঠিক ঠিক ব্রহ্মচর্য হয় না । মনোজগৎ আরও সূক্ষ্ম – সেখানে সামান্য ঘা লাগলেই বাহ্যজগতে তার প্রভাবে বিরাট ঝড় বয়ে যায় ৷ সূক্ষ্ম জগৎ ছাড়াও আছে কারণ জগৎ ! কারণ জগৎ সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম – সেখানে আবার যদি একটু স্পন্দনও হয় – তাহলেই শরীরে টলমল অবস্থা হতে পারে ৷ তাই কারো বাহ্য আচার বা আচরণ দিয়ে কি বুঝবে – অন্তঃসংযম হলে তবে সাধক কিছুটা নিরাপদ হয় ৷ [ক্রমশঃ]