গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দ একবার কথা প্রসঙ্গে বনগ্রাম আশ্রম এ সিটিং-এ গ্রাম বাংলার একটি প্রচলিত মজার গল্প বলেছিলেন – সেই গল্পটি এখানে বলার চেষ্টা করছি ।
একজন গ্রাম্য সহজ সরল বোকাসোকা চাষী তাদের গ্রামের বারোয়ারিতলায় কীর্তন গানে শুনেছিলেন , “ভগবানের ষোল কলা , আর নারী ‘ষোলো’-র উপরে ‘আঠারো’ কলা !” চাষী বাড়ি ফিরে এসে ওর স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করল – ” হ্যাঁরে বউ ! তোদের ‘আঠারো কলা’ – ষোল কলার থেকেও আরো দুটো বেশি কলা – ওই দুটো কলা একটু দেখাবি ?” বউ প্রথমটায় ব্যাপারটা বুঝতে পারছিল না, পরে বুঝে বলল _”আচ্ছা – আচ্ছা ! সময় হলে দেখাবো – এখন যা করছো কর তো !”
এইরকম ভাবে সেই সরল চাষী রোজ রোজ রাতে বউয়ের কাছে এসে আবদার করে , ” এই বউ ! তুই আমার নিজের বউ – তোর তো আমার কাছে কিছুই গোপন নাই – তাহলে ওই দুটো কলা দেখাবি না কেন ? ওটাও দেখিয়ে ফেল্ !”
রোজ রোজ বোকা স্বামীর বায়নাক্কা আর কত সহ্য করে চাষী বউ ! একদিন চাষীর খুব পীড়াপীড়ি দেখে সে সেদিন বলেই ফেলল – ” আচ্ছা – যাও, এত করে যখন বলছ, তাহলে কালই দেখাবো !”
চাষী তো মহাখুশি! মনে মনে ভাবল_সেই রাতে সে মনের সুখে নিদ্রা যেতে পারবে! কারন তার মনের ধুকপুকুনি টা তো দূর হবে! তার বউ এতদিনে যে জিনিসটা গোপনে লুকিয়ে রেখেছিল – তা তো এইবার ওকে দেখাবে !!!!
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে চাষী নিত্যদিনের মতো যথারীতি জমি চাষ করতে চলে গেল । চাষী বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবার পরই, চাষী-বউ করল কি ছেলেকে দিয়ে বাজার থেকে একটা ইলিশ মাছ কিনে নিয়ে এলো ৷ তারপর ছেলেকে দিয়ে বাবার জন্য মাঠে জলখাবার পাঠাবার সময় চাষী বউ ছেলেকে ভালো করে শিখিয়ে দিল যে , ওর বাবা যে জায়গায় লাঙ্গল দিয়ে চাষ করছে – তার খুব কাছেই ওই ইলিশ মাছটি যেন চুপিসারে গিয়ে পুঁতে রাখে ৷ ওর বাবা (সহজ-সরল চাষীটি) যখন জল খাবারের থালা নিয়ে গাছ তলায় খেতে বসবে সেই ফাঁকে যেন ছেলেটি ওই কাজটি সেরে ফেলে ! এতে কি হবে – চাষী কিছু টেরটিও পাবে না – আবার জল খাবার খেয়ে চাষী যেই না বাকি জমিতে লাঙ্গল চালাতে শুরু করবে – অমনি ইলিশ মাছটি উঠে পড়বে !
এইরকম সব ব্যবস্থা করে নিয়ে চাষী-বৌ ইলিশ মাছ রান্নার ঝাল মসলা বাঁটতে বসলো । এদিকে চাষী-বউয়ের চালাক চতুর ছেলেটি মাতৃআজ্ঞা ঠিকঠাক পালন করল! বাপের অজ্ঞাতে ঠিক লাঙ্গলের ডগাতেই ইলিশ মাছটি পুঁতে রেখেছিল ৷ জলখাবার (পান্তা ভাত , কলাই বাঁটা , কাঁচা পেঁয়াজ , কাঁচা লঙ্কা , তেঁতুলের টক) খাওয়া হয়ে গেলে , একটা বিড়ি ধরিয়ে কয়েকটা সুখ টান দিয়ে চাষী উঠে পড়লো বাকি জমিটা লাঙ্গল দেবার জন্য । ছেলেটি বাবার এঁটো বাসন গুলো জড়ো করে একটা গামছায় বেঁধে ওখানেই অপেক্ষা করতে লাগলো ৷ কারণ সে তো ভালো মতোই জানে – এখনি কিছু একটা ঘটনা ঘটতে চলেছে !
ভাবতে না ভাবতেই বাবার ডাক্ – “খোকা – খোকা , ছুটে আয় ! দেখবি আয় জমিতে কি পেয়েছি ! এ যে সে জিনিষ নয় রে_ একেবারে রুপালি ফসল রে ! টাটকা ইলিশ মাছ | এই নে – মাছটা নিয়ে দৌড়ে গিয়ে তোর মাকে দিয়ে আয় ! আমার কতদিনের শখ ছিল – বাজার থেকে গোটা ইলিশ মাছ নিয়ে এসে তোদেরকে খাওয়াবো ! মা কালী – মা দুর্গা আজ আমার সেই সাধ পূরণ করল রে ! যা – যা তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে যা – মাকে গিয়ে বল সরষে-লঙ্কা বেঁটে ভালো করে যেন ইলিশ মাছের ঝাল রান্না করে, আর দুখানা মচমচে করে ‘ভাজা’-ও করতে বলবি !”
মাতৃভক্ত ছেলে অন্তরে হাসতে হাসতে বাসনপত্র সহ মাছটি গামছায় বেঁধে নিয়ে বাড়ি ফিরে গেল ! মা মাছটিকে ধুয়ে বেছে রান্না করে আগেভাগেই ছেলেকে খাইয়ে দিয়ে বিশ্রামে পাঠিয়ে দিল । একটু পরেই কর্মক্লান্ত চাষী এসে হাজির । এসেই গায়ের ধুলো-বালি-কাদা ধুয়ে পরিষ্কার করেই বললো , “অ-বৌ ! আজ এখন আর স্নান করতে যেতে মন চাইছে না , তুই তাড়াতাড়ি ইলিশ মাছের ঝাল দিয়ে এক থালা ভাত আগে বেড়ে দে দেখি , খাবার পরেই নাহয় স্নানটা সারবো !” ইলিশ মাছ খাবার আর তর সইছিল না তার! তাই তাড়াতাড়ি মেঝেতে চাটাই পেতে খেতে বসে গেল ৷ …….. [পরের দিন বাকি অংশ]
(ক্রমশঃ)