[আগের এপিসোডে আমরা দেখেছিলাম পাঁচজন ঋষি সামান্য অপরাধে এক অপ্সরার দ্বারা ‘মর্তে মানুষ রূপে জন্মাতে হবে’ – এই অভিশাপগ্রস্থ হ’ন। তার ফলে স্বর্গরাজ্যে হুলুস্থুল পড়ে গিয়েছিল! কারন অনেককিছুকে এই ঘটনার সাথে জুড়ে _কিভাবে সমস্ত কিছু নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা যায়, তার একটা রূপরেখা ওখানে তৈরি করা হয়েছিল। পাঁচ ঋষি পাঁচটি হাবাগোবা শিশুরূপে জন্ম নিয়ে, দেবগুরু বৃহস্পতির (বর্তমান নাম গুরু পরমানন্দ) কাছে মানুষ হচ্ছিল। এরপরের ঘটনা আজ……. ]
……ওরা সারাদিন শুধু খাই খাই করে, খাবার না পেলে ঐ কান্না _আর খেতে পেলেই ঠান্ডা! কিছুদিনের মধ্যেই এই পাঁচজনের ‘তাগড়াই’ চেহারা হয়ে গেল! ওরা এতো বেশি বেশি খেতে শুরু করল যে _ব্রাহ্মণ(গুরু পরমানন্দ)-ব্রাহ্মণীর পক্ষে এদের আহার্য্য যোগাড় করাই মুস্কিল হয়ে দাঁড়ালো।
গুরু পরমানন্দ তো ব্যাপারটা সবই জানতেন _তাই তাঁর অসুবিধা হোত না, কিন্তু ব্রাহ্মণী এই পাঁচটি জড়দ্গব ছেলের সবসময়ের উৎপাত সহ্য করতে পারতেন না _ফলে মাঝে মাঝেই মেজাজ হারিয়ে ফেলতেন! ফলে তিনি ছেলেগুলিকে বকাবকি, মারধোর সবই করতেন!
কিন্তু তাতে কি হবে! এরা তো শিশুর মতো, একেবারে হাবাগোবা! মারলে-বকলে বসে বসে কাঁদে, তারপর আবার কিছুক্ষণ পরেই খেতে চায়!অনেকদিন ধরে
এইরকমটাই চলছিল _কিন্তু একদিন একটা ঘটনায় ব্যাপারটা চরমে উঠে গেল! ঘটনাটা বলি_!
গুরুদেব তখন বৃদ্ধ হয়েছেন _বাইরের কাজ আর তেমন করতে পারেন না! এদিকে আশ্রমে একটা দুধেল গরুর খুব প্রয়োজন হয়ে পড়ল! নিজেদের জন্য এবং ঠাকুরের ভোগের জন্য প্রত্যহ দুধ লাগে! গুরুদেব গৃহিনীর শত নিষেধ সত্বেও ঐ জোয়ানমদ্দ পাঁচভাইদের হাতে কিছু টাকা দিয়ে হাটে পাঠালেন _একটা দুধেল গরু কেনার জন্য!
গুরুদেব তাদেরকে কাছে বসিয়ে বেশ ভালো করে বুঝিয়ে দিলেন _আগে ওরা তো গুরুর সাথে হাটে গেছে, তাই কি ভাবে হাটে গিয়ে ভালো গরু কিনতে হয়_সে সম্বন্ধে ওদের ধারণা রয়েছে। তবুও উনি ওদেরকে গরু কেনার ব্যাপার-স্যাপার বেশ ভালো করে অনেকক্ষণ ধরে বোঝালেন_যেহেতু ওদের নিজেদের বুদ্ধি খুবই কম, তাই ওরা যেন উপস্থিত ভদ্রপঞ্চজনের মতামত গ্রহণ করে। অর্থাৎ পাঁচজনে যে গরুটাকে ভালো দুধেল গরু হিসাবে বর্ননা ও প্রশংসা করবে _ওরা যেন সেই গরুটি কেনে!!
এই প্রথম কোন একটা বড় কাজের দায়িত্ব পেয়ে ছেলেগুলি তো খুবই খুশি! মা-য়ের (গুরুপত্নী) কাছে পেটপুরে খেয়ে এবং পথে আরো খাবার জন্য আহার্য্য বেঁধে নিয়ে ওরা পাঁচজনে হুমহুম্ করতে করতে রওনা দিল হাটের দিকে!
অনেকটা হেঁটে ওরা প্রায় হাটের কাছে পৌঁছেই গেছে_ এমন সময় ওরা দেখল যে অনেকজন মিলে একটা বড় হৃষ্টপুষ্ট গাইগরুকে একটা বড় বাঁশে বেঁধে রাস্তা থেকে একটু দূরে মাঠের মধ্যে ফেলে দিয়ে এল। তারপর ঐ লোকগুলি বলাবলি করতে লাগল _”গরুটি কি দুধেল গরুই না ছিল! কি ভালো গরু_কত শান্তশিষ্ট আর খুব দুধ দিতো!”
ছেলেগুলি এই কথাগুলো শুনেই পরস্পরের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করে ঐ লোকেদের হাতে গুরুদেবের দেওয়া টাকা গুঁজে দিয়ে, ফেলে দেওয়া মৃত গরুটাকে সবাই মিলে বাঁশে বেঁধে, কাঁধে করে নিয়ে এসে একেবারে ব্রাহ্মণের বাড়ির উঠোনে ‘ধরাস্’ করে ফেলে দিল!
মরা গরু উঠোনে ফেলতে দেখেই ব্রাহ্মণী মরাকান্না জুড়ে দিল_ “আমার এ কি সব্বোনাশ হোল গো! আঁককুড়োর ব্যাটারা আমার টাকা কটা জলান্জলি দিয়ে এসে_ কোথা থেকে একটা মরা গরু নিয়ে এসেছে গো!”
ব্রাহ্মণ বুঝতে পারলেন যে ভুলটা তাঁরই হয়েছে, তাই যাহোক করে গিন্নীকে চুপ করালেন এবং লোক ডেকে গরুটাকে ভাগাড়ে ফেলে আসার ব্যবস্থা করলেন।
ব্রাহ্মণীর কিন্তু রাগ পড়ে নি! উনি পাঁচজনকে নিয়ে গিয়ে একটা ঘরে বন্ধ করে রেখে ঘরটায় শেকল তুলে দিলেন। আর মুখে বললেন_” আজ থেকে তোদের খাওয়া দাওয়া বন্ধ! তিনবেলা তোদের জন্য গাদা গাদা খাবার যোগাড় করতে আমার যে পয়সা নষ্ট হচ্ছে _গরুর দাম উসুল না হওয়া পর্যন্ত আর খাবার পাবি না!!”
ছেলেগুলি শরীরে বিশাল তাগড়াই হোলে কি হবে _বুদ্ধিতে তো শিশুর মতো! তারা বন্ধ ঘরে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলো, আর দমাদ্দম্ দরজায় লাথি ঘুসি মারতে লাগলো। কাঁদছে আর মুখে বলছে_” ওমা! দরজা খুলে দাও না _আমাদের যে বড্ড খিদে লেগেছে!” ব্রাহ্মণীর সেই এক উত্তর _”পয়সা উসুল না হলে খ্যাঁট্ বন্ধ”!
বারবার ব্রাহ্মণী টাকা পয়সার খোঁটা দেওয়ায় _ওদের সবার(পাঁচ ঋষির) মনোজগতে এই প্রথম একটা ভীষণ আঘাত লাগল অর্থাৎ মনোজগতে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হোল! আর তাতেই কিন্তু সেখানে একটা অলৌকিক অঘটন ঘটে গেল! ……. [ক্রমশঃ]