গুরু মহারাজ কথা বলছিলেন মানুষের জীবন ও জগৎ প্রসঙ্গে। উনি বললেন – প্রত্যেক মানুষের মাঝে দেবভাব , মনুষ্যভাব ও অসুরভাব রয়েছে ৷ কোন মানুষ যখন দয়াপ্রবণ , স্নেহশীল , শ্রদ্ধাবান অর্থাৎ মানবিক গুণসম্পন্ন তখন সে মানুষ! যখন তার মধ্যে নিঃস্বার্থ-ভাবে দেবার ভাব দেখা যায় তখন সে দেবতা! আর যখন মানুষের মধ্যে এগুলির কোনটাই থাকে না বরং এসবের বিপরীত ধর্মী ভাব অর্থাৎ ঘৃণা , হিংসা , স্বার্থপরতা , লোভ ইত্যাদি Negative ভাব প্রকাশ পায়, তখন সে অসুর!
প্রতিটি মানুষের মধ্যেই এই তিনটি ভাব রয়েছে কিন্তু যে কোন একটি ভাব প্রধান হয় , ফলে সেই ব্যক্তি সেই স্বভাবের মানুষ হিসাবে পরিচিত হয়!
অতিবড় নিষ্ঠুর ব্যক্তিও যখন তার শিশুসন্তানকে আদর করে , তার আব্দার নীরবে মেনে নেয় তখন ক্ষণিক হলেও তার মধ্যে দেবভাব জেগে ওঠে ৷
সুতরাং ভালো হবার বীজ সবার মধ্যেই রয়েছে। যে কোন মানুষ-ই পারে __সে যে অবস্থায় আছে বা সে যে ভাববিশিষ্ট , সেখান থেকে নিজেকে উন্নীত করতে! যেভাবে রত্নাকর বাল্মীকি হয়েছিলেন _সেই একই ক্রমে যে কোন মানুষ উন্নত হতে পারে। তবে একটাই শর্ত রয়েছে _মানবজীবনে প্রয়োজন শুধু সদ্-গুরুলাভ আর নিষ্ঠাভাবে গুরুনির্দিষ্ট কর্ম পালন!
যাইহোক, সেদিনের আলোচনায় ফিরে আসি! অসুর আর দেবতার স্বভাব এবং আচরণ কিরূপ – সেটা বোঝাতে গিয়ে গুরু মহারাজ একটি পৌরাণিক গল্পের অবতারণা করলেন।
একবার স্বর্গরাজ্যে দেবাসুরে সংগ্রাম চলছিল, কে শ্রেষ্ঠ – এইটা নিয়ে! দেবতারা অসুরদেরকে ডেকে বলল – ” শোন ! এভাবে লড়াই-ঝগড়া করে কোন মীমাংসা হবে না ৷ চলো , আমরা সকলে পিতামহ ব্রহ্মার কাছে যাই , তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন ফলে তিনি জানেন কে বড় , কে ছোট বা কারা শ্রেষ্ঠ- কারা নিকৃষ্ট!
সকলে রাজী হয়ে গেল ব্রহ্মার কাছে যেতে । ব্রহ্মা তো দিব্যদৃষ্টিতে সবই দেখতে পাচ্ছেন – তাই তিনি আগেভাগেই সকলের জন্য রান্না চাপিয়ে খাবার ব্যবস্থা করেছেন – সকলকে আহার্য্য দিয়ে সন্তুষ্ট করতে হবে তো !তাঁর অসুর সন্তানেরা খাবে, তাই এলাহি ব্যবস্থা ! চোব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয়__ কোন প্রকার খাদ্যেরই ত্রুটি নেই ! খাবারের সুগন্ধে চতুর্দিক ‘ম-ম’ করছে! বহুপথ অতিক্রম করে পথশ্রান্ত দেব ও অসুরের দল যখন ব্রহ্মলোকে পৌঁছাল, তখন প্রায় দ্বিপ্রহর ৷ ওখানে পৌঁছেই উভয়দল নিজ নিজ পক্ষ সমর্থন করে পিতামহের কাছে বক্তব্য রাখতে চাইল কিন্তু পিতামহ ব্রহ্মা বললেন – ” বৎস্গণ ! তোমরা পথশ্রমে ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত! আমার এখানে উত্তম আহার্য্য প্রস্তুত – নিশ্চই তোমরা আহার্য্যের সুঘ্রাণ টের পাচ্ছ! তাই আগে আহার্য্য গ্রহণ_ পরে আলোচনা !
যাও , পাশেই মন্দাকিনীর স্বচ্ছ্ব জল বয়ে চলেছে সেখানে স্নান করে এস।”
ক্ষুধার্ত দেবাসুরের দল স্নানে চলে গেল । অসুরেরা ক্ষুধাকাতর বেশী , তারা শারীরিক বল বেশী ব্যবহার করে , মানসিক শক্তিব্যয়ীদের অত বেশী আহার্য্যের প্রয়োজন হয় না । তাই অসুরেরা তাড়াতাড়ি স্নান সেরেই যেখানে খাবার দেবার কথা_ সেখানে এসে হাজির ! দেবতাদের একটু দেরী হচ্ছিল কারণ তারা স্নান সেরে অহ্নিক বা দেবার্চনা করছিল ৷ যাইহোক, দেবতারা যখন সবকিছু সেরে আহার্য্য গ্রহণের স্থানে এসে পৌঁছালো তখন অসুরেরা অধৈর্য্য হয়ে পড়েছে! তাই খুব তাড়াতাড়ি খাবার পরিবেশন হোল আর পাতে সুস্বাদু-সুগন্ধী খাবার পরার সাথে সাথেই অসুরকুল খাবার জন্য রেডি !
কিন্তু অসুরকুল যেই না খাবার মুখে তুলতে যাবে অমনি পিতামহ ব্রহ্মা সকলকে সাবধান করে বলে উঠলেন – “দাঁড়াও ! কেউ নিজের হাতে মুখে খাবার তুলবে না ! যদি ঐভাবে খাও তাহলে তোমাদের মাথা তৎক্ষণাৎ স্কন্ধচ্যূত হয়ে যাবে ।”
– কি কান্ড ! মুখের গ্রাস মুখের সামনে তুলেও নিজের হাতে খেতে পারছে না ! খাদ্যের সুগন্ধে জিভে জল সপ্-সপ্ করছে কিন্তু খাদ্য খাবার উপায় নাই ! অসুরেরা কি আর করে ! এ ওর মুখের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করে, একটু খাবার চটকা চটকি করে রাগে গজগজ্ করতে করতে উঠে চলে গেল ৷ দেবতারা পিতামহের নিষেধাজ্ঞা শুনে প্রথমটায় চুপ করে গেল , তারপর পরস্পরের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে যে যার পাশের ব্যক্তি কে খাওয়াতে শুরু করলো।নিজের হাতে কাউকেই খেতে হোল না!
এইভাবে সকলেই পেট ভরে খাবার খেয়ে তৃপ্তিতে ঢেকুর তুলতে তুলতে উঠে গেল । ব্রহ্মাজী কে আর আলাদা করে বলতে হলো না যে কে শ্রেষ্ঠ !
গুরু মহারাজ গল্পটা বলার পর বললেন – “যে দেয় সেই দেবতা ! পিতৃদেব ভব , মাতৃদেব ভব , আচার্য্যদেব ভব । পিতা-মাতা-আচার্য্য বা গুরু শুধু দেয় তাই তাদের দেবতা বলা হয়েছে ৷ সূর্য , চন্দ্র , বাতাস (পবন) ,জল , অগ্নি এরাও জীবকুলকে নিঃশর্তে সাহায্য করে , পরিষেবা দেয় – তাই তারাও দেবতা ।
কোন কোন পন্ডিত মত দিয়েছে যে অগ্নি , বজ্র, ঝড়, বন্যা ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ কে ভয় পেয়েছে আদিম মানুষ__ তাই ভয়ে তাদেরকে দেবতার আসনে বসিয়ে পুজো করেছে। কিন্তু এই থিওরি ভুল! নিঃস্বার্থভাবে, নিঃশর্তে যে দেয়_ সেই দেবতা বা দেবী । যেসব মহাপুরুষ বা মহীয়সীরা সমাজকে প্রত্যাশাবিহীন ভাবে ভালোবাসা দিয়েছে , মানুষের তথা সমাজের ভালোর জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছে – তাদেরকেই দেব বা দেবী আখ্যা দিয়েছে মানুষ!
এই জন্যই বলা হয় শ্রীচৈতন্যদেব, শ্রীরামকৃষ্ণদেব অথবা সারদাদেবী ইত্যাদি।”
যাইহোক, আলোচ্য গল্পটিতে দেখা গেল অসুরেরা _ স্বার্থপর , নিজের কথাই সবসময় ভাবে , ইন্দ্রিয়পরায়ন , দৈব মানে না – নিজের পুরুষকার কেই সর্বস্ব মনে করে!
অপরপক্ষে দেবতারা অর্থাৎ দেবভাবাপন্ন মানুষেরা নিজের কথা না ভেবে প্রত্যেকেই অপরের কথা ভাবল , অপরের মুখে অন্ন তুলে দিল , এতে সকলেরই কল্যাণ হল এবং কার্য্যসিদ্ধিও হলো । এটাই কর্ম রহস্য ! ‘সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা অপরের তরে’ ৷৷ [ক্রমশঃ]