প্রশ্ন-মানবের জন্মান্তর ব্যাপারটা আমার নিকট খুবই রহস্যময়—এই ‘জন্মান্তর রহস্য’ বিষয়ে আপনি যদি বিস্তারিত আলোচনা করেন, তাহলে এই বিষয়ে আমাদের ধারণা পরিষ্কার হয়।
উত্তর–প্রিয় আত্মন্, ‘জন্মান্তর রহস্য’ সম্বন্ধে বিশদ আলোচনা করছি, তুমি মনোযোগ সহকারে শ্রবণ কর।
প্রিয় আত্মন্, মানুষের মনোজগতে একটা কথা বার বার উদিত হয়-—কথাটা হল—মৃত্যু অর্থাৎ দেহ-বিনাশের সাথে সাথে দেহীও কি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় ? নাকি মৃত্যুর পরেও মানবের কোন অস্তিত্ব থাকে ? আর যদি অস্তিত্ব থাকে, তাহলে দেহ বিনাশের পর দেহিগণ কোথায় যান এবং কি অবস্থায় থাকেন—এই অনাদি জিজ্ঞাসা মানুষের চিরকালের।
সুসভ্য ভারতীয়গণ বহু পূর্বেই এই বিষয়টি নিয়ে অনেক চিন্তা- ভাবনা করেছিলেন। অতঃপর তাঁরা যোগলব্ধ দিব্য অনুভূতি দ্বারা জিজ্ঞাসার সমাধান করে কম্বুকণ্ঠে ঘোষণা করলেন তাঁদের বোধজাত পরম সত্য : তুমি অজড়, অমর, অমৃত, শাশ্বত, সনাতন আত্মা । তোমার বিনাশ নেই—তুমি অবিনশ্বর
এই জড়দেহ নশ্বর, মৃত্যু নামক অবস্থার ভিতর দিয়ে পঞ্চভূতে বিলীন হয়। কিন্তু দেহ বিনাশপ্রাপ্ত হলেও আত্মা অবিনাশী আত্মা নিত্য—শাশ্বত-সনাতন । সচ্চিদানন্দ আত্মা স্বমহিমায় অখণ্ডরূপে বিরাজমান।
প্রিয় আত্মন্ ! জন্ম নামক অবস্থার ভিতর দিয়ে জীবগণ পাঞ্চভৌতিক দেহধারণ করে এবং মৃত্যু নামক অবস্থার ভিতর দিয়ে পাঞ্চভৌতিক দেহত্যাগ করে। সুতরাং আত্মা জন্মায়ও না এবং মরেও না—আত্মা অমৃততত্ত্ব
প্রিয় আত্মন্ ! তুমি নিজে ঐ আত্মতত্ত্ব। ঐ আত্মাকে জান—অমৃতকে বোধ কর। তুমি বিদেহ— তুমি আত্মা। দেহের বিনাশ হলেও তোমার বিনাশ নেই, কেবল ভ্রান্তিবশত নিজেকে দেহ ভাবছ এবং দেহের বিনাশকে নিজের বিনাশ ভেবে শোক এবং ক্লেশভোগ করছ। প্রকৃতপক্ষে তুমি দেহ নও, তুমি সচ্চিদানন্দ আত্মা ।
এই দেহ, প্রাণ, মন, বুদ্ধি – সমস্ত কিছুর তুমিই একমাত্র দ্রষ্টা, তুমি সাক্ষী এবং তুমিই বিজ্ঞাতা। তুমি অজড়—অমর – শাশ্বত —সনাতন আত্মা ।
সুতরাং শোক করো না, নিজেকে জান— স্বমহিমায় মহিমান্বিত হও। এই শাশ্বত বাণী বেদ-উপনিষদের বাণী আর যাঁরা এই বাণী ঘোষণা করলেন—তাঁরাই ঋষি
উপরোক্ত আলোচনায় আমরা বুঝলাম আত্মা বিদেহ এবং সর্বব্যাপক –অখণ্ড আকাশবৎ
জীব-শরীরকে তিনভাগে ভাগ করা হয়, যথাক্রমে স্কুল, সূক্ষ্ম এবং কারণ। পাঞ্চভৌতিক পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়-বিশিষ্ট এই স্থূলদেহ। পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়, পঞ্চ প্রাণ, পঞ্চ তন্মাত্রা, মন ও বুদ্ধিবিশিষ্ট সূক্ষ্মদেহ আর চিত্ত ও অহংকার নিয়ে হয় কারণদেহ । এই কারণ শরীরকে জীবাত্মা বলা হয় । জীবাত্মা যখন জন্মরূপ অবস্থার মধ্যে দিয়ে স্কুল দেহ ধারণ করে, তখন সে কার্যরূপ গ্রহণ করে। আবার জীবাত্মা যখন মৃত্যুরূপ অবস্থার মধ্যে দিয়ে স্থূলদেহ পরিত্যাগ করে, তখন সে কারণরূপ পরিগ্রহ করে ।..
সুতরাং জন্মরূপ অবস্থার মধ্যে দিয়ে জীবাত্মা কার্যরূপ পায় এবং মৃত্যুরূপ অবস্থার মধ্যে দিয়ে জীবাত্মা কারণরূপে যায়।
ভারতীয় ঋষিগণ জীবাত্মার পুনর্জন্ম স্বীকার করেন যা বৈজ্ঞানিক- বোধজাত সত্য। সুতরাং এই বিজ্ঞান, একান্ত আত্মবিজ্ঞান বাঅধ্যাত্মবিজ্ঞান সাপেক্ষ। এই বিজ্ঞানকে জানতে হলে যোগল জ্ঞান আবশ্যক
ঋষিগণ বলেন—চুরাশি লক্ষ ক্রমান্বয়ে ভ্রমণ করে, বিভিন্ন জীবদেহ ধারণ করে জীবাত্মা বিভিন্ন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে অসংখ্য অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে করতে এই দুল ভ মানবদেহ লাভ করেছে। আবার এই মানবদেহেও জন্মান্তর চলতে থাকে। জীবাত্মা স্বভাব অনুযায়ী ভাবানুরূপ বিভিন্ন মানবদেহ ধারণ করে এবং এই মানবজীবনেই সে তার প্রকৃত স্বরূপের বোধ করতে সক্ষম হয় । যতদিন পর্যন্ত আত্ম-স্বরূপের বোধ না হয়, ততদিন সে সংস্কার এবং ভাবানুযায়ী বিভিন্ন মানবদেহ ধারণ করতে থাকে। ক্রমে যখন তার আত্মস্বরূপের বোধ হয়, তখন এই জন্ম-মৃত্যুর আবর্তন হতে মুক্তিলাভ ঘটে এবং সে তার পূর্ব স্বরূপ অখণ্ড সাক্ষীচৈতন্য আকাশব স্ব স্বরূপে অবস্থান করে।
এখন আমরা বুঝলাম – আত্মতত্ত্বের বোধ না হলে পুনর্জন্ম অতিক্রম করা যায় না। যতদিন আত্মবোধ বা আত্মজ্ঞান না হয়, ততদিন তার প্রকৃতি তাকে পুনর্জন্ম নিতে বাধ্য করাবে
প্রশ্ন—কিন্তু অনেক ধর্ম-সম্প্রদায়তো পুনর্জন্ম মানেন না বা স্বীকার করেন না—সেই সম্পর্কে কিছু বলুন না ?
উত্তর—প্রিয় আত্মন্ ! তুমি ঠিকই বলেছ – অনেকেই জন্মান্তর বা পুনর্জন্ম মানেন না। কিছু কিছু মনীষিগণ এরূপ বলে- ছেন যে, মানুষের পুনর্জন্ম হয় না, মৃত্যুর পর তারা মহাপ্রলয়কাল পর্যন্ত অপেক্ষা করে। মহাপ্রলয়কালে ঈশ্বর বিচারের আসনে বসবেন এবং পাপ-পুণ্যের বিচার করবেন, শাস্তি ও পুরস্কারস্বরূপ কাউকে অনন্তকাল নরকযন্ত্রণা এবং কাউকে অনন্তকাল স্বর্গসুখ ভোগ করাবার ব্যবস্থা করবেন। ঐ মনীষিগণ যতদূর কল্পনা করা যায়, ততদূর কল্পনা দ্বারা স্বর্গ ও নরক কল্পনা করেছেন। স্বর্গ মানে যাবতীয় লোভনীয় স্থল ভোগের বর্ণনা এবং নরক মানে যাবতীয় জাগতিক স্থল ভীতিজনক কষ্টের বর্ণনা ।
এখন একটা প্রশ্ন অমাদের মনে জাগে—মহাপ্রলয়ের পূর্ব পর্যন্ত জীবাত্মাগণ কোথায় এবং কিভাবে অবস্থান করে ? আকাশস্থ নিরালম্বভাবে, নাকি বায়ুভূতকে আশ্রয় করে ঘুরে ফিরে বেড়ায় ? অথবা যেখানে দেহকে সমাধি দেওয়া হয়েছিল সেখানে থাকে ? উক্ত মনীষিগণ বলে থাকেন—যে মৃত্তিকায় দেহকে সমাধিস্থ করা হয়েছে, সেই সমাধিকে আশ্রয় করে জীবাত্মারা শায়িত থাকে এবং মহাপ্রলয়কাল পর্যন্ত এদের সমাধিতে অপেক্ষা করে থাকতে হয় । ঈশ্বরদূত এসে এদের পুনরায় জাগ্রত করবেন এবং তারা বিচারপ্রার্থী হবে । ঈশ্বর তাদের পাপ-পুণ্যের বিচার করবেন এবং হিসাব অনুযায়ী কাউকে অনন্ত নরক যন্ত্রণা ও কাউকেও অনন্ত স্বর্গসুখ ভোগ করতে পাঠাবেন।
এখন ভারতীয় ঋষিগণ দ্বারা বোধজাত জীবাত্মার জন্মান্তর রহস্য বা পুনর্জন্ম সম্পর্কে আমরা আলোচনা করব ।
পরমাত্মা বিদেহ, তিনি জড় ও চেতনাসমূহ ব্যাপ্ত করে স্বমহিমায় অথণ্ডরূপে বিরাজমান আছেন। জীবাত্মা ক্রমশ জড়, উদ্ভিদজ, স্বেদজ, অণ্ডজ, জরায়ুজ, বানর, নর ইত্যাদি স্তর অতিক্রম করে থাকে। এভাবে জীবাত্মা অন্নময়, প্রাণময়, মনোময়, বিজ্ঞানময় এবং আনন্দময়—পঞ্চকোষের ক্রমবিকাশরূপ দেহগ্রহণ করতে করতে অবশেষে মানবশরীর প্রাপ্ত হয়ে থাকে । আর মানবশরীরই শ্রেষ্ঠ শরীর । কারণ জীবাত্মা পূর্ব পূর্ব যত শরীর গ্রহণ করেছিল, সেই শরীরে পঞ্চকোষের পূর্ণ অভিব্যক্তি ছিল না, একমাত্র মানব শরীরেই পঞ্চকোষের পূর্ণ অভিব্যক্তি সম্ভব হয় । এই কারণে মানবজন্ম বা মানবদেহকে মহান ও শ্রেষ্ঠ বলা হয়।
প্রিয় আত্মন্ ! মানব নিজের অহংকার, আকাঙ্ক্ষা, কামনা-বাসনার বেষ্টনীর মধ্য হতে আজীবন কর্মজাল বিস্তার করে চলেছে। সেইহেতু মানবের তৃপ্তি এবং অতৃপ্তির বেগ তার ভিতর প্রচণ্ড মমত্ববোধ জাগিয়ে তোলে আর এই মমত্বের আবেশ বা অভিমানবোধ তার সূক্ষ্ম শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সঞ্চারিত থাকে । এজন্য সাধারণ মানব স্বার্থবুদ্ধির বাইরে চিন্তা করতে হোঁচট খায় । মানবের দেহ বিনষ্ট হলেও তার অতৃপ্ত কামনারাশি প্রবল ইচ্ছাশক্তির মাঝে নিজেকে সংগোপনে বাঁচিয়ে রাখে। জীবের এই অন্তর প্রকৃতি বা স্বভাব হতে ইচ্ছাশক্তিরূপ অন্তশক্তিই বাহ্য প্রকৃতিকে পরিবর্তন করে থাকে। সুতরাং বাহ্য প্রকৃতি যা, তা অন্তর । প্রকৃতিরই বহির্বিকাশ মাত্র। এই প্রবল ইচ্ছাশক্তিরূপ অন্তশক্তির প্রবাহকে কোনরূপ বাহ্য বিষয় দ্বারা প্রতিরোধ করা যায় না। শীঘ্রই হোক কিংবা বিলম্বেই হোক কারণরূপ ঐ শক্তি কার্যরূপ ফল প্রসব করবেই করবে, কারণ যতক্ষণ না কারণবীজ বিনষ্ট হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত ও কার্য করবেই। আত্মজ্ঞান দ্বারা ঐ অনাদি কারণকে দগ্ধ করে ফেললে আর কার্য হবার সম্ভাবনা নেই ৷
প্রিয় আত্মন—মানবকে ধর্ম আশ্রয় করতে হবে। ধর্ম হল জীবনের কলা। ধর্ম মানবের সত্তার গভীরতম স্তরে পরিবর্তন ঘটায় এবং জীবনকে রূপান্তরিত করে—মানবকে এক চরম বোধ ও পরম সত্যের সঙ্গে সংযুক্ত করে। আর ঐখানেই আছে জীবনের পরিপূর্ণতা ।
এই প্রবৃত্তি বা বাসনার ক্রিয়াস্থল হল প্রাণ (যা জীবনীশক্তিরূপে কার্য করছে)৷ প্রবৃত্তি বা বাসনা সমস্ত প্রাণিজগৎকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে আর প্রাণিগণের বাসনাই ঐ সংস্কারের মূল। ঐ বাসনার জন্যই প্রাণীকুল জন্ম -মৃত্যুরূপ ( কার্যকারণ ) আবর্তের ভিতর দিয়ে গমনাগমন করছে শরীর, প্রাণ, মন—ইন্দ্রিয়গণের প্রতিটি কর্মপ্রচেষ্ট৷ সূক্ষ্মশরীর-আধারে সঞ্চিত থাকে আর ঐ পুঞ্জীকৃত সংস্কার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে থাকে সংসারের প্রতিটি প্রাণী ৷
সুতরাং সূক্ষ্ম শরীরের সঞ্চিত বাসনারাশিরই বহিপ্রকাশ স্থূলরূপ ক্রিয়মাণ কর্মসকল আর ঐ বাসনার প্রেরণার তাগিদেই সূক্ষ্মশরীর নূতন স্থল জীব-শরীর নির্বাচন করে থাকে । অতৃপ্ত বাসনার পরিপূরণ বা পরিতৃপ্তি না হওয়া পর্যন্ত তাকে তা ভোগ করবার নিমিত্ত বারবার স্থল শরীর ধারণ করতে হয়। বাসনারাশির মধ্যে যে বাসনাগুলি সর্বাপেক্ষা প্রবল, সেই সেই প্রবৃত্তিগুলি তার চরিত্রে ভীষণভাবে প্রকাশ পাবে ।
অতএব বাসনাময় সূক্ষ্ম শরীরের নূতন স্থল শরীর গ্রহণ তার সংস্কাররাশির উপর নির্ভরশীল আর ঐ সংস্কাররাশির মধ্যে প্রবল কামনাগুলিই প্রবৃত্তিরূপে ইচ্ছাশক্তিতে পরিণত হয় । জীবিতকালে ঐ প্রবল বাসনা বা চিন্তাগুলিই স্থুল শরীর ত্যাগ মুহূর্তে শক্তিশালী হয়ে প্রবল বেগে দ্রুত গতিতে অন্তপ্রকৃতিতে (সূক্ষ্ম শরীরে) রূপান্তরিত হয়ে যায় এবং বাসনাময় সূক্ষ্ম শরীরের প্রকৃতিকে বা চরিত্রকে সেইভাবে গঠন করে থাকে । প্রবৃত্তিগুলি তখন ঐ স্বভাবের গভীরে নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে ।
সুতরাং আমরা বুঝতে পারলাম স্থুল চিন্তা বা বাসনাগুলি অন্তপ্রকৃতিতে অর্থাৎ সূক্ষ্ম শরীরে লীন হয় এবং সূক্ষ্ম শরীর কারণ শরীরে প্রলুপ্ত হয় । (স্থল প্রাণিদেহে প্রাণকে অবলম্বন করেই সূক্ষ্মশরীর ক্রিয়াশীল থাকে।) জীব যখন স্বপ্নহীন গাঢ় নিদ্রা অবস্থায় যায়, তখন সূক্ষ্ম শরীর কারণ শরীরে প্রভুপ্ত হয়— যথাক্রমে মনের ইচ্ছা বা প্রবৃত্তিগুলি বুদ্ধিতে এবং বুদ্ধির সংস্কারগুলি অহংকারে এবং অহংকার চিত্ততে প্রসুপ্ত হয় – এটাই স্বপ্নহীন গাঢ় নিদ্ৰা বা সুপ্তি। এই সময় কেবল জীবদেহে প্রাণ ক্রিয়াশীল থাকে, কিন্তু মন, বুদ্ধি, অহংকার চিত্তে প্রসুপ্ত থাকে। পুনরায় জীব যখন জাগ্রত হয়, তখন ক্রমান্বয়ে সমস্ত কিছু আবার ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। যেমন অহংকার বা অভিমান প্রথম জাগ্রত হয় চিত্ত হতে, তারপর অভিমান বুদ্ধিতে ক্রিয়াশীল হয় এবং বুদ্ধির সংস্কারগুলি মনেতে আন্দোলিত হয়ে ইচ্ছা বা প্রবৃত্তিরূপে ক্রিয়াশীল হয়। আর ঐ ইচ্ছা বা প্রবৃত্তিগুলি প্রাণকে অবলম্বন করে স্কুল জীবদেহে কার্যকলাপ করে থাকে ।
এখন নিশ্চয় হওয়া গেল যে, স্থূলদেহে প্রাণকে অবলম্বন করে যখন সূক্ষ্মশরীর ক্রিয়াশীল থাকে, সেই অবস্থাই জীবের জাগ্রত অবস্থা আবার যখন সূক্ষ্ম শরীরকে অবলম্বন করে কারণ শরীর ক্রিয়াশীল থাকে – সে অবস্থা হল জীবের স্বপ্ন অবস্থা এবং যে অবস্থায় সূক্ষ্ম শরীর কারণ শরীরে প্রস্তুপ্ত হয় অথচ স্থূলশরীরে প্রাণের ক্রিয়া থাকে—তখনই স্বপ্নহীন গাঢ় নিদ্রা বা জীবের সুষুপ্তি অবস্থা । পর্যায়ক্রমে এই তিনটি অবস্থা প্রতিটি জীবনে ঘটে থাকে ।
অন্নময় ও প্রাণময় কোষ নিয়ে স্থূল শরীর, মনোময় ও বিজ্ঞানময় কোষ নিয়ে সূক্ষ্ম শরীর এবং আনন্দময় কোষ নিয়ে কারণ শরীর বিদ্যমান। প্রাণ অন্নময় স্থূলদেহকে আশ্রয় করে ক্রিয়াশীল থাকে । কোন কারণবশত যদি এই অন্নময় স্থূলদেহের বিপত্তি বা ব্যাঘাত ঘটে, তখন জীবের প্রাণ সংকটকাল উপস্থিত হয়। এই সময় প্রাণ ক্রিয়াশীলতা হারিয়ে ক্রমশ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে এবং স্থলদেহের মৃত্যু ঘটে ।
এই স্থূলদেহের বিপর্যয় বা ব্যাঘাত কোন না কোন কারণে হতে পারে, যথা আধিভৌতিক, আধিদৈবিক এবং আধ্যাত্মিক । মূলকথা এটা স্থূলদেহেরই বিপর্যয় বা বিপত্তি—প্রাণ যাকে অবলম্বন করে ক্রিয়াশীল ছিল। জীবের মৃত্যুতে নিস্পন্দ প্রাণহীন স্থূলদেহ পড়ে থাকে ধরামাঝে । ঘন সুষুপ্তিতে নিমগ্ন জীবাত্মা স্থূলদেহ ত্যাগ করে। নানান সম্প্রদায়ের নানা সংস্কার অনুযায়ী তা পঞ্চভূতে পুনরায় বিলীন হয়। এমনও দেখা যায় ঘন সুষুপ্তিতে প্রাণ তার ক্রিয়াশীলতা হারিয়ে ফেলে এবং জীবদেহের মৃত্যু ঘটায় ।
প্রশ্ন—আপনার আলোচনা শুনে আমার জন্মান্তর রহস্যের বিষয়টা অনেকটা স্বচ্ছ হয়েছে এবং ঐ বিষয় সম্পর্কে আরো কিছু জানবার জন্য আমি বিশেষভাবে আগ্রহান্বিত। এখন আপনি যদি অনুগ্রহ করে ঐ প্রস্থপ্ত জীবাত্মা বা কারণ-শরীর দেহত্যাগের পর কিভাবে এবং কোথায় অবস্থান করে আর পুনর্জন্মই বা গ্রহণ করে কেমন করে—এই সম্পর্কে কিছু আলোচনা করেন তো খুবই আনন্দ হয়।
উত্তর– প্রিয় আত্মন্! প্রস্তুপ্ত জীবাত্মা স্থূলদেহ হতে নিষ্ক্রমণ করে কারণরূপে ব্যোমে বিচরণ করে। কারণ সমগ্র মহাবিশ্ব চরাচর – জড়-চেতন সমূহই মহাকাশ বা ব্যোমেই বিচরণ করে। আকাশই সমস্ত কিছুর ধারক এবং আকাশই সমস্ত চরাচর গতিশীল বিষয় সকলের আশ্রয়স্থল । সুতরাং জীবাত্মা প্রস্তুপ্ত অবস্থায় আকাশেই বিচরণ করে থাকে
পুনরায় চিত্তের প্রস্তুপ্তি ভঙ্গ হয় বিশ্বনিয়ন্তার কার্যকারণ সূত্রে । এই বিশ্বনিয়ন্তাই ঈশ্বর । অনন্ত বিশ্বপ্রকৃতির কার্যকারণ তাঁর দ্বারাই নিয়মিত এবং নিয়ন্ত্রিত হয়। ঐ অনাদি কার্য-কারণ সূত্রেই ব্যষ্টি জীবাত্মার সুষুপ্তি ভঙ্গ হয় । এই অনন্ত বিশ্বের অনাদি কার্য-কারণ সূত্র বিশ্বপিতা পরমেশ্বরের দ্বারাই শুনিয়ন্ত্রিত—সেখানে জীবাত্মার কোন স্বাধীনতা নেই কিন্তু যখন জীবাত্মা আত্মজ্ঞান দ্বারা চরম ও পরম সত্যকে অবগত হয় বা ঐ পরমবোধে উপনীত হয়, কেবল তখনই ঐ কার্য-কারণকে অতিক্রম করে ঐ পরম অবস্থা বা স্বাধীনতা লাভ করে । এই হল জীবাত্মার ভগবানত্ব — ঈশ্বরত্ব বা ব্ৰহ্মত্ব লাভ ঐ পরম স্থিতিই একমাত্র স্বাধীন এবং নিরাপদ আর ঐ স্থিতিই প্রতিটি জীবাত্মার পক্ষে শ্রেয় বা জীবাত্মার চরম উদ্দেশ্য এবং পরম প্রাপ্তি ।
উপরোক্ত আলোচনায় আমরা বুঝতে পারলাম যে, বিশ্বনিয়ন্তা পরমেশ্বরের কার্যকারণ সূত্রে জীবাত্মার যখন চিত্তের প্রস্তুপ্তি ভঙ্গ হয়, তখন অহংকার জাগ্রত হয় এবং অহংকে আশ্রয় করে বাসনাময় সূক্ষ্ম শরীরের অতৃপ্ত কামনারাশি তীব্র আকাঙ্ক্ষায় বেদনাতুর হয়ে ওঠে। অপূর্ণ বাসনার আবর্তনে অন্তপ্রকৃতিতে তীব্র বেদনাবোধ জাগিয়ে তোলে । তখন সূক্ষ্মশরীর স্থল ভোগশরীর ধারণ করবার জন্য আতুর হয়ে ওঠে অর্থাৎ দেহ গ্রহণের জন্য প্রবল তাগিদ বোধ করতে থাকে। অন্তপ্রকৃতির তৃপ্ত-অতৃপ্ত প্রবৃত্তির ক্ষোভ প্রবল হতে প্রবলতর হয়ে উঠলে, ঐ প্রবৃত্তির তাগিদে বা প্রেরণায় প্রবল ইচ্ছাশক্তির উদয় হয়। তখন ঐ ইচ্ছাশক্তিই দেশ-কাল-পাত্র-বিশেষে জীবাত্মাকে নূতন স্থল শরীর নির্বাচন বা গ্রহণ করায়। সুতরাং স্থল দেহলাভের তীব্র আকাঙ্ক্ষাই জীবাত্মাকে স্থূল-সৃষ্টির কার্য-কারণ সূত্রের আবর্তে পুনরায় প্রবিষ্ট করায়। গ্রন্থ
প্রিয় আত্মন্ ! স্থল সৃষ্টির কার্য-কারণ সূত্রে প্রবিষ্ট হওয়া মাত্রই জীবাত্মা পুনরায় প্রসুপ্ত হয়ে পড়ে এবং স্থল সৃষ্টির কার্য-কারণ সূত্রের আবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রসুপ্ত অবস্থায় মাতৃজঠরে প্রবেশ করে থাকে। মাতৃজঠরে প্রাণের স্পর্শে অন্নময় স্থলদেহ কলায় কলায় ক্রমান্বয়ে বৰ্দ্ধিত হতে থাকে। চার মাসের পর হতে অন্নময় কোষকলা ক্রমান্বয়ে মানুষের আকৃতি পেতে থাকে। মাতৃজঠরে চার মাস পর্যন্ত অতিবাহিত হয় জীবাত্মার প্রস্তুপ্ত অবস্থায়—এটা সুষুপ্তিকাল । চার মাস অতিবাহিত হলে পুনরায় জীবাত্মার প্রসুপ্তি ভঙ্গ হয় । এবার জীবাত্মার স্বপ্নকাল উপস্থিত হয় এবং অন্তর প্রকৃতির সূক্ষ্ম সংস্কাগুলি ক্রমান্বয়ে জাগ্রত হতে থাকে । ছয়মাস অতিবাহিত ও দুটি অবস্থাই চলতে হবার পর জীবাত্মার পূর্যায়ক্রমে প্রশ্ন ও সুবিধারা ঐ দুটি অবস্থা থাকে। অর্থাৎ মাতৃজঠরে নিদ্রাস্থিতিতে ভোগ করতে থাকে ছয় মাস হতে স্বপ্ন ও সুষুপ্তি—পর্যায়ক্রমে ভোগ প্রসব কাল পর্যন্ত ।
স্থূল শরীরের অন্নময় কোষকলা যখন পূর্ণ অবয়ব প্রাপ্ত হয়, তখন পঞ্চপ্রাণ—( প্রাণ, অপান, সমান, উদান ও ব্যান )-এর পূর্ণ ক্রিয়াশীলতা শুরু হয়—মাতা প্রসবযন্ত্রণা বোধ করে এবং জীবাত্মা মানবশিশুরূপে ভূমিষ্ঠ হয়। এই সময় অন্নময় স্থূলশরীরে পঞ্চপ্রাণের ক্রিয়া পূর্ণরূপে আরম্ভ হয়। জীবাত্মার জাগ্রত অবস্থা উপস্থিত হয় । অন্নময় শরীরকে ঘিরে এই প্রাণের ক্রিয়া আমৃত্যু স্পন্দিত হতে থাকে এবং অন্তপ্রকৃতির প্রবৃত্তিগুলি স্থূলদেহকে অবলম্বন করে ক্রমান্বয়ে প্রকাশ পেতে থাকে। এই হল জীবনের বৃত্তান্ত -পুনর্জন্ম বা জন্মান্তর রহস্য ।
প্রিয় আত্মন্ ! বা প্রবৃত্তির আত্মজ্ঞান হলে জীবের সঞ্চিত বাসনার বীজ হল দগ্ধ হয়ে যায়, তখন আর নতুনদেহ গ্রহণের কোন সম্ভাবনা থাকে না।
আত্মজ্ঞান হলে কেবল প্রারব্ধবশে স্থূল শরীর থেকে যায়, আর আত্মা প্রারব্ধ বা সমাপ্ত হলে স্থূলদেহ পঞ্চভূতে মিশে যায়। পরমচৈতন্য স্থিতিতে—স্ব-স্বরূপে আকাশবৎ বিরাজমান থাকে।
প্রিয় আত্মন্ ! তুমি অজড়, অমর, নিত্য, শাশ্বত, সনাতনআত্মা ৷
তুমি পরম অমৃততত্ত্ব—সচ্চিদানন্দ আত্মা । তুমি পরম চৈতন্য- ঘন নির্বেদ অখণ্ড আত্মা ।
তুমি সমস্ত ঘটনার সাক্ষী — সমস্ত দৃশ্যের দ্রষ্টা— সমস্ত জ্ঞানের বিজ্ঞাতা—সমস্ত অনুভবের অনুভবী—শুদ্ধ, বুদ্ধ, মুক্ত, বোধরূপ আত্মা। তত্ত্বমসি’—’তত্ত্বমসি’—‘তত্ত্বমসি’
