প্রশ্ন –হে দেব, পূর্বে আপনার মুখ হতে চক্রসমূহের অদ্ভুত বর্ণনা শুনে অশেষ আনন্দলাভ করলাম। এখন অনুগ্রহ করে কুলকুণ্ডলিনী জাগরণের পদ্ধতি সম্পর্কে যদি কিছু বলেন তো খুবই উপকৃত হই ।
উত্তর—প্রিয় আত্মন্—এটা যোগসাপেক্ষ এবং যোগলব্ধ । যোগসাধনা দ্বারাই এর চরম উপলব্ধি করা যায়, তথাপি এই বিষয়ে কিছু বলছি—কেমন করে এবং কিভাবে এই কুণ্ডলিনী জাগ্রত হয়।
মহাবন্ধ, মূলবন্ধ এবং আরো অনেক পদ্ধতি আছে কুণ্ডলিনী জাগরণের । কিন্তু সাধারণত অপান বায়ুকে রোধ করে ঊর্ধ্ব গামী করে কুম্ভক অবলম্বন করলে ঐ নিরুদ্ধবায়ু অগ্নিস্থানে অগ্নিকে আঘাত করে জাগিয়ে দেয়, তখন ঐ উদ্দীপ্ত অগ্নি ও বেগবান বায়ু কুণ্ডলিনীকে উদ্দীপ্ত করে, এমতাবস্থায় অধোগামী অপান বায়ু M ঊর্ধ্ব মুখী হয়ে নাভিমূলে মণিপুর চক্রে অগ্নিমণ্ডলে প্রবেশ করে তাতে আঘাত করলে অগ্নি প্রজ্জলিত হয় এবং ঐ প্রজ্জ্বলিত অগ্নি শিখার রূপ ধারণ করে দীর্ঘ হয় । তারপর ঐ অগ্নিশিখা ও অপান বায়ু প্রাণবায়ুকে স্পর্শ করে, তখন সমগ্রব্যাপী অগ্নি প্রদীপ্ত হয়ে ওঠে। আর ঐ তাপে তপ্ত হয়ে প্রসুপ্ত নিদ্রিত কুণ্ডলিনী শক্তি জাগ্রত হয়ে সুষুম্নার মধ্যে প্রবেশ করে
প্রশ্ন –হে দেব, ঐ কুণ্ডলিনী শক্তি জাগ্রত হয়ে সোজা গিয়েসহস্রারে পরম শিবে মিলিত হয় কি ?
উত্তর–প্রিয় আত্মন্, ঠিক তা নয়, এর এক অপূর্ব ক্রম রয়েছে -প্রকৃত সাধক তা বুঝতে পারেন । কুণ্ডলিনী শক্তি জাগ্রত হয়ে যখন ঊর্ধ্ব দিকে গমন করে তখন মূলাধারে অবস্থিত ব্রহ্মা, ডাকিনীশক্তি এবং চতুর্দলের চারটি বর্ণ ও গন্ধতত্ত্ব, পৃথ্বীবীজ লং-এর সঙ্গে মিলিত হয়ে কুণ্ডলিনীরদেহে লয়প্রাপ্ত হয়। তারপর মূলাধার চক্র হতে কুণ্ডলিনী সাধিষ্ঠান চক্রে প্রবেশ করে আর প্রবেশ করা মাত্রই সাধিষ্ঠান পদ্মের দলগুলি উর্ধ্বমুখী হয়ে ওঠে । ঐ চক্রের মহাবিষ্ণু ও রাকিনীশক্তি এবং ষড়দলের ছয়টি বর্ণ ও রসতত্ত্ব বরুণবীজ ‘বং’ এর সঙ্গে মিলিত হয়ে কুণ্ডলিনীদেহে বিলীন হয় । অর্থাৎ গন্ধতত্ত্ব রসতত্ত্বে মিশে যায়। কুণ্ডলিনীদেহে যে পৃথ্বীবীজ ‘লং’ অবস্থান করেছিল তা বরুণবীজ ‘বং’-এর সঙ্গে মিশে যায় । এইভাবেই কুণ্ডলিনীশক্তি মণিপুর চক্রে প্রবেশ করে। ঐ চক্রে অবস্থিত রুদ্র ও লাকিনীশক্তি এবং দশম দলের দশটি বর্ণ ও রূপতত্ত্ব অগ্নিবীজ ‘রং’-এর সঙ্গে মিলিত হয়ে কুণ্ডলিনী- দেহে বিলীন হয় । অর্থাৎ রসতত্ত্ব রূপতত্ত্বে মিশে যায় । কুণ্ডলিনীতে অবস্থিত বরুণবীজ ‘বং’ অগ্নিবীজ ‘রং’-এর মধ্যে মিশে যায়। এইভাবে মণিপুর চক্র হতে অনাহত চক্রে প্রবেশ করতে তন্ত্র সাধককে ব্রহ্মগ্রন্থি ভেদ করতে হয়। এই গ্রন্থি ভেদ করা খুবই কঠিন। কারণ মণিপুর চক্র পর্যন্ত প্রাকৃত জড়শক্তির বিস্তার থাকে। শক্তি শুদ্ধ হয়ে বিশুদ্ধভাব প্রাপ্ত না হলে এই চক্র হতে উৎক্রমণ অতি দুরূহ ব্যাপার । সুতরাং পশুভাব দূরীভূত না হওয়া পর্যন্ত এই গ্রন্থি ভেদ হয় না।
প্রিয় আত্মন্, সাধক যখন এই ব্রহ্মগ্রন্থি ভেদ করেন, তখন খুবই কাঠিন্য অনুভব করেন পরিশেষে এই দুরূহ ব্রহ্মগ্রন্থি ভেদ করে কুণ্ডলিনী অনাহত চক্রে প্রবেশ করে । অনাহত চক্রে উপনীত হওয়া মাত্র ঐ চক্রের ঈশান ও কাকিনীশক্তি এবং অনাহত পদ্মের বারোটি দলের বারোটি বর্ণ ও স্পর্শতত্ত্ব বায়ুবীজ ‘যং’-এর সঙ্গে মিশে কুণ্ডলিনী দেহে বিলীন হয় । অর্থাৎ অগ্নিবীজ ‘রং’ বায়ুবীজ ‘যং’-এ মিশে যায় । এই অনাহত চক্র হতে বিশুদ্ধ চক্রে যাবার পথে সাধককে আর একটি অতি দুরূহ গ্রন্থি ভেদ করতে হয় । এই গ্রন্থির নাম বিষ্ণুগ্রন্থি। দ্বৈতজ্ঞান বিলুপ্ত না হওয়া পর্যন্ত এই গ্রন্থিভেদ হয় না । অবশেষে সাধক যদি এই অতি দুরূহ গ্রন্থিটি ভেদ করেন তখন কুণ্ডলিনী শক্তি বিশুদ্ধ চক্রে প্রবেশ করে। ঐ চক্রে অবস্থিত অর্ধনারীশ্বর সদাশিব ও শাকিনীশক্তি এবং বিশুদ্ধ পদ্মের ষোলটি দলের ষোলটি বর্ণ ও শব্দতত্ত্ব আকাশবীজ ‘হং’-এর সঙ্গে মিশে কুণ্ডলিনীদেহে বিলীন হয়। অর্থাৎ বায়ু বীজ ‘যং ব্যোমবীজ ‘হং’- এ মিশে যায়। তারপর কুণ্ডলিনী আজ্ঞাচক্রে প্রবেশ করে এবং ঐ চক্রে স্থিত পরম শিব ও হাকিনীশক্তি এবং দ্বি-দল পদ্মের ছুটি বর্ণ অহংতত্ত্বতে মিশে গিয়ে কুণ্ডলিনীদেহে বিলীন হয় । অর্থাৎ আকাশ বীজ ‘হং’ অহংকার তত্ত্বে মিশে যায়। এই কুণ্ডলিনী শক্তিকে সহস্রার চক্রে নিয়ে যাবার পথে সাধকের আরো একটি অতি দুরূহ গ্রন্থিকে ভেদ করতে হয় । তার নাম রুদ্র গ্রন্থি । এইখানেও সাধককে চরম পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয় । অবশেষে এই অতি দুরূহ রুদ্রগ্রন্থি ভেদ করতে পারলে তখন কুণ্ডলিনী সহস্রারে প্রবেশ করে। সহস্রার চক্রে কুণ্ডলিনী প্রবেশ করে পরম শিবের সঙ্গে আলিঙ্গন প্রাপ্ত হয় । পরম শিবে কুণ্ডলিনী মিলিত হলেই অমৃতধারা বিগলিত হয়ে সুধাবর্ষণ করতে থাকে । আর সাধক ঐ অমৃতধারা পান করে পরমানন্দসাগরে নিমগ্ন হন।
প্রিয় আত্মন্ ! কুণ্ডলিনী শক্তি যখন উদ্দীপ্ত হয়ে ঊর্ধ্ব মুখী হতে থাকে, তখন তা অতি উজ্জ্বল জ্যোতিরূপ ধারণ করে এবং ঐ চক্র সকলের মধ্যে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত শক্তিসমূহকে চতুর্দিক হতে আকুঞ্চন করে কুণ্ডলিনী আপন শরীরে মিশিয়ে নেয় এবং আন্দোলিত হতে হতে ঊর্ধ্বে উৎক্রমণ করতে থাকে। কুণ্ডলিনীকে সহস্রারে যাওয়ার পথে ত্রিলিঙ্গ ভেদ করতে হয়, যথাক্রমে মূলাধারে স্বয়ম্ভুলিঙ্গ, অনাহতে বাণলিঙ্গ ও আজ্ঞাচক্রে ইতরলিঙ্গ। এই ত্রিলিঙ্গ ভেদ করে কুণ্ডলিনী সহস্রারে পরম শিবের সঙ্গে মিলিত হয়। যথাক্রমে পৃথ্বীতত্ত্ব অপতত্ত্বে, অপতত্ত্ব অগ্নিতত্ত্বে, অগ্নিতত্ত্ব বায়ুতত্ত্বে, বায়ুতত্ত্ব আকাশতত্ত্বে, আকাশতত্ত্ব অহংতত্ত্বে এবং অহংতত্ত্ব আত্মতত্ত্বে বা শিবতত্ত্বে বিলীন হয়। যথাক্রমে গন্ধ তন্মাত্রা রস তন্মাত্রায়, রস তন্মাত্রা রূপ তন্মাত্রায়, রূপ তন্মাত্রা স্পর্শ তন্মাত্রায়, স্পর্শ তন্মাত্রা শব্দ তন্মাত্রায়, শব্দ তন্মাত্রা অহং-এ এবং অহং পরমাত্মা পরমাশিবে মিলিত হয়। মাটি (Solid) জলে, জল (Liquid) আগুনে, আগুন (Gas) মরুতে, মরুৎ (Plasma) ব্যোমে, ব্যোম (Space- ether) অহংকারে, অহংকার (igo) অখণ্ড চৈতন্যরূপী পরমশিবে (Unlimit conscious a) মিলিত হয় ॥
— পরিশিষ্ট—
-ভৈরব-
সংসার সম্মোহন চক্রে পুনরাবর্তনে
সম্মোহিত সারিবদ্ধ মানব প্রজাতি
জগৎ যন্ত্রণা-কক্ষে অবর্ণনীয় নির্যাতন ।
পুঞ্জ পুঞ্জ অসূয়া-মুগ্ধ পাঞ্চভৌতিক জীবন
হতাশায় দুঃখে-সুখে বেদনায় দগ্ধ,
তবুও অণুস্বাতন্ত্রের আস্ফালন দগ্ধ যৌবনে,
হে ভৈরব, আজ্ঞাচক্রে মন দাও।
ঐ সম্মুখে শ্মশানে অঙ্গারে দগ্ দগে যন্ত্রণা
উদ্ভিন্ন-যৌবনা তরুণী-শরীর জ্বলছে
শুষে নিচ্ছে ঈশ্বরের লক্-লকে জিভ
সব অসূয়া অভিমান আর যন্ত্রণা
গ্রাস করে মহাকাল ।
মানুষের আদি-অন্ত যাবতীয় ইতিহাস
মানবতীর্থ মুক্তির সাধনপীঠ।
যেখানে জীবন-মৃত্যু মিলেমিশে একাত্ম –
পঞ্চমুণ্ডির আসনে আসীন হও ভৈরব ।
নিশীথ কালরাত্রি আখড়ায় ধুনি জ্বলছে
কল্কের মাথায় আলেয়ার আগুন
হে ভৈরব, আজ্ঞাচক্রে মন দাও ।
প্রসীদে প্রসীদে মা জগদম্বা-
হে মা, প্রসন্ন হও আমার প্রতি !
আমি বিবস্ত্র উদ্ভ্রান্ত ভৈরব-
নীরবে আবিষ্ট আসক্তমনে
আরক্ত নরকরোটি কপাল পাত্রে
আড়ষ্ট ওষ্ঠে করি ঘন চুম্বন,
হে ভৈরব, আজ্ঞাচক্রে মন দাও।
পিঙ্গল তামাটে জটাজাল উড়ছে
ছড়িয়ে দিচ্ছে ভস্ম দূরান্তরের বাতাস
বৃক্ষ শাখায় কাঁদে শকুন শিশু
রাত্রিকণ্ঠে বাজে বার বার মাতৃমন্ত্র
ধুনি-অঙ্গারে ধুনোর গন্ধ
মানবমেদের মৃগনাভি সৌরভ
পৃথ্বীশরীর মাতাল হয়ে ওঠে
হে ভৈরব, আজ্ঞাচক্রে মন দাও ।
নিষেধের পর্দা সরালো পৃথিবী,
ও নিজেকে বললো আমি ভৈরবী
ওর জীবন সঞ্চারে আছে শুধু
ভাটিয়ালী গান আর বাউলের সুর—
ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে উষ্ণ আবেশে
ফিস্ ফিস্ করে কানে বাজলো সে,
রস আর রসদ নিয়ে তুমি রূপকথার রসিক,
দম্ ভরে রসপানে মত্ত হও
হে ভৈরব, আজ্ঞাচক্রে মন দাও ৷
এঁটো শালপাতার মতো মৃত অস্পষ্ট ছবি
আঙ্গুলের ছোঁয়ায় জীবন্ত হয়ে ওঠে,
রস আর রসদেভরা রূপকথার রসিক
চারপাশে উন্মুক্ত প্রকৃতির উল্লাস,
নগ্ন শরীর রোমাঞ্চে পুলকিত পুনঃ পুনঃ
আর সম্মুখে শ্মশানে গিলে খাচ্ছে
ঈশ্বরের লক্-লকে জিভ ৷
নররক্তে পুষ্ট হয় দেবতার মুখ
বুকে বাজে মাতৃমন্ত্র মাভৈঃ
হে ভৈরব, আজ্ঞাচক্রে মন দাও ।
মহাকালীপদে কর আত্মসমর্পণ
হে ভৈরব, এবার প্রশান্ত হও—
জীবন-মুক্তির তরে হও ধ্যানলীন ।
গোগ্রাসে গ্রাস করে মহাকাল
সমস্ত হতাশা—সমস্ত দুঃখ-কষ্ট,
দিগন্ত প্রসারিত বৈরাগ্য ছটায়
আঁধার সরে যায় দূরে—বহুদূরে।
বেদনা আর আনন্দের ভিতর
ক্রমশ: আমি জেগে উঠ্ছি—
সহস্রারে ব্রহ্ম-কমলের সৌরভ পাচ্ছি,
হে ভৈরব, মধুপানে মত্ত হও— হে ভৈবব—লও অমৃতের আস্বাদন ॥
