গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দ মানবজীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে সেসব কথা বিভিন্ন সিটিং-এ বলতেন – এখন আমরা সেইসব নিয়ে আলোচনা করছিলাম । জীব এবং জড়ের মধ্যে পার্থক্যের সংজ্ঞা আমরা জীবন বিজ্ঞান বই-এ প্রায় সবাই পড়েছি, কিন্তু গুরুমহারাজ যখন এই দুইয়ের পার্থক্যের কথা বলেছিলেন তখন আমাদের মনে হয়েছিল – ” আরে ! এমনটা তো কখনও ভাবিনি ! জীবনবিজ্ঞান পুস্তকে তো এমনটাই লেখা উচিৎ ছিল !” গুরু মহারাজ শাস্ত্রােক্ত শ্লোক উল্লেখ করে বলেছিলেন – জীবের লক্ষণ ”আহার-নিদ্রা-মৈথুনঞ্চ-ভয়ম্’। অর্থাৎ প্রতিটি জীবের প্রাথমিক লক্ষণ-ই হোল – আহার্য্যগ্রহণ, সুযোগ পেলেই বিশ্রাম এবং নিদ্রা, বংশবৃদ্ধির জন্য বা পরম্পরা বজায় রাখার জন্য মৈথুন বা জনন ক্রিয়া, আর জীবের অন্যতম লক্ষণ হ’ল ভয় ৷ গুরুমহারাজ বলেছিলেন – জীবের যে কোন ‘ভয়ে’-র উৎসই হচ্ছে মৃত্যুভয় I কোন জীবই যেন মরতে চায় না – তাই মৃত্যুভয় !
এছাড়া গুরুমহারাজ জড় ও জীবের পার্থক্য করতে গিয়ে বলেছিলেন জীবের চিন্তাশক্তি রয়েছে – জড়ের নাই, জীবের বুদ্ধিবৃত্তি রয়েছে – জড়ের নাই, জীবের ইচ্ছাশক্তি রয়েছে – জড়ের নাই, জীবের অভিযোজন ক্ষমতা রয়েছে – জড়ের নাই, জীব নিজের অস্তিত্বের নিরাপত্তার অভাব বোধ করে এবং তার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া রয়েছে – জড়ের এগুলি নাই, ইত্যাদি আরও কত যে Point বলতেন সব স্মরণেই নাই । কিন্তু জীবের এইগুলি লক্ষণ হলেও এই লক্ষণগুলির ক্রিয়াশীলতাই জীবকে বিবর্তনে উন্নত থেকে উন্নততর করে তোলে এবং পৌঁছে দেয় শ্রেষ্ঠ জীব মানুষে !
মানুষ শরীর পাবার পর মানুষের বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ঘটতে থাকে এবং মনের ক্রিয়াশীলতার ব্যাপ্তি ঘটে । মানুষের মধ্যে মনুষ্যসুলভ গুণসমূহের প্রকাশ ঘটতে থাকে সেগুলি হ’ল – ভালবাসা, স্নেহ, মায়া, মমতা, শ্রদ্ধা, বিনয় বা বিনম্রতা, প্রেম ইত্যাদি। এইগুলিকেই সাধারণত ‘মানবিক গুণ’ বলা হয়, কারণ মানুষ ছাড়া অন্যান্য জীবে এই সমস্ত লক্ষণগুলির যথাযথ প্রকাশ দেখা যায় না । সেইজন্য মানুষ অন্যান্য জীব অপেক্ষা আলাদা ! আর মানুষ সবচাইতে আলাদা এইজন্য যে, মানুষ-ই একমাত্র ভগবানকে জানতে পারে – সে নিজেই ভগবান হয়ে উঠতে পারে । আর এটাই মানুষের Purpose of Life ! পূর্ণ হয়ে ওঠা – সম্পূর্ণ হয়ে ওঠা ! গুরুমহারাজের কাছে শুনেছিলাম – ব্রহ্মময় জগৎ ! ব্রহ্ম-ই ‘অনু’তে অনুস্যূত হয়ে রয়েছেন, আবার ব্রহ্মই বিভূতে (বিরাটরূপে) ওতপ্রোত হয়ে রয়েছেন । ব্যক্ত-অব্যক্ত এই বিশ্বব্রহ্মান্ডের যা কিছু সবই ব্রহ্মের-ই প্রকাশ !
তবে ব্রহ্ম সর্বত্র সমানভাবে প্রকাশমান নন । যদি সূর্যের উদাহরণ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করা হয় – তাহলে যেমনটা দেখা যায় যে সূর্যের আলো সর্বত্র সমানভাবে পড়লেও – সবকিছুতে সূর্য্য সমানভাবে প্রকাশিত হয় না । অস্বচ্ছ বস্তু অপেক্ষা স্বচ্ছ বস্তুতে সূর্যের প্রকাশ বেশি বলে প্রতীয়মান হয় – ঠিক তেমনই ব্রহ্ম জড়বস্তুতে এক কলায় প্রকাশিত । উদ্ভিদজতে দুই কলায় প্রকাশিত, স্বেদজ জীবে তিন কলায়, অন্ডজ জীবে চার কলায়, জরায়ুজে ষষ্ঠ কলায় প্রকাশিত এবং মানুষে ব্রহ্ম অষ্ট-কলা বা আট কলায় প্রকাশিত (অন্ডজ থেকে ব্রহ্ম‌ পর্যন্ত ক্রম গুলি দুই কলার অন্তর কেন_একথা জিজ্ঞাসা করায় গুরুজী উত্তর দিয়েছিলেন_”বিবর্তনের ধারায় অন্ডজ থেকেই স্ত্রী-পুরুষ পৃথক পৃথক হয়”!)। একে অর্দ্ধকলাও বলা হয় ৷ মানুষের উপরের ধাপ দেবতা – যেখানে ব্রহ্ম দশম কলায় প্রকাশিত, দেবতার উপরে রয়েছে ঋষি বা সিদ্ধ অবস্থা – এই অবস্থায় ব্রহ্ম দ্বাদশ কলায় প্রকাশিত । অবতারাদি যখন লীলা করেন, তখন সেই শরীরে ব্রহ্ম চতুর্দশ কলায় প্রকাশিত, আর পুরুষোত্তম রূপে ব্রহ্ম স্বয়ং – ষোলকলায় পূর্ণরূপে প্রকাশিত ।
কথা হচ্ছিল মানুষের Purpose of Life বা মানবজীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে – এটাকে লক্ষ্যও বলা যায় । নিজেকে সম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত হয়ে ওঠাই মানবজীবনের উদ্দেশ্য ! উপনিষদে রয়েছে – “পূর্ণমিদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণ মূদচ্যতে, পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে” – উহা পূর্ণ, (কিন্তু) ইহাও পূর্ণ ! পূর্ণ থেকে পূর্ণ-ই পাওয়া যায়, (তাছাড়া) পূর্ণ থেকে পূর্ণ বাদ দিলে পূর্ণই পাওয়া যায় । এই যে বলা হয়েছে – ” উহা অর্থাৎ ব্রহ্ম পূর্ণ, কিন্তু এটাও বলা হয়েছে ইহা (সৃষ্টি, তা সে যে কোন একজন ব্যক্তি-ও হতে পারে)-ও পূর্ণ ! ব্যক্তির ক্ষেত্রে অর্থাৎ যে কোন মানুষের ক্ষেত্রে এই যে পূর্ণতার বোধ এটাই মানবের Purpose of Life !
পূর্ণতার বোধ আসার আগে পর্যন্ত মানুষ নিজেকে ভেবে বসে থাকে যে – সে অপূর্ণ ! গুরুমহারাজ খুব সুন্দরভাবে এই কথাটা বর্ণনা করেছিলেন – ” পূর্ণ-ই অপূর্ণতার জ্বালা বুকে নিয়ে ছুটে চলেছে পূর্ণতার দিকে !” এই যাত্রাই – জীবন যাত্রা ! জড় থেকে জীব, এককোশী অনুন্নত জীব থেকে উচ্চতর বা উন্নততর জীবে এবং শেষে মানুষ হয়ে ওঠা এবং মানুষের শরীর লাভ পাবার পর তার বিবেকের জাগরণ এবং চেতনার আত্মিক উত্তরণ ঘটিয়ে পূর্ণত্বে উপনীত হয়ে – আত্মসাক্ষাৎকার বা ব্রহ্মসাক্ষাৎকার করা ৷ সাগর থেকে লক্ষ লক্ষ বুদবুদ তৈরী হয়ে, কিছুকাল স্থিতিলাভ করে আবার সমুদ্রেই মিশে যাওয়া ! … [ক্রমশঃ]