[“বীরভূমে ন’কাকা” প্রসঙ্গে কথা হচ্ছিল। এখন ন’কাকার ছেলে মেয়ে জামাই দের কথা হচ্ছে! তারপরে আবার ফিরে যাব বীরভূমে।]
কি সুন্দর যে লাগতো _যখন ঐ মেয়ে-জামাই, বা ন’কাকার অন্য ছেলে মেয়েরা বনগ্রামে ওনার বাড়িতে যেতো ! একবাড়ি ছেলেমেয়েরা সবাই ‘বাবা-বাবা’ অথবা ‘মা-মা’ করছে __বাড়ির পরিবেশটা যেন আনন্দে মুখর হয়ে উঠতো! তারপর একে একে অনেকেই ন’কাকার কাছে দীক্ষা নিতে শুরু করেছিল, ফলে এইভাবে ন’কাকিমাকে আরও অনেক ছেলে-মেয়ে উপহার দিয়েছিলেন ন’কাকা ! এরাই ন’কাকিমার বাড়ি হাসি-আনন্দে-ভালোবাসায়-শ্রদ্ধায় ভরিয়ে তুলত! এখানে একটা কথা বলতেই হচ্ছে যে , ন’কাকা-কাকিমার ছেলে-মেয়েগুলোর বেশীরভাগেরই বাড়ি বীরভূমে !
আমি অবাক হোতাম, যখন দেখতাম ওরা যখন আসতো তখন বিভিন্ন প্যাকেট থেকে ন’কাকিমার জন্য বের করতো একটু পোস্ত , একটু ডাল বা অন্যান্য মসলা !
কেন? একটু একটু কেন? __ কারণ , ওদের মাসকাবারি বাজারে এবার যে পোস্তটা এসেছে সেটা হয়তো খুবই ভালো কোয়ালিটির, অন্তত খেতে গিয়ে ওদের তাই মনে হয়েছিল! ব্যস – তাই আর সবটা খাওয়া হয় নি, বাকিটা মা-বাবার (ন’কাকা-ন’কাকিমা) জন্য নিয়ে এসেছে ! অন্য সবকিছুও তাই !
এই রকম ভালোবাসা !!!! আমি সত্যি সত্যিই অবাক হোতাম ! আমরা তো দীর্ঘদিন ধরে ন’কাকাকে দেখছি , ওনার সাথে মিশছি , ওনার বাড়ি যাওয়া-আসা করেছি , উনি অনেকবার আমাদের বাড়িও গেছেন – কিন্তু আমরা তো ওনাকে এই রকম ভালবাসতে পারিনি !
আমার মনে হয়েছে সত্যি সত্যিই বনগ্রামের মানুষসহ বর্ধমান জেলার মানুষজনেরা ওনাকে এত ভালবাসতে পারেনি ! তবে ব্যতিক্রম সব ব্যাপারেই থাকে, হয়তো এক্ষেত্রেও ছিল – বর্ধমান জেলার বা অন্যান্য জেলারও অনেক ভক্তই ন’কাকাকে বাবার মতো আর ন’কাকিমাকে মায়ের মতো শ্রদ্ধা কোরতো বা এখনও করে ! একবার ন’কাকার সাথে মেমারি গেছিলাম । সেখানে বনগ্রামের ”হুই”_বাড়ির একটি পরিবার বাড়ি তৈরি করে ওখানে রয়েছে ৷ ওদের বাড়ির একমাত্র ছেলেটি (যে ধানের ব্যবসা করে) ন’কাকাকে প্রনাম করে আমার সামনেই বলছিল __গুরু মহারাজের পর একমাত্র ন’কাকাকেই সে মহাপুরুষ হিসেবে মানে । তাই ন’কাকা যদি তাকে দীক্ষা দেয় তাহলেই সে দীক্ষা নেবে – অন্য কারো কাছে নয় ! প্রয়োজনে সে দীক্ষা না নিয়ে থাকবে _সেও ভি আচ্ছা!!
সেদিনও কিন্তু আমি যথেষ্ট অবাক না হয়ে পারিনি – কারণ সাধারণত দেখা যায় , গ্রামের মানুষ বা স্থানীয় মানুষ, তাদের আশেপাশে থাকা যে কোনো Great Man -দের অতটা পাত্তা দেয় না ! (কথাতেই রয়েছে “গ্রামে ‘মোদো’ , ভিন্নগ্রামে ‘মধুসূদন’) ন’কাকার ক্ষেত্রে সেটা খাটলো না – অবশ্য বনগ্রামের আরও অনেক মানুষই ন’কাকাকে গুরুর মতই শ্রদ্ধা করতো – আপদে-বিপদে ন’কাকার পরামর্শ নিতো!
তবে ‘বীরভূমে ন’কাকা’ – কিন্তু সব জায়গার চেয়ে আলাদা ছিল!
তাই আবার ফিরে আসি বীরভূমে অর্থাৎ আদিত্যপুর আশ্রমে এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় । আমরা ন’কাকার সাথে যখন প্রথম প্রথম আদিত্যপুর (বোলপুর) আশ্রমে যেতাম , তখন ঠাকুরঘর ছাড়া ছেলেদের জন্য এবং Free dispensary -র জন্য তৈরি একটি তিন কুঠুরি ইঁটের ঘর (ঢোকার গেট-এর বাঁ পাশে) তৈরি হয়েছিল ৷ ঠাকুর ঘর সংলগ্ন একটা চালা ঘর তৈরি করে সেখানে রান্না হতো এবং নন্দ মহারাজ সেখানেই থাকতো ৷ এরপর ধীরে ধীরে পুকুর পাড়ে রান্নাঘর হোল , রান্নাঘরের পিছন দিকে পঙ্কজ মহারাজ (বক্সী)-এর জন্য একটা অ্যাটাচ পায়খানা বাথরুমযুক্ত ছোট্ট একটা ঘর হোল । তারপরে হোল মাটির দু-কুঠুরী ঘরটা আসবেষ্টস-এর চাল বায়ু কোণের দিকে।
যত ঘর বাড়তে লাগল ততই লোকও বাড়তে লাগলো । একেবারেই প্রথমে ছিল (আমরা যখন প্রথম গেলাম) শুধু মহারাজ আর দুটি ছেলে – প্রশান্ত ও অমিত ৷ এরা দুজনেই বনগ্রাম থেকে মাধ্যমিক পাস করার পর এসেছিল ৷ অমিত রায়-ই প্রথম এসেছিল। যখন সবে একটি কুঁড়েঘর হয়েছিল আদিত্যপুর আশ্রমে – তখন থেকেই অমিত এই আশ্রমে ৷ ও তখন একা একাই ওই মাঝ মাঠের মধ্যে সারাদিন এবং রাত্রিতেও থেকেছে! অথচ তখন যারা এই আশ্রমের দায়িত্বপ্রাপ্ত মহারাজ ছিল [অনির্বাণ মহারাজ বা পঙ্কজ মহারাজ (স্বামী পরমাত্মানন্দ) ] , ওরা থাকতো নিরাপদ আশ্রয়ে বোলপুরের ত্রিশূলাপট্টিতে হরিপদ ভল্লাবাবুর দোতলার সাধুদের জন্য বানানো একটি নির্দিষ্ট ঘরে ৷ আর ঐ ঘরের পাশের ঘরটি ছিল গুরু মহারাজের জন্য (এখনও ঐ ঘরটি ঠাকুর ঘর হিসাবেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে)! গুরু মহারাজ যখন বোলপুরে পদার্পণ করেছিলেন তখন উনি দুরাত্রি এবং প্রায় তিন দিন ভল্লাবাবুর দোতালার ওই ঘরটিতে ছিলেন ৷৷
আমরা এখন যে কথাগুলো বলছি, সেগুলি আদিত্যপুর আশ্রমের রূপ ও বিকাশ সংক্রান্ত কথা ।
প্রথম প্রথম ন’কাকা এবং ওনার সাথী হিসাবে আমরা আশ্রমের ঠাকুর ঘরের মেঝেতেই শুতাম । পরে মাটির ঘরটা (বায়ুকোনের দিকে) হওয়ায় নন্দ মহারাজ ওখানে চলে গিয়েছিলেন। ফলে, ন’কাকাকে ঠাকুর ঘরে একা নিজের মতো থাকতে দিয়ে, আমি নন্দ মহারাজের পাশে নতুন ঘরে(তখনকার) শোয়ার জায়গা পেতাম _আর ন’কাকা ঠাকুর ঘরেই (দীর্ঘদিন) থেকে যেতেন । ধীরে ধীরে ন’কাকার ভক্ত সংখ্যা বাড়তে থাকল, এর ফলে উনি ঠাকুরঘরে থাকার কারণে দুপুরের দিকে ওনার কোন বিশ্রামই হতো না – বহিরাগত ভক্তরা (কীর্ণাহার , আমোদপুর , সিউড়ি , বোলপুর বা সন্নিকটস্থ স্থান থেকে) ঠাকুর ঘরের বারান্দাতেই দুপুরের খাবার পর বসে বা শুয়ে থাকতো বা থাকতে বাধ্য হোত! অনেকেই ঠাকুরঘরে ন’কাকার সঙ্গে দেখা করার জন্য বা একান্তে একটু কথা বলার জন্য অথবা একটু সেবা করার সুযোগ লাভের জন্য_ ঐ ঘরে ঢুকে পরে পড়তো। কেউ কেউ ন’কাকার একটু পদসেবা করার অছিলায় তার সংসারের খুঁটিনাটি সমস্যা নিয়ে আলোচনাটাও সেরে নিতো ৷ এইসব কারণে দুপুরের দিকে প্রায় কোনদিনই ন’কাকার বিশ্রাম হোত না!! (ক্রমশঃ)