[‘বীরভূমে ন’কাকা’ _এই প্রসঙ্গে কথা হচ্ছিল। কিন্তু তা করতে গিয়ে আমরা এখন আদিত্যপুর আশ্রমের রূপ ও বিকাশ নিয়ে একটু আলোচনা করা হচ্ছে! আর তাতেই কিছু উল্লেখযোগ্য character-দের আনতেই হচ্ছে! যেহেতু তারা প্রায় সবাই living character, তাই অনেকের কাছেই এটা একটু embarrassing! কিন্তু কি-ই করার!]
আগের দিন আলোচনা হচ্ছিল বিশুমামা ও তাঁর ভাগ্নেদের সম্বন্ধে! ওনার ভাগ্নেদের পরিবারের বড় ভাই গৌরের কথা আগের দিন বলা হয়েছে, ওর ছোট ভাই কৌশিক দত্ত (সিউড়ি কলেজের লেকচারার) গৌরদা(**ওনার আসল নাম তপন দত্ত, উনি এই কদিন আগে ২০২০-র জুন মাসে সেরিব্রাল অ্যাটাকে মারা গেলেন!**)-দের অনেকটাই পরে আশ্রম এর সাথে যুক্ত হয়েছিল । কিন্তু যখন থেকে যুক্ত হলো তখন থেকে যেন সবার চাইতে এগিয়ে গেল ! কৌশিক বা ওনার স্ত্রী চন্দ্রাও মামা বাবুর মতই আশ্রমের কাজে নিবেদিত প্রাণ ! আশ্রমের বা নন্দ মহারাজের যে কোন প্রয়োজনে প্রফেসর গৌতম ঘোষের মতোই সে ও সর্বদা ওনার পাশে থাকে।
সমস্ত ভক্তদের কথা বলতে গেলে পাঠকেরা বিরক্ত হবেন, তাই একবারে Frontline – এ যাদের দেখতাম, তাদের কথা একটু আধটু বলা হচ্ছে!
সেই হিসাবে আর একজনের কথা না বললেই নয় – তিনি হচ্ছেন আদিত্যপুর গ্রামের ধনপতি মুখুজ্জে ৷ অকৃতদার এই ছেলেটি এই আশ্রম প্রতিষ্ঠার প্রায় গোড়া থেকেই যুক্ত রয়েছেন ! ধনপতির সাথে গুরু মহারাজের স্থূলে দেখা হয়নি – কিন্তু তবুও এমন কিছু ঘটনা ঘটেছিল যাতে করে প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল যে, ধনপতির জীবনে গুরু মহারাজের সূক্ষ্ম উপস্থিতি রয়েছে (ঘটনাটা বোধহয় আগে বলা হয়েছে !)
এছাড়াও আদিত্যপুর গ্রামের মুখার্জি পরিবারের ক্ষমাপতি মুখার্জি এবং তাদের পরিবারের সকলে(স্ত্রী ছাড়াও _বিবাহিত কন্যারা) ধীরে ধীরে আদিত্যপুর পরমানন্দ মিশনের সাথে এবং বলাই বাহুল্য ন’কাকার সাথেও যুক্ত হয়েছিলেন!
এইভাবে গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দের করুণায় বোলপুর নিকটস্থ আদিত্যপুর আশ্রমটি ধীরে ধীরে বোলপুরের মতো সাংস্কৃতিক মনোভাবাপন্ন সমাজে একটা পরিচিতি লাভ করে গেল এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ও অন্যান্য সম্পদে সুন্দরভাবে সেজে উঠতে শুরু কোরলো ৷
আশ্রমটির ডোবা-পুকুরটিকে খনন করে চারিদিকে সেই মাটি ফেলে প্রচুর ফুল ও ফলের গাছ লাগানো হয়েছিল , সেগুলি যখনই ফুলে-ফলে ভরে ওঠে, তখন আশ্রমের শোভা যেন আরও বেড়ে যায়! এইভাবেই ধীরে ধীরে হোলেও বর্তমানে বেশ সুন্দরভাবে আশ্রমটির রূপরেখা তৈরি হয়েছে।
যাইহোক , আবার ন’কাকার প্রসঙ্গে ফিরে আসি ! ন’কাকার প্রথম আগমনের পর থেকেই আদিত্যপুর আশ্রমের রূপ ও বিকাশের কাজ যেন আরও দ্রুত হতে থাকে । বেশ কয়েকটি জমি (আশ্রম সংলগ্ন) কেনা হয় , দ্রুত কয়েকটি ঘর বাড়ি তৈরি হয়ে যায় ৷ অবশ্য এগুলি করার প্রয়োজন ‌ও হয়ে পড়েছিল – কারণ ন’কাকা এই আশ্রমে যাওয়া-আসা শুরু করার পর থেকেই – সমগ্র বীরভূম এবং দূরবর্তী স্থানেরও প্রচুর সংখ্যায় ভক্ত আদিত্যপুর আশ্রমমুখী হতে শুরু করেছিল !
সাধারণত ন’কাকা প্রতি বৎসর তিন-চারবার আদিত্যপুর আশ্রমে যেতেন-ই । উনি যখন যখন-ই ওই আশ্রমে যেতেন – তখন তখনই ওনাকে কেন্দ্র করে বয়ে যেতো আনন্দের বন্যা – বসে যেতো ভক্তজনের মেলা ! শয়ে শয়ে মানুষ পাগলের মতো ছুটে আসতো – ওই সরল , সাদাসিদে , সদাহাস্যময় মানুষটির কাছে !
সত্যি কথা বলছি – আমরা নিজেরাই অনেক সময় অবাক হয়ে যেতাম ! কি এমন আছে এই মানুষটির মধ্যে !!! কি দেখে এত মানুষ ওনার কাছে ছুটে ছুটে আসছে !!!
গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দের মধ্যে আধ্যাত্মিক ঐশ্বর্যের প্রকাশ ছিল , হাজার মানুষের মধ্যেও স্বামী পরমানন্দ থাকলে দূর থেকে তাঁর অপরূপ রূপ দেখে মানুষ বুঝতে পারতো_ যে ইনি একজন অনন্য মানুষ ! অতি বড় পাষণ্ডও যদি পাঁচ মিনিট গুরু মহারাজের স্বকন্ঠের মধুর বাণী শ্রবণ কোরতো – তাহলেই সে মুগ্ধ হোত এবং বুঝতে পারতো – তিনি একজন অসাধারণ জ্ঞানের অধিকারী ! আর যদি কেউ একটু তাঁর সঙ্গে মিশতো – তাহলেই সে বুঝতে পারতো স্বামী পরমানন্দ ছিলেন সাক্ষাৎ প্রেমস্বরূপ ! এই প্রেমের কোন তুলনা হয় না ! জাগতিক কোন সম্পর্ক , কোন স্নেহ-প্রেম-ভালোবাসার বন্ধন দিয়ে এনার অপার্থিব প্রেমের ব্যাখ্যা করা যাবে না !
ন’কাকার মধ্যে ঐশ্বর্যের দিকটা এতকিছু ছিল না _তবু ঐ একটা জায়গাতেই ন’কাকার সাথে গুরু মহারাজের মিল_প্রেমের জায়গায় ! ন’কাকার অত অত রূপ ছিল না – ওনার সৎসঙ্গের মধ্যে স্বরস্বতীর বীণার ঝংকার ছিল না – কিন্তু তাঁর ছিল অলৌকিক সারল্য আর অকৈতব প্রেম ! যে কেউ তাঁর কাছে এলেই – সাদরে তিনি তাকে গ্রহণ করতেন এবং প্রত্যেককে তার ন্যায্য মর্যাদাটুকু দিতেন ! ব্যস্ , এইটুকুই যথেষ্ট ! মানুষ কিন্তু অন্তরে এটাই চায় – বাইরে হয়তো সে অনেক কিছুই চায় কিন্তু মনের গোপন পুরে অন্তঃকরণের চাহিদার দিক থেকে বিচার করলে দেখা যাবে__একজন মানুষ আরেকজনের কাছে তার প্রাপ্য মর্যাদাটুকুই চায় ! সেইটা সে পরিবারে যথার্থভাবে পায় না – সমাজে পায় না , কর্মস্থানে পায় না , বরং প্রতিক্ষেত্রে সে পায় প্রতিযোগিতা , অসহযোগিতা – সে শুধু অপমান-অমর্যাদা-ঈর্ষা-হিংসা-নিন্দার শিকার হয় ! এইটাই তো প্রতিটি সংসারী মানুষের জীবন-যন্ত্রণার অন্যতম একটা কারণ!
আর এইজন্যেই মানুষ কোনো মহাপুরুষের সন্ধান পেলে সেখানে পাগলের মতো ছুটে ছুটে যায় ! ত্রিতাপজ্বালায় দগ্ধ মানুষের জীবনে যে খুব বেশি বেশি করে প্রয়োজন হয়_ একজন মহাপুরুষের ! যিনি তাঁর কাছে আসা সকল মানুষকে ভালোবাসবেন ! কেমন ভালোবাসবেন , না – প্রত্যাশাবিহীন ভালোবাসবেন ! তিনি ধনী-নির্ধন , উচ্চ-নীচ , ছোট-বড় , নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলকে মর্যাদা দেন ! কেমন মর্যাদা দেন? না – যে যতটা মর্যাদা পাওয়ার উপযুক্ত – তাকে ততটাই মর্যাদা দেন ।(ক্রমশঃ)