বীরভূমের বিভিন্ন প্রান্তে ন’কাকা যখন যেতেন _তখন স্থানীয় মানুষের কাছে আমরা প্রায়ই শুনতাম যে বামদেব ঐ অঞ্চলে আসতেন এবং তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে কোনো না কোনো মন্দির‌ও রয়েছে! ‘কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব হোত’__এইকথা জিজ্ঞাসা করলে ন’কাকা বলেছিলেন, “বামদেব বেশিরভাগ সময়েই আকাশমার্গ অবলম্বন করে গভীর রাত্রিতে চলাফেরা করতেন ! যার ফলে উনি সন্ধ্যা পর্যন্ত তারাপীঠে কাটিয়েও রাতারাতি সিউড়ি , অট্টহাস , লাভপুর ইত্যাদি স্থান ছাড়াও আরও নানা জায়গায় চলে আসতেন ! সেখানকার মানুষ ওনাকে পেয়ে আনন্দ কোরতো , নানান গল্প-গুজব হোত ! বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বামদেব কোন না কোন দেবী মন্দিরে গিয়ে উঠতেন – সেখানে দেবীর পূজাও করতেন ! সেই সব মন্দিরগুলি আজও বামদেবের স্মৃতিবিজড়িত স্থান – সেখানে আজও ভক্তকুল আসা-যাওয়া করে , মায়ের পুজো দেয় , আর ঐ মহাপুরুষের আগমনের ফলে সৃষ্ট উন্নত ভাবরাশির স্পর্শ পেয়ে ধন্য হয় মানুষজন !”
তীর্থ দর্শনের , মঠ-মিশন-মন্দিরে পূজা দেবার এটাই তো সার্থকতা ! ঐ সব স্থানে উন্নত মহামানবেরা কোনো না কোনো সময় পদার্পণ করেছেন এবং শক্তি প্রদান করেছেন __তাঁদের দেওয়া সেই উন্নত Vibration__ স্থানটিতে আজও বিদ্যমান ! তাই আজ‌ও যখন সেখানে সাধারণ মানুষজন যায় – তাদের মধ্যে সাময়িক ভক্তিভাব জাগ্রত হয় , আর সেই সময়ে ঐ মহাপুরুষদের দেওয়া উন্নত Vibration ভক্তদের শরীরে-মনে সঞ্চারিত হয় ! এইজন্যেই কোন মঠ-মিশন-মন্দির বা তীর্থস্থানে গেলে মানুষের মনে একটা প্রশান্তির ভাব আসে ৷৷
এবার আমরা আবার ফিরে আসি ‘আদিত্যপুর আশ্রমে ন’কাকা’-র কথায় ! প্রথমদিকে (২০০৬/০৭ সালে) ন’কাকা যখন আদিত্যপুর আশ্রমে যেতেন – তখন খুব একটা বেশি লোকজন হোত না ! বনগ্রাম আশ্রমের পুরোনো ভক্তরা , যাদের বীরভূম অঞ্চলে বাড়ি – তারাই সকলে আসতো ! ওই অঞ্চলের পুরোনো ভক্তদের একটা মিলনস্থল হয়ে উঠেছিল – আদিত্যপুর আশ্রম ! এরপরে সমগ্র বীরভূমের প্রান্তে ন’কাকাকে পৌঁছে দেবার অন্যতম ভূমিকা ছিল কীর্ণাহারের সনৎকাকার !
প্রথমেই সনৎকাকা ন’কাকাকে সঙ্গে করে নিয়ে কীর্ণাহার , সিউড়ি , আমোদপুর ইত্যাদি বিভিন্ন স্থানে ওনার আত্মীয়দের বাড়ি বাড়ি যেতে শুরু করলেন । ন’কাকা যে বাড়িতেই যেতেন সেখানে তাদের কিছু আত্মীয়-স্বজন বা পারিবারিক বন্ধু-বান্ধব সহ অন্যান্য লোকজন এসে ভিড় জমাতো! তারাও পরে আবার ন’কাকার ভক্ত হয়ে যেতো!
সনৎকাকার শ্বশুরবাড়ি আমোদপুর ৷ সেখানে ওনার শ্যালক মাস্টারমশাই (মিহির বাবু) ও ওনার স্ত্রী এবং ওনার দুই ছেলে ভোলা এবং লাল্টু , এমনকি ভোলার স্ত্রী সকলেই ন’কাকার প্রতি খুব দ্রুত অনুরক্ত হয়ে উঠেছিল । সেই সময় কি হয়েছিল – বনগ্রাম আশ্রমের সাথে যাদেরই একটু আধটু পরিচয় ছিল , তারা সবাই জানতো যে, গুরু মহারাজ (স্বামী পরমানন্দ) আর শরীরে নাই , কিন্তু ন’কাকাও আর একজন মহাপুরুষ! তাহলে তাকে হাতের কাছে পেয়েছি যখন – আর ছাড়ি কেন ? ভোলারা দীক্ষা নিয়ে নিল , লাল্টুর বন্ধু হিসাবে (বা পরিচিত হিসাবে) আসতে শুরু করলো উদয় এবং চন্দন (উদয় চ্যাটার্জি এবং চন্দন মুখার্জি) । উদয় মার্কেটিং-এ চাকরি করে – অল্পস্বল্প রোজগার , তার মধ্যে বিয়ে করেছে মানবীর সাথে ৷ ওদের একটা বাচ্চা হয়েছে – মেয়েটির ছোটবেলাতেই শরীরে একটা অসুবিধা নিয়েই জন্মেছিল ! সেই অসুবিধা সামগ্রিকভাবে দূর করতে শিশু অবস্থাতেই ওটার অপারেশন করাতেই হবে ! এই ঘটনায় ঐ দম্পতি খুবই ভয়ে ভয়ে ছিল !
কিন্তু ভয় কি ? তোমরা তো বীরভূমের লোক! তোমাদের ন’কাকা আছেন তো !
উদয়ের আকুল আবেদনে সাড়া দিয়ে ন’কাকা রাজি হলেন ওর বাড়ি যেতে! ন’কাকার সাথে সেখানে গিয়ে আমরা দেখলাম শিশুকন্যাটিকে [এখন(২০১৯) আট-দশ বছর বয়স হয়ে গেছে] ! ন’কাকা আশীর্বাদ করলেন – অপারেশন হোল , শিশুটি একেবারে সুস্থ হয়ে গেল !
উদয়ের বন্ধু চন্দন তখন টুইশানি পড়াতো । চন্দন যখনই ন’কাকার সাথে দেখা করতে আসতো – ওর সাথে ওর ছাত্র-ছাত্রীদেরকেও নিয়ে আসতো । তাদের মধ্যে একটি মেয়েকে খুবই আনতো – আমি ভাবতাম ওই মেয়েটি বোধহয় ওর আত্মীয়-স্বজন অথবা #স্বজন হতে চলেছে ! কিন্তু আমার ভাবনা ভুল প্রমাণ করে চন্দন কিছুদিনের মধ্যেই সঞ্চিতাকে বিয়ে করে বসল ! ন’কাকা আমাকে বলেছিলেন চন্দনের ছাত্রীটি খুবই ভালো মেয়ে !
পরে দেখতাম ওই মেয়েটি ওর ভাইকে নিয়ে একা একাই ন’কাকার কাছে আসতো! কিছুদিনের মধ্যেই শুনলাম মেয়েটি (তখন হয়ত কলেজে পড়তো) হঠাৎ করে মারা গেছে !ঐ মেয়েটি যখন ন’কাকার কৃপা পেয়েছিল তখন তার নিশ্চয়ই পরবর্তী জন্ম ভালো হবেই!
চন্দনের স্ত্রী সঞ্চিতা খুবই ভক্তিমতি মেয়ে! ন’কাকা আমোদপুরে যখন চন্দনের বাড়ি গিয়েছিলেন – হয়তো তখন চন্দন ন’কাকার বাড়িতে ব্যবহার করার জন্য একজোড়া চটিজুতো কিনে এনেছিল, অথবা অন্য কোন ভাবে ন’কাকার একজোড়া নতুন চটি পেয়েছিল।
ন’কাকা পড়েছিলেন সেই চটি! সঞ্চিতা এমন ভক্তিমতী মেয়ে যে, ন’কাকা চলে যাবার পর দিন থেকে সে ন’কাকার পড়া সেই চটি দুটো ঠাকুরের আসনে বিভিন্ন দেবদেবী এবং গুরু মহারাজ (স্বামী পরমানন্দ)-এর ফটোর নিচে রেখে নিয়মিত পুজো করতে শুরু করেছিল ! সঞ্চিতা আমাকে বলেছিল – ও নাকি মাঝে মাঝে ওই চটি-তে ধুলোবালি লেগে থাকতে দেখে ; তাই ওর মনে হয় নিশ্চয়ই মাঝে মাঝে ন’কাকা ওর বাড়ি আসেন এবং ওই চটি পায়ে দিয়ে ঘোরাফেরা করেন !
একথা শুনে আমার মনে হয়েছিল __চটির ওই ধুলোবালি উড়ে এসেও তো লাগতে পারে, – তবু ওই মেয়েটির বিশ্বাস আমাকে মুগ্ধ করেছিল , ভেবেছিলাম ঐরকম অকপট বিশ্বাস যদি আমারও থাকতো !!(ক্রমশঃ)