[বীরভূমে ন’কাকা প্রসঙ্গে কথা বলতে গেলেই ওনাকে কেন্দ্র করে যে সমস্ত ভক্ত মন্ডলী গড়ে উঠেছিল _তাদের কথা বলতেই হবে! গুরুমহারাজ একবার বলেছিলেন _”সদগুরু(বা মহাপুরুষ)-রা হোলেন বারবধূর মতো! ভালো-মন্দ, ধনী-নির্ধন, উচ্চ-নীচ ইত্যাদি সকলকে সন্তুষ্ট করাটাই তাঁর কাজ! সুতরাং তাঁদের শরীরধারন রূপ লীলায় _কত শত-সহস্র মানুষের সাথে তাঁদের যোগাযোগ হয় এবং তাদেরকে কত আলাদা আলাদা style – এ satisfied করতে হয় _সেগুলি জানাটাও তো কম লীলা নয় !]
ন’কাকার সাথে যখন থেকে আমি আদিত্যপুর যেতে শুরু করলাম – তখনও ওই আশ্রমে চিন্ময় ডাক্তার (চিন্ময় ব্যানার্জি হোমিওপ্যাথি ডাক্তার , বাড়ি বীরভূমের দুবরাজপুরে , কলকাতার বউবাজারে এবং বীরভূমে আরও দু-এক স্থানে চেম্বার রয়েছে) আসা যাওয়া শুরু করেনি ৷ তবে এর দু-তিন বছরের মধ্যেই চিন্ময় আদিত্যপুর আশ্রম এবং ন’কাকার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে গিয়েছিল ৷ পরবর্তীতে ওর সাথে ন’কাকার সম্পর্ক এতটাই গভীর হয় যে , ডঃ চিন্ময়কে ন’কাকা- ন’কাকিমার সন্তান বললেও অত্যুক্তি হয় না! চিন্ময় ডাক্তার, বীরভূমের হেতমপুরের প্রখ্যাত যোগী, পরমসাধক ও মহাবাউল জয়শংকর বাবার আশীর্বাদপুষ্ট ! জয়শংকর বাবা খুবই উন্নত অবস্থার যোগী ছিলেন – ওনার জয়দেব-কেঁদুলিতেও আশ্রম রয়েছে ৷ উনি প্রায় (পুরোপুরি একশ!) একশ বছর বয়সে শরীর ছেড়েছিলেন । চিন্ময় ডাক্তারের দৌলতে আদিত্যপুর আশ্রমের নন্দ মহারাজের সাথেও জয়শংকর বাবার আলাপ হয়েছিল । উনি নন্দ মহারাজকেও খুব স্নেহ করতেন ৷
আমি একবার চিন্ময় ডাক্তার এবং নন্দ মহারাজের সাথে হেতমপুর আশ্রমে গিয়েছিলাম । ওখানে গিয়ে দেখলাম বাবার বয়স তখন ৯৯+ (আমাদের যাবার ১/২ মাসের মধ্যেই উনি শরীর ছেড়েছিলেন) ! ওনার একমাত্র সন্ন্যাসী শিষ্য ব্রহ্মচারী বাবার বয়স তখন প্রায় ৮০ , কিন্তু বাবার কাছে তিনি তখনও ছেলেমানুষ অর্থাৎ জয়শংকর বাবার ছেলে হয়েই জীবন কাটাচ্ছেন ! আমরা ঐ আশ্রমে পৌঁছে যখন ব্রহ্মচারী বাবার কুঠিয়ার সামনে গেলাম – তখন দেখলাম উনি দু-একজন অতিথি সাধু-ব্রহ্মচারীর সাথে কথা বলছেন – ঈশ্বরীয় কথা ! বলার মধ্যে এবং গলার মধ্যে যথেষ্ট ‘দম’ রয়েছে – বোঝা গেল উনি যেটা জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছেন – সেটাই বলছেন ! বই পড়া কথা বা কোনো শোনা-কথা ‘বমি’ করছেন না ! খুব ভালো লেগেছিলো ব্রহ্মচারী বাবাকে ! পরবর্তীতে উনি বেশ কয়েকবার আদিত্যপুর আশ্রমে এসেছেন – আমরাও গেছি – ফলে ওনার সাথে বহুবার আলাপ করার সুযোগ হয়েছিল ।
কিন্তু জয়শঙ্কর বাবার সাথে হেতমপুরে আমাদের সেবারই শেষ সাক্ষাৎ ! ন’কাকার সাথে ওনার স্থূলে সাক্ষাৎ হয়নি – অন্যভাবে হয়েছিল – সে কথায় পরে আসছি , আগে আমি ওই সাধুবাবাকে কেমন দেখেছিলাম সেইটা বলে নিই ? আমরা (নন্দ মহারাজ , চিন্ময় ডাক্তার ও আমি) যখন হেতমপুরে জয়শংকর বাবার আশ্রমে গিয়ে পৌঁছালাম – তখন সন্ধ্যাবেলা । ওখানকার কালী মন্দিরে সন্ধ্যারতি হচ্ছিল ৷ বেশ কিছু স্থানীয় ভক্তরা আরতি দর্শনের জন্য সেখানে জড়ো হয়েছিল। আমরাও নাটমন্দিরে বসে আরতি দেখতে লাগলাম । পুরোহিত মশাই সন্ধ্যারতির কাজ শেষ করে উপস্থিত সকলকে প্রসাদ বিতরণ করতে শুরু করলেন – আমরাও পেলাম কিছু প্রসাদ ! এরপরই মন্দির প্রাঙ্গণ ফাঁকা হয়ে গেলো – তখন ব্রহ্মচারী বাবা আমাদেরকে ডেকে নিয়ে গেলেন জয়শংকর বাবার কুঠিয়ায় (ঘরে) !
ওটা মন্দির সংলগ্ন একটা ছোট ঘর , সামনে একটু বারান্দা । ঘরে গিয়ে দেখলাম একটা ছোট চৌকিতে মশারি টাঙানো রয়েছে , বাইরে থেকে গেরুয়া চাদরের অংশ দেখা যাচ্ছে ! ব্রহ্মচারী বাবা একটু জোরে জোরেই হেঁকে বললেন – ” ওই দেখো , চিন্ময় ডাক্তার এসেছে – তোমার গোপাল(জয়শংকর বাবা ডাক্তার চিন্ময়কে” গোপাল” বলেই সম্বোধন করতেন) ! আর আদিত্যপুর আশ্রমের সেই ছেলেটা (নন্দ মহারাজ , নন্দ মহারাজের তখন বয়স ৫০-৫২ , কিন্তু জয়শংকর বাবার কাছে ছেলে !) এসেছে , আরও একজন ওদের সাথে এসেছে !”
ব্রহ্মচারী বাবার কথা শেষ হতেই মশারির ভেতর থেকে প্রথমে বেরিয়ে এলো অত্যন্ত শীর্ণ, ধবধবে ফর্সা দুটি হাত – তারপরে সাদা চুল , সাদা দাড়ি সমন্বিত একটি অতিবৃদ্ধ সন্ন্যাসীর প্রসন্ন মুখ ! প্রথমেই তিনি সেই দুটি হাত দিয়ে চিন্ময় ডাক্তারের মাথায়, গায়ে_মুখে হাত বোলাতে বোলাতে কত আদর করলেন ! স্নেহপূর্ণ বাক্যে ডাক্তারের কত প্রশংসা করলেন , ওকে কিছু নির্দেশও দিলেন ! তারপর বললেন – “আরো কে কে এসেছে বললে যে , তারা কই ?” আমরা চৌকির নিচেই পাশাপাশি বসেছিলাম , ব্রহ্মচারী বাবা আমাদের পিছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন । উনি বলে দিলেন _”এইতো আদিত্যপুর আশ্রমের সাধু! তুমি তো ওকে দেখতে চাইছিলে! তাই এসেছে!”
ফলে নন্দ মহারাজ ওনার মাথাটা একটু এগিয়ে নিয়ে যেতেই – এবার নন্দ মহারাজের মাথায়-মুখে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে কত আদর করলেন – যেন স্নেহ-করুণা-ভালবাসা ঝরে ঝরে পড়ছিল ! উনি আদর করছিলেন আর কেবল বলছিলেন – ” বলো ! ‘হরিবোল’ , ‘হরিবোল’ – শিবদূর্গা শিবদুর্গা বলো ! কালী – কালী বলো ! বলো – বলো – সবাই মিলে বলো ! তোমাদের সবার মঙ্গল হবে – সবার কল্যাণ হবে ! ঠাকুরের নাম করো! __আর কে এসেছে !” ব্রহ্মচারী বাবা হেঁকে বললেন – “আর একটা ছেলে এসেছে আদিত্যপুর আশ্রম থেকে ওদের সাথে !” উনি আবার সেই শীর্ণকায় ফর্সা হাত দুটি বাড়িয়ে বললেন – “কই – কই , কে এসেছে – সবার ভালো হোক – সবার মঙ্গল হোক । খুব ভালো হবে – সবার মঙ্গল হবে !” – এই বলতে বলতে আমারও মাথায়-মুখে হাত বুলিয়ে দিলেন!
সেদিন সেই সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে সারাজীবনের ত্যাগ – তপস্যায় সিদ্ধ ওই অপাপবিদ্ধ পবিত্রপ্রান বৃদ্ধ সন্ন্যাসীর কাছে এই অযাচিত স্নেহ পেয়ে আমার দু-চোখে জলের ধারা কিছুতেই বাধা মানছিল না !(ক্রমশঃ)
ন’কাকার সাথে যখন থেকে আমি আদিত্যপুর যেতে শুরু করলাম – তখনও ওই আশ্রমে চিন্ময় ডাক্তার (চিন্ময় ব্যানার্জি হোমিওপ্যাথি ডাক্তার , বাড়ি বীরভূমের দুবরাজপুরে , কলকাতার বউবাজারে এবং বীরভূমে আরও দু-এক স্থানে চেম্বার রয়েছে) আসা যাওয়া শুরু করেনি ৷ তবে এর দু-তিন বছরের মধ্যেই চিন্ময় আদিত্যপুর আশ্রম এবং ন’কাকার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে গিয়েছিল ৷ পরবর্তীতে ওর সাথে ন’কাকার সম্পর্ক এতটাই গভীর হয় যে , ডঃ চিন্ময়কে ন’কাকা- ন’কাকিমার সন্তান বললেও অত্যুক্তি হয় না! চিন্ময় ডাক্তার, বীরভূমের হেতমপুরের প্রখ্যাত যোগী, পরমসাধক ও মহাবাউল জয়শংকর বাবার আশীর্বাদপুষ্ট ! জয়শংকর বাবা খুবই উন্নত অবস্থার যোগী ছিলেন – ওনার জয়দেব-কেঁদুলিতেও আশ্রম রয়েছে ৷ উনি প্রায় (পুরোপুরি একশ!) একশ বছর বয়সে শরীর ছেড়েছিলেন । চিন্ময় ডাক্তারের দৌলতে আদিত্যপুর আশ্রমের নন্দ মহারাজের সাথেও জয়শংকর বাবার আলাপ হয়েছিল । উনি নন্দ মহারাজকেও খুব স্নেহ করতেন ৷
আমি একবার চিন্ময় ডাক্তার এবং নন্দ মহারাজের সাথে হেতমপুর আশ্রমে গিয়েছিলাম । ওখানে গিয়ে দেখলাম বাবার বয়স তখন ৯৯+ (আমাদের যাবার ১/২ মাসের মধ্যেই উনি শরীর ছেড়েছিলেন) ! ওনার একমাত্র সন্ন্যাসী শিষ্য ব্রহ্মচারী বাবার বয়স তখন প্রায় ৮০ , কিন্তু বাবার কাছে তিনি তখনও ছেলেমানুষ অর্থাৎ জয়শংকর বাবার ছেলে হয়েই জীবন কাটাচ্ছেন ! আমরা ঐ আশ্রমে পৌঁছে যখন ব্রহ্মচারী বাবার কুঠিয়ার সামনে গেলাম – তখন দেখলাম উনি দু-একজন অতিথি সাধু-ব্রহ্মচারীর সাথে কথা বলছেন – ঈশ্বরীয় কথা ! বলার মধ্যে এবং গলার মধ্যে যথেষ্ট ‘দম’ রয়েছে – বোঝা গেল উনি যেটা জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছেন – সেটাই বলছেন ! বই পড়া কথা বা কোনো শোনা-কথা ‘বমি’ করছেন না ! খুব ভালো লেগেছিলো ব্রহ্মচারী বাবাকে ! পরবর্তীতে উনি বেশ কয়েকবার আদিত্যপুর আশ্রমে এসেছেন – আমরাও গেছি – ফলে ওনার সাথে বহুবার আলাপ করার সুযোগ হয়েছিল ।
কিন্তু জয়শঙ্কর বাবার সাথে হেতমপুরে আমাদের সেবারই শেষ সাক্ষাৎ ! ন’কাকার সাথে ওনার স্থূলে সাক্ষাৎ হয়নি – অন্যভাবে হয়েছিল – সে কথায় পরে আসছি , আগে আমি ওই সাধুবাবাকে কেমন দেখেছিলাম সেইটা বলে নিই ? আমরা (নন্দ মহারাজ , চিন্ময় ডাক্তার ও আমি) যখন হেতমপুরে জয়শংকর বাবার আশ্রমে গিয়ে পৌঁছালাম – তখন সন্ধ্যাবেলা । ওখানকার কালী মন্দিরে সন্ধ্যারতি হচ্ছিল ৷ বেশ কিছু স্থানীয় ভক্তরা আরতি দর্শনের জন্য সেখানে জড়ো হয়েছিল। আমরাও নাটমন্দিরে বসে আরতি দেখতে লাগলাম । পুরোহিত মশাই সন্ধ্যারতির কাজ শেষ করে উপস্থিত সকলকে প্রসাদ বিতরণ করতে শুরু করলেন – আমরাও পেলাম কিছু প্রসাদ ! এরপরই মন্দির প্রাঙ্গণ ফাঁকা হয়ে গেলো – তখন ব্রহ্মচারী বাবা আমাদেরকে ডেকে নিয়ে গেলেন জয়শংকর বাবার কুঠিয়ায় (ঘরে) !
ওটা মন্দির সংলগ্ন একটা ছোট ঘর , সামনে একটু বারান্দা । ঘরে গিয়ে দেখলাম একটা ছোট চৌকিতে মশারি টাঙানো রয়েছে , বাইরে থেকে গেরুয়া চাদরের অংশ দেখা যাচ্ছে ! ব্রহ্মচারী বাবা একটু জোরে জোরেই হেঁকে বললেন – ” ওই দেখো , চিন্ময় ডাক্তার এসেছে – তোমার গোপাল(জয়শংকর বাবা ডাক্তার চিন্ময়কে” গোপাল” বলেই সম্বোধন করতেন) ! আর আদিত্যপুর আশ্রমের সেই ছেলেটা (নন্দ মহারাজ , নন্দ মহারাজের তখন বয়স ৫০-৫২ , কিন্তু জয়শংকর বাবার কাছে ছেলে !) এসেছে , আরও একজন ওদের সাথে এসেছে !”
ব্রহ্মচারী বাবার কথা শেষ হতেই মশারির ভেতর থেকে প্রথমে বেরিয়ে এলো অত্যন্ত শীর্ণ, ধবধবে ফর্সা দুটি হাত – তারপরে সাদা চুল , সাদা দাড়ি সমন্বিত একটি অতিবৃদ্ধ সন্ন্যাসীর প্রসন্ন মুখ ! প্রথমেই তিনি সেই দুটি হাত দিয়ে চিন্ময় ডাক্তারের মাথায়, গায়ে_মুখে হাত বোলাতে বোলাতে কত আদর করলেন ! স্নেহপূর্ণ বাক্যে ডাক্তারের কত প্রশংসা করলেন , ওকে কিছু নির্দেশও দিলেন ! তারপর বললেন – “আরো কে কে এসেছে বললে যে , তারা কই ?” আমরা চৌকির নিচেই পাশাপাশি বসেছিলাম , ব্রহ্মচারী বাবা আমাদের পিছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন । উনি বলে দিলেন _”এইতো আদিত্যপুর আশ্রমের সাধু! তুমি তো ওকে দেখতে চাইছিলে! তাই এসেছে!”
ফলে নন্দ মহারাজ ওনার মাথাটা একটু এগিয়ে নিয়ে যেতেই – এবার নন্দ মহারাজের মাথায়-মুখে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে কত আদর করলেন – যেন স্নেহ-করুণা-ভালবাসা ঝরে ঝরে পড়ছিল ! উনি আদর করছিলেন আর কেবল বলছিলেন – ” বলো ! ‘হরিবোল’ , ‘হরিবোল’ – শিবদূর্গা শিবদুর্গা বলো ! কালী – কালী বলো ! বলো – বলো – সবাই মিলে বলো ! তোমাদের সবার মঙ্গল হবে – সবার কল্যাণ হবে ! ঠাকুরের নাম করো! __আর কে এসেছে !” ব্রহ্মচারী বাবা হেঁকে বললেন – “আর একটা ছেলে এসেছে আদিত্যপুর আশ্রম থেকে ওদের সাথে !” উনি আবার সেই শীর্ণকায় ফর্সা হাত দুটি বাড়িয়ে বললেন – “কই – কই , কে এসেছে – সবার ভালো হোক – সবার মঙ্গল হোক । খুব ভালো হবে – সবার মঙ্গল হবে !” – এই বলতে বলতে আমারও মাথায়-মুখে হাত বুলিয়ে দিলেন!
সেদিন সেই সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে সারাজীবনের ত্যাগ – তপস্যায় সিদ্ধ ওই অপাপবিদ্ধ পবিত্রপ্রান বৃদ্ধ সন্ন্যাসীর কাছে এই অযাচিত স্নেহ পেয়ে আমার দু-চোখে জলের ধারা কিছুতেই বাধা মানছিল না !(ক্রমশঃ)
