[ন’কাকার করুনার কথা কত আর বলব_তবু বলছি! আমার নিজের ব্যাপারেও ন’কাকা যে কতটা করুনাময় ছিলেন __তার দু-একটা উদাহরণ এখানে তুলে ধরছি! একান্ত ব্যক্তিগত কথা __হয়তো বলা উচিত নয়, তবু বলছি! যদি পাঠকদের বিরক্তি উৎপাদন করে _তাই আগে থেকেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি!]
…… আর একদিনের কথা এইখানেই বলে নিই – সেটা প্রথম প্রথম ন’কাকা শ্রীরামপুরে যেতে শুরু করার (২০০৪/২০০৫) অনেক পরের কথা ! সম্ভবত ২০১০ সালের কথা ! আমার ছেলে হর্ষ লিলুয়ায় M.C.K.V. ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ইলেক্ট্রিক্যাল বিভাগে ভর্তি হবার পর প্রথম যেদিন নতুন ছাত্র ও তাদের Guardian-দের পরিচিতি বা সমাবর্তন ছিল! ইনস্টিটিউশন থেকে আমন্ত্রণ পেয়ে ঐ দিনে লিলুয়ায় M.C.K.V. Institution-এ অভিভাবক হিসেবে যাবার জন্য আমি ন’কাকাকে অনুরোধ জানাতেই – উনি রাজি হয়ে গেলেন ! আমাকে ফোনে বললেন – ” তা – ওই সময় আমার তো তেমন কোন কাজ নাই – তাহলে তোমাদের সাথে একবার হর্ষ-র নতুন কলেজে গেলেও হয় – একবার দেখে আসা যাবে !”
নির্দিষ্ট দিনের আগের দিন আমি শ্রীরামপুরে (আমার শ্বশুরবাড়ি) চলে গেছি – ন’কাকাও প্রথমে ওখানেই (অসীমদার বাড়ি অর্থাৎ ন’কাকার শ্যালিকার বাড়ি) উঠবেন – তাই আমরা সকাল থেকেই অপেক্ষা করছি ন’কাকার আগমনের ! কিন্তু সেদিন সকাল থেকে সে কি বৃষ্টি ! একেবারে আকাশ ভাঙ্গা বৃষ্টি ! ন’কাকা শেওড়াফুলি স্টেশনে ভিজতে ভিজতেই নামলেন , আমি স্টেশনে অপেক্ষা করছিলাম । আমার তো ছিলই – ওনার কাছেও ছাতা ছিল , তাও আমরা দুজনেই স্টেশন থেকে বাইরে আসতে আসতেই ভিজে গেলাম ৷ এরপর অটো ধরে এবং খানিকটা হেঁটে অসীমদার বাড়ি পৌঁছানো পর্যন্ত সত্যি সত্যিই একেবারে ভিজে যা তা অবস্থা !
যাইহোক অসীমদার বাড়ি পৌঁছে উনি কাপড়-চোপড় পাল্টে ফ্রেশ হয়ে বসলেন – কিছুক্ষণ পরেই গরম গরম খিচুড়ি-বেগুনভাজা ইত্যাদি সহযোগে দুপুরের খাবার একটু আগেভাগেই সেরে নেওয়া হলো – কারণ এবার আমাদেরকে লিলুয়া যেতে হবে ! বৃষ্টি সমানে হয়েই চলেছে – তার মধ্যেই আমরা তিনজনে (আমি ন’কাকা ও হর্ষ) বেরিয়ে পড়লাম ছাতা নিয়ে – আবার ভেজা ! রাস্তায় এত জল জমে গেছে যে একটা রিক্শা পর্যন্ত পাওয়া গেল না ! স্ট্যান্ডে ছাতা মাথায় অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েও কোন যানবাহন পাওয়া গেল না – জি.টি.রোডের উপর দিয়ে জলের স্রোত বয়ে যাচ্ছে ! ন’কাকা বললেন – ” দাঁড়িয়ে থেকে আর কি হবে বাবা – চলো হেঁটেই স্টেশনে চলে যাই ।” ওই বৃষ্টির মধ্যে প্রায় এক হাঁটু জল ভেঙে ভেঙে, পৌনে এক কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে আমরা শেওড়াফুলি স্টেশনে পৌঁছালাম । ন’কাকা ধুতি গুটিয়ে চাষী লোকের মত উপরে তুলে নিয়েছিলেন , আমরাও প্যান্ট হাঁটুর উপরে তুলে হাঁটছিলাম !
তারপর আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে , ট্রেনে ওঠার কিছুক্ষণ পরেই বৃষ্টি থেমে গেল ! আমরা তিনজনে লিলুয়ায় নেমে লোককে জিজ্ঞাসা করতে করতে (হর্ষ ও জানতো না কারণ ওইদিনই হর্ষর-ও প্রথম ওখানে যাওয়া! ভর্তি তো কাউন্সিলিংয়ের সময়েই হয়ে গিয়েছিল !) M.C.K.V. Institution-এ পৌঁছালাম ৷
বিশাল গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকে, একটা বড় প্রাঙ্গণ পেড়িয়ে main building – এ ঢুকলাম। ওখানে নিচতলায় underground-এ বিশাল একটা air conditioned হলঘর রয়েছে , যেখানে এই সভাটি অনুষ্ঠিত হচ্ছিল ! বেলুড় মঠ থেকে সন্ন্যাসীরা আমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন , তাছাড়া বিভিন্ন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের অধ্যক্ষ এবং ওই ইনস্টিটিউটের প্রধানেরা মঞ্চে উপস্থিত ছিল। নিচে প্রচুর ছেলেমেয়ে এবং তাদের অভিভাবকরা বসে ছিল! আমরাও তিনজন ওখানে গিয়ে পাশাপাশি গদি চেয়ারে আরাম করে বসলাম ।
অনুষ্ঠানের সূচনা হ’ল – রামকৃষ্ণ মিশনের একজন সন্ন্যাসী (যিনি বেলুড় টেকনিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ) বক্তব্য শুরু করলেন ৷ আমরা অবাক হয়ে দেখলাম (আমি আর হর্ষ) অল্পক্ষনের মধ্যেই ন’কাকা কিন্তু সুন্দর ভাবে ঘুমিয়ে গেলেন ! হর্ষ তখন বয়সে ছোট (১৭ বছর) – ও সেদিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করায় , আমি ওকে কানে কানে বললাম – ” উনি কি আর ঘুমোচ্ছেন রে – উনি পুরো ব্যাপারটা একবার দেখে নিচ্ছেন !” আমার কথার সত্যতা প্রমাণের এবং আমাদের অবাক হবার আরও যথেষ্ট কারণ ছিল – আমরা সবিস্ময়ে দেখছিলাম ঘুমন্ত অবস্থাতেও উনি মাঝে মাঝেই বক্তাদের কথায় সবার সাথে হাততালি দিচ্ছিলেন ! একবার কোন বক্তা যখন কোন ব্যাপারে ওনার প্রস্তাবে অভিভাবকেরা সম্মত হলে যেন হাত তুলে তা সমর্থন করে – এ কথা বলায় ন’কাকা ঘুমন্ত অবস্থাতেই (দীর্ঘক্ষণ মাথা নিচু করে ঢুলে পরা অবস্থায় তিনি ছিলেন) উনি হাত তুলে সমর্থন জানালেন ৷
সেদিন অত কষ্ট করে হর্ষর নতুন ইনস্টিটিউটে যাবার পর ন’কাকার সাথে একা একা বহুক্ষণ কাটানোর সুযোগ পেয়ে খুবই আনন্দ লেগেছিল । আমার আনন্দ আরও বেড়ে গেল – যখন ন’কাকা টিফিন খেতে রাজী হওয়ায়, তাঁর অনুমতিক্রমে আমরা ২/৩ ঘন্টা পর হলঘর থেকে বেরিয়ে আমন্ত্রিতদের জন্য বরাদ্দকৃত টিফিন খাবার জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় গেলাম । ওখানে বাথরুমে একটু চোখেমুখে জল নিয়ে ফ্রেশ হয়ে জমিয়ে টিফিন খাওয়া হলো –টিফিনটা তো ভালো ছিলই, ওরা কফিটাও দিয়েছিল খুব ভালো! এক কাপ করে খাওয়ার কিছুক্ষণ পর ন’কাকা বললেন – “আজকে যা ভেজা হয়েছে , তাতে যদি আরও এক কাপ কফি পাওয়া যায় তো বেশ হয় !” ন’কাকার আদেশ পাওয়াতেই ছুটে গেলাম কাউন্টারে – সেখান থেকে আবার দু-কাপ কফি নিয়ে এসে হাসতে হাসতে আনন্দ করতে করতে খাওয়া !সম্ভবত একটা টিফিনও এক্সট্রা নিয়ে আসা হয়েছিল! সেই সব আনন্দমুখর দিনগুলি কি আর আমার জীবনে কখনো ফিরে আসবে??!!
বিকালের দিকে আর বৃষ্টি হলো না , ফলে শ্রীরামপুরে ফিরে আসার সময় আমাদের কোন অসুবিধাই হয়নি । রাত্রে ঘরোয়াভাবে কিছু আলোচনা হল , আমি ভেবেছিলাম হয়তো উনি পরের দিন সকালে ওখানকার ভক্তদের খবর দেবেন এবং হয়তো গৌতমের বাড়ি বা সুদর্শন মাস্টারমশাইয়ের বাড়ি যাবেন এবং সেখানে সিটিং এর একটা ব্যবস্থা করা হবে !
গৌতম ভড় এবং শংকর ক্ষ্যাপা (শংকর দাসের আবার ব্যবহার খুবই ছেলেমানুষী সুলভ ছিল – তাই ওকে ওর বন্ধু বান্ধবরা শংকর ক্ষ্যাপা বা ক্ষ্যাপা শংকর বলে ডাকত ! ন’কাকাও মাঝে মাঝে আদর করে ‘ক্ষ্যাপা’ বলে সম্বোধন করতেন! )-কে খবর দিলেই ওরা দুজনে দুটো মোটরসাইকেল নিয়ে এসে হাজির হোতো এবং ওরা-ই বিভিন্ন ভক্তদের বাড়িতে ন’কাকাকে নিয়ে যেতো । সাধারণত শঙ্করের মোটরসাইকেলে ন’কাকা আর গৌতমের মোটরসাইকেলে আমি চাপতাম । শুধু শঙ্করের মোটরসাইকেলেও ন’কাকা ও আমি দুজনেই চেপে অনেকবার ভক্তদের বাড়ি বাড়ি গেছি ৷(ক্রমশঃ)