[ন’কাকা এবং গুরুমহারাজের সম্পর্কের কথা আগের দিন কিছুটা আলোচনা করা হচ্ছিল। সেখান থেকে আবার আমরা ফিরে আসছি _ন’কাকার সাথে বিভিন্ন উন্নত soul বা মহাত্মা-মহাপুরুষদের যোগাযোগের ঘটনায়!!]
এখন আমরা আবার ফিরে যাই ন’কাকা প্রসঙ্গে !
ন’কাকা যখন প্রথমবার বারেন্দা আশ্রমে এসেছিলেন (বারেন্দা পরমানন্দ মিশন , কাটোয়ার নিকট বনগ্রামের-ই একটি শাখা আশ্রম , এই আশ্রমে গুরু মহারাজ তিন-চারবার এসেছিলেন) , ওনার সাথে এই স্থানের ভূতপূর্ব মালিক , যিনি শেষ বয়সে বোষ্টম হয়েছিলেন – তার যোগাযোগ হয় ৷ তাছাড়াও পরদিন সকালে ন’কাকা আমাদেরকে বলেছিলেন যে একজন প্রাচীন ও উন্নত সাধক নিতাইচরণ গোস্বামী মহারাজের সাথেও সেই রাত্রে ওনার যোগাযোগ হয়েছিল !
বহু পূর্বে ৪০০/৪৫০ বছর আগে এই সাধক অজয় নদীর ধারে বারেন্দা গ্রামের প্রান্তে একটি কুঠির বানিয়ে সাধন-ভজন করতেন । সম্ভবতঃ এই সাধক চৈতন্য-পরবর্তীকালের লোক ছিলেন , ফলে মহাপ্রভুর সাথে তার দেখা হয়নি! আর এইটাই ঐ সাধকের খুব আক্ষেপ ছিল ৷ তিনি এটা জানতেন যে অজয়ের ধার ধরে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নবদ্বীপ থেকে ‘জয়দেব কেন্দুবিল্বের মেলা’য় যাতায়াত করতেন । এই জন্যই তিনি অজয়ের ধারে আশ্রমটি করে মনে মনে প্রার্থনা করতেন ভগবান যেন তার এই স্থানে (তখন কুঠির ছিল) আসেন , বসেন – ভক্তসঙ্গ করেন !
সেই নিতাইচরণের জীবদ্দশায় তো স্থূলে তার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়ইনি (স্থূলে না হলেও হয়তো সূক্ষ্মে হয়েছিল) – বরং তারপরে প্রায় সুদীর্ঘ ৪০০/৪৫০ বছর কেটে গেছে , অজয়-গঙ্গা দিয়ে কত লক্ষ লক্ষ , কোটি কোটি গ্যালন জল বয়ে চলে গিয়ে বঙ্গোপসাগরে বিলীন হয়ে গেছে! প্রভুর আসার সময় হোলো এইমাত্র কয়েক বৎসর আগে ! ১৯৯৩/৯৪ সালে সম্ভবতঃ গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দ প্রথমবার বারেন্দা আশ্রমে এসেছিলেন !
কিছুদিন আগেই গুরুমহারাজের একটা কথা আমার খুবই মনে পড়ছিল – “পৌষের কম্বল চৈত্রে”( “শীতের কম্বল গ্রীষ্মে”)! আধ্যাত্মিক জগতেও এই ধরনের লীলাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঘটে ! যে সময়ে যেটা পাবার প্রয়োজন _সেই সময় সেইটা পাওয়া যায় না! নিতাইচরনের ক্ষেত্রেও _এইটাই ঘটেছিল!!
যাইহোক , ন’কাকার সাথে এই নিতাইচরণের সেই রাতেই যোগাযোগ ঘটেছিল এবং ন’কাকা সকালে আমাদেরকে বলেছিলেন যে , সেই সাধক খুবই প্রসন্ন , কারণ সে জানতে পেরেছে যে – তাঁর সংকল্প এতদিনে সিদ্ধ হতে চলেছে অর্থাৎ শীঘ্রই ভগবান স্বয়ং ওই স্থানে তাঁর পদধূলি দিতে চলেছেন ।
তাই-ই হয়েছিল , ন’কাকারা আসার -এক বছরের মধ্যেই গুরু মহারাজ এসেছিলেন বারেন্দা পরমানন্দ মিশনে! গুরুমহারাজও প্রথম যেদিন ঐ আশ্রমে পা দিয়েছিলেন, সেদিন উনিও খুব আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন ! হয়তো নিতাইচরনের মনোবান্ছা পুরন করে ভগবানও ভক্তের সাথে সমানভাবে আনন্দের ভাগীদার হয়েছিলেন।
এবার ন’কাকাকে নিয়ে একটু অন্য প্রসঙ্গে আসছি! ন’কাকার সাথে কাটোয়া শহরে গঙ্গার ধারের দিকে বারোয়ারিতলার কাছে ওনার এক আত্মীয়ার বাড়ি গেছিলাম (অন্ততঃ দু-তিনবার গেছিলাম) । ওদের বাড়ির অনেকেই ন’কাকার কাছে দীক্ষাও নিয়েছিল । প্রাচীন কাটোয়া (চৈতন্য সমসাময়িক সময়ে কন্টক নগর নাম ছিল) বলতে গঙ্গার তীরবর্তী বসতগুলিকেই বোঝায় – সেটা বুঝেছিলাম ঐ আত্মীয়ার বাড়ির ভেতরটায় গিয়ে ! বহু পুরোনো আমলের বাড়ি – দেখেই বোঝা যাচ্ছিল ওইসব পরিবারের লোকেরা কাটোয়ার বহু পুরোনো বাসিন্দা! ওদের বাড়িতে একটা বিশাল মোটা বেলগাছ ছিল । ওরা বলেছিল গাছটার পাঁচশো বছর বা তারও বেশি বয়স ! ওই গাছের পাকা বেল ওরা ন’কাকার জন্য যত্ন করে রেখে দিয়েছিল ! উনি গেলে ওরা সেই বেল ওনাকে নিবেদন করেছিল ! ন’কাকা ঐ বেল খেয়ে আমার কাছে খুবই আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন।
ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময় আমি এই স্থানের প্রাচীনত্ব বা ঐ পরিবারটি সম্বন্ধে ন’কাকার কাছ থেকে জানতে চাইছিলাম । উনি (ন’কাকা) সেদিনই বলেছিলেন – “জায়গাগুলি খুবই প্রাচীন , এই জনপদ চৈতন্যের কৃপাপ্রাপ্ত , সেইসময় এবং তার পরবর্তী কালেও বহু উন্নত মহাত্মারা কাটোয়ায় গঙ্গাতীরে কুটির নির্মাণ করে সাধন ভজন করেছিলেন , ফলে এখনও সেইসব প্রভাব বিরাজমান! আর যেকোন জায়গায় বনেদি পরিবারের মানুষজন সাধারণত ভালই হয় ( তবে সব কিছুর ব্যতিক্রম আছে)। হাতের পাঁচটা আঙুল যেমন সমান হয় না , তেমনি ওইসব পরিবারেও দু-একটি সদস্য বদ্ হয়_বই কী! ‘কুলাঙ্গার’ কথাটি তো এই জন্যেই এসেছে , যে কুলে জন্মাবে সেই কুলকে একেবারে জ্বালিয়ে ছাড়বে !” আমি ওনার(ন’কাকার) কথা বলার ভঙ্গিমা দেখে খুব হাসছিলাম ৷ উনি বললেন – ” হেসো না ৷ সত্যি-ই বলছি , ওইসব ছেলে(কুলাঙ্গার) যে বংশে জন্মাবে__ __তার অত্যাচারে-অনাচারে সেই পরিবারের সবাই একেবারে জ্বলে-পুড়ে মরবে ! তাইতো বলা হয় ‘কুলাঙ্গার’।”(ক্রমশঃ)