[ন’কাকা যখন আদিত্যপুর আশ্রমে থাকতেন _তখন অনেক পন্ডিত ব্যক্তিরা আসতো। আর স্বাভাবিক কারণেই তারা সকলের কাছে তাদের পান্ডিত্য জাহির করার চেষ্টা করত। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই আমরা ঠিক উল্টো দৃশ্যও দেখতে পেতাম। এইসব প্রসঙ্গেই আলোচনা চলছিল। গুরুমহারাজ পন্ডিতদের সম্পর্কে কি বলেছিলেন.. সেইসব কথাও হোক।]
আমাদের মনে আছে গুরু মহারাজের কাছে হাওড়া থেকে আসতেন একজন মহাপন্ডিত ব্যক্তি – এনাঙ্কশেখর বাগচী ! গুরুমহারাজ অবশ্য এই পন্ডিত ব্যক্তির খুবই প্রশংসা করতেন ! উনি বলেছিলেন – ” পন্ডিত হলে এনাঙ্ক বাবুর মতো হওয়া উচিত ! এনাঙ্ক বাবুর ভারতীয় যে কোনো শাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল ! সবচাইতে অবাক করার মতো ব্যাপার ছিল ওনার স্মৃতিশক্তি! যে কোনো শাস্ত্রের যে কোনো সংস্কৃত শ্লোক এবং তার বাংলা ব্যাখ্যা অনর্গল বলতে পারতেন ! কথায় কথায় বলতেন – “আমার শাস্ত্র” ! সংস্কৃত , হিন্দি , বাংলা , ইংরেজি চারটি ভাষায় সাবলীলভাবে বক্তৃতা করতে পারতেন ! হাওড়া অঞ্চলে তৎকালে (১৯৮০ – ১৯৯০ সাল পর্যন্ত আমার দেখা) যে কোনো জ্ঞানী গুণীদের সভায় ওনার উপস্থিতি থাকতোই ! এনাঙ্কবাবু যেহেতু হাওড়ায় থাকতেন, তাই তিনি গঙ্গাবাবু (‘পরমানন্দম’ রচয়িতা গঙ্গানারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায়)-র পূর্ব পরিচিত ছিলেন এবং ওনার সাথেই আশ্রমে আসা-যাওয়া করতেন। এনাঙ্কবাবু প্রথমবার বনগ্রামে পা দিয়েই আশ্রমের কূর্মপৃষ্ঠ মাঠ , প্রাচীন বট , পুষ্করিণী এবং তাতে রাজহাঁস চড়ছে (তখন আশ্রমে কয়েকটা সাদা রাজহাঁস ছিল) – এসব দেখেই বলে উঠেছিলেন – “আমার শাস্ত্র বলছে – এইসব লক্ষণ থাকলে সেই স্থানের পাশ দিয়ে অবশ্যই কোন স্রোতস্বিনী প্রবাহমান থাকা উচিত !” পরে সিটিংয়ে বসে গঙ্গাবাবু যখন গুরুমহারাজকে ঐ কথাগুলি বলেন , তখন গুরুমহারাজ বলেছিলেন – “এনাঙ্কবাবু ঠিক কথাই বলেছেন ! এই আশ্রমের পাশ দিয়ে এখন যে ছোট নালা বা ক্যানেলের মতো বয়ে যাওয়া নদীটি রয়েছে , ঐটিই বহু প্রাচীন কালে ‘ভল্লুকা’ নামে একটি স্রোতস্বিনী নদী ছিল । যা দামোদরের শাখা – এবং তা বেশ আকারে বড়সড়ই ছিলো ৷” গুরুমহারাজ আরও বলেছিলেন – দামোদর তীরবর্তী মানুষজনেরা বা ব্যবসায়ীরা নৌকাযোগে ‘ভল্লুকা’ নদীপথে short রাস্তায় ধাত্রীগ্রাম দিয়ে গঙ্গা নদীতে যেতে পারতো ! অর্থাৎ এই নদীটি-ই দামোদর এবং গঙ্গার যোগসূত্র ছিল।
সে যাই হোক , ওই এনাঙ্কবাবুর মৃত্যুর পর গুরুমহারাজ একদিন ওনার প্রসঙ্গ তুলে বলেছিলেন – “পন্ডিত ব্যক্তিদের পাণ্ডিত্যাভিমান থাকবেই , এতে দোষের কিছু নাই ! কত কষ্ট করে দিন জেগে – রাত জেগে পড়াশোনা করে করে মেধার উৎকর্ষতা ঘটিয়ে তবে কোনো ব্যক্তি পন্ডিত হয় – তাহলে সে তার দাম তো চাইবেই ! কিন্তু ‘বিদ্যেবোঝাই ব্যক্তি’ আর ‘পন্ডিত ব্যক্তি’ এক নয় ! কোন পন্ডিত যদি শুধু নিজেকেই জাহির করতে চায় – তাহলে সমাজ তাকে কোনোদিন-ই সম্মান দেয় না ! অপরপক্ষে কোনো পন্ডিত যদি অপরকে শিক্ষা দেবার জন্য , মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোয় আনার জন্য তার পাণ্ডিত্যকে কাজে লাগায় তাহলে সমাজের মানুষ , দেশের মানুষ তাকে দীর্ঘদিন মনে রাখে – তার কথা স্মরণ করে! হয়তো তাকে আদর্শ করে অনেকে জীবন পথে এগিয়ে চলতেও চায় ! ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর এই ধরনের মানুষ ছিলেন। বিদ্যাসাগরকে ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ বলেছিলেন – তুমি তো আর শুকনো পন্ডিত নও , তুমি সিদ্ধ, তাই তোমার ভিতরটা নরম ৷ শাস্ত্রে রয়েছে ‘বিদ্যা দদাতি বিনয়ম্’ – তাহলে যারা পন্ডিত , যারা বিদ্বান তাদের মধ্যে বিনয় ভাব না থেকে উদ্ধত ভাব আসাটাই তো অনৈতিক। পন্ডিত ব্যক্তির মধ্যে যদি বিনয় ভাব থাকে , তাহলে জানবে ‘সে যেন হাতির দাঁত – সোনা দিয়ে বাঁধানো !’ আর এইরকম পন্ডিত-ই যথার্থ পন্ডিত I”
নাঃ! – আদিত্যপুর আশ্রমে আমরা এই ধরণের পন্ডিত কোনো ব্যক্তিকে দেখতে পাই নি ! আমরা বেশীরভাগ নিরোদ বাবু(যার কথা আগের দিন বলা হয়েছিল) -দের মতোই পন্ডিত দেখতাম ৷ কিন্তু যে জন্য ‘আদিত্যপুর আশ্রমে ন’কাকা’-র কথা বলতে গিয়ে নিরোদবাবুর Reference আনলাম – সেইটা এবার বলি ! পন্ডিতদের বাগে আনার ক্ষেত্রে গুরুমহারাজ এবং ন’কাকা – এই দুজন মহাপুরুষের দুটো ভিন্ন ভিন্ন style-এর কথা বলার জন্য এই Reference টানা ! বনগ্রামে মহা মহা পণ্ডিতেরা যেদিন সিটিং-এ আসতো – তারা প্রথমটায় খুবই ফটর্ ফটর্ করতো, কিন্তু সেটা বড়জোর আধ ঘন্টা নাহলে চল্লিশ মিনিট । অতক্ষণ পর্যন্ত গুরুমহারাজ ওই ব্যক্তিকে Allow করতেন – বা হয়তো এর মধ্যেই তার সকল পান্ডিত্য উনি Read করে নিতেন! ব্যস , তারপরেই গুরুমহারাজ তাঁর বসার ভঙ্গিমাটা একটু change করে নিতেন অর্থাৎ ডান পা-টাকে, বাঁ পায়ের উপরে রাখতেন এবং শুরু করে দিতেন কথা বলা ! বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা দেখতাম – সেই পন্ডিত ভদ্রলোক যেখানটায় কথা বলা শেষ করেছিলেন – গুরুমহারাজ ঠিক সেইখান থেকে শুরু করে, ওই ব্যাপারটির আরো সুক্ষ্ম বা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম স্তরে নিয়ে চলে যেতেন ! সায়েন্সের Topic হলে – সেই ব্যাপারটির High থেকে আরো Higher সায়েন্স দিয়ে ব্যাখ্যা করতে শুরু করতেন ৷ ফলে গুরু মহারাজের কথা ৫/১০ মিনিট শোনার পরই ওই ভদ্রলোক কেমন যেন চুপসে যেতো! খুব অহংকারী বা অধিক পাণ্ডিত্যাভিমানী হলে সে উঠে চলে যেতো – আর কোনোদিন বনগ্রামমুখো হোত না ! আর এক ধরনের পণ্ডিতদের দেখতাম – তারা শেষ অবধি গুরুমহারাজের কথাগুলি শুনতো – পরে যাবার সময় বলতো – ” আপনাদের গুরুদেব প্রচুর Modern magazine, বিশেষত Science Magazine পড়েন , তাছাড়া অন্যান্য বিজ্ঞানের গবেষণামূলক বই-টইও পড়েন, ভদ্রলোকের (গুরু মহারাজ) প্রচুর পড়াশুনো !”
সত্যিই যারা প্রকৃত পন্ডিত ব্যক্তি, তারা প্রথমটায় নিজেদের একটু-আধটু জ্ঞান জাহির নিশ্চয়ই কোরতো – কিন্তু ওনার কথা শোনার পর শান্ত হয়ে যেতো এবং সময় সুযোগ পেলে আবার আসতো ! আর এইভাবে আসা-যাওয়া করতে করতে তারাও গুরুমহারাজকে জীবনের ধ্রুবতারা , জীবনের এগিয়ে চলার পথের আদর্শ হিসাবে মেনে নিত !
কিন্তু ন’কাকার style ছিল সম্পূর্ণ আলাদা ! উনি তাঁর অলৌকিক সারল্য এবং অসম্ভব সহজতা দিয়ে ধীরে-ধীরে এই সব ধরনের পণ্ডিতদেরই গ্রাস করে নিতেন ! যে নিরোদ বাবুর কথা দিয়ে আজকের এই আলোচনাটা শুরু করেছিলাম – যার জন্য বহুদিন আদিত্যপুরে দূরাগত বা নিকটস্থ ন’কাকার ভক্তগণ ন’কাকার কথা শুনতে পাননি , শুধু ওনার পন্ডিতি শুনেই বাড়ি চলে যেতে হয়েছে! দুই-একজন ধৈর্য্য রাখতে না পেরে, বাধ্য হয়ে ওনাকে একটু চুপ করার জন্য অনুরোধ করতেও বাধ্য হোত! দু-এক বছর পরে,ন’কাকা আদিত্যপুরে থাকাকালীন, সেই হেন নিরোদ বাবুকে একদিন দেখি – খুবই সকাল-সকাল সস্ত্রীক এসে ন’কাকাকে নিয়ে ঘরে ঢুকে গেলো, খানিক পরে উঁকিঝুঁকি মেরে দেখি – ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলা ন’কাকার পা দুটো ধরে বসে বসে কাঁদছে আর কি যেন কাতর কণ্ঠে নিবেদন করছে !
পরে ন’কাকার কাছে শুনেছিলাম ওনার পারিবারিক কোনো এমন একটা অঘটন ঘটে গেছে – যেটা সামাজিকভাবে উনি মেনে নিতে পারছিলেন না! তাই ওনার কি করা উচিত – কিভাবে ব্যাপারটা নেওয়া উচিত তার পরামর্শ করার জন্য-ই উনি সেদিন ন’কাকার কাছে সস্ত্রীক এসেছিলেন ৷ কিন্তু আশ্চর্য হয়ে আমরা দেখেছিলাম যে , ওই ঘটনার পর থেকে আর কোনোদিন ওই ভদ্রলোক ন’কাকার আলোচনায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করেন নি ! ন’কাকা আদিত্যপুরে গেলে অন্ততঃ একদিন এসে উনি ন’কাকার সাথে দেখা করে যেতেন! ন’কাকার আলোচনা সভাতেও বসতেন এবং আর পাঁচজন সাধারণ মানুষেরই মতো চুপচাপ বসে থাকতেন !
এইভাবে আমি আরও কিছু পুরোনো অর্থাৎ পরমানন্দ মিশনের পন্ডিত ভক্তদের দেখেছিলাম – যারা ন’কাকাকে “পূজারী বামুন” বলতো ! এবং মুখে একটু আধটু পাত্তা দিলেও – অন্তরে মোটেও পাত্তা দিত না ! ঐরকম ব্যক্তিদের প্রতি আমি ন’কাকার দৃষ্টি আকর্ষন করার চেষ্টা করলে – ন’কাকা বলতেন – ” বাবা ! যার যেমন ভাব – তার তেমন লাভ ! উনি আমাকে যা-ই ভাবুন না কেন , আমি তো জানি – আমি কি বা কে ? শোনোনি , গুরু মহারাজ বলতেন – ‘খুদ্ জানতা হ্যায় অউর খোদা জানতা হ্যায় !’ হেঁ – হেঁ বাবা ! উপরওয়ালার চোখকে কি কেউ ফাঁকি দিতে পারে!! সে সর্বদাই বিরাট চোখে এই সমগ্র বিশ্বকে দেখছে !”(ক্রমশঃ)