ন’কাকা যখনই ভক্তদের সঙ্গে তারাপীঠে যেতেন – প্রায় সবক্ষেত্রেই উনি চাকপাড়ার সুকুমার মুখার্জীর বাড়ি থেকেই যেতেন ৷ আগেই বলা হয়েছে যে, সুকুমার বাবু খুবই ভক্ত মানুষ ! তিনি ন’কাকাকে চরম ভক্তি করতেন ! ওনার ভক্তির বাহুল্য দেখে আমাদেরই নিজেদেরকে ওনার কাছে খুবই ছোট মনে হতো । সেইজন্য মুখুজ্যেমশাই ন’কাকার পথশ্রমের ক্লান্তি দূর না করিয়ে অর্থাৎ ওনার বাড়িতে একবেলা বিশ্রাম না করিয়ে কখনোই তারাপীঠে মায়ের মন্দিরে নিয়ে যেতেন না ! মুখুজ্জে মশাইয়ের মামার বাড়ি ছিল পাশের গ্রাম ‘আটলায়’ ! আর আটলা থেকে এক কিমির মধ্যেই তারাপীঠ ! বহু পূর্বে ওইসব স্থান হয়তো খুবই দুর্গম ছিল কিন্তু বর্তমানে পাকা রাস্তা এবং দ্বারকা নদীর উপর বা অন্যান্য জলাস্থান গুলির উপর ছোট ছোট ব্রিজ বা কালভার্ট হওয়ায় এখন সব রকম গাড়ি সারা দিনরাত চলাচল করছে।
হাওড়া বা বর্ধমান থেকে ট্রেনে করে যেসব যাত্রীরা তারাপীঠ যায় তাদের রামপুরহাট স্টেশনে নামাই ভালো । কারণ ওখান থেকে বাস, ট্রেকার, টোটো ইত্যাদি নানা রকমের ব্যবস্থা রয়েছে ৷ তবে ‘তারাপীঠ রোড’ নামে রামপুরহাটের আগের যে স্টেশনটি রয়েছে সেখানেও নামা যায় । সেখানে নামলে একেবারে সোজা রাস্তা ধরে চাকপাড়া-আটলা হয়ে তারাপীঠ মায়ের মন্দিরে পৌঁছে যাওয়া যায় । যারা গাড়ি করে যায় – তারা ঐ পথেই যায় ৷ সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে চাকপাড়া থেকে আটলা হয়ে তারাপীঠ মন্দির আরও খুব বেশি রাস্তা নয় ।
যাইহোক, এই আটলা গ্রামেই বামদেবের জন্ম হয়েছিল । তাই ভক্তদের কাছে এই গ্রামটিও একটি তীর্থস্থান ! কিন্তু বর্তমানে বামদেবের বংশধরেরা পাশাপাশি দুটো-তিনটি স্থানে ছোট-বড় মন্দির বা দেবস্থান নির্মাণ করে – সেইটাই ‘বামদেবের প্রকৃত জন্মস্থান’ বলে দাবী করে এবং মানুষকে ধন্দে ফেলে দেয় ! তবে ভক্তরাও কম চালাক নয় – তারা এখানেও মাথা ঠেকায় – ওখানেও মাথা ঠেকায় ! ব্যস ! এটাতেই আসল-নকল একাকার হয়ে যায় ।৷
ন’কাকার সাথে আমরা যখনই আটলা যেতাম, দেখতাম উনি দু-তিন জায়গাতেই যাচ্ছেন, দু-তিন জায়গাতেই টাকা দিয়ে প্রণাম করছেন – ফলে আমরাও তাই করতাম । চাকপাড়ার মুখুজ্যেমশাই (সুকুমার বাবু)-এর মামার বাড়ি ছিল আটলায়, ওই চাটুজ্জে পরিবারে অর্থাৎ বামদেবের বংশধরদের কোন একটি বাড়িতে । সুকুমার বাবু সেই বাড়ির লোকেদেরকে নিশ্চয়ই ন’কাকা সম্বন্ধে কিছু কথা ( অর্থাৎ তিনি যে আগের শরীরে বামদেব স্বয়ং ছিলেন ) আগে থাকতেই বলে রেখেছিলেন – ফলে সেই বাড়ির মানুষেরা ন’কাকাকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে গিয়েছিল ৷ ওই বাড়িতেই দুপুরে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল । ওখানে গিয়ে শুনেছিলাম – ওই পরিবারের একজন (সুকুমার বাবুর দাদু, যার সবে কিছুদিন আগেই মৃত্যু হয়েছিল) খুবই উন্নত সাধক ছিলেন ৷ বামদেবের বংশধরেরা এখন আর কেউ নেই। হয়তো ওই বাড়ির দৌহিত্ররা এখনো ঐ মন্দিরে পূজারীর কাজ করে । তবে তারাপীঠ মন্দিরেও অনেক পান্ডা বা পুরোহিতের সঙ্গে জানাশোনা ছিল। সেই হিসাবেই সুকুমার বাবু ন’কাকাকে নিয়ে যখনই ৺রী তারামায়ের মন্দিরে যেতেন – তখন সেখানে পরিচিত অনেকেই থাকায় একটু বিশেষ সুযোগ-সুবিধা পেতেন ৷
সেইদিন আটলা-য় প্রায় সারাটা দিন থাকার সুবাদে আমরা (আমি, নন্দ মহারাজ, অসিত দা প্রমুখরা ) ঐ গ্রামটি পুরোটা ঘুরে ঘুরে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। গ্রামটি খুবই ছোট, ওখানে বামদেবের মন্দির ছাড়াও গ্রামটির দক্ষিণ প্রান্তে গাছপালা সমন্বিত স্থানে গ্রাম্যদেবীর একটি মন্দির রয়েছে। ঐ স্থানটিও আমাদের খুব ভালো লেগেছিল। ঐ সুন্দর শান বাঁধানো চত্বরে বসেই আমাদের দুপুরের বেশ খানিকটা সময় কেটে গেছিল।
ন’কাকার সাথে বামদেবের জন্মস্থান দর্শনের জন্য বেড়িয়ে গিয়ে সামনের মন্দিরে এবং দুটি আলাদা বাড়িতে (প্রত্যেক বাড়ির মালিকরাই দাবী করছিল যে, সেই বাড়িতেই বামা চরনের জন্ম হয়েছিল।) বামদেবের জন্মস্থান দর্শন করতে গিয়েছিলাম। আর অবশ্যই আমরা ন’কাকাকে জিজ্ঞাসায় জিজ্ঞাসায় অস্থির করছিলাম _” ন’কাকা! আসলে বামদেবের জন্মস্থান তাহলে কোনটা?”
যে কোন জিজ্ঞাসার উত্তর দিতে ন’কাকার এক সেকেন্ডের বেশি সময় লাগতো না _এক্ষেত্রেও লাগে নি! স্মিত হেসে ন’কাকা উত্তর দিয়েছিলেন _” আর বাবা! এরা কি কেউ জানে আসল জন্মস্থান কোনটা! বামাচরনের ছোটবেলাটা তো খুবই অভাব অনটনের মধ্যে কেটেছিল _ বামা-র জীবদ্দশায় কতটুকু মর্যাদা ই বা স্থানীয় মানুষজনেরা দিয়েছে! কতিপয় কয়েকজন _যাদের কাছে তিনি ধরা দিয়েছিলেন, তারা ছাড়া বাকিরা তো তাঁকে খ্যাপা – পাগল এইসব বলে অবহেলা করেছে, অত্যাচার করেছে! ফলে সেইসময়ে কোন স্থানটি বামা চরনের জন্মস্থান __এই নিয়ে কার-ই বা মাথাব্যথা ছিল! তাছাড়া প্রতিবৎসরের দ্বারকা নদীর বন্যায় চাটুজ্জেদের ঘরবাড়ি কতবার ভেঙে নষ্ট হয়েছে, আবার নতুন করে নতুন স্থানে চালাঘর তৈরি হয়েছে! তাই কে নির্ধারণ করবে বাবা _সঠিক স্থান কোনটি? আর ওসবে আমাদের কাজটাই বা কি! এই ভিটেতে তো সেই মহাত্মার জন্ম হয়েছিল _তাই ভিটের যে কোন জায়গায় মাথা ঠেকালেই তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো হবে।”_সহজ মানুষের সহজ সিদ্ধান্ত!! (ক্রমশঃ)
হাওড়া বা বর্ধমান থেকে ট্রেনে করে যেসব যাত্রীরা তারাপীঠ যায় তাদের রামপুরহাট স্টেশনে নামাই ভালো । কারণ ওখান থেকে বাস, ট্রেকার, টোটো ইত্যাদি নানা রকমের ব্যবস্থা রয়েছে ৷ তবে ‘তারাপীঠ রোড’ নামে রামপুরহাটের আগের যে স্টেশনটি রয়েছে সেখানেও নামা যায় । সেখানে নামলে একেবারে সোজা রাস্তা ধরে চাকপাড়া-আটলা হয়ে তারাপীঠ মায়ের মন্দিরে পৌঁছে যাওয়া যায় । যারা গাড়ি করে যায় – তারা ঐ পথেই যায় ৷ সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে চাকপাড়া থেকে আটলা হয়ে তারাপীঠ মন্দির আরও খুব বেশি রাস্তা নয় ।
যাইহোক, এই আটলা গ্রামেই বামদেবের জন্ম হয়েছিল । তাই ভক্তদের কাছে এই গ্রামটিও একটি তীর্থস্থান ! কিন্তু বর্তমানে বামদেবের বংশধরেরা পাশাপাশি দুটো-তিনটি স্থানে ছোট-বড় মন্দির বা দেবস্থান নির্মাণ করে – সেইটাই ‘বামদেবের প্রকৃত জন্মস্থান’ বলে দাবী করে এবং মানুষকে ধন্দে ফেলে দেয় ! তবে ভক্তরাও কম চালাক নয় – তারা এখানেও মাথা ঠেকায় – ওখানেও মাথা ঠেকায় ! ব্যস ! এটাতেই আসল-নকল একাকার হয়ে যায় ।৷
ন’কাকার সাথে আমরা যখনই আটলা যেতাম, দেখতাম উনি দু-তিন জায়গাতেই যাচ্ছেন, দু-তিন জায়গাতেই টাকা দিয়ে প্রণাম করছেন – ফলে আমরাও তাই করতাম । চাকপাড়ার মুখুজ্যেমশাই (সুকুমার বাবু)-এর মামার বাড়ি ছিল আটলায়, ওই চাটুজ্জে পরিবারে অর্থাৎ বামদেবের বংশধরদের কোন একটি বাড়িতে । সুকুমার বাবু সেই বাড়ির লোকেদেরকে নিশ্চয়ই ন’কাকা সম্বন্ধে কিছু কথা ( অর্থাৎ তিনি যে আগের শরীরে বামদেব স্বয়ং ছিলেন ) আগে থাকতেই বলে রেখেছিলেন – ফলে সেই বাড়ির মানুষেরা ন’কাকাকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে গিয়েছিল ৷ ওই বাড়িতেই দুপুরে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল । ওখানে গিয়ে শুনেছিলাম – ওই পরিবারের একজন (সুকুমার বাবুর দাদু, যার সবে কিছুদিন আগেই মৃত্যু হয়েছিল) খুবই উন্নত সাধক ছিলেন ৷ বামদেবের বংশধরেরা এখন আর কেউ নেই। হয়তো ওই বাড়ির দৌহিত্ররা এখনো ঐ মন্দিরে পূজারীর কাজ করে । তবে তারাপীঠ মন্দিরেও অনেক পান্ডা বা পুরোহিতের সঙ্গে জানাশোনা ছিল। সেই হিসাবেই সুকুমার বাবু ন’কাকাকে নিয়ে যখনই ৺রী তারামায়ের মন্দিরে যেতেন – তখন সেখানে পরিচিত অনেকেই থাকায় একটু বিশেষ সুযোগ-সুবিধা পেতেন ৷
সেইদিন আটলা-য় প্রায় সারাটা দিন থাকার সুবাদে আমরা (আমি, নন্দ মহারাজ, অসিত দা প্রমুখরা ) ঐ গ্রামটি পুরোটা ঘুরে ঘুরে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। গ্রামটি খুবই ছোট, ওখানে বামদেবের মন্দির ছাড়াও গ্রামটির দক্ষিণ প্রান্তে গাছপালা সমন্বিত স্থানে গ্রাম্যদেবীর একটি মন্দির রয়েছে। ঐ স্থানটিও আমাদের খুব ভালো লেগেছিল। ঐ সুন্দর শান বাঁধানো চত্বরে বসেই আমাদের দুপুরের বেশ খানিকটা সময় কেটে গেছিল।
ন’কাকার সাথে বামদেবের জন্মস্থান দর্শনের জন্য বেড়িয়ে গিয়ে সামনের মন্দিরে এবং দুটি আলাদা বাড়িতে (প্রত্যেক বাড়ির মালিকরাই দাবী করছিল যে, সেই বাড়িতেই বামা চরনের জন্ম হয়েছিল।) বামদেবের জন্মস্থান দর্শন করতে গিয়েছিলাম। আর অবশ্যই আমরা ন’কাকাকে জিজ্ঞাসায় জিজ্ঞাসায় অস্থির করছিলাম _” ন’কাকা! আসলে বামদেবের জন্মস্থান তাহলে কোনটা?”
যে কোন জিজ্ঞাসার উত্তর দিতে ন’কাকার এক সেকেন্ডের বেশি সময় লাগতো না _এক্ষেত্রেও লাগে নি! স্মিত হেসে ন’কাকা উত্তর দিয়েছিলেন _” আর বাবা! এরা কি কেউ জানে আসল জন্মস্থান কোনটা! বামাচরনের ছোটবেলাটা তো খুবই অভাব অনটনের মধ্যে কেটেছিল _ বামা-র জীবদ্দশায় কতটুকু মর্যাদা ই বা স্থানীয় মানুষজনেরা দিয়েছে! কতিপয় কয়েকজন _যাদের কাছে তিনি ধরা দিয়েছিলেন, তারা ছাড়া বাকিরা তো তাঁকে খ্যাপা – পাগল এইসব বলে অবহেলা করেছে, অত্যাচার করেছে! ফলে সেইসময়ে কোন স্থানটি বামা চরনের জন্মস্থান __এই নিয়ে কার-ই বা মাথাব্যথা ছিল! তাছাড়া প্রতিবৎসরের দ্বারকা নদীর বন্যায় চাটুজ্জেদের ঘরবাড়ি কতবার ভেঙে নষ্ট হয়েছে, আবার নতুন করে নতুন স্থানে চালাঘর তৈরি হয়েছে! তাই কে নির্ধারণ করবে বাবা _সঠিক স্থান কোনটি? আর ওসবে আমাদের কাজটাই বা কি! এই ভিটেতে তো সেই মহাত্মার জন্ম হয়েছিল _তাই ভিটের যে কোন জায়গায় মাথা ঠেকালেই তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো হবে।”_সহজ মানুষের সহজ সিদ্ধান্ত!! (ক্রমশঃ)
