[ এখন আমরা আবার বীরভূমে ন’কাকা প্রসঙ্গেই ফিরে এসেছি। আজ ন’কাকার স্থুলশরীর ছাড়ার দুই_বছর পূর্ণ হোল। চোখের জল মুছে তাঁকে স্মরণ করেই লেখা শুরু করা হোল।ন’কাকার আশীষ সবার শিরে ঝরে ঝরে পড়ুক।]
ন’কাকাকে নিয়ে বীরভূমের সমস্ত তীর্থক্ষেত্রগুলির ঘোরার যে সাধ ভক্তদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছিল – সেটা কিন্তু Successful হয়নি ৷ তবে মাঝে মাঝেই আদিত্যপুর আশ্রম থেকে বেরিয়ে পড়া হতো কঙ্কালীতলা , নানুরের চন্ডীদাস পীঠ এবং মা বাশুলীর মন্দির , লাভপুরের মা ফুল্লরা মন্দির __ইত্যাদির উদ্দেশ্যে ! অবশ্য বিভিন্ন স্থানের ভক্তবাড়ি যাবার পথেও অনেক সময় ঢুকে পড়া হতো কোনো না কোনো পীঠে ! এইরকমই কীর্ণাহারের কাছে মুণ্ডমালিনীতলা নামে একটি স্থান আছে (তারাপীঠেও আলাদা একটা মুন্ডমালিনী তলা রয়েছে) –সেখানেও যাওয়া হয়েছিল ৷ নানুরে আলতা মায়ের (ন’কাকার একজন একনিষ্ঠ ভক্তিমতী ভক্ত) বাড়ি ৷ ফলে ওখানে ন’কাকা বেশ কয়েকবার গেছেন – আর ওরাই আবার বাশুলী মাতার সেবাইত গোষ্ঠীর মধ্যে একজন ৷ ফলে নানুর গেলেই বাশুলী মায়ের মন্দিরে যাওয়া হোত , ওখানে পুজোও দেওয়া হোত । মন্দিরে ঢোকার আগেই একটা বিরাট উঁচু স্তূপ রয়েছে – যেটাকে ভারত সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ অধিগ্রহণ করেছে হয়তো ১৫/২০-বছর বা তারও বেশি কিন্তু তেমন করে কোন খননকার্যই করেনি ! কেন করেনি – স্থানীয় কোনো ব্যক্তিই তার কোনো সন্ধান দিতে পারলো না ! ঘেরা-বেরা হয়েছে, সরকারি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রেখেছে, পালাক্রমে গার্ড দেবার জন্য লোক appointed রয়েছে__কিন্তু আসল কাজটা(জায়গাটা খুঁড়ে প্রাচীন নিদর্শনাদি বের করে আনা)-ই হয় নি ! কান্ড কারখানা দেখে নিজেদেরই খারাপ লাগছিল। সরকারের এইরকমভাবে কত টাকাপয়সা ফালতু খরচ হয়ে যায় _কে তার হিসাব রাখে!!
যাইহোক, এবার আসি লাভপুরের কথায় _কথিত আছে লাভপুরেও পীঠস্থান রয়েছে – সেখানে রয়েছে মা ফুল্লরার মন্দির । এখানেও ন’কাকা বেশ কয়েকবার গেছিলেন। এই মন্দির প্রাঙ্গণে একবার কয়েকজনকে উনি দীক্ষাও দিয়েছিলেন ! এখানে প্রত্যেকবার মায়ের পুজো দেওয়া তো হয়েছিলই – দু-একবার এখানে মায়ের ভোগ-প্রসাদও খাওয়া হয়েছিল ! একটা জিনিস লক্ষ্য করেছিলাম অট্টহাস সতীপীঠে এবং মা ফুল্লরার ওখানে দুপুরের প্রসাদে তেঁতুলের টক compulsory ! মা ফুল্লরার প্রসাদ খাবার সময় খুব সম্ভবত মাছের টক দিয়েছিল বলে মনে হচ্ছে!
লাভপুরে আমাদের আশ্রমের ভক্ত রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর – উনি এবং ওনার স্ত্রী _দুজনেই ন’কাকাকে খুব শ্রদ্ধা করতেন ! ফলে ওদের বাড়িও দু-একবার যাওয়া হয়েছিল । খুব ভালো মানুষ ওরা – ন’কাকার সহযাত্রী সবাইকেই খুবই আপ্যায়ন ও যত্ন করেছিল ৷ রবীন্দ্রনাথ বাবুর বাড়ির প্রায় পাশাপাশিই – কথা সাহিত্যিক তারাশঙ্করের ভিটেবাড়ি । এটাও সরকার অধিগ্রহণ করেছে! খুব একটা ভালো ভাবে না হলেও – যাহোক করে ওখানে একটা সংগ্রহশালা গড়ে উঠেছে এবং তারাশঙ্করের পৈতৃক ভিটের অংশগুলি রক্ষণাবেক্ষণের চেষ্টা চলছে ! তারাশঙ্করের ভিটে দর্শনের পরই ন’কাকা শুরু করলেন – তারাশঙ্করের আদ্যোপান্ত ইতিহাস । তারাশঙ্করের এক বাল্য বিধবা পিসিমা ছিলেন, যিনি প্রায়ই তারাপীঠে বামদেবের কাছে যেতেন এবং বামদেবকে গুরুর মতো শ্রদ্ধা করতেন –! চাটুজ্জে বাড়িতে অনেকদিন পরে শিশুপুত্র হওয়ায়(তারাশঙ্করের জন্ম হোলে) ওই পিসি সেই খবর নিয়ে চলে যান ‘বামা’-র কাছে শিশুর জন্য আশীর্বাদ প্রার্থনা করতে এবং তার নামকরণ করাতে ! বামদেব আশীর্বাদ করেছিলেন এবং ৺মা তারার নামে নাম রাখতে বলে দিয়েছিলেন – তাই ছেলের নাম হয় তারাশঙ্কর । বামদেব ওই পিসি-কে আরও বলে দিয়েছিলেন – মায়ের নামে নাম রাখলে ওই ছেলে একদিন খুব নাম করবে , তার বিরাট খ্যাতি হবে ।
ন’কাকার কাছে এইসব ইতিহাস শুনতে শুনতে আমার গুরু মহারাজের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল ! গুরু মহারাজ একদিন সতীপীঠ অট্টহাস (ওটা বীরভূমের নিকটস্থ হলেও পূর্ব বর্ধমানের মধ্যে পড়ে ৷) সম্বন্ধে আলোচনা করছিলেন ৷ উনি বলেছিলেন – ” আমি যখন ছোট বয়সে অট্টহাস সতীপীঠ যাই, তখন ওখানে গভীর জঙ্গল ছিল । পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ঈশানী নদীতে কোন নৌকা ছিল না (এখন ব্রিজ হয়ে গেছে – তখন ছিল না) , শুধু ছিল তালগাছের ডোঙা (তালগাছের গোড়ার দিকটা ১৫/২o ফুট লম্বা করে কেটে নেওয়া হতো । এবার এক ফুট মতো মাপ নিয়ে সরু করে মাঝখান বরাবর সমান করে করাত , ছেনী ইত্যাদির সাহায্যে কেটে তুলে ফেলে দেওয়া হতো ৷ দুটো ধার বা প্রান্ত-কে কাটা হতো না – ফলে মাঝখানটা নৌকার খোলের মতো হয়ে যেতো ! এইবার সেটাকে জলে ভাসিয়ে দিলেই – ওটা ছোট নৌকার কাজ করতো । তিন-চার জন যাত্রীকে একবারে পার করা যেতো ! কিন্তু যাত্রীরা টলমল করলেই ডোঙা ডুবে যেতো ! ফলে গভীর জলে এই জলযান খুবই মারাত্মক ,মোটেই নিরাপদ নয় !) ৷ আমি ডোঙা পার হয়ে অট্টহাসের জঙ্গলে মায়ের মন্দিরে গেছিলাম । ওখানে তখন সন্ধ্যার পর আর কোনো সাধারণ মানুষ যেতো না ! পুরোহিত মশাই সারাদিন থাকতো , ভক্তরাও ঐ গ্রাম বা ভিন্নগ্রাম থেকে শুধুমাত্র দিনের বেলাতেই ✓রী মায়ের পুজো দিতে আসতো ৷ দুপুরে প্রতিদিন মায়ের অন্নভোগ হোত – যাত্রীরা কেউ থাকলে তারাও প্রসাদ পেতো । কিন্তু সন্ধ্যার প্রাক্কালে পুরোহিত মশাই মাকে ‘শীতল’ নিবেদন করে চলে যেতো, রাত্রে ওই জঙ্গলে আর কেউ আসতো না !! শুধু ওখানে থাকতো সাধু-সন্তরা অথবা তান্ত্রিক-কাপালিকরা ! তাছাড়া গভীর রাতে অনেক সময় আসতো ডাকাতের দল ! তারা মায়ের পুজো করে , মায়ের কাছে প্রার্থনা করে চলে যেতো ডাকাতি করতে !”
গুরু মহারাজ তখনকার অট্টহাসে অর্থাৎ গভীর জঙ্গলাকীর্ণ নির্জন অট্টহাসে ৭ দিন ছিলেন ৷ উনি নিশ্চয়ই লাভপুরে ফুল্লরাতলাতেও গেছিলেন – কিন্তু সেটা এইরকম ভাবে বিস্তারিত কিছু বলেননি ! কিন্তু গুরুমহারাজ এটা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে , প্রাচীন সতীপীঠ হ’ল অট্টহাস , লাভপুরের ফুল্লরাতলাও আগে থাকতেই ছিল __কিন্তু ততটা Highlighted ছিল না। কথা সাহিত্যিক তারাশঙ্করের সাহিত্যে এই দেবীর মাহাত্ম্য কথা প্রচারিত হবার পর থেকেই কলকাতার শিক্ষিত সমাজ এখানে যাওয়া আসা শুরু করে। তখন কলকাতায় তারাশঙ্করের খুবই নাম-যশ ! ওনার লেখার সূত্র ধরে অনেক বড় মাপের মানুষ তখন লাভপুরে আসতে শুরু করলো এবং ফুল্লরা মায়ের খ্যাতি _অট্টহাস অপেক্ষা যেন অনেকটাই বেড়ে যেতে লেগেছিল ।(ক্রমশঃ)