[যে কোন মহাপুরুষের জীবনে ভক্তদের ভক্তির অত্যাচার একটা অন্যতম অঙ্গ। সেই প্রসঙ্গেই কথা হচ্ছিল]
গোয়ালে গরুর কাজ করতে গিয়ে তখন প্রায়ই শুনতাম ন’কাকার বা ন’কাকিমার পায়ে চোট লেগেছে কিংবা গরুর শিং লেগে গায়ের কোনো জায়গা কেটে গেছে ৷ এইসব কাজেও তিলক (বা ত্রিলোচন রায়) ওনাদেরকে প্রচুর সাহায্য করতো ৷ তাছাড়া ছোটখাটো ইলেকট্রিক্যাল সমস্যা, দোকান-বাজার যাওয়া – ইত্যাদি একপ্রকার সমস্ত কাজেই তিলক ঐ বাড়ির প্রায় সব কাজই কোরতো ।
আমরা যারা ন’কাকাকে ভালবাসতাম, অথচ দূরে দূরে থাকি (যদিও মহাপুরুষদের কাছে ‘দূর’ বা ‘কাছে’র সংজ্ঞা আলাদা), তারা অনেকটাই নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম – তিলকের স্বেচ্ছায় ন’কাকার বাড়িতে করা এই সেবাকাজ দেখে ! যতই হোক ন’কাকা বা ন’কাকিমার বয়স হয়েছে (যদিও ওনাদের Physical বয়সটা বয়সই নয়) , যদি সব সময়কার জন্য একজন Helping Hand থাকে তাহলে তো নিশ্চয়ই ভালো হয় !
কিন্তু যা আমাদের বেশিরভাগ মানুষের স্বভাবে বা সংস্কারে রয়েছে – তার বাইরে তো আমরা যেতে চাই না বা যেতে পারিও না ৷ এদের মধ্যে এক হ’ল – কোনো ভালো জিনিসকেই আমরা ঠিক মতো ধরে রাখতে পারি না ! দুই – নিজেদের মানদন্ড দিয়ে বাইরের সবকিছুই মাপতে যাই, এমনকি মহাপুরুষদেরকেও। ফলে – মহাপুরুষদের বিশালতাকে ওই মিটারে মাপতে গিয়ে জীবনের সবচাইতে ভুলটা করে ফেলি ! তিন নম্বরটা হ’ল – কারো সাথে মেশামেশি করতে করতেই তার প্রতি একটা অধিকারবোধ আসে ৷ আর যদি তিনি কোন Great Man হন – তাহলে তো কথাই নেই ! যেহেতু অনেক মানুষ ওই মহামানবটির কাছে আসে তাঁকে ভালোবাসে বা ভক্তি করে – তখন ওই মহান মানুষটির কাছে কাছে থাকা, একটু-আধটু অধিকার প্রাপ্ত ব্যক্তির মধ্যে বিশাল অহমিকার জন্ম নেয় !
ধরে নিন ‘আমি’-ই সেই ব্যক্তি – তাহলে আমি তখন নিজেকে মনে করব ‘আমি যেন দক্ষিণেশ্বরের ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের কৃপাপ্রাপ্ত হৃদয় ! যে ঠাকুরের divine touch পেয়ে বলেছিল – ” ও মামা ! আমরা তো এখানকার মানুষ নই গো (তখন হৃদয় নিজের শরীরসহ সবকিছুকে জ্যোতির্ময় দেখছিল !)! চল-চল, আমরা জগত উদ্ধার করিগে !”
ঠাকুর দেখলেন হৃদয়ের আধার এখনো অতটা প্রস্তুত হয় নাই – তাই উনি পুনরায় হৃদয়ের হৃদয়ে Touch করে তার পূর্বের অবস্থা (মনুষ্যভাবে) ফিরিয়ে দিয়েছিলেন !
সবক্ষেত্রেই মহাপুরুষদেরকে এটাই করতে হয় – আমরা গুরু মহারাজকেও দেখেছি তাঁর কাছাকাছি থাকার সুযোগ পাওয়া ব্যক্তিদেরকে তিনি বারবার তিরস্কার করে, শাসন করে – ওই পূর্বোক্ত ত্রুটি সংশোধনের চেষ্টা করতেন ! কতবার ওনাকে বলতে শুনেছি – “তোরা আমার কথা ঠিকমতো পালন করছিস না, তোদের আচরনের দ্বারা ভক্তদের মনে অসন্তোষ সৃষ্টি হচ্ছে! এর জন্য তোদের প্রারব্ধ ভুগতে হবে ৷ মানুষ আমার কাছে ভালবেসে আসতে চায় – এখানে থাকতে চায়, আর তুই(/তোরা) তাদের মনে ব্যাথা দিস্ ! এমন এমন কথা বলিস – যে তারা চোখের জল ফেলতে ফেলতে আমার কাছে আসে ! এগুলো ভালো নয় – এগুলো করবি না ৷ এমন করলে প্রারব্ধ ভোগের হাত থেকে কিছুতেই রেহাই পাবি না !”
ত্রিলোচনের ক্ষেত্রেও এমনি সাধারণ-ই কিছু ঘটনা ঘটেছিল ৷ আমরা দেখলাম – যে ত্রিলোচন (তিলক) মা-বাবার (ন’কাকা-ন’কাকিমা) এত সেবা করতো, এত খেয়াল রাখতো যার জন্য আমরা দূরবর্তী স্থানের ভক্তরা নিশ্চিন্তে থাকতাম – সেই ত্রিলোচন-ই ধীরে ধীরে ন’কাকার বাড়ি থেকে দূরে(স্থুলভাবে) চলে গেল ! মাঝে তো খুবই মান-অভিমানের পালা চলেছিল, ন’কাকার শরীর ছাড়ার আগে সেইটা অবশ্য অনেকটা কম হয়েছিল ৷
আমরা এই অপ্রিয় আলোচনাটাও করে রাখলাম – কারণ আবার মহাপুরুষগণ শরীর নেবেন, আবার আমাদেরই অনেকে তাঁদের কাছাকাছি থাকার বা তাঁদের সেবা করার সুযোগ পাবো – আমরা যেন এইসব ঘটনা থেকে শিক্ষা লাভ করি ! আমরা যেন নিজেদের জায়গাটা সম্বন্ধে সদা-সর্বদা ওয়াকিবহাল থাকি ! আমাদেরই করা সামান্য ভুলের খেসারত দিতে গিয়ে যেন আমরা মানব জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সুযোগটা Miss না করে যাই ! মহাপুরুষেরা কৃপা করার জন্যই তো শরীর নেন – তাই তাঁদের কৃপা করা বা করুণা করাটাই সহজতা, এটা যেন তাদের স্বভাব ৷ সুতরাং আমরা যদি আমাদের অসহজতাটা একটু সরিয়ে, আমাদের নিজেদের নানারকম অভিমানগুলোকে দূরে রেখে, তাঁর কাছে যেতে চাই – তাহলে তিনি দুহাত বাড়িয়ে আমাদেরকে কাছে টেনে নেবার জন্য প্রস্তুত ! হ্যাঁ – হ্যাঁ – আপনারা ঠিকই শুনছেন – মহাপুরুষ যখন ধরণীর ধূলায় অবতীর্ণ হ’ন – তিনি এতটাই সহজ অবস্থায় – সহজলভ্য অবস্থায় নিজেকে মেলে ধরেন । আপনারা যারা এই কথাগুলো শুনছেন বা পড়ছেন – তারা এটাকে অন্তরের গভীরতম প্রদেশে খোদাই করে রেখে দেবেন, যাতে করে যে কোন জন্ম-জন্মান্তরেও যেন কথাটা বিস্মৃত না হ’ন ৷ যখনই কোনো মহামানবকে কাছে পাবেন – নিজের সমস্ত দুর্বলতা দূর করে তাঁর চরণতলে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলবেন – ” প্রভু আমাকে তোমার কাজের সঙ্গী করে নাও !” কোনো “দাও”– “দাও” নয় – শুধু একটা কথাই বলা, ” প্রভু আমাকে নাও !” ব্যস্ ! দেখবেন তিনি কত খুশি হবেন – তিনি আপনাকে তাঁর একান্ত আপন করে নেবেন । এতটা আপন – যেন আর কেউ হয় না – এতটা আপন একমাত্র ঈশ্বরই হতে পারে – ভগবানই হতে পারে ! মর্তের গুরু-ই তো ঈশ্বরের অবতার বা ভগবান ! [ক্রমশঃ]