[ গুরুমহারাজ বা ন’কাকার ন্যায় মহাপুরুষেরা যাকে একবার গ্রহন করেন, তাঁরা কখনই আর তাকে বর্জন করেন না। সর্বোপরি যাকে প্রথম দিনে যেভাবে মর্যাদা দিয়েছেন _শেষ পর্যন্ত সেটা বজায় রেখেছেন বা হয়তো আরো সেটা বাড়িযেছেন কিন্ত কমান নি। এইসব বিষয়েই কথা হচ্ছিল।]
গুরুমহারাজ বলেছিলেন, “যে সমস্ত মানুষ সদ্গুরুর কাছে দীক্ষা নিয়ে তাঁর নির্দেশ পালন ঠিকমতো করে তাদের উপর গুরু প্রসন্ন থাকে, ফলে তাদের কথা স্বতন্ত্র কিন্তু বাকীদেরকে এই শরীরের মৃত্যুর পর সূক্ষ্ম অবস্থায় সাধন-ভজন করতে হয়! সেখানেও তাদের জন্য মাস্টার রয়েছে – Trainer রয়েছে ! সেই অবস্থায় যেহেতু স্থুল ইন্দ্রিয়াদি থাকে না – তাই অনেকটা ঝামেলা মুক্ত অবস্থায় সাধন-ভজন করানো যায়, ওখানে এটাই করা হয় ।”
গুরু মহারাজের কাছে এই কথাগুলি শোনার বেশ কিছুদিন পর বনগ্রাম আশ্রমের লাইব্রেরী থেকে আমি পরমহংস যোগানন্দের একটা বই পাই – “যোগী কথামৃত” ৷ সেখানে দেখি যোগানন্দের গুরুদেব স্থুলশরীর ছাড়ার পরেও তার শিষ্য যোগানন্দের সাথে স্থূলশরীরে যোগাযোগ করছেন এবং তাকে তাঁর শরীর ছাড়ার পর কি অবস্থায় তিনি রয়েছেন তা বোঝাতে গিয়ে বলছেন যে, তিনি এখন সূক্ষ্ম অবস্থায় সূক্ষ্ম শরীরধারীদের “গুরু” হিসাবে রয়েছেন ! তিনি ওই অবস্থায় তাদেরকে আধ্যাত্মিক ভাবে উন্নত করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন !
এছাড়াও গুরু মহারাজের কাছে শুনেছিলাম – ন’কাকার বাবার কথা! যিনি স্থুলশরীর ছাড়ার অনেকদিন পরে সূক্ষ্ম শরীরে গুরু মহারাজের সাথে অমরনাথ তীর্থ দর্শন করতে গিয়েছিলেন ! পথে যেতে যেতে গুরু মহারাজ অনেক সময় ওনার সাথে স্থূলভাবেই কথা বলে ফেলতেন (ন’কাকার বাবার সুক্ষশরীর হলেও, গুরু মহারাজের তো স্থূল শরীর _তাই অমনটা হচ্ছিল!) – এটা দেখে ওনার সাথে থাকা উত্তর ভারতের ভক্তরা একটু আশ্চর্য হয়ে ওনাকে জিজ্ঞাসাও করেছিল – ” গুরুজী ! আপনি পথ চলতে চলতে মাঝে মাঝে কার সাথে কথা বলেন ?” গুরু মহারাজ এই জিজ্ঞাসাটি হেসে এড়িয়ে গিয়েছিলেন । পরে উনি আমাদেরকে বলেছিলেন – অমরনাথ যাওয়ার ওই দলে কয়েকজন মহিলাও ছিল, ওরা কোনো সূক্ষ্ম শরীরধারী সঙ্গে সঙ্গে রয়েছে__এই কথাটা জানতে পারলে হয়তো অস্বস্তিতে পড়ে যাবে বা ভয় পাবে – তাই উনি কারুকেই আসল কথাটা বলেন নি ! ঘটনা ঘটে যাবার অনেক পরে গুরু মহারাজ বনগ্রাম আশ্রমে সিটিং-এ এসব কথা বলেছিলেন ৷
যে বিষয়টি নিয়ে এতোক্ষণ আলোচনা হোলো, তাতে বোঝা গেল এই যে, মহাপুরুষগণ যাকে একবার গ্রহণ করেন – তাকে আর সহজে ত্যাগ করেন না ! ‘সহজে’ কথাটা ব্যবহার করা হল এই জন্য যে, গুরুমহারাজ একবার বলেছিলেন – “যে কোনো নিঃস্বার্থ সেবাকার্য্য করছে এমন ব্যক্তি অথবা আধ্যাত্মিক ব্যক্তির কাছে নানাভাবে সাহায্য আসে, সেই সাহায্য অদৃশ্যভাবে আসে (উনি বলেছিলেন এই পৃথিবীর ভালো-মন্দের ভার যে গুরুকুলের উপর থাকে, তাঁরাই ঐ ধরণের জনকল্যাণকরকারী ব্যক্তিকে সাহায্য করেন) ! ওই ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা বুঝতেই পারবে না – কিভাবে কিভাবে তাদের কাজের অগ্রগতি হয়ে যাচ্ছে! হয়তো মনে হচ্ছে সামনে ভীষণ প্রতিবন্ধকতা – কাজটা হয়তো সাকসেসফুল হবেই না ! কিন্তু দেখা যাবে _কিছুদিনের মধ্যেই সব ঠিক হয়ে যাচ্ছে ! শুধু ধৈর্য্য, নিষ্ঠা এবং ঈশ্বরের প্রতি অবিচল বিশ্বাস থাকলে কাজটি সুসম্পন্ন হবেই হবে। হয়তো দেখা যাবে যেরকমটা মনে করা হয়েছিল – তার থেকেও ভালো, বা আরও বিশাল করে কাজটা হয়ে গেল!
এরকমটাই তো হয় ! যত বিরাট বিরাট সেবা প্রতিষ্ঠান, মঠ, মিশন, অন্যান্য ধর্মীয় ধর্মস্থান, লঙ্গরখানা – এগুলি সৃষ্টিই বা হচ্ছে কি করে এবং এইগুলি সব চলছেই বা কি করে ? কোনো না কোনো আধ্যাত্মিক ব্যক্তির দ্বারা এই সেবা প্রতিষ্ঠান বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির প্রথম পথ চলা খুব‌ই ধীর পদক্ষেপে শুরু হয় – তারপর তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে কিছু ত্যাগী মানুষ, আধ্যাত্মিক মানুষ সেই কাজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন – ব্যস্, শুরু হয়ে গেল কর্মযজ্ঞ ! এবার এই যজ্ঞের ফল পেতে থাকে সমাজের মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীরাও ! ধীরে ধীরে এই কর্মকাণ্ড বা প্রতিষ্ঠানটি বিশাল থেকে বিশালতর রূপ নেয় ! ওই যে বলা হোলো – অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে, সাহায্য আসতেই থাকে – আসতেই থাকে! এই সাহায্য ততক্ষণ আসতে থাকবে – যতক্ষণ ওই প্রতিষ্ঠানটির কর্মীগণ (প্রতিষ্ঠানটি সৃষ্টির ২/৩ জেনারেশন পর_সাধারনতঃ আর নিষ্ঠা,ভক্তি অতোটা থাকে না) তাদের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্যের প্রতি নিষ্ঠাবান থাকে। কিন্তু যদি মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে আসে তাহলেই গন্ডগোল ! ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটির বা সেবামূলক কেন্দ্রটির সুনাম নষ্ট হয়ে যায় ! আর ওখান থেকে কোনো নিঃস্বার্থ সেবাকার্য হয় না –এমন দেখা গেছে যে, ভক্ত মানুষজনেরাও তাদের সাহায্যের হাত গুটিয়ে নিয়েছে! কেন্দ্রটির কর্তাদের তখন ভক্তজনের চাঁদা,ডোনেশন ইত্যাদির উপর অথবা কেন্দ্রের নিজস্ব উপার্জনের দিকে নজর দিতে হয়_নাহলে কেন্দ্রটি‌ই বন্ধ হয়ে যায় ! তবে এসব হয় অনেক পরে! আগে যেটা হয়, সেটা হচ্ছে, ওই যে গুরুকুল – ওনারাই তাঁদের অদৃশ্য শক্তির supply Line-টা কেটে দেন ! আর ওইটা কেটে দেওয়ার জন্যই পরবর্তী ব্যপারগুলো পরপর ঘটতে দেখা যায় !
সুতরাং যে কোনো আধ্যাত্মিক মানুষ (যারা সৎ, নিষ্কপট, সহজ) যতক্ষণ তাঁর লক্ষ্যে অবিচল থাকে, নিষ্ঠায় কোনো ঘাটতি না থাকে – ততক্ষণ সে তরতরিয়ে এগিয়ে যায়, কোন বাধাই তার কাছে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে না ! কিন্তু যেইমাত্র তার পদস্খলন ঘটে, ওই ব্যক্তির মধ্যে অহংকার, অভিমান জন্মে যায় – তখনই ওই সাহায্য বন্ধ হয়ে যায়, আর ওই ব্যক্তির অধঃপতন ঘটে যায় । যে আধ্যাত্মিক শক্তি সে একটু একটু করে সঞ্চয় করেছিল, সেগুলি ধীরে ধীরে সব নষ্ট হয়ে যায় এবং ওই ব্যক্তি একটি Common man-এ পরিণত হয়ে যায় । কি দুর্ভাগ্য ! কোনো ধনী ব্যক্তি যদি সব ধন হারিয়ে ফেলে একেবারে রাস্তায় ভিখারী হয়ে যায়, তখন তার যে দুর্দশা হয় – এক্ষেত্রে অর্থাৎ কোন আধ্যাত্মিক ব্যক্তি যদি তারই নিজের করা অপরাধের জন্য তার সাধন শক্তি হারিয়ে Common man-এ পরিণত হয় – তার কষ্ট হয় আরও শতগুন বেশি ! [ক্রমশঃ]