[বোলপুর বা শ্রীরামপুর ছাড়াও ন’কাকা অন্যত্র বিভিন্ন ভক্তদের বাড়িতেও যেতেন। এখন সেই সব কথা হচ্ছিল।]
সিঙ্গুর বা তার আশেপাশে আরো দু-চারটি বাড়িতে ন’কাকা যেতেন অর্থাৎ সেই বাড়ির ভক্ত মানুষজনেরা ওনাকে যত্ন করে নিয়ে যেতো । এদের মধ্যে কামারকুন্ডু-র ডাক্তারবাবু হারাধন মান্নার নাম উল্লেখযোগ্য ! ডাক্তারবাবু এবং ওনার স্ত্রী খুবই ভক্ত মানুষ । আশ্রমের যে কোনো মহারাজ বা কোনো ব্রহ্মচারিণী অসুস্থ হলে তাদের সকলের অন্যতম একটি নিরাপদ স্থান হোলো কামারকুন্ডুতে ডাক্তার মান্নার নার্সিংহোম । ন’কাকাও দু-একবার নার্সিংহোমে দু’চারদিন করে কাটিয়েছেন । এছাড়া অন্য কোনো কারণে বা ডাক্তারবাবুদের (ডাক্তার বাবু এবং ওনার স্ত্রী, ডাক্তারবাবুর স্ত্রী মনিকা খুবই ভক্তিমতী এবং ডাক্তারবাবুর যথার্থ সহধর্মিনী !) আমন্ত্রণে ন’কাকা অনেকসময় ডাক্তারবাবুর বাড়িতেও যেতেন । ডাক্তারবাবু(হারাধন মান্না) সম্বন্ধে কথা বলতে গিয়ে ন’কাকা আমাকে বলেছিলেন – “ডাক্তার মান্না ভালো মানুষ ! দেখো বাবা ! ‘বড়’ সবাই হোতে পারে না ! ‘বড়’-র বড় গুণ থাকতে হবে – তবেই তো সে বড় হবে ৷ ডাক্তার তো কতই রয়েছে – কিন্তু মান্না ডাক্তারের মতো বড় মনের মানুষ তুমি কটা পাবে ! আশ্রমের যে কারো কিছু হোলেই মান্নার নার্সিংহোমে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে ! এটা কি কম কথা ? কে – কার ঝামেলা নেয় বলো তো ! খরচ-খরচা ইত্যাদি ছাড়াও এ সবের জন্যে তো নিজেকেও একটা ঝামেলা ভোগ করতে হয় ! কিন্তু ডাক্তার বা ওর স্ত্রী সেটা মনে করে না ! গুরুর প্রতি ওদের এত বিশ্বাস যে, আশ্রমের লোক মানেই– ওরা ‘নিজেদের লোক’ বলেই মনে করে । নার্সিংহোমে আশ্রমের কেউ ভর্তি থাকলে ডাক্তার তো প্রত্যহ দুবেলা visit-এ আসেই, ডাক্তারের স্ত্রীও নিয়মিত তাকে দেখে যায় – ঠিক মতো যত্ন হচ্ছে কিনা তার খোঁজ খবর নেয় । এগুলো কি কম কথা বাবা৷ সাধন-ভজন _শুধু চোখ বুঁজে বসে থাকলেই হয়, অন্য ভাবে কি হয় না? হয়, _ওদের(ডাক্তারবাবু এবং ওনার স্ত্রী) সাধন-ভজন এইভাবেই হচ্ছে! ”
ন’কাকার মুখে বেশিরভাগ মানুষের প্রশংসার কথাই শুধু শুনতাম । কদাচিৎ উনি কোনো মানুষের দোষ দেখতেন বা তার কোনো দোষের কথা আলোচনা করতেন । অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ধরনের প্রসঙ্গের অবতারণা হলে উনি কথাটা এড়িয়ে যেতেন! আমাদের মধ্যে কেউ কোনো অন্য ব্যক্তির দোষের কথা বলতে চাইলে উনি বিরক্ত হতেন ! বলতেন – “বাবা ! মানুষের দোষ দেখে কি হবে ! ওইসব দোষ তো আমারও রয়েছে ! আমি ওর জায়গায় থাকলে হয়তো আরো বেশি বেশি করে খারাপ কাজ করতাম ! ওর জায়গায় যেতে পারিনি বলেই হয়তো – inferior complex থেকে ‘ওর’ সমালোচনা করছি ! তাই কারো দোষ না দেখে তার যে গুলো ভালো দিক – সেইটা দেখো ! তাহলে দেখবে – নিজেরাই মহান হয়ে উঠবে ! দ্যাখো বাবা ! নিজেকে মহান করে গড়ে তোলাই মানব জীবনের উদ্দেশ্য ! অন্য লোকের দিকে তাকিয়ে কি লাভ ?”
ন’কাকা আরও বলেছিলেন _”সেই মহান মানুষ স্বামী পরমানন্দকে দ্যাখো ! সে তো সবাইকে নিয়ে কেমন সুন্দরভাবে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো_তার তো কোনদিন কখনো কোনো অসুবিধা হয় নি ! একটা ছোট কুঁড়েঘর দিয়ে বনগ্রাম আশ্রমের প্রতিষ্ঠা করেছিল, আর আজকে কি দেখছো – কোটি কোটি টাকার বিল্ডিং – শতশত আবাসিক ! তাছাড়াও কত শত লোক আসছে – যাচ্ছে । শুধুমাত্র আশ্রমের রান্নাঘর চালানোটাই কি কম কথা বাবা ! ছোটখাট একটা সংসার চালাতে গিয়ে মানুষ হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে – আর প্রতিদিন হাজার লোকের ‘পাত’ পরছে (হাজার লোক থালায়/পাতায় খাচ্ছে) – এটা যোগানো ঐ পরমানন্দ ‘ভগবান’ – বলেই তাঁর পক্ষে সম্ভব ! এসব কথা কে আর ভাবছে বাবা ! আমি তো প্রতিদিন আশ্রমে যাই – দেখি, অনেক আশ্রমিক আছে তারা যেন নিশ্চিন্ত হয়ে ওখানে থাকছে – খাচ্ছে ! ভাবখানা এই যে – আশ্রমে রয়েছি, তাতেই সবাইকে উদ্ধার করে দিয়েছি ! কিন্তু তাদের সবার ভাবার দরকার – ‘ আমি কি করছি !’ আমি যাঁকে দেখে এখানে এসেছি – তাঁকে প্রসন্ন করাই আমার উদ্দেশ্য ! আমাকেও তো বিবেকের জাগরণ এবং আত্মিক উত্তরণ ঘটাতে হবে ! সেই সব চিন্তা যাদের নেই তাদের আশ্রম-জীবন বৃথা ! পরমানন্দ পরম করুণাময় – তাই আশ্রমে কোন নিয়ম করে নি ৷ আমি পরমানন্দকে বারবার বলেছিলাম – ‘আশ্রমিকদের জন্য কিছু কিছু নিয়ম করো ‘ – কিন্তু ও বলল – “ন`কাকা ! আমি থাকতে এখানে কোনও বাঁধাধরা নিয়ম হবে না !” আমার কথা নিল না, এবার আশ্রমের কর্মকর্তা যারা আছে – তারা ভুগছে ৷ দ্যাখো বাবা ! নিয়ম করতেই হবে – না হলে আশ্রম চালাতে পারবে না ৷ আজই এমন দেখছো –এরপর যত দিন যাবে, পরিস্থিতি আরও হাতের বাইরে চলে যাবে ৷”
ন’কাকা একটা কথা আমাকে প্রায়শই মনে পাড়াতেন – ” বাবা ! লোকে যে যাই বলুক, আমরা নিজেরা তো জানি যে ‘আমি কতটা যোগ্য’ হয়ে উঠতে পেরেছি ৷ গুরুমহারাজও বলতেন – ‘ খুদ জানতা হ্যায় আওর খোদা জানতা হ্যায় ৷’ তাই মানুষ কি বলল, কতটা মান্যিগন্যি করলো – সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো –’ নিজে হয়ে ওঠা ‘! এই যে পাঁচজনে আমাদেরকে ভালোবাসছে, কাছে ডাকছে, যত্ন করছে – এগুলো সবই সেই মহান মানুষটার (গুরুমহারাজ) জন্য ! আমাদের আর কি আছে বলো ?” [ক্রমশঃ]