ন’কাকার মুল্যায়ন করা সত্যি সত্যিই আমাদের পক্ষে অসম্ভব! সাধারণ মানুষ ও মহাপুরুষদের মধ্যে যে কতখানি ফারাক – তা সাধারণ মানুষ কখনোই বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে পারবে না । গুরুমহারাজ একবার বলেছিলেন – ” গুরু না হলে তুই বুঝবি কি করে গুরুর গুরুত্ব কতখানি !” সত্যিই তো – আমরা অপূর্ণ আর তাঁরা পূর্ণ, – তাহলে কি করেই বা আমরা তাঁদের কোনো কাজের বা কথার মূল্যায়ন করতে পারবো ? গুরু মহারাজের মতো মহাপুরুষরা যা বলেছেন বা যা করেছেন – আমরা সেগুলিকে ‘আমাদের মতো’ করে বোঝার চেষ্টা করতে পারি – তার বেশি কি করবো ? আর এইটা করতে গিয়েই যত বিপত্তি ! আমরা বুদ্ধিমানেরা (বুদ্ধিজীবীরা) সকলেই আলাদা আলাদা ভাবে তাঁদের কথার, তাঁদের কাজের ব্যাখ্যা করতে শুরু করে দিই ! এর ফল হিসাবে জন্ম নেয় – “নানা মুনির নানা মত”! সবকিছু Hotch-Potch বা একটা জগাখিচুড়ি অবস্থায় পরিণত হয় ! এক একজন মহাপুরুষের শিক্ষা নিয়ে শুরু হয়ে যায় – আলাদা আলাদা পরম্পরা ! সেইসব আলাদা আলাদা পরম্পরার অনুগামীরা পরস্পরের সাথে বিবাদে লিপ্ত হয়ে পড়ে – একে অপরের দোষারোপ করতে শুরু করে ! এই ভাবেই শত-সহস্র-লক্ষভাগে বিভক্ত আজকের পৃথিবীর ধর্মীয় সমাজ ! আর গোলমালটা এভাবেই শুরু হয়ে গিয়েছে |
গুরুমহারাজ বলেছিলেন – আজ থেকে কয়েক লক্ষ বছর আগে, আদিম মানব সমাজে তো আর আজকের ধর্মীয় বিভাগগুলি ছিল না ! তখন ছিল শুধু নিজে বেঁচে থাকা, আর নিজের গোষ্ঠীকে বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম । প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম, অন্তঃপ্রজাতি সংগ্রাম এবং আন্তঃপ্রজাতি সংগ্রাম ! সেই মানব জীবনের শুরুর দিনগুলি থেকে আজকের এই সমাজ ব্যবস্থায় পৌঁছাতে যে কয়েক লক্ষ বৎসর লেগে গেছে – সেখানে কত রকমের যে বিবর্তন ঘটেছে, পরিবর্তন এসেছে – তার কি ইয়ত্তা আছে ? কে জানে সে সব ইতিহাস ? শুধু বর্তমান ব্যবস্থার উপর দাঁড়িয়ে কোন সিদ্ধান্ত করা কি চরম আহাম্মকি হবে না ? আর এই আহাম্মকি-ই হয়ে চলেছে সর্বক্ষেত্রে, কি সামাজিক ক্ষেত্রে, কি ধর্মীয় ক্ষেত্রে, কি অন্যান্য যে কোন ক্ষেত্রে ! এই যুগটা যেন চরম একটা ভন্ডামি-র যুগ ! প্রত্যেকেই যা করে – তা বলে না, যা বলে তা নিজের জীবনে আচরণ করে না ! সবাই জ্ঞানী – সবাই অপরকে শেখাতে চাইছে কিন্তু নিজে কোন শিক্ষা নেবে না । ভাবটা এমন – যেন সে স্বয়ম্ভু, সে স্বয়ংসম্পূর্ণ, বাইরে থেকে কিছু নেবার আর তার কোন প্রয়োজন-ই নাই ।
তাছাড়া এ যুগটা চরম অসহিষ্ণুতারও যুগ ! কেউ কাউকে সহ্য করতে পারছে না ! সবাই একার মতে চলতে চাইছে – কেউ পাশাপাশি আরো পাঁচজনকে নিয়ে একটা সহমতে আসার চেষ্টা করছে না ! এই অসহিষ্ণুতা-ই সমাজকে ক্ষয়িষ্ণু করে চলেছে ! আজ চরম অবক্ষয়ের মুখে পড়ে আছে সমগ্র মানব সমাজ ! কেউ কোথাও ভালো নেই ! আমরা তৃতীয় বিশ্বের অধিবাসীরা হয়তো ভাবছি প্রথম বা দ্বিতীয় বিশ্বের জনগণ হয়তো ভালো আছে, সুখে আছে, শান্তিতে আছে, – কিন্তু এই ভাবনাটা একদমই ভুল ! কেউ সুখে নাই – কেউ শান্তিতে নাই ! সবাই জ্বলছে ! কেউ অভাবের আগুনে – অশিক্ষার আগুনে – অজ্ঞানতার আগুনে, আবার কেউ অত্যাচার-অনাচার-সন্ত্রাসের আগুনে, ধনী দেশগুলির জনগণ জ্বলছে একাকীত্ব, প্রেমহীনতা, অস্তিত্বের সংকট – ইত্যাদির আগুনে ৷
তাহলে সত্যিই কি কেউই ভালো নাই – কেউই সুখে বা শান্তিতে নাই ? না – তা নয় ! তিনি বা তাঁরাই ভালো আছেন, সুখে-শান্তিতে আছেন – যিনি বা যাঁরা হৃদয় দিয়ে বিশ্বাস করেন বা মনে-প্রাণে বুঝেছেন যে, ” নাল্পে সুখমস্তু – ভূমৈব সুখম্ ।” ঋষিরা জ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখেছিলেন _জাগতিক বিষয়সমূহ সবই “অল্প” — একমাত্র ব্রক্ষ-ই বিরাট । ওই যে একটু আগে বলা হয়েছিল – এই বিরাট বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে পৃথিবী গ্রহ যেন ক্ষুদ্র একটা বিন্দু বিশেষ ! সুতরাং তার মধ্যে থাকা ভোগের বিষয়সমূহ দুর্ভোগ বয়ে আনবে না তো – আর এর চেয়ে বেশি কি আনবে ? কারণ এগুলি তো ‘অল্প’! তাই (ন + অল্প) “নাল্পে সুখম্ অস্তি”– অল্পে (জাগতিক বিষয়সমূহের দ্বারা) কখনও সুখ (পরমের বোধ) আসতে পারে না _একমাত্র ‘ভূমা’-ই সুখ দিতে পারে ।
সেই অর্থে, গুরু মহারাজের পরে প্রকৃত আনন্দময় পুরুষ বা সুখী মানুষ হিসাবে আমরা খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম ন”কাকাকে!!! [ক্রমশঃ]